পেনশন নেই
ফ্রিল্যান্সিংয়ের অন্ধকার দিক: অসুস্থ হলে আয় শূন্য, বুড়ো হলে ভরসা নেই
১
জ্বর আসল রাতে।
জাহিদ বুঝতে পারেনি প্রথমে। ভাবল ক্লান্তি। সারাদিন ল্যাপটপে বসে কাজ করেছে, রাত এগারোটায় শেষ হয়েছে, চোখ জ্বালা করছে, শরীর ম্যাজম্যাজ করছে। স্বাভাবিক। ঘুমালেই ঠিক হয়ে যাবে।
ঘুমাল। ঠিক হলো না।
ভোর চারটায় ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। সকাল আটটায় আবার আসল। এবার কাঁপুনি। দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। জুলাই মাসের গরমে জাহিদ কম্বল টেনে শুয়ে আছে।
মা এসে কপালে হাত দিল। "জ্বর তো ভয়ানক।"
"একটু জ্বর, মা। কিছু না।"
"একটু জ্বর কম্বল মুড়ি দিয়ে শোয়? থার্মোমিটার আন।"
একশো তিন।
মা চুপ করে গেল। জাহিদও চুপ। মাইমনসিংয়ে তখন ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে। পত্রিকায় প্রতিদিন খবর আসছে। ঢাকায় শ দুয়েক কেস হয়েছে ইতিমধ্যে। মাইমনসিংয়ে এখনো কম, কিন্তু শূন্য না।
"ডাক্তার দেখা।" মা বলল। আদেশ, অনুরোধ না।
"আজকে একটা ক্লায়েন্টকে ডেলিভারি দিতে হবে, মা। কাল যাব।"
"কাল তুই হাঁটতে পারবি না। এখন চল।"
২
ডাক্তার দেখে বলল রক্ত পরীক্ষা করতে। রক্ত পরীক্ষা হলো। রিপোর্ট এলো সন্ধ্যায়।
ডেঙ্গু পজিটিভ।
প্লেটলেট কাউন্ট এক লাখ বিশ হাজার। এখনো নরমাল রেঞ্জের ভেতরে, কিন্তু কমছে। ডাক্তার বলল বাসায় রেস্ট, প্রচুর পানি, প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ খাওয়া যাবে না, আর দুদিন পরপর রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে।
"কতদিন লাগবে?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
"দশ দিন। মিনিমাম।"
"দশ দিন?"
ডাক্তার জাহিদের দিকে তাকাল। "ডেঙ্গু নিয়ে তাড়াহুড়ো করলে ICU-তে যেতে হয়। দশ দিন বিশ্রাম নাও।"
জাহিদ বাসায় ফিরে ল্যাপটপ খুলল। দুটো প্রজেক্ট চলছে। একটা ওয়ার্ডপ্রেস সাইট, আর একটা React-এ ড্যাশবোর্ড। ওয়ার্ডপ্রেসের কাজ তিন দিনের মধ্যে দিতে হবে। ড্যাশবোর্ডের ডেডলাইন আট দিন পর।
জাহিদ একটু কাজ করার চেষ্টা করল। আধা ঘণ্টা পর চোখে অন্ধকার দেখল। মাথা ঘুরছে। স্ক্রিনের অক্ষরগুলো নাচছে। শরীর বলছে, "শোও।" ল্যাপটপ বলছে, "কাজ করো।"
শরীর জিতল। জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করে শুয়ে পড়ল।
৩
পরদিন সকালে Upwork-এ মেসেজ এলো। ওয়ার্ডপ্রেসের ক্লায়েন্ট। মাইক। অস্ট্রেলিয়া থেকে।
"Hey Zahid, how's the progress? Can I see a preview today?"
জাহিদ টাইপ করল: "Hi Mike, I'm really sorry but I got dengue fever. I'll need about a week to recover. I'll get back to work as soon as I can."
