ডলারের হিসাব
যখন আয় ডলারে, খরচ টাকায়
১
জাহিদ হিসাব করছে।
খাতায় না। ল্যাপটপের নোটপ্যাডে। কিন্তু হিসাবটা পুরোনো ধাঁচের, যেভাবে বাবা দোকানের খাতায় করত। এক পাশে আয়, অন্য পাশে ব্যয়। মাঝখানে একটা লাইন। লাইনের ডান পাশটা বাম পাশের চেয়ে বড় হলে মাস চলবে। ছোট হলে ধার।
তফাত একটাই। বাবার হিসাব ছিল টাকায়। জাহিদের হিসাব ডলারে শুরু, টাকায় শেষ।
এই জায়গাটাতে ব্যাপারটা জটিল হয়ে যায়।
গত মাসে আপওয়ার্ক থেকে এসেছে বারোশো ডলার। তার আগের মাসে ছয়শো। তার আগের মাসে এগারোশো। কোনো প্যাটার্ন নেই। একটা মাসে তিনটা প্রজেক্ট পাওয়া যায়, পরের মাসে একটাও না। ফ্রিল্যান্সিং মানে এটাই। আজ রাজা, কাল ফকির। এর মধ্যে কোনো গ্যারান্টি নেই।
জাহিদ গড় ধরে এক হাজার ডলার।
এক হাজার ডলার। শুনতে ভালো লাগে। ইংরেজিতে বললে আরো ভালো লাগে। ওয়ান থাউজ্যান্ড ডলারস। মফস্বলের ছেলে, বাবা মুদি দোকানদার, মাসে হাজার ডলার কামায়। গল্পটা সুন্দর।
কিন্তু গল্প আর হিসাব এক জিনিস না।
২
হিসাবটা এরকম।
গ্রস আয়: ১০০০ ডলার। এটা ক্লায়েন্ট যা দেয়। কিন্তু এটা জাহিদের হাতে আসে না। মাঝখানে অনেকগুলো হাত।
প্রথম হাত: আপওয়ার্ক। দশ পার্সেন্ট কমিশন। একশো ডলার কেটে নেয়। কাজ খুঁজে দেওয়ার জন্য, প্ল্যাটফর্ম চালানোর জন্য, পেমেন্ট প্রসেস করার জন্য। জাহিদ প্রথম প্রথম রাগ করত। একশো ডলার! কিন্তু এখন বোঝে, আপওয়ার্ক ছাড়া সে ক্লায়েন্ট পেত না। মফস্বল থেকে সান ফ্রান্সিসকোর ক্লায়েন্ট ধরার আর কোনো রাস্তা নেই।
বাকি: ৯০০ ডলার।
দ্বিতীয় হাত: পেওনিয়ার। টাকা তোলার সিস্টেম। দুই পার্সেন্ট ফি। আঠারো ডলার। ছোট অংক, কিন্তু প্রতি মাসে। বছরে দুইশো ষোলো ডলার। একটা ভালো মনিটর কেনা যেত।
বাকি: ৮৮২ ডলার।
তৃতীয় হাত: ব্যাংক। পেওনিয়ার থেকে টাকা লোকাল ব্যাংকে আনতে আরো তিন পার্সেন্ট কনভার্সন লস। ডলার টু টাকা। মার্কেট রেট ১২০ টাকা, ব্যাংক দেয় ১১৬-১১৭। প্রতি ডলারে তিন-চার টাকা কম। ৮৮২ ডলারে প্রায় ছাব্বিশ ডলার লস।
বাকি: ৮৫৬ ডলার।
৮৫৬ গুণ ১২০ (মার্কেট রেটে হিসাব করলে) = ১,০২,৭২০ টাকা। কিন্তু ব্যাংক রেটে আসলে আসে প্রায় ৯৯,০০০-১,০০,০০০ টাকা।
এক লাখ টাকা। এক হাজার ডলার থেকে এক লাখ টাকা। মাঝখানে দেড়শো ডলার গায়েব। ম্যাজিক।
জাহিদ নোটপ্যাডের স্ক্রিনে তাকিয়ে রইল। সংখ্যাগুলো নীল আলোয় জ্বলছে।
