ফ্রিল্যান্সারের একদিন

সকাল সাতটা থেকে রাত এগারোটা, দশ পা কমিউট, চার ঘণ্টা ফ্লো স্টেট, আর একটা একাকীত্ব যেটার কোনো সলিউশন নেই

পর্ব ৫৪ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

সকাল সাতটা।

অ্যালার্ম বাজে না। কারণ অ্যালার্ম সেট করা নেই। কোথাও যেতে হবে না। কোনো বাস ধরতে হবে না। কোনো বসের সামনে ঠিক নয়টায় হাজিরা দিতে হবে না।

জাহিদ চোখ মেলে। জানালা দিয়ে আলো ঢুকছে। শীতকাল, তাই আলো একটু দেরিতে আসে। ঘরের কোণে ল্যাপটপটা ডেস্কের ওপর বসে আছে, কাল রাতে যেখানে রেখে ঘুমিয়েছিল ঠিক সেখানে। ল্যাপটপের পাশে চার্জার, মাউস, একটা খালি চায়ের কাপ।

প্রথম কাজ: ফোন চেক। Upwork অ্যাপ খুলল। দুইটা মেসেজ।

একটা লন্ডনের ক্লায়েন্ট Mr. Harrison-এর। রাত একটায় পাঠিয়েছে বাংলাদেশ সময়ে। মানে ওদের সন্ধ্যা সাতটা। লিখেছে: "Zahid, could you add a filter dropdown for the quarterly view? Should be straightforward."

"Should be straightforward." জাহিদ মনে মনে হাসল। ক্লায়েন্টদের সবকিছুই straightforward মনে হয়। কিন্তু বলল না কিছু। রিপ্লাই করল: "Sure, I'll get it done today. Will update you by EOD your time."

দ্বিতীয় মেসেজটা Upwork সিস্টেম থেকে। "You have 1 new invite." একটা প্রজেক্ট ইনভাইট। কেউ তার প্রোফাইল দেখে কাজ দিতে চাইছে। ক্লিক করে দেখল, একটা WordPress সাইটের কাজ। পাশ করে দিল। WordPress এখন আর করে না।

সকাল আটটা। রান্নাঘর থেকে পরোটা ভাজার গন্ধ আসছে।

মা রোজ সকালে পরোটা বানান। আলু ভর্তা, ডিম ভাজি। এটা জাহিদের জীবনের সবচেয়ে বড় luxury, যদিও সে এটা luxury ভাবে না। ঢাকায় যারা কাজ করে, তারা সকালে চা-বিস্কুট খেয়ে দৌড়ায়। মেসের ভাত দুপুরে। রাতে ফিরে ক্লান্ত শরীরে ম্যাগি নুডলস।

জাহিদ ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসল। বাবা আগেই খেয়ে ফেলেছেন, CNG নিয়ে বের হবেন। মিম স্কুল ড্রেস পরে চুল বাঁধছে। HSC-তে পড়ে এখন। সায়েন্স নিয়েছে। কিন্তু বায়োলজি ভালো লাগে না বলে অভিযোগ করে রোজ।

মিম বলল, "ভাইয়া, তুমি কি আজকে বাসায় থাকবে?"

জাহিদ বলল, "আমি রোজই বাসায় থাকি।"

মিম বলল, "এটাই তো সমস্যা।"

মা বললেন, "খা, ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।"

বাবা বেরিয়ে গেলেন। মিম কলেজে গেল। মা রান্নাঘর গুছিয়ে মসজিদের পাশের মহিলা মজলিসে যাবেন। বাড়িতে জাহিদ একা। ল্যাপটপ আর সে।

সকাল নয়টা। কাজ শুরু।

আজকের মেইন প্রজেক্ট: অস্ট্রেলিয়ার একটা ছোট অ্যাকাউন্টিং ফার্মের জন্য একটা ড্যাশবোর্ড। ফার্মের নাম Greenfield Accounting। মেলবোর্নে। তিনজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট, একজন রিসেপশনিস্ট। ছোট ফার্ম। কিন্তু তাদের ক্লায়েন্ট প্রায় দুইশো, বেশিরভাগ ছোট ব্যবসা।

ড্যাশবোর্ডটায় কী থাকবে: ক্লায়েন্টদের ইনভয়েস ট্র্যাকিং, পেমেন্ট স্ট্যাটাস, ট্যাক্স ডেডলাইন রিমাইন্ডার, রেভিনিউ সামারি। React ফ্রন্টেন্ড, Node.js ব্যাকেন্ড, PostgreSQL ডেটাবেস।

