বার্নআউট

তিন বছর না থেমে দৌড়ানো, বুকে ব্যথা, আর পাঁচ দিনের ছুটিতে খুঁজে পাওয়া স্বাধীনতার আসল মানে

পর্ব ৫৯ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

জাহিদের ঘুম ভাঙে রাত তিনটায়। প্রতিদিন। শরীর ক্লান্ত, চোখ জ্বলে, কিন্তু মাথা থামে না।

কখনো ক্লায়েন্টের ইমেইল মাথায় ঘোরে। কখনো সজীবের লেখা কোডের বাগ। কখনো শুক্রবারের ডেডলাইন। কখনো কিছুই না, শুধু একটা অস্থিরতা, যেটার কোনো নাম নেই।

তিন বছর হলো কোডকারিগর চালাচ্ছে। তিন বছরে একটা দিনও পুরোপুরি ছুটি নেয়নি। শুক্রবার, শনিবার, ঈদ, পহেলা বৈশাখ, কোনো কিছুতে ল্যাপটপ বন্ধ থাকেনি।

ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠল। স্ল্যাকে মেসেজ। অস্ট্রেলিয়ার ক্লায়েন্ট। "Hey Zahid, quick question about the API endpoint."

রাত তিনটায় quick question।

জাহিদ ফোন তুলে রিপ্লাই দিল। কারণ না দিলে ক্লায়েন্ট ভাববে সে responsive না। রেটিং কমবে। রেটিং কমলে কাজ কমবে। কাজ কমলে আয় কমবে। আয় কমলে সজীব আর তানজিনের বেতন দিতে পারবে না।

এই চেইনটা মাথায় সবসময় চলে। ঘুমাবো না রিপ্লাই দেবো? রিপ্লাই। খাবো না কোড করবো? কোড। বিশ্রাম নেবো না ডেডলাইন ধরবো? ডেডলাইন।

উত্তর সবসময় একটাই। কাজ।

সকালে আয়নার সামনে দাঁড়ালে জাহিদ নিজেকে চিনতে পারে না। চোখের নিচে কালো দাগ। গাল ভেঙে গেছে। ওজন কমেছে সাত কেজি গত ছয় মাসে। সকালে চা আর বিস্কুট। দুপুরে ভাত খেতে বসে তিন কামড়ের পর ল্যাপটপের দিকে তাকায়, তারপর ভাত ঠান্ডা হয়ে যায়।

হাসিনা আম্মা বলেন, "জাহিদ, খাওয়া শেষ কর আগে।"

"হ্যাঁ আম্মা, একটু দাঁড়াও।"

সেই "একটু" কখনো শেষ হয় না।

কোডিং করতে ভালো লাগতো একসময়। একটা ফাংশন লিখে সেটা কাজ করলে যে আনন্দ হতো, সেটা ছিল জাহিদের জ্বালানি। কিন্তু এখন কোড লিখতে বসলে কিছু মনে আসে না। কার্সার জ্বলে, নেভে। আঙুল কীবোর্ডে, কিন্তু কিছু টাইপ হয় না।

ডাক্তাররা এটাকে বলে burnout। জাহিদ শুধু জানে এটা আগে ছিল না।

মিম এখন HSC-র ছাত্রী। লম্বা হয়েছে, চুপচাপ হয়েছে, কিন্তু চোখ খুব তীক্ষ্ণ।

একদিন সন্ধ্যায় জাহিদ ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে। খাবার টেবিলে। মিম পাশে এসে বসল।

"ভাইয়া, তুমি আগে হাসতে। এখন শুধু ল্যাপটপের দিকে তাকাও।"

জাহিদ স্ক্রিন থেকে চোখ তুলল। কিছু বলতে গেল, কিন্তু কথা এলো না।

"আমি তোমাকে গত মাসে দুইবার হাসতে দেখেছি। দুইবার। আমি গুণেছি।"

"কী বলছিস, মিম। আমি ঠিকই আছি।"

"না, ঠিক নেই। তুমি আম্মার সাথে কথা বলো না। আব্বার ফোন আসলে বিরক্ত হও। আমি কিছু জিজ্ঞেস করলে এক শব্দে উত্তর দাও। তুমি এরকম ছিলে না।"

জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করল। ধীরে ধীরে। স্ক্রিন কালো হলো।

দুইবার হাসি। পুরো মাসে। মিম গুণেছে। কেউ গুণে রাখে মানে সে চিন্তিত। ছোট বোন চিন্তিত বড় ভাইকে নিয়ে। এটা জাহিদের বুকে লাগল।