তারপর ইনকাম ট্যাক্স। যদি ঠিকমতো ডিক্লেয়ার করে। প্রথম তিন লাখে দশ পার্সেন্ট, তার পরে পনেরো। মাসে প্রায় ছয় হাজার টাকা। বছরে বাহাত্তর হাজার।
ট্রু নেট: মাসে সাতানব্বই হাজার টাকা। মোটামুটি।
জাহিদ ক্যালকুলেটর বন্ধ করল। ঠোঁটের কোণে একটু হাসি। সাতানব্বই হাজার। মফস্বলে এটা অনেক টাকা। কিন্তু হাসিটা টিকল না।
৩
কারণ তুলনাটা মাথায় এসে গেল।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার, যাকে সবাই ইউএনও বলে, তার বেতন পঁয়ষট্টি হাজার টাকা। বিসিএস পাশ, ক্যাডার সার্ভিস, পুরো দেশের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। বাবা বলে, "ইউএনও সাহেব আসলে সবাই দাঁড়ায়।" ইউএনও সাহেবের গাড়ি আছে, বাংলো আছে, পিওন আছে। জাহিদের কিছুই নেই। কিন্তু জাহিদের আয় ইউএনওর চেয়ে বেশি।
সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার। আশি হাজার টাকা বেতন। ম্যানেজার সাহেব স্যুট পরে, এসি অফিসে বসে, লোকে সম্মান করে। জাহিদ লুঙ্গি পরে ঘরে বসে কাজ করে। কিন্তু জাহিদের আয় ম্যানেজারের চেয়ে বেশি।
কলেজের প্রিন্সিপাল। পঁচাত্তর হাজার। স্কুলের হেডমাস্টার। পঞ্চান্ন হাজার। থানার ওসি। বাহাত্তর হাজার।
জাহিদ সবার চেয়ে বেশি কামায়। মফস্বলে সে হয়তো সবচেয়ে বেশি আয়ের মানুষদের একজন। আর সে এটা করে ঘরে বসে, একটা ল্যাপটপে, পায়জামা পরে। কিন্তু এই "কিন্তু"টা বড়।
৪
ইউএনওর বেতন প্রতি মাসে আসে। ব্যাংক ম্যানেজারের বেতন প্রতি মাসে আসে। অসুস্থ হলে বেতন আসে। ছুটিতে গেলে বেতন আসে। বছরে দুটো বোনাস। পেনশন। প্রভিডেন্ট ফান্ড। গ্র্যাচুইটি। হেলথ ইন্স্যুরেন্স। সরকারি কোয়ার্টার।
জাহিদের কিছুই নেই।
দুই সপ্তাহ জ্বরে পড়লে আয় শূন্য। কোনো সিক লিভ নেই। কাজ না করলে টাকা নেই। এটাই চুক্তি। ফ্রিল্যান্সারের সাথে দুনিয়ার চুক্তি।
আর সবচেয়ে বড় ভয়: আপওয়ার্ক যদি অ্যাকাউন্ট ব্যান করে?
এটা হয়। জাহিদ ফেসবুক গ্রুপে দেখেছে। একজন ছেলে, তিন বছর ধরে কাজ করত, রেটিং ৯৮ পার্সেন্ট, হঠাৎ একদিন অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড। কারণ? টার্মস অফ সার্ভিসের কোনো একটা ধারা ভঙ্গ হয়েছে। কী ধারা? কেউ জানে না। আপিল করেছে। উত্তর আসেনি। তিন বছরের ক্যারিয়ার, রিভিউ, রেপুটেশন, সব শেষ। রাতারাতি।
জাহিদ সেই পোস্ট পড়ে ঘণ্টাখানেক চুপ করে বসেছিল। বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। এক হাজার ডলার। যদি কাল থেকে শূন্য?
