টিম বানানো
একজন ফ্রিল্যান্সার থেকে তিনজনের এজেন্সি, মফস্বলে চাকরি তৈরি, আর বস হওয়ার ঝামেলা
১
সমস্যাটা গাণিতিক।
জাহিদ হিসাব করে দেখল, দিনে সর্বোচ্চ বারো ঘণ্টা কাজ করা যায়। দুই ঘণ্টা ক্লায়েন্ট কমিউনিকেশন, এক ঘণ্টা ইমেইল-প্রপোজাল-ইনভয়েস। বাকি নয় ঘণ্টা কোডিং। মাসে দুটো প্রজেক্ট। বারোশো থেকে ষোলোশো ডলার। টাকায় দেড় লাখের কিছু বেশি।
মফস্বলের হিসাবে অসাধারণ। কিন্তু এটাই সিলিং। এর ওপরে যাওয়ার রাস্তা নেই, যতক্ষণ না জাহিদ নিজেকে ক্লোন করতে পারছে।
ক্লোন করা যায় না। কিন্তু হায়ার করা যায়।
২
আইডিয়াটা মাথায় এলো একটা প্রজেক্টের মাঝখানে।
ক্লায়েন্ট চায় একটা ই-কমার্স সাইট। ব্যাকএন্ড, ফ্রন্টএন্ড, পেমেন্ট, অ্যাডমিন প্যানেল। বাজেট: এগারোশো ডলার। সময়: তিন সপ্তাহ।
একা করা সম্ভব, কিন্তু ঘুম কমাতে হবে। ফ্রন্টএন্ডের কাজটা সময়সাপেক্ষ, তবে কঠিন না। HTML/CSS স্লাইসিং, রেসপন্সিভ লেআউট। এগুলো করতে গেলে ব্যাকএন্ডের সময় কমে।
যদি কেউ ফ্রন্টএন্ডটা করে দিত?
এই "যদি" থেকে শুরু।
৩
জাহিদ মনে করল সজীবের কথা।
সজীব। আঠারো বছর। এইচএসসি সবে পাশ। জাহিদের পাড়ারই ছেলে, তিন-চার বছরের ছোট।
গল্পটা জাহিদের চেনা। বাবা কাপড়ের দোকানে কাজ করেন। কম্পিউটার সায়েন্সে ভর্তি হতে চেয়েছিল, সিট পায়নি। এখন NU-তে ম্যানেজমেন্টে ভর্তি হবে, নাকি কিছু একটা করবে, সেই চিন্তায় আছে।
কিন্তু সজীবের একটা জিনিস আছে। ইউটিউব দেখে HTML আর CSS শিখেছে। নিজে নিজে। একটা পুরনো ল্যাপটপ, ভাঙা স্ক্রিন, চার জিবি র্যাম। সেটা দিয়ে ওয়েবসাইট বানায়। সুন্দর না, কিন্তু বানায়।
জাহিদ সজীবের দিকে তাকাল আর তিন বছর আগের নিজেকে দেখল।
৪
"সজীব, তুই কি আমার সাথে কাজ করবি?"
ফোনে কথা হলো। সজীব প্রথমে বুঝতে পারল না। কী কাজ? কোথায়? কত টাকা?
জাহিদ বলল, "ফ্রিল্যান্সিং। আমি Upwork-এ কাজ পাই। ফ্রন্টএন্ডের কিছু কাজ তোকে দেব। তুই করবি। আমি চেক করব। ক্লায়েন্টকে ডেলিভার করব।"
"কিন্তু ভাই, আমি তো শুধু HTML আর CSS পারি। React জানি না।"
"React পরে শিখবি। এখন HTML/CSS দিয়ে শুরু কর। PSD বা Figma থেকে স্লাইসিং। রেসপন্সিভ লেআউট। এগুলো তুই পারবি।"
"কত টাকা দেবেন?"
জাহিদ ভাবল। অভিজ্ঞতা নেই, ট্রেনিংয়ে সময় লাগবে। কিন্তু মফস্বলের ছেলে, আট হাজার টাকা তার কাছে অনেক।
"আট হাজার। মাসে। পার্ট-টাইম। দিনে চার-পাঁচ ঘণ্টা।"
ফোনের ওপাশে একটু চুপ। তারপর সজীব বলল, "আমি করব।"
৫
প্রথম সপ্তাহ ছিল বিপর্যয়।
জাহিদ সজীবকে একটা ল্যান্ডিং পেজের Figma ফাইল দিল। বলল, "HTML/CSS-এ কনভার্ট কর। রেসপন্সিভ।"
সজীব দুই দিন পর জমা দিল। মোবাইলে লেআউট ভাঙা। ফন্ট সাইজ হার্ডকোড করা পিক্সেলে। মিডিয়া কোয়েরি নেই। একটা ব্যানার ইমেজ তিন এমবি। CSS-এ !important পঁচিশ জায়গায়।
জাহিদ WhatsApp ভিডিও কলে স্ক্রিন শেয়ার করে একটা একটা করে ভুল দেখাল।
"দেখ, ফন্ট সাইজ rem-এ দিতে হবে, px-এ না।"
"ভাই, rem কী?"