জাহিদ VS Code খুলল। গতকাল যেখানে থামিয়েছিল, সেখান থেকে শুরু। ইনভয়েস লিস্ট পেজের ফিল্টারিং ফিচার। ক্লায়েন্ট চায় স্ট্যাটাস অনুযায়ী ফিল্টার করতে পারুক: paid, unpaid, overdue।

কোডিং শুরু হলো।

মফস্বলের একটা টিনের চালের ঘরে বসে জাহিদ মেলবোর্নের একটা অ্যাকাউন্টিং ফার্মের জন্য সফটওয়্যার বানাচ্ছে। এই বাক্যটা ভাবলে এখনও মাঝে মাঝে অবাস্তব লাগে।

দুপুর বারোটা। লাঞ্চ।

মা ডাকলেন। ভাত, মাছের ঝোল, আলু ভাজি, ডাল। ঘরে রান্না করা খাবার। গরম।

ঢাকায় রাসেল এখন অফিসের পাশের হোটেলে মিক্সড ভাত খাচ্ছে। পঁচাত্তর টাকা। পরিমাণ কম, স্বাদ মোটামুটি।

জাহিদের খাবারের খরচ: শূন্য। বাড়িতে খায়। মা রান্না করেন। ঢাকায় একজন চাকরিজীবীর খাবারে মাসে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা যায়। জাহিদের যায় না। মফস্বলে থাকার সুবিধাগুলো এরকম। চুপচাপ, দেখা যায় না। কিন্তু আছে।

খাওয়া শেষে মা জিজ্ঞেস করলেন, "কাজ কেমন?"

জাহিদ বলল, "ভালো।"

মা বললেন, "সারাদিন ঘরে বসে থাকো, শরীর খারাপ হবে। বিকালে একটু হাঁটতে বেরোও।"

"হুম।"

দুপুর একটা। প্রপোজাল লেখার সময়।

Upwork-এ প্রতিদিন নতুন জব পোস্ট হয়। জাহিদের নিশ: React ড্যাশবোর্ড, ফুল-স্ট্যাক ওয়েব অ্যাপ। এই ক্যাটাগরিতে সার্চ করল। পাঁচটা জব বাছাই করল। পাঁচটাতে প্রপোজাল লিখল।

প্রপোজাল লেখা একটা আর্ট। বেশিরভাগ ফ্রিল্যান্সার টেমপ্লেট কপি-পেস্ট করে পাঠায়। "Dear Sir/Madam, I have read your job description..." ক্লায়েন্ট এরকম পঞ্চাশটা প্রপোজাল পায়।

জাহিদ প্রতিটা কাস্টমাইজ করে। ক্লায়েন্টের জব ডিসক্রিপশন পড়ে, ওয়েবসাইট ভিজিট করে, প্রথম লাইনেই প্রবলেমটা ধরে। "I noticed you need a way to track overdue invoices. Here's how I'd approach it..."

পাঁচটা প্রপোজাল। এক ঘণ্টা সময়। এর মধ্যে রিপ্লাই আসবে হয়তো একটায়। হয়তো শূন্যটায়। এটাই ফ্রিল্যান্সিংয়ের বাস্তবতা। দশটা প্রপোজালে একটা-দুইটা রিপ্লাই। তার মধ্যে কাজ হয় আরও কম।

কিন্তু থামা যায় না। প্রপোজাল বন্ধ করলে পাইপলাইন শুকিয়ে যায়। আর পাইপলাইন শুকিয়ে গেলে দুই মাস পর কাজ থাকবে না।

দুপুর দুইটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা।

এই চার ঘণ্টা জাহিদের দিনের সবচেয়ে দামি সময়। ডিপ কোডিং। ফ্লো স্টেট।

ফোন সাইলেন্টে। WhatsApp নোটিফিকেশন বন্ধ। ব্রাউজারে শুধু VS Code, টার্মিনাল, আর Stack Overflow। বাকি সব ট্যাব বন্ধ।

Greenfield-এর ইনভয়েস ফিল্টারিং শেষ করল তিনটার মধ্যে। তারপর Mr. Harrison-এর quarterly view ফিল্টার ড্রপডাউন। "Should be straightforward" কাজটা straightforward ছিল না। State management-এ বাগ। ডিবাগ করতে দেড় ঘণ্টা, ঠিক করতে আরও ত্রিশ মিনিট।