এটাই ফ্রিল্যান্সিংয়ের অন্ধকার দিক। রাস্তাটা আলোকিত, কিন্তু রেলিং নেই। পা পিছলে গেলে ধরার কিছু নেই।
৫
বাবা বোঝে না।
বাবা বোঝে "মাসে এক লাখ আসে।" এটুকুই যথেষ্ট। বাবা দোকানে বসে গর্ব করে। "আমার ছেলে কম্পিউটারে কাজ করে। বিদেশ থেকে টাকা আসে।" পাড়ার লোকে শোনে। কেউ বিশ্বাস করে, কেউ করে না। যারা বিশ্বাস করে, তারা বলে, "ভালো ভালো, পোলাটা জেতে গেছে।" যারা করে না, তারা বলে, "কী কাম করে কে জানে, ঘরে বসে বসে।"
বাবার কাছে ডলারের হিসাব নেই। কমিশন নেই। কনভার্সন লস নেই। বাবা জানে: "টাকা আসে।" ব্যস।
মা ভিন্ন।
মা একদিন জিজ্ঞেস করল, "এই টাকাটা কতদিন আসবে?"
জাহিদ থমকে গেল। কারণ এটাই তো আসল প্রশ্ন। দশ বছর? বিশ বছর? পঞ্চাশ বছর? ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কি পঞ্চাশ বছর পর থাকবে? আপওয়ার্ক কি পঞ্চাশ বছর পর থাকবে? এআই কি জাহিদের কাজ কেড়ে নেবে?
কেউ জানে না।
"আসবে, আম্মা। চিন্তা কোরো না।"
মা কিছু বলল না। কিন্তু মায়ের চোখে জাহিদ একটা জিনিস দেখল যেটা বাবার চোখে নেই। বাবার চোখে গর্ব। মায়ের চোখে হিসাব। মা হিসাব করছে, এই আয় যদি থেমে যায়, তাহলে কী হবে। মা ভবিষ্যৎ দেখছে, বাবা বর্তমান।
মায়েরা এরকমই। তারা সবসময় পরের মাসের কথা ভাবে।
৬
জাহিদ সিদ্ধান্ত নিল।
মাসে ত্রিশ হাজার টাকা সেভিংস। বাকি সাতষট্টি হাজারে সংসার চলবে। মফস্বলে সাতষট্টি হাজারে সংসার চলে, ভালোই চলে। ভাড়া কম, খাবার সস্তা, যাতায়াত খরচ নেই কারণ বাড়ি থেকেই কাজ।
ত্রিশ হাজার টাকা। প্রতি মাসে। এক বছরে তিন লাখ ষাট হাজার। দুই বছরে সাত লাখ বিশ হাজার। তিন বছরে দশ লাখ আশি হাজার।
এটা জাহিদের ইমার্জেন্সি ফান্ড। ফ্রিল্যান্সারের পেনশন প্ল্যান। যদি কাজ বন্ধ হয়ে যায়, যদি অসুস্থ হয়, যদি আপওয়ার্ক ব্যান করে, তাহলে অন্তত ছয় মাস চলতে পারবে। ছয় মাসে অন্য কিছু একটা জোগাড় হবে। হয়তো। আশা করা ছাড়া আর কী করার আছে।
জাহিদ ব্যাংকে গিয়ে একটা ফিক্সড ডিপোজিট খুলল। ক্লার্ক জিজ্ঞেস করল, "পেশা কী?"
"ফ্রিল্যান্সার।"
ক্লার্ক অবাক হলো না। ইদানীং মফস্বলেও শব্দটা চেনা হয়ে গেছে। কিন্তু ক্লার্ক একটু অন্যভাবে তাকাল। ফ্রিল্যান্সার মানে ইনকাম সার্টিফিকেট নেই, পে-স্লিপ নেই, নিয়োগকর্তার চিঠি নেই। ব্যাংকের জন্য এটা একটা ধোঁয়াশা ক্যাটাগরি।
"ট্রেড লাইসেন্স আছে?"