জাহিদ বুঝল, শুধু কাজ দিলে হবে না। শেখাতে হবে।
পরের দুই সপ্তাহ প্রতিদিন এক ঘণ্টা সজীবকে শেখাল। Flexbox, Grid, মিডিয়া কোয়েরি, ইমেজ অপ্টিমাইজেশন, ডেভটুলস। এই এক ঘণ্টা জাহিদের নিজের কাজের সময় থেকে গেল। প্রথম মাসে সজীবকে হায়ার করে আসলে সময় বাঁচায়নি, বরং বেশি খরচ করেছে।
কিন্তু জাহিদ জানত, এটা বিনিয়োগ। তিন বছর আগে কেউ তাকে শেখায়নি। যদি তখন কেউ একটু গাইড করত, ছয় মাসের শেখা তিন মাসে হতো।
তৃতীয় সপ্তাহে সজীব প্রথম কাজটা ঠিকমতো জমা দিল। রেসপন্সিভ। ক্লিন CSS। ইমেজ অপ্টিমাইজড।
জাহিদ বলল, "ভালো হয়েছে।"
সজীব বলল, "সত্যি?"
"হ্যাঁ। এবার পরেরটা ধর।"
এটুকুই। বিশাল প্রশংসা না, কিন্তু যথেষ্ট। মফস্বলের একটা ছেলে, যাকে কেউ কোনোদিন বলেনি "তুই পারবি", সে প্রথমবার শুনল "ভালো হয়েছে।"
৬
প্রথম মাসের হিসাব।
জাহিদ তিনটা প্রজেক্ট নিল। একটা সে আগেই পেয়েছিল, দুটো নতুন। সজীব ফ্রন্টএন্ড স্লাইসিংয়ের কিছু কাজ করল। জাহিদ ব্যাকএন্ড আর ক্লায়েন্ট ম্যানেজমেন্টে ফোকাস করল।
রেভিনিউ: আঠারোশো ডলার। টাকায় প্রায় দুই লাখ আট হাজার।
খরচ: সজীবের বেতন আট হাজার। ইন্টারনেট এক হাজার। মোট নয় হাজার।
নেট: প্রায় দুই লাখ টাকা।
একা কাজ করলে বারোশো থেকে পনেরোশো ডলার হতো। এখন আঠারোশো। পার্থক্য তিনশো থেকে ছয়শো ডলার। সজীবের খরচ বাদ দিলেও লাভ বেশি।
গণিত কাজ করছে।
৭
দ্বিতীয় হায়ার হলো রুবিনা।
রুবিনা জাহিদের শহরেরই মেয়ে। বাইশ বছর। অনার্স পাশ করেছে বাংলায়। BCS-এর প্রিপারেশন নিচ্ছে, কিন্তু মনে মনে জানে ষাট হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে চান্স পাওয়া কঠিন।
অনলাইনে গ্রাফিক ডিজাইন শিখেছে। Canva দিয়ে শুরু, তারপর Photopea, তারপর Figma। সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, ব্যানার, লোগো বানাতে পারে। প্রফেশনাল লেভেলের? না। কিন্তু "কুইক ডিজাইন" এর জন্য যথেষ্ট।
জাহিদ রুবিনাকে অফার করল দশ হাজার টাকা মাসে। রুবিনা রাজি হলো। শর্ত একটাই: বাড়ি থেকে কাজ। বাবা-মা বাইরে যেতে দেবেন না।
জাহিদ বলল, "বাড়ি থেকেই করো। WhatsApp-এ কথা বলব। কোনো সমস্যা নেই।"
৮
রুবিনার বাবা-মা সমস্যা হলেন।
রুবিনার বাবা স্কুলে শিক্ষক। সম্মানিত মানুষ। তাঁর মেয়ে BCS দেবে, চাকরি পাবে, এটা প্ল্যান। মেয়ে সারাদিন কম্পিউটারে বসে থাকে, কার সাথে যেন চ্যাট করে, এটা তিনি ভালো চোখে দেখেন না।
"টাকা কোথা থেকে আসে? কে দেয়? কেন দেয়?" রুবিনার বাবা জিজ্ঞেস করলেন।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া কঠিন একজন মফস্বলের স্কুলশিক্ষককে, যিনি সারাজীবন একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে কাজ করেছেন। অফিস আছে, বস আছে, বেতন আসে মাস শেষে, এটা চাকরি। কম্পিউটারে বসে ছবি বানানো, সেটা চাকরি কীভাবে?