পাঁচ মিনিট পর উত্তর এলো।
"Oh no, that sounds bad. Hope you feel better soon. But I really need this done by Thursday. Is there any way you can finish it?"
"I don't think so, Mike. I can barely sit up right now."
আরো দুই মিনিট।
"I understand. I'll have to find someone else then. Take care of yourself."
এটুকুই। দুই সপ্তাহের কাজ, চারশো ডলারের প্রজেক্ট, চল্লিশ শতাংশ শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু মাইকের আর দরকার নেই। মাইক অন্য কাউকে হায়ার করবে। জাহিদের চল্লিশ শতাংশ কাজ? জলে গেল।
ক্লায়েন্ট তো বসে থাকবে না। ক্লায়েন্টের নিজের ডেডলাইন আছে, নিজের ক্লায়েন্ট আছে, নিজের ব্যবসা আছে। জাহিদ অসুস্থ, সেটা দুঃখজনক, কিন্তু মাইকের সমস্যা না। মাইকের সমস্যা হলো তার ওয়েবসাইট বৃহস্পতিবারের মধ্যে দরকার।
ফ্রিল্যান্সিংয়ে সহানুভূতি আছে। কিন্তু সহানুভূতি আর ব্যবসা একসাথে চলে না।
৪
দুদিন পর প্লেটলেট কাউন্ট কমে আশি হাজার হলো। ডাক্তার বলল চিন্তার কিছু নেই, এটা ডেঙ্গুতে স্বাভাবিক, কিন্তু নজরে রাখতে হবে।
জাহিদ বিছানায় শুয়ে আছে। শরীরের প্রতিটা হাড়ে ব্যথা। চোখের পেছনে যন্ত্রণা। মাথা ভারী। খাওয়ার রুচি নেই। মা জোর করে ডাবের পানি, স্যালাইন, ভাতের মাড় খাওয়াচ্ছে।
ড্যাশবোর্ডের ক্লায়েন্ট সারাহকে মেসেজ দিল জাহিদ। সারাহ মেক্সিকো থেকে। আগে তিনটা প্রজেক্ট করেছে জাহিদের সাথে। ভালো সম্পর্ক।
"Sarah, I have dengue. I'll need an extension of about 10 days."
সারাহ উত্তর দিল: "Oh God, please take care. Don't worry about the project. Take your time."
জাহিদ একটু স্বস্তি পেল। সব ক্লায়েন্ট মাইকের মতো না। কিন্তু সারাহর "take your time"-এর একটা সীমা আছে, সেটাও জাহিদ জানে। দশ দিন ওয়েট করবে। পনেরো দিন হয়তো। বিশ দিন? কঠিন।
ল্যাপটপটা বন্ধ। টেবিলের ওপর ধুলো জমছে। জাহিদ তাকিয়ে আছে ল্যাপটপের দিকে।
আগে যখন কেউ জিজ্ঞেস করত, "তোর অফিস কোথায়?", জাহিদ গর্ব করে বলত, "ল্যাপটপটাই অফিস।" আজ সেই অফিস বন্ধ। আর অফিস বন্ধ মানে আয় বন্ধ।
৫
দশ দিন পর জাহিদ উঠে বসল। জ্বর নেই। প্লেটলেট নরমাল। শরীর দুর্বল, কিন্তু কাজ করার মতো অবস্থা। ল্যাপটপ খুলল।
Upwork প্রোফাইলে গেল। মাইকের প্রজেক্ট ক্যান্সেলড। চারশো ডলার গায়েব। সারাহর প্রজেক্ট এখনো আছে, কিন্তু ডেডলাইন পেরিয়ে গেছে। সারাহ ওয়েট করছে, কিন্তু মেসেজে একটু অধৈর্যের ছাপ।
জাহিদ হিসাব করল।
দশ দিনে আয়: শূন্য টাকা।
দশ দিনে খরচ: ডাক্তার দেখানো পনেরোশো, রক্ত পরীক্ষা তিনবার চার হাজার পাঁচশো, ওষুধ আটশো, ডাবের পানি আর ফলমূল দুই হাজার। মোট প্রায় নয় হাজার টাকা।
হারানো আয়: মাইকের চারশো ডলার (প্রায় ছেচল্লিশ হাজার টাকা) প্লাস সারাহর প্রজেক্টে দশ দিনের বিলম্য। আর মাইক ভালো ক্লায়েন্ট ছিল। রেগুলার কাজ দিত। সেই ক্লায়েন্ট এখন অন্য কারো কাছে গেছে।
মোট হিসাব: দশ দিনের অসুস্থতায় জাহিদের লোকসান প্রায় পঞ্চান্ন হাজার টাকা। প্লাস একটা রেগুলার ক্লায়েন্ট হারানো, যার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য হিসাব করা কঠিন।
৬
ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পর জাহিদের মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরতে লাগল। আগে কখনো এই প্রশ্ন আসেনি।
যদি আবার অসুস্থ হই?