"না।"
"টিন আছে?"
"আছে।"
"ইনকাম প্রুফ?"
জাহিদ আপওয়ার্কের আর্নিংস পেজ দেখাল। ক্লার্ক স্ক্রিনের দিকে তাকাল। সবুজ রঙে লেখা: Total Earnings: $14,200. ক্লার্কের ভ্রু উঁচু হলো। কিন্তু মুখে কিছু বলল না। ব্যাংক ডলারের স্ক্রিনশট ইনকাম প্রুফ হিসেবে নেয় না।
শেষ পর্যন্ত ব্যাংক স্টেটমেন্ট দিয়ে কাজ চালাল। পেওনিয়ার থেকে প্রতি মাসে যে টাকা আসে, সেটাই প্রমাণ।
জাহিদ ভাবল, এটাও একটা আজব জিনিস। সে প্রতি মাসে এক লাখ টাকা কামায়, কিন্তু ব্যাংকের কাছে সে "অপ্রমাণিত"। সিস্টেম তাকে চেনে না। সে সিস্টেমের বাইরের মানুষ।
৭
হেলথ ইন্স্যুরেন্স।
এটা জাহিদ নিজে খুঁজে বের করল। বাংলাদেশে ব্যক্তিগত হেলথ ইন্স্যুরেন্স নেওয়ার চল কম। বেশিরভাগ মানুষ হাসপাতালে গেলে পকেট থেকে দেয়। কিন্তু জাহিদ হিসাব করে দেখল, একটা বড় অপারেশন লাগলে দুই-তিন লাখ টাকা যাবে। সেভিংস শেষ। আবার শূন্য থেকে শুরু।
সে একটা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে গেল। বছরে ছয় হাজার টাকা প্রিমিয়াম। পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত কভারেজ। হাসপাতাল, অপারেশন, ওষুধ।
"পেশা?"
"ফ্রিল্যান্সার।"
আবার সেই চাহনি। কিন্তু ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি টাকা পেলে প্রশ্ন কম করে।
জাহিদ ফর্ম পূরণ করল। নমিনি: মা। ছয় হাজার টাকা দিল।
পুরো শহরে সে সম্ভবত একমাত্র ফ্রিল্যান্সার যে হেলথ ইন্স্যুরেন্স নিয়েছে। বাকিরা শুনলে হাসবে। "ইন্স্যুরেন্স? তুই কি বুড়া হইছস?" কিন্তু জাহিদ জানে, সে বুড়া হয়নি, সে হিসাব শিখেছে। ডলারে আয় করলে হিসাবটা আরো ভালো করে শিখতে হয়।
৮
কিন্তু সবকিছু হিসাব দিয়ে চলে না।
প্রেজেন্ট বায়াস। এই শব্দটা জাহিদ একটা ইউটিউব ভিডিওতে শুনেছে। মানে হলো, মানুষ ভবিষ্যতের বড় লাভের চেয়ে এখনকার ছোট আনন্দকে বেশি গুরুত্ব দেয়। একশো টাকা এখন, নাকি দুইশো টাকা ছয় মাস পর? বেশিরভাগ মানুষ বলবে: একশো টাকা এখন দাও।
ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে এটা মহামারির মতো।
জাহিদ দেখেছে। ফেসবুক গ্রুপে, ফ্রিল্যান্সার কমিউনিটিতে। একটা ছেলে প্রথম মাসে পাঁচশো ডলার পেয়েছে। পরের সপ্তাহে নতুন ফোন। আইফোন। ষাট হাজার টাকা। আরেকজন হাজার ডলার পেয়ে সিএনজি বেচে গাড়ি কিনেছে। লোন নিয়ে। ইএমআই মাসে পঁচিশ হাজার। যদি দুই মাস কাজ না পায়, ইএমআই দেবে কীভাবে?