রুবিনার মা আরেক ধাপ এগিয়ে। "পাড়ার লোক কী বলে জানো? বলে, ওর মেয়ে অনলাইনে কী করে কে জানে।"
এই "কে জানে" এর মধ্যে একটা ইঙ্গিত আছে। বাংলাদেশের মফস্বলে একটা মেয়ের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র। সন্দেহ। প্রমাণ ছাড়া, যুক্তি ছাড়া, শুধু "কে জানে" বলে একটা মেয়ের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।
রুবিনা কাঁদল। জাহিদকে ফোনে বলল, "ভাই, মনে হয় পারব না।"
জাহিদ বলল, "প্রথম মাসের বেতন পেলে বাবাকে দেখাও। দশ হাজার টাকা। তারপর দেখো কী বলেন।"
৯
রুবিনার প্রথম মাসের বেতন: দশ হাজার টাকা।
bKash-এ এলো। রুবিনা বাবাকে দেখাল। বাবা চুপ করে তাকিয়ে রইলেন। দশ হাজার টাকা। তাঁর নিজের বেতন আঠারো হাজার। মেয়ে ঘরে বসে দশ হাজার আনছে।
বাবা কিছু বললেন না। কিন্তু পরের মাস থেকে "কম্পিউটারে বসে থাকে" নিয়ে আর কথা হলো না।
পাড়ার লোক? তারা এখনো বলে। কিন্তু রুবিনার বাবা এখন জবাব দেন, "আমার মেয়ে চাকরি করে।"
চাকরি। শব্দটা ভুল। কিন্তু শব্দটা ঢাল হিসেবে কাজ করে।
১০
এখন তিনজন। জাহিদ, সজীব, রুবিনা।
কোনো অফিস নেই। তিনটা আলাদা ঘর, একটা WhatsApp গ্রুপ। গ্রুপের নাম: "Work"। সৃজনশীল না, কিন্তু কাজ চলে।
সকালে জাহিদ কাজ ভাগ করে দেয়। সজীবকে ফ্রন্টএন্ড, রুবিনাকে ডিজাইন। নিজে ব্যাকএন্ড। সন্ধ্যায় রিভিউ। রাতে ক্লায়েন্টকে আপডেট।
এটা কি এজেন্সি? কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই, ট্রেড লাইসেন্স নেই, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই কোম্পানির নামে। জাহিদের ব্যক্তিগত Payoneer অ্যাকাউন্ট থেকে সব লেনদেন।
কিন্তু কার্যত? তিনজন মানুষ, তিনটা দক্ষতা, একসাথে কাজ করছে। এটা এজেন্সি।
১১
বস হওয়া সহজ না।
জাহিদ এটা তিন মাসের মধ্যে বুঝল।
সজীব ডেডলাইন মিস করে। বুধবারে জমা দেওয়ার কথা, দিল শুক্রবারে। "ভাই, কারেন্ট ছিল না।" মফস্বলে লোডশেডিং, দিনে চার-পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই। এটা সত্য। কিন্তু আমেরিকায় বসে থাকা ক্লায়েন্ট "কারেন্ট নাই" বুঝবে না।
রুবিনা ভালো কাজ করে, কিন্তু ধীরে। একটা ব্যানার সেটে দুই দিন লাগে, যেটা এক দিনে হওয়া উচিত। পারফেকশনিস্ট। প্রতিটা পিক্সেল নিয়ে ভাবে।
জাহিদ বলল, "ক্লায়েন্ট eighty percent চায়। সময়মতো eighty percent দিলে খুশি। দেরিতে hundred percent দিলে রাগান্বিত।"
এই কথা জাহিদ শিখেছে দুই বছরে। রুবিনাকে শেখাচ্ছে দুই মাসে। এটাই দলের সুবিধা।
১২
সবচেয়ে কঠিন কাজ: কোয়ালিটি কন্ট্রোল। সজীব আর রুবিনা যা জমা দেয়, প্রতিটা পেজ, প্রতিটা ডিজাইন, প্রতিটা লাইন রিভিউ করতে হয়। দিনে তিন ঘণ্টা বাড়তি।