যদি দশ দিন না, এক মাস কাজ করতে না পারি?
যদি এমন কিছু হয় যে ছয় মাস কাজ করা সম্ভব না?
ফ্রিল্যান্সিংয়ে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একটাই: তাহলে আয় শূন্য।
এটা কোনো জটিল অর্থনীতি না। সোজা হিসাব। জাহিদ যদি কাজ না করে, তাহলে কেউ তাকে টাকা দেবে না। কোনো কোম্পানি নেই যে তার বেতন ঠিকই দিয়ে যাবে। কোনো HR ডিপার্টমেন্ট নেই যে তাকে মেডিকেল লিভ অ্যাপ্রুভ করবে। কোনো ইন্স্যুরেন্স নেই। কোনো প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই। কিছু নেই।
জাহিদ হলো একটা ওয়ান-ম্যান কোম্পানি। কোম্পানির মালিক সে, কর্মচারী সে, অ্যাকাউন্টেন্ট সে, মার্কেটিং ম্যানেজার সে। আর কোম্পানি যদি অসুস্থ হয়, তাহলে কোম্পানি বন্ধ।
৭
জাহিদ ভাবল ফারুকের কথা।
ফারুক। স্কুলের বন্ধু। BCS দিয়ে সহকারী কমিশনার হয়েছে। বেতন পঁয়ত্রিশ হাজার। জাহিদের মাসিক আয়ের অর্ধেকেরও কম। জাহিদ এই হিসাব দেখে মনে মনে একটু গর্ব করত। ফারুক BCS ক্যাডার, কিন্তু আমি ফারুকের দ্বিগুণ কামাই।
কিন্তু ফারুকের যদি ডেঙ্গু হয়?
ফারুক মেডিকেল লিভ নেবে। সরকারি চাকরিতে বছরে পনেরো দিন মেডিকেল লিভ আছে। পুরো বেতনসহ। ফারুক দশ দিন বিছানায় শুয়ে থাকবে, তার পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা ঠিকই আসবে। তার ডেস্কে যে ফাইল পড়ে আছে, সেগুলো অন্য কেউ দেখবে। ফারুকের অনুপস্থিতিতে অফিস চলবে। ফারুক ফিরে আসবে, জয়েন করবে, সব আগের মতো।
জাহিদ? দশ দিনে পঞ্চান্ন হাজার টাকা গেছে আর একটা ক্লায়েন্ট হারিয়েছে। চিরকালের জন্য।
সুমাইয়ার কথাও ভাবল। সুমাইয়া ডাক্তার। সরকারি হাসপাতালে। তার বেতন বায়ান্ন হাজার, প্রাইভেট প্র্যাক্টিস ধরলে মাসে লাখ টাকা তো হয়ই। কিন্তু সেটা মূল কথা না। মূল কথা হলো সুমাইয়ার চাকরিতেও পনেরো দিন মেডিকেল লিভ আছে। প্লাস হেলথ ইন্স্যুরেন্স। প্লাস পেনশন। প্লাস গ্র্যাচুইটি।
রাসেলের কথাও ভাবল। রাসেল ঢাকায় একটা সফটওয়্যার কোম্পানিতে কাজ করে। বেতন পঁয়ষট্টি হাজার। প্রাইভেট কোম্পানি, তাই পেনশন নেই। কিন্তু চৌদ্দ দিন সিক লিভ আছে। হেলথ ইন্স্যুরেন্স আছে। প্রভিডেন্ট ফান্ড আছে। রাসেল অসুস্থ হলে তার বেতন বন্ধ হয় না।
শুধু জাহিদের বন্ধ হয়।
৮
কিন্তু দশ দিনের অসুস্থতা তো ছোট সমস্যা। আসল সমস্যা আরো বড়। আরো গভীর। আরো দূরের।
জাহিদের বয়স এখন তেইশ। ষাট বছর বয়সে সে কী করবে?