চারটার দিকে ক্লান্ত লাগল। কিন্তু উঠল না। কোডের ভেতরে ঢুকে গেছে। কোন ফাংশন কোথায় কল হচ্ছে, কোন কম্পোনেন্ট কোন প্রপস নিচ্ছে, সব মাথায় ম্যাপ করা। এই অবস্থা একবার ভাঙলে আবার তৈরি করতে কুড়ি মিনিট লাগে। তাই ভাঙে না।

ছয়টার দিকে সব শেষ। পেমেন্ট স্ট্যাটাস পেজে কালার কোডিং: সবুজ paid, হলুদ pending, লাল overdue।

চার ঘণ্টা। কোনো মিটিং নেই। কোনো ইন্টারাপশন নেই। শুধু কোড। এটা ফ্রিল্যান্সিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা।

সন্ধ্যা ছয়টা। মাগরিবের আজান।

জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করল। মসজিদে গেল। নামাজ পড়ে ফিরে চা খেল। মা চা বানিয়ে রেখেছেন। আদা চা, একটু বেশি চিনি দিয়ে।

ফোন চেক করল। WhatsApp-এ রাসেলের মেসেজ।

রাসেল: "ভাই, আজকে মিরপুর থেকে মতিঝিল ২ ঘণ্টা লাগল। ২ ঘণ্টা! বাসে দাঁড়িয়ে। পায়ে ব্যথা।"

জাহিদ: "কষ্টের কথা।"

রাসেল: "তুই ভালো আছিস। বাড়িতে বসে কাজ।"

জাহিদ হাসল। হ্যাঁ, বাড়িতে বসে কাজ। কমিউটের সময়: দশ পা। বিছানা থেকে ডেস্ক। দশ সেকেন্ড।

রাসেলের কমিউটে বছরে বারোশো ঘণ্টা যায়। পঞ্চাশ দিন। বছরের প্রায় দুই মাস শুধু রাস্তায়। জাহিদের কমিউট: শূন্য। এটা একটা competitive advantage যেটা কেউ হিসাবে আনে না।

রাসেল: "তুই তো সারাদিন ঘরে থাকিস। বোর হোস না?"

জাহিদ: "হই।"

সন্ধ্যা সাতটা। ক্লায়েন্ট কল।

Zoom খুলল। Mr. Harrison। লন্ডন থেকে। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। ছোট অ্যাকাউন্টিং ফার্মের মালিক। দুইজন স্টাফ। বাংলাদেশ কোথায় জানেন কি না সন্দেহ। কিন্তু জাহিদের কাজ ভালো, সেটা জানেন।

"Zahid, let me share my screen."

স্ক্রিন শেয়ার করলেন। quarterly view দেখালেন। ফিল্টার ড্রপডাউন কাজ করছে। চার্ট আপডেট হচ্ছে।

"This looks great."

চারটা শব্দ। "This looks great." কোনো বসের "well done" থেকে এই চারটা শব্দ বেশি মূল্যবান। কারণ এই চারটা শব্দের পেছনে টাকা আছে। রিভিউ আছে। আরও কাজের সম্ভাবনা আছে।

Mr. Harrison বললেন, "I have another small project coming up next month. A client portal. Would you be interested?"

"Absolutely."

কলটা পনেরো মিনিটে শেষ। কোনো ম্যানেজমেন্ট আপডেট নেই। কোনো KPI রিভিউ নেই। কোনো "let's circle back" নেই। সরাসরি কাজ দেখাও, ফিডব্যাক নাও, পরের কাজের কথা বলো। ব্যস।

রাত আটটা। ডিনার।

পরিবার একসাথে খায়। বাবা CNG চালিয়ে ফিরেছেন। ক্লান্ত। কিন্তু খাওয়ার সময় কথা বলেন। মিম কলেজের গল্প করে। ফিজিক্স স্যার ক্লাসে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, এই নিয়ে হাসাহাসি।

বাবা জিজ্ঞেস করলেন, "কাজ কেমন হলো?"