সমস্যাটা কোথায়? জাহিদ জানে। সব নিজে করে।

কোড নিজে লেখে। রিভিউ জাহিদকে করতে হয়। ক্লায়েন্টের সাথে কথা জাহিদ বলে। প্রপোজাল জাহিদ লেখে। ইনভয়েস জাহিদ পাঠায়। সার্ভার ডাউন হলে জাহিদ ঠিক করে। নতুন টেকনোলজি শিখতে হলে জাহিদ শেখে।

সজীব ভালো কোডার, কিন্তু ক্লায়েন্টের সাথে ইংরেজিতে কথা বলতে পারে না। তানজিন শিখছে, কিন্তু এখনো সিনিয়র লেভেলের কাজ দেওয়া যায় না। পুরো কোম্পানিটা জাহিদের কাঁধে।

সকাল আটটায় ল্যাপটপ খোলে। রাত বারোটায় বন্ধ করে। কখনো একটায়। কখনো দুইটায়। ষোলো ঘণ্টা। সাত দিন। বায়ান্ন সপ্তাহ। তিন বছর।

ঈদে ক্লায়েন্ট মেসেজ করেছে, জাহিদ রিপ্লাই দিয়েছে। মায়ের জন্মদিনে ডেডলাইন ছিল, কেক কিনতে পারেনি। আব্বা ঢাকায় এসেছিলেন একবার, জাহিদ পুরোটা সময় রুমে বসে কোড করেছে।

আট মাস হলো একটানা। কোনো ছুটি না। শুক্রবারও না।

বুকে ব্যথা শুরু হলো একদিন বিকেলে। হঠাৎ। প্রথমে ভাবল গ্যাস। চা খেল। ব্যথা গেল না। বাম দিকে চাপ। শ্বাস নিতে কষ্ট।

জাহিদের মাথায় প্রথম যে চিন্তা এলো সেটা হার্ট অ্যাটাক না। প্রথম চিন্তা: "কালকের ডেডলাইন কে সামলাবে?" এটাই সমস্যা।

কাছের ক্লিনিকে গেল। ECG করলেন ডাক্তার। হার্টের কিছু হয়নি। ব্লাড প্রেসার একটু বেশি। বাকি সব স্ট্রেস।

"আপনি কী করেন?"

"ফ্রিল্যান্সিং। সফটওয়্যার।"

"কত ঘণ্টা কাজ করেন?"

"চৌদ্দ থেকে ষোলো।"

ডাক্তার চশমা খুলে রাখলেন। "চব্বিশ বছরে বুকে ব্যথা। ভালো লক্ষণ না। হার্টের কিছু হয়নি এখনো। কিন্তু এভাবে চালালে হবে। আপনি কি ঠিকমতো খান?"

জাহিদ উত্তর দিল না।

"সেটাই সমস্যা।"

ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে হাঁটছে জাহিদ। রিকশা চলছে, মানুষ যাচ্ছে-আসছে, দোকানে আলো জ্বলছে। পৃথিবী চলছে। একটা কথা মাথায় ঘুরছে। চব্বিশ বছরে বুকে ব্যথা।

সে কী জন্য এই কাজ শুরু করেছিল? স্বাধীনতার জন্য। নিজের মতো করে কাজ করার জন্য।

কিন্তু এখন কোনো বস নেই, বিশটা ক্লায়েন্ট আছে। প্রত্যেকে আলাদা বস। একজন সকাল আটটায় মিটিং চায়, আরেকজন রাত এগারোটায়। নয়টা-পাঁচটার চাকরি ছেড়ে চব্বিশ ঘণ্টার চাকরি নিয়েছে।

যে ছেলে rat race থেকে পালিয়েছিল, সে নিজেই এখন একটা rat race চালাচ্ছে। একা। নিজের ট্র্যাকে। কিন্তু দৌড়ানো একই।

সুমাইয়া ফোন করল রাতে। এখন মেডিকেল কলেজে ইন্টার্ন।

"মিম বলল তোর বুকে ব্যথা হয়েছে। ডাক্তারের কাছে গেছিস?"

"গেছি। কিছু হয়নি। স্ট্রেস।"

"তুই ডাক্তারের কাছে যাস না সহজে। যখন গেছিস, মানে ব্যাপারটা সিরিয়াস ছিল।"

জাহিদ চুপ।

"শোন, আমি ডাক্তার। মানে এখনো পুরো ডাক্তার না, কিন্তু এটুকু বুঝি। তোর শরীর তোকে সিগন্যাল দিচ্ছে। তুই সেটা ইগনোর করলে পরেরটা আরো জোরে আসবে।"

"কাজ তো থামানো যায় না।"

"কাজ থামানো যায় না, তুই থামানো যায়। পার্থক্য বোঝ। তুই না থাকলে কাজ অন্য কেউ করবে। কিন্তু তুই না থাকলে তোকে কে replace করবে?"