ফারুক ষাট বছরে অবসর নেবে। তারপর পেনশন পাবে। মাসে পঁচিশ-ত্রিশ হাজার টাকা। আমৃত্যু। ফারুক মারা গেলে তার স্ত্রী পাবে। পেনশন হলো সরকারি চাকরির সবচেয়ে বড় পুরস্কার। তিরিশ বছর চাকরি করো, বাকি জীবন সরকার দেখবে।
সুমাইয়ারও একই। অবসরের পর পেনশন, গ্র্যাচুইটি, আর বিশাল একটা অবসরকালীন সুবিধা।
রাসেল? রাসেলের পেনশন নেই, কিন্তু প্রভিডেন্ট ফান্ড আছে। প্রতি মাসে বেতনের একটা অংশ জমা হচ্ছে। কোম্পানিও সমপরিমাণ দিচ্ছে। ত্রিশ বছর পর মোটা একটা টাকা পাবে।
আর জাহিদ?
জাহিদ ষাট বছরে কাজ বন্ধ করলে, আয় বন্ধ। ব্যস। এতটুকুই।
কোনো EPF নেই। কোনো গ্র্যাচুইটি নেই। কোনো অবসরকালীন তহবিল নেই। কোনো কোম্পানি তার জন্য কিছু জমিয়ে রাখছে না। কারণ কোনো কোম্পানি নেই। জাহিদ নিজেই কোম্পানি। আর কোম্পানি নিজের জন্য কিছু জমায়নি।
তেইশ বছর বয়সে ষাটের কথা ভাবা কঠিন। ষাট অনেক দূরে। সাঁইত্রিশ বছর দূরে। সাঁইত্রিশ বছর তো পুরো একটা জীবন। কে এত দূরের কথা ভাবে?
কিন্তু ডেঙ্গু জাহিদকে শিখিয়েছে যে শরীর কথা শোনে না। শরীরের নিজের টাইমলাইন আছে। আর সেই টাইমলাইন সবসময় মানুষের পরিকল্পনার সাথে মেলে না।
৯
রাতে মা এসে পাশে বসল। জাহিদ সেরে উঠেছে, কিন্তু মুখটা চিন্তিত।
"কী হইছে? শরীর খারাপ লাগতেছে?"
"না, মা। শরীর ঠিক আছে।"
"তাহলে মুখ এরকম কেন?"
জাহিদ চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, "মা, আমি যদি কাজ করতে না পারি, তাহলে আমাদের কী হবে?"
মা কিছুক্ষণ চুপ। তারপর বলল, "তুই এখন ভালো আছিস। কিন্তু বুড়ো হলে কে দেখবে?"
জাহিদ মাকে দেখল। মায়ের চোখে যে প্রশ্ন, সেটা নতুন না। মা এই প্রশ্ন নিজে নিজে করেছে অনেকবার। চাকরি ছাড়া ছেলে, ফ্রিল্যান্সিং করে, ভালো কামায়, কিন্তু কোনো নিশ্চয়তা নেই। আজ আছে, কাল? কে জানে।
"মা, আমি একটা DPS খুলব।"
"DPS মানে?"