ঘুমায় রাত দুইটায়। ওঠে আটটায়। ক্লান্তিকর। কিন্তু প্রতি মাসে রিভিউতে কম সময় লাগছে। প্রথম মাসে তিন ঘণ্টা। দ্বিতীয় মাসে আড়াই। তৃতীয় মাসে দুই। সজীব আর রুবিনা শিখছে। ভুল কমছে।
বিনিয়োগ কাজ করছে।
১৩
ছয় মাসের হিসাব।
রেভিনিউ: মাসে গড়ে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার ডলার। টাকায় আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ।
খরচ: সজীব আট হাজার, রুবিনা দশ হাজার, ইন্টারনেট এক হাজার। মোট উনিশ হাজার।
নেট: মাসে দুই লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা।
একা কাজ করলে সর্বোচ্চ দেড় লাখ হতো। এখন আড়াই লাখ। পার্থক্য এক লাখ টাকা।
কিন্তু টাকার চেয়ে বড় হিসাব আছে।
সজীব আর রুবিনা। দুটো মানুষ যারা ছয় মাস আগে বেকার ছিল। সজীব HSC পাশ করে কিছু করার নেই। রুবিনা অনার্স পাশ করে BCS প্রিপারেশন নিচ্ছে অনিশ্চিতভাবে।
এখন দুজনেই কাজ করে। দুজনেই আয় করে। দুজনেই দক্ষতা বাড়াচ্ছে। সজীব এখন React শিখছে। রুবিনা Figma-তে UI ডিজাইন করছে। ছয় মাস আগের তুলনায় দুজনেই আলাদা মানুষ।
জাহিদ একটা চাকরি খুঁজত। এখন জাহিদ চাকরি তৈরি করে।
১৪
একদিন সন্ধ্যায় জাহিদ ভাবল, এই জিনিসটার একটা নাম দরকার।
তিনজন মিলে কাজ করে, কিন্তু ক্লায়েন্টের কাছে এটা "জাহিদ" এর প্রোফাইল। Upwork-এ জাহিদের নাম। Fiverr-এ জাহিদের নাম। কাজের পেছনে তিনজন, কিন্তু সামনে একজন।
একটা ব্র্যান্ড হলে ভালো হয়। পরে যখন নিজের ওয়েবসাইট বানাবে, যখন সরাসরি ক্লায়েন্ট আনবে, তখন একটা নাম লাগবে।
জাহিদ অনেক ভাবল। TechBD? জেনেরিক। PixelPro? মফস্বলের গন্ধ নেই। তারপর মাথায় এলো: কোডকারিগর।
কোড আর কারিগর। কারিগর মানে craftsman। কাঠমিস্ত্রি কারিগর। রাজমিস্ত্রি কারিগর। জাহিদরা কোডের কারিগর।
জাহিদ WhatsApp গ্রুপে লিখল, "আমাদের নাম: কোডকারিগর।"
সজীব লিখল, "মানে?"
"CodeCraftsman। কিন্তু বাংলায়।"
রুবিনা লিখল, "সুন্দর।"
ব্যস। নাম হয়ে গেল। কোনো রেজিস্ট্রেশন হলো না। কোনো লোগো বানানো হলো না। কোনো বিজনেস কার্ড ছাপানো হলো না। শুধু তিনজন মানুষ, তিনটা ল্যাপটপ, একটা WhatsApp গ্রুপ, আর একটা নাম।
কোডকারিগর। মফস্বলের ডিজিটাল কারখানা।
১৫
জাহিদ সেই রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ভাবল।
তিন বছর আগে সে দশ হাজার টাকার চাকরি খুঁজত। কেউ নেয়নি। NU-র ছেলে, মফস্বলের ছেলে, কোনো কানেকশন নেই।
এখন সে তিনজনের দলের প্রধান। অন্যদের কাজ দিচ্ছে, বেতন দিচ্ছে, শেখাচ্ছে।
আমি একটা চাকরি খুঁজতাম। এখন আমি চাকরি তৈরি করি।
এই বাক্যটা কাউকে বলল না। মুখে বলার মতো বাক্য না। কিন্তু মাথার ভেতরে ঘুরল অনেকক্ষণ।
কোডকারিগর। কোনো অফিস নেই। কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই। কোনো বিজনেস কার্ড নেই। শুধু কাজ।
আর কাজই যথেষ্ট।