মফস্বলে ডলার ইনকাম মানে একটা বিপজ্জনক মিশ্রণ। বড় আয়, সস্তা বাজার, আশেপাশে মানুষের চোখে ঈর্ষা। এই তিনটা মিলে একটা টান তৈরি হয়। খরচ করো। দেখাও। প্রমাণ করো।
সিএনজি ছেড়ে গাড়ি। টিনের চাল ছেড়ে পাকা বাড়ি। সাধারণ ফোন ছেড়ে আইফোন। সস্তা জামা ছেড়ে ব্র্যান্ড। দেখানোর জন্য। কাকে দেখানোর জন্য? পাড়ার লোক? আত্মীয়? নিজেকে?
জাহিদ প্রায় এই ফাঁদে পড়ে যাচ্ছিল।
৯
রাতুল ফোন করেছিল গত সপ্তাহে। রাতুল ঢাকায় থাকে, সেও ফ্রিল্যান্সার, গ্রাফিক ডিজাইনার। মাসে দেড় হাজার ডলার কামায়।
"কী করলি টাকা দিয়ে?"
"সেভ করছি।"
রাতুল হাসল। "সেভ? তুই কি বাবা-মায়ের আমলের লোক? ভোগ কর ভাই। জীবন একটাই।"
রাতুল গত মাসে মিরপুরে একটা ফ্ল্যাটে উঠেছে। ভাড়া পঁয়ত্রিশ হাজার। আগে পনেরো হাজারের ফ্ল্যাটে ছিল। কিন্তু "স্ট্যাটাস" দরকার। ক্লায়েন্টের সাথে ভিডিও কলে ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো দেখায়।
জাহিদ ভাবল, ক্লায়েন্ট কি ব্যাকগ্রাউন্ড দেখে? ক্লায়েন্ট কাজ দেখে। কিন্তু রাতুলকে বলল না। রাতুলের সাথে এসব নিয়ে তর্ক করে লাভ নেই।
"তুই একটা ভালো বাইক কিন না অন্তত," রাতুল বলল।
"বাইক লাগে না। কোথাও যাই না।"
"সেটাই তো সমস্যা। তুই কোথাও যাস না, কিছু করিস না, শুধু কাজ আর সেভ। ফ্রিল্যান্সিং করে কৃপণ হইলি?"
জাহিদ ফোন রেখে দিল। কৃপণ না। হিসেবি। দুইটা আলাদা জিনিস।
১০
তবে জাহিদ একটা জিনিস কিনল।
ল্যাপটপ।
পুরোনো ল্যাপটপটা ছিল চার জিবি র্যাম। তিন বছরের পুরোনো। কোড করতে গেলে ভিএস কোড খুলতে দুই মিনিট লাগত। ব্রাউজারে চারটা ট্যাব খুললে ফ্যান ঘুরত যেন হেলিকপ্টার উড়ছে। ডিজাইন ফাইল খুলতে গেলে ক্র্যাশ। কখনো কখনো কাজের মাঝখানে স্ক্রিন জমে যেত। আনসেভড কোড উড়ে যেত। একবার এটা ক্লায়েন্টের ডেডলাইনের দিন হয়েছিল। জাহিদ সেদিন সারারাত জেগে আবার করেছিল।
সত্তর হাজার টাকা। ষোলো জিবি র্যাম। এসএসডি। আই ফাইভ প্রসেসর। দেশে তৈরি না, ইম্পোর্ট করা। ঢাকা থেকে কুরিয়ারে আনল।
বাবা দেখে বলল, "আরেকটা কম্পিউটার?"