"ফিলোসফি মারিস না।"

"ফিলোসফি না, মেডিসিন। পাঁচ দিন ছুটি নে। ল্যাপটপ বন্ধ কর। খা, ঘুমা, হাঁট।"

"পাঁচ দিন? ক্লায়েন্ট..."

"পাঁচ দিন অপেক্ষা করতে পারবে না এমন ক্লায়েন্ট রাখার দরকার নেই।"

সজীবকে বলল, "আমি পাঁচ দিন ছুটি নিচ্ছি। তুমি আর তানজিন সামলাও।"

সজীব অবাক। "ভাই, আপনি ছুটি নিচ্ছেন?"

ক্লায়েন্টদের মেসেজ দিল। "I'll be unavailable for 5 days. My team lead Sajib will handle any urgent issues." তিনজন okay বলল। একজন বলল "is everything alright?" একজন কিছু বলল না।

ল্যাপটপ বন্ধ করল। চার্জার খুলে আলমারিতে রাখল। ফোনে স্ল্যাক আর ইমেইল notification বন্ধ করল।

আট মাসে প্রথমবার ল্যাপটপ বন্ধ। স্ক্রিনে নিজের প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছে। চেহারাটা চেনা যাচ্ছে না।

প্রথম দিন কিছুই করল না। সকালে চা। তারপর বারান্দায় বসে রইল। কিছু না করে। শুধু বসে।

অদ্ভুত লাগল। হাতে কোনো task নেই, কোনো deadline নেই, কোনো notification আসছে না। শুধু সময়। খালি সময়।

দুপুরে আম্মার সাথে বসে ভাত খেল। পুরো খাবার শেষ করল। ফোন ছাড়া। তিন বছরে প্রথমবার। হাসিনা আম্মা কিছু বললেন না। কিন্তু চোখে পানি এসেছিল।

বিকেলে মাঠে গেল। ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে। একটা ছেলে বলল, "ভাইয়া, ফিল্ডিং করবেন?" জাহিদ করল। আধঘণ্টা ক্রিকেট খেলল। ঘামল। হাঁপাল। হাসল।

রাতে ঘুমালো দশটায়। ঘুম ভাঙল সাতটায়। নয় ঘণ্টা। কত মাস পর।

দ্বিতীয় দিন গ্রামে গেল। আব্বা-আম্মার কাছে। দুপুরে মায়ের রান্না খেল। ডাল, ভাত, আলু ভর্তা, শুটকি। কোনো স্ক্রিন ছাড়া। বিকেলে মাঠে হাঁটল। একা। কোনো earphone নেই, কোনো podcast নেই। শুধু বাতাসের শব্দ, পাখির ডাক, দূরে একটা গরুর গাড়ির চাকার আওয়াজ।

জাহিদ আবিষ্কার করল, সে এই শব্দগুলো ভুলে গিয়েছিল।

১০

তৃতীয় দিন। সকাল থেকে অস্থিরতা।

ক্লায়েন্ট কী ভাবছে? সজীব কি ঠিকমতো কাজ করছে? API endpoint-এ যে bug ছিল, সেটা কি ফিক্স হয়েছে?

মাথায় একটা লুপ চলছে। While(true) { worry(); }

দুপুরের পর আর পারল না। ফোন তুলল। notification বন্ধ, কিন্তু ম্যানুয়ালি স্ল্যাক খুলল।

পাঁচটা মেসেজ। সজীব: "Australian client-এর কাজ ডেলিভার করেছি, তারা happy।" তানজিন: "Design approved." সজীব: "API bug fixed." সজীব: "কিছু দরকার হলে জানাবেন, নাহলে আমরা সামলাচ্ছি।" ক্লায়েন্ট: "Thanks Sajib, looks good."

কিছুই urgent না। কিছুই ভেঙে পড়েনি। পৃথিবী ঘুরছে। জাহিদ ছাড়াও।

ফোন রেখে দিল। একটা অদ্ভুত অনুভূতি। সে indispensable না। সে যে ভাবত কোডকারিগর তাকে ছাড়া চলবে না, সেটা সত্য না।

এটা humbling। কিন্তু liberating-ও।

১১

চতুর্থ দিন। দশ ঘণ্টা ঘুমালো। শরীর যেন তিন বছরের ঘুমের ঋণ শোধ করছে।

সকালে উঠে অবাক হলো। মাথা হালকা। চোখ জ্বলছে না। বুকে কোনো চাপ নেই। পেটে ক্ষিধা। আসল ক্ষিধা। তিন বছরে প্রথমবার ক্ষিধা পেয়ে খুশি লাগল।

মিম ফোন করল। "ভাইয়া, কেমন আছো?"