জাহিদ বলল, "ভালো। একটা নতুন প্রজেক্টের কথা হয়েছে।"

বাবা মাথা নাড়লেন। বাবা জানেন না React কী, ড্যাশবোর্ড কী, ক্লায়েন্ট কোন দেশে। বাবা শুধু জানেন, জাহিদ ল্যাপটপে কিছু একটা করে, আর মাসে টাকা আসে। এটাই যথেষ্ট।

প্রথম দিকে জিজ্ঞেস করতেন, "তুই কী করিস?" জাহিদ বোঝাত, "ওয়েবসাইট বানাই।" বাবা বলতেন, "ওয়েবসাইট কেন বানাতে হয়? সবার তো ফেসবুক আছে।" সে আলোচনা আর এগোয়নি। এখন শুধু "কাজ কেমন হলো?" আর "ভালো।" এটুকুই।

১০

রাত নয়টা। শেখার সময়।

জাহিদ প্রতিদিন রাত নয়টা থেকে এগারোটা পড়ে। নতুন জিনিস শেখে। আজকে Next.js। App Router। Server Components। ইন্ডাস্ট্রি দ্রুত বদলায়। গত বছর যেটা নতুন ছিল, এ বছর সেটা পুরনো। React Server Components এখন সবার মুখে। ক্লায়েন্টরা জিজ্ঞেস করতে শুরু করেছে, "Do you know Next.js?"

জানতে হবে। না জানলে পিছিয়ে পড়বে। পিছিয়ে পড়লে প্রপোজাল accept হবে না। প্রপোজাল accept না হলে কাজ নেই। কাজ না থাকলে টাকা নেই।

ফ্রিল্যান্সিংয়ে কেউ তোমাকে ট্রেনিং দেবে না। নিজে শিখতে হবে। ডকুমেন্টেশন, ব্লগ পোস্ট, GitHub রিপো। এগুলোই শিক্ষক।

জাহিদ Next.js-এর ডকুমেন্টেশন পড়ল। একটা প্র্যাক্টিস প্রজেক্ট বানাল। দুই সপ্তাহ পর "Do you know Next.js?" প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে: "Yes."

১১

রাত এগারোটা। দিন শেষ।

ল্যাপটপ বন্ধ করল। বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকাল। ফ্যান ঘুরছে। মশা একটা কানের কাছে গুনগুন করছে।

আজকের দিনটা কেমন গেল?

কোডিং করেছে প্রায় আট ঘণ্টা। প্রপোজাল লিখেছে পাঁচটা। ক্লায়েন্ট কল করেছে একটা। নতুন একটা জিনিস শিখেছে। মা-র হাতের রান্না খেয়েছে তিনবেলা। পরিবারের সাথে বসে খেয়েছে। বাবার সাথে কথা বলেছে। মিমের কলেজের গল্প শুনেছে।

খারাপ না।

কিন্তু...

১২

কিন্তু একটা জিনিস আছে যেটা জাহিদ কাউকে বলে না।

একাকীত্ব।

দিনের বেশিরভাগ সময় সে একা। সকালে পরিবার বের হয়ে যায়। ঘরে সে আর ল্যাপটপ। দুপুরে মা আসেন, খাওয়া হয়, আবার একা। সন্ধ্যায় পরিবার ফেরে, কিন্তু পরিবারের সাথে কাজের কথা বলা যায় না। বাবা বোঝেন না। মা বোঝেন না। মিমের নিজের পড়াশোনা।

বন্ধুরা ঢাকায়। রাসেল মতিঝিলে, সাগর গাজীপুরে, তৌফিক সিলেটে। সবাই ছড়িয়ে গেছে।

মফস্বলে জাহিদের বয়সী ছেলেরা চায়ের দোকানে আড্ডা দেয়, ক্রিকেট খেলে, রাজনীতি নিয়ে তর্ক করে। জাহিদের সাথে তাদের কোনো কমন টপিক নেই। React নিয়ে কথা বলবে কার সাথে? কোডের বাগ নিয়ে হতাশা শেয়ার করবে কার সাথে?

অফিসে যারা কাজ করে, তাদের লাঞ্চে সঙ্গী থাকে। চায়ের ব্রেকে গল্প হয়। ম্যানেজারকে নিয়ে রসিকতা হয়। এই ছোট ছোট মানবিক যোগাযোগগুলো দিনটাকে সহনীয় করে।

জাহিদের সেসব নেই। তার ক্লায়েন্টরা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে। "This looks great" বলে, টাকা দেয়, চলে যায়। কেউ জিজ্ঞেস করে না, "Zahid, how are you doing? Like, really?"