"এটা কারখানা, বাবা। আমার কারখানায় একটাই মেশিন। সেটা ল্যাপটপ। পুরোনোটা দিয়ে আর কাজ হচ্ছিল না।"
বাবা বুঝল না। কিন্তু মাথা নাড়ল।
মা বলল, "সত্তর হাজার?" চোখে হিসাব। সত্তর হাজার মানে দুই মাসের সেভিংসের চেয়ে বেশি। মা এটা মাথায় মাথায় হিসাব করে ফেলল।
"দরকার ছিল, আম্মা।"
"হুম।"
মায়ের "হুম" মানে: আমি বিশ্বাস করছি, কিন্তু পুরোপুরি না।
১১
নতুন ল্যাপটপে প্রথম দিন কাজ করে জাহিদ বুঝল, সে এতদিন কী কষ্ট করেছে।
ভিএস কোড তিন সেকেন্ডে খুলছে। ব্রাউজারে বারোটা ট্যাব, কোনো সমস্যা নেই। ডিজাইন ফাইল স্মুথ। ফ্যান ঘুরছে না। কাজ দ্রুত হচ্ছে। আগে যেটা করতে ছয় ঘণ্টা লাগত, এখন চার ঘণ্টায় হচ্ছে। দুই ঘণ্টা বেঁচে যাচ্ছে। সেই দুই ঘণ্টায় আরেকটা কাজ নেওয়া যায়। অথবা বিশ্রাম নেওয়া যায়।
সত্তর হাজার টাকা। এটা খরচ না। এটা ইনভেস্টমেন্ট। জাহিদ এই তফাতটা বোঝে। রাতুলের পঁয়ত্রিশ হাজারের ফ্ল্যাট খরচ। জাহিদের সত্তর হাজারের ল্যাপটপ ইনভেস্টমেন্ট।
এটাই প্রেজেন্ট বায়াসের উল্টো দিক। কিছু কিছু খরচ আসলে ভবিষ্যতের জন্য করা হয়। কিন্তু সেটা বুঝতে হলে হিসাব জানতে হয়।
১২
রাতে ছাদে দাঁড়িয়ে জাহিদ ফোনে পেওনিয়ার অ্যাপ খুলল। ব্যালেন্স: ৩৪২ ডলার। এটা আগামীকাল ব্যাংকে ট্রান্সফার করবে। তারপর আবার শূন্য। পরের প্রজেক্টের পেমেন্ট আসবে দশ দিন পর। যদি ক্লায়েন্ট সময়মতো দেয়।
এক হাজার ডলার। এটা একটা সংখ্যা। কিন্তু এর পেছনে আছে অনিশ্চয়তা, ফি, কমিশন, কনভার্সন লস, ট্যাক্স, আর একটা ভয়। ভয়টা হলো: এটা আসা বন্ধ হলে কী হবে।
জাহিদ জানে, বাংলাদেশে প্রায় সাত লাখ ফ্রিল্যান্সার আছে। তাদের বেশিরভাগ মাসে দুই-তিনশো ডলার কামায়। হাজার ডলার ক্লাবে সে উপরের দিকে। কিন্তু উপরে থাকা মানে পড়ার ভয়ও বেশি।
ঘরে ঢুকল। নতুন ল্যাপটপটা টেবিলে বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। এটাই তার কারখানা। এটা দিয়ে সে ডলার কামায়, টাকায় বাঁচে। মাঝখানে হিসাব। হিসাবটা সহজ না। কিন্তু হিসাব না জানলে ডলার দিয়েও কিছু হয় না।
মা ঠিকই জিজ্ঞেস করেছিল: "এই টাকাটা কতদিন আসবে?"
উত্তর জাহিদের জানা নেই। কারো জানা নেই। কিন্তু যতদিন আসবে, ততদিন হিসাব করে খরচ করতে হবে। সেভ করতে হবে। ইন্স্যুরেন্স রাখতে হবে।
কারণ ডলার আসে, ডলার যায়। হিসাব থাকলে মানুষটা টিকে থাকে।
জাহিদ লাইট নিভিয়ে দিল। অন্ধকারে ল্যাপটপের চার্জিং লাইটটা জ্বলছে। ছোট্ট একটা সাদা আলো। ফুলস্টপের মতো।