"ডিপোজিট পেনশন স্কিম। প্রতি মাসে দশ হাজার টাকা জমা দেব। বিশ বছর পর পঞ্চাশ লাখ টাকা পাব।"
মা কিছু বলল না। পঞ্চাশ লাখ টাকা মায়ের কাছে কল্পনার বাইরের সংখ্যা। মায়ের জীবনে সবচেয়ে বড় টাকা ছিল যখন বাবা CNG কেনার জন্য দুই লাখ জোগাড় করেছিল। সেটা ধার করা টাকা, শোধ করতে চার বছর লেগেছিল।
"আর সঞ্চয়পত্র কিনব। সরকারি। নিরাপদ।"
"এগুলো তোর বাপকে বল। আমি এসবের কিছু বুঝি না।"
"বাবা কী বুঝবে, মা?" জাহিদ হাসল। বাবা CNG চালিয়েছে সারাজীবন। বাবার পেনশনও নেই। বাবার DPS-ও নেই। বাবা বুড়ো হলে কে দেখবে? জাহিদ দেখবে। সেই জাহিদ বুড়ো হলে কে দেখবে? সেই প্রশ্নের উত্তর কারো কাছে নেই।
১০
পরদিন জাহিদ গুগলে সার্চ করল: "DPS calculator Bangladesh."
হিসাব করল। প্রতি মাসে দশ হাজার টাকা জমা দিলে, বিশ বছর পরে, ব্যাংকের বর্তমান সুদের হারে, প্রায় আটচল্লিশ থেকে বায়ান্ন লাখ টাকা পাওয়া যাবে। ব্যাংকভেদে একটু কম-বেশি।
পঞ্চাশ লাখ টাকা। শুনতে অনেক। কিন্তু বিশ বছর পর পঞ্চাশ লাখের মূল্য কত? মুদ্রাস্ফীতি ধরলে আজকের বিশ লাখের সমান হবে। বিশ লাখ টাকা দিয়ে কত দিন চলা যায়? পাঁচ বছর? হয়তো। তারপর?
সঞ্চয়পত্রও দেখল। পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রে সুদের হার এগারো দশমিক পঁয়ষট্টি শতাংশ। ভালো রেট। নিরাপদ। সরকারি গ্যারান্টি। কিন্তু ফ্রিল্যান্সার হিসেবে জাহিদ তো নিয়মিত আয় পায় না। এই মাসে আশি হাজার, পরের মাসে ত্রিশ হাজার। কোন মাসে কত জমাবে? সেটাও একটা সমস্যা।
তারপর ভাবল জমির কথা। মাইমনসিংয়ের বাইরে, একটু মফস্বলে, পাঁচ কাঠা জমি পাঁচ লাখ টাকায় পাওয়া যায়। পনেরো বছর পর সেই জমির দাম হবে পনেরো থেকে বিশ লাখ। জমি হলো বাংলাদেশে সবচেয়ে পুরনো পেনশন প্ল্যান। দাদা-পরদাদারা জমি কিনত, বুড়ো হলে জমি বেচত বা ভাড়া দিত। এটাই ছিল রিটায়ারমেন্ট ফান্ড।
কিন্তু পাঁচ লাখ কোথায়? জাহিদের সেভিংস আছে দেড় লাখ। বাকি সাড়ে তিন লাখ কবে জমবে? আর জমি কেনা মানে একবারে একটা বড় টাকা বের করে দেওয়া। ফ্রিল্যান্সারের জন্য এটা রিস্কি। কারণ সেই টাকাটাই তো ইমার্জেন্সি ফান্ড।
১১
জাহিদ খাতায় লিখল:
ফারুক (সরকারি চাকরি): বেতন ৩৫ হাজার। মেডিকেল লিভ ১৫ দিন। পেনশন আছে। গ্র্যাচুইটি আছে। জব সিকিউরিটি আছে। চাকরি থেকে বের করা প্রায় অসম্ভব।