১৩

কর্পোরেটে যারা কাজ করে, তারা বলে ফ্রিল্যান্সিং স্বাধীনতা। ফ্রিল্যান্সাররা জানে ফ্রিল্যান্সিং একাকীত্ব।

স্বাধীনতা আছে। কাউকে রিপোর্ট করতে হয় না, নিজের সময় নিজে ঠিক করা যায়, অফিস পলিটিক্স নেই। এগুলো সত্য। কিন্তু আরও কিছু আছে।

কোনো career ladder নেই। প্রমোশন বলে কিছু নেই। আজকে যেটা করছ, পাঁচ বছর পরও সেটাই করবে। শুধু রেট বাড়বে। তুমি চিরকাল "the freelancer।"

কোনো মেন্টরশিপ নেই। সিনিয়র কেউ নেই যে বলবে, "এই ভুলটা করো না।" নিজে ভুল করে, নিজে শিখতে হয়।

কোনো বেনিফিট নেই। স্বাস্থ্য বীমা নেই। পেইড লিভ নেই। অসুস্থ হলে ইনকাম শূন্য। ফ্রিল্যান্সিংয়ে আজকে কাজ না করলে আজকে টাকা নেই।

আর সবচেয়ে বড় কথা: সামাজিক জীবন নেই। বিয়ের কথা উঠলে মা বলেন, "তুই কী করিস সেটা মেয়ের বাড়ির লোকজনকে বোঝাব কীভাবে?" চাকরি থাকলে সোজা, "ব্যাংকে চাকরি।" কিন্তু "ল্যাপটপে কাজ করে, বিদেশিদের সাথে" শুনে মফস্বলের মানুষ কনফিউজড হয়। "আমি ফ্রিল্যান্সার" বললে মানুষ ভাবে বেকার। "আমি সফটওয়্যার ডেভেলপার" বললে ভাবে গুগলে চাকরি করে।

১৪

রাতে ঘুমানোর আগে জাহিদ একটা কথা ভাবল।

ফ্রিল্যান্সিং মানে স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতা মাঝে মাঝে একাকীত্ব।

রাসেলের অফিসে দুই ঘণ্টা যেতে হয়। কিন্তু অফিসে বন্ধু আছে। টিম আছে। বসের সাথে ঝগড়া আছে, কিন্তু অন্তত মানুষ আছে।

জাহিদের অফিস তার ঘরের কোণে। তার সহকর্মী একটা ল্যাপটপ। তার বস একটা স্ক্রিনের ওপাশে, হাজার মাইল দূরে। তার ক্যান্টিন মা-র রান্নাঘর। তার HR ডিপার্টমেন্ট Upwork-এর অ্যালগরিদম।

এই জীবন কি ভালো?

হ্যাঁ, অনেকদিক থেকে ভালো। টাকা ভালো। সময়ের স্বাধীনতা ভালো। পরিবারের কাছে থাকা ভালো। কমিউটের যন্ত্রণা নেই, সেটা ভালো।

কিন্তু মানুষ শুধু টাকা আর সময় দিয়ে বাঁচে না। মানুষের দরকার মানুষ। দরকার সঙ্গ। দরকার এমন কেউ যে বোঝে তুমি কী করো, কেন করো, কতটা কঠিন।

জাহিদ চোখ বন্ধ করল।

কাল সকাল সাতটায় আবার একই দিন। Upwork মেসেজ চেক। পরোটা। কোডিং। প্রপোজাল। ডিপ কোডিং। মাগরিব। ক্লায়েন্ট কল। ডিনার। শেখা। ঘুম।

একই দিন। প্রতিদিন। সাত দিন সপ্তাহে।

ফ্রিল্যান্সারের কোনো শুক্রবার নেই। কোনো ছুটির দিন নেই। কারণ ছুটি মানে ইনকাম শূন্য। আর ইনকাম শূন্য মানে ভয়। সেই ভয়টা কখনো যায় না।

ফ্রিল্যান্সিং মানে স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতার দাম আছে। সেই দামটা একাকীত্ব। আর সেই একাকীত্বের কোনো invoice নেই, কোনো payment নেই, কোনো Upwork রিভিউ নেই।

শুধু একটা খালি ঘর। একটা ল্যাপটপ। আর একটা ফ্যানের শব্দ।