"ভালো, মিম। তুই কেমন?"

"তুমি আমাকে তিন মাসে প্রথম জিজ্ঞেস করলে আমি কেমন আছি।"

তিন মাস। নিজের বোনকে তিন মাসে একবারও জিজ্ঞেস করেনি কেমন আছে? কী হয়ে গেছিল তার?

১২

পঞ্চম দিন। বাড়ির পেছনের পুকুরপাড়ে বসে আছে জাহিদ। পানিতে একটা শাপলা ফুটেছে। সাদা। চারপাশে সবুজ পাতা।

এই পুকুরে সে ছোটবেলায় সাঁতার কাটত। তারপর HSC, তারপর কম্পিউটার শেখা, তারপর ফ্রিল্যান্সিং, তারপর এজেন্সি। প্রতিটা ধাপে সে "এগিয়েছে"। কিন্তু কোথায় এগিয়েছে? টাকা বেশি আসে। পরিবারের অবস্থা ভালো। কিন্তু সে নিজে? সে কি ভালো আছে?

তিন বছর আগে কোড লিখতে খুশি হতো। নতুন কিছু শিখলে উত্তেজিত হতো। ক্লায়েন্টের "great work" শুনলে বুকটা ভরে যেত। এখন "great work" শুনলে মনে হয় পরের প্রজেক্ট কবে? আনন্দ থেকে অভ্যাস। অভ্যাস থেকে বোঝা।

present bias। এখনকার লাভকে ভবিষ্যতের চেয়ে বেশি মূল্য দেওয়া। জাহিদ ঠিক এটাই করেছে। আরেকটু বেশি কাজ করলে আরেকটু বেশি টাকা। সত্য। কিন্তু ভবিষ্যতের শরীর? মানসিক স্বাস্থ্য? সম্পর্ক? সেগুলো discount করেছে। প্রতিদিন, প্রতিটা সিদ্ধান্তে।

১৩

ছুটি শেষ। ঢাকায় ফিরল। ল্যাপটপ খুলল। তিনশো সাতাশটা unread email। বিরাশিটা স্ল্যাক মেসেজ। সতেরোটা GitHub notification।

আগে হলে আতঙ্কিত হতো। এখন হলো না। ধীরে ধীরে একটা একটা করে দেখল। বেশিরভাগই informational। কিছু সজীব সামলেছে। কোনো বিপর্যয় হয়নি।

সজীব বলল, "ভাই, আসলে আপনি না থাকলে আমি বুঝলাম কোথায় আমার দুর্বলতা। ক্লায়েন্টের সাথে কথা বলতে প্রথমে ভয় লাগছিল, কিন্তু পরে ঠিক হয়ে গেল।"

জাহিদ ভাবল, এটাও সে ভুল করেছিল। সব নিজে করতে গিয়ে সজীবকে বড় হওয়ার সুযোগ দেয়নি। পাঁচ দিনে অনেক কিছু পরিষ্কার হলো।

১৪

সেদিন রাতে জাহিদ একটা নোটবুক খুলল। কাগজের নোটবুক। ল্যাপটপ না।

লিখল: "আমি তিন বছর ধরে এমনভাবে কাজ করেছি যেন আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। শুধু আজ আছে। আজকের ক্লায়েন্ট, আজকের ডেডলাইন, আজকের ইনভয়েস। কিন্তু আমার একটা শরীর আছে, একটা পরিবার আছে, একটা মন আছে। এগুলোও investment চায়।"

"সব নিজে করা বন্ধ। সজীবকে দায়িত্ব দেওয়া। ক্লায়েন্ট বাছাই। রাতে কাজ বন্ধ। সপ্তাহে একদিন ছুটি।"

"আর সবচেয়ে বড় কথা: আমি indispensable না। এটা মেনে নিতে হবে।"

কলম রাখল। রাত সাড়ে দশটায় ঘুমাল।

ঘুমানোর আগে একটা কথা মাথায় এলো। স্বাধীনতা মানে যখন খুশি কাজ করা না। স্বাধীনতা মানে যখন খুশি কাজ না করা।

এই পার্থক্যটা বুঝতে তিন বছর লেগেছে। একটা বুকে ব্যথা লেগেছে। একটা ছোট বোনের গোনা হাসি লেগেছে।

কিন্তু দেরিতে হলেও বুঝেছে। সেটাই যথেষ্ট।

বাইরে ঢাকার রাস্তায় গাড়ি চলছে। কোথাও কেউ কাজ করছে। কোথাও কেউ ঘুমাচ্ছে। জাহিদ আজ ঘুমাবে। কাল কাজ করবে। কিন্তু আজ ঘুম।

আজ ঘুম।