সুমাইয়া (সরকারি ডাক্তার): বেতন ৫২ হাজার। প্লাস প্রাইভেট প্র্যাক্টিস। মেডিকেল লিভ ১৫ দিন। পেনশন আছে। হেলথ ইন্স্যুরেন্স আছে।
রাসেল (প্রাইভেট সফটওয়্যার কোম্পানি): বেতন ৬৫ হাজার। সিক লিভ ১৪ দিন। হেলথ ইন্স্যুরেন্স আছে। প্রভিডেন্ট ফান্ড আছে। পেনশন নেই।
জাহিদ (ফ্রিল্যান্সার): আয় ৬০-৮০ হাজার। মেডিকেল লিভ: নেই। পেনশন: নেই। হেলথ ইন্স্যুরেন্স: নেই। প্রভিডেন্ট ফান্ড: নেই। সিক লিভ: নেই। গ্র্যাচুইটি: নেই। জব সিকিউরিটি: নেই।
তালিকাটা দেখে জাহিদ চুপ হয়ে গেল। আয়ের কলামে সে সবার ওপরে। কিন্তু বাকি সব কলামে সে শূন্য।
১২
সেই রাতে জাহিদ বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
ফ্রিল্যান্সিং তাকে কী দিয়েছে? স্বাধীনতা দিয়েছে। ঘড়ি ধরে অফিস করতে হয় না। বসের বকা খেতে হয় না। যখন ইচ্ছা কাজ, যখন ইচ্ছা ঘুম। নিজের সময় নিজের। আয়ও ভালো। বাবার পনেরো বছরের CNG আয়ের চেয়ে জাহিদের দুই বছরের আয় বেশি।
কিন্তু ফ্রিল্যান্সিং তার কাছ থেকে কী নিয়েছে? নিশ্চয়তা নিয়েছে। আগামীকালের গ্যারান্টি নিয়েছে। ষাট বছরের পরিকল্পনা নিয়েছে।
ফ্রিল্যান্সিং হলো বর্তমানের খেলা। আজকের ক্লায়েন্ট, আজকের প্রজেক্ট, আজকের আয়। কাল? কাল আবার নতুন করে শুরু। প্রতিদিন শূন্য থেকে। প্রতিদিন প্রমাণ করতে হয় যে তুমি এখনো দরকারি। একটা দিনও প্রমাণ করতে না পারলে, তুমি গায়েব।
চাকরিতে তুমি একটা সিস্টেমের অংশ। তুমি না থাকলেও সিস্টেম চলে। তুমি অসুস্থ হলে সিস্টেম তোমাকে বহন করে। তুমি বুড়ো হলে সিস্টেম তোমাকে পেনশন দেয়। তুমি মারা গেলে সিস্টেম তোমার পরিবারকে দেখে।
ফ্রিল্যান্সিংয়ে তুমিই সিস্টেম। তুমি পড়ে গেলে সিস্টেম পড়ে যায়।
জাহিদ জানে, DPS খুলতে হবে। সঞ্চয়পত্র কিনতে হবে। একটু একটু করে জমাতে হবে। নিজের পেনশন নিজে বানাতে হবে। কারণ আর কেউ বানিয়ে দেবে না।
কিন্তু সেটা কবে শুরু করবে? পরের মাসে? পরের বছরে? "আরেকটু কামাই করি, তারপর জমাব"? এটাই তো present bias। আজকের ভালো লাগাটা এত জোরালো যে কালকের প্রয়োজনটা ম্লান হয়ে যায়।
তেইশ বছরের জাহিদ ষাট বছরের জাহিদকে চেনে না। চেনে না বলে তার জন্য কিছু করতে চায় না। ষাট বছরের জাহিদ একা, ক্লান্ত, আর ল্যাপটপ ধরার শক্তি নেই। সেই জাহিদকে কে দেখবে?
ফ্রিল্যান্সিং হলো বর্তমানের স্বাধীনতা আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। দুটো একসাথে আসে। আলাদা করা যায় না।