ফ্রিল্যান্সিং vs চাকরি
দুটো পথ, দুটো হিসাব, একটাও সরলরেখা না
১
রাসেল ফোন করল রাত সাড়ে দশটায়।
জাহিদ তখন একটা ক্লায়েন্টের Shopify স্টোরের ফাইনাল ডেলিভারি চেক করছিল। স্ক্রিনে বিশটা প্রোডাক্ট পেজ। একেকটায় ছবি, দাম, ডেসক্রিপশন। সব মিলিয়ে দেখতে হবে মোবাইলে কেমন লাগে। ক্লায়েন্ট আমেরিকার, সকাল আটটায় উঠে চেক করবে, তার আগে সব ঠিক থাকতে হবে।
ফোন বাজল। রাসেল। জাহিদ ধরল।
"কী রে?"
"কিছু না। বাসায় ফিরলাম এইমাত্র। ভাবলাম তোকে একটু ফোন করি।"
জাহিদ ঘড়ি দেখল। রাত সাড়ে দশটা। "এত রাতে বাসায় ফিরলি?"
"একটা ফিচার ডেপ্লয় করতে হইছিল। প্রোডাকশনে বাগ ছিল। ছটায় ধরা পড়ল, দশটায় ফিক্স হইল।" রাসেল একটু থামল। "তোর কী অবস্থা?"
"কাজ করছি।"
"এখনো?"
"ক্লায়েন্ট আমেরিকায়। ওদের সকাল আমাদের রাত।"
রাসেল হাসল। ক্লান্ত হাসি। "দুইজনেই রাত সাড়ে দশটায় কাজ করছি। একজন অফিসের জন্য, একজন ক্লায়েন্টের জন্য। কোনো পার্থক্য আছে?"
জাহিদ ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরাল। ভাবল।
"আছে," বলল। "তুই আজ ওভারটাইম করেছিস, কিন্তু কাল তোর স্যালারি একই থাকবে। আমি আজ রাত জেগে কাজ করছি, কিন্তু এই ডেলিভারির পর আটশো ডলার আসবে।"
"কিন্তু তোর তো কোনো গ্যারান্টি নেই যে পরের মাসেও আটশো আসবে।"
জাহিদ কিছু বলল না। কারণ রাসেল ঠিক বলেছে।
২
এই কথোপকথনটা জাহিদের মাথায় ঘুরতে থাকল পরের কয়েকদিন।
ফ্রিল্যান্সিং নাকি চাকরি। ইন্টারনেটে এই বিতর্ক চলে অনন্তকাল ধরে। ফেসবুক গ্রুপে প্রতি সপ্তাহে কেউ না কেউ পোস্ট দেয়: "ফ্রিল্যান্সিং ভালো নাকি চাকরি?" নিচে দুইশো কমেন্ট। একদল বলে ফ্রিল্যান্সিং, কারণ স্বাধীনতা। আরেকদল বলে চাকরি, কারণ নিশ্চয়তা। কেউ কাউকে কনভিন্স করতে পারে না। কেউ করার চেষ্টাও করে না আসলে। সবাই নিজের পক্ষে যুক্তি দেয়, অন্যের কথা শোনে না।
জাহিদ চার বছর ফ্রিল্যান্সিং করেছে। সে জানে ফ্রিল্যান্সিং কেমন। রাসেল দুই বছর চাকরি করছে। সে জানে চাকরি কেমন। দুজনের কাছেই ডেটা আছে। অনুমান না, অভিজ্ঞতা।
জাহিদ একটা স্প্রেডশিট খুলল। Google Sheets। দুটো কলাম। বাম দিকে "ফ্রিল্যান্সিং (জাহিদ)", ডান দিকে "চাকরি (রাসেল)"।
হিসাব করতে শুরু করল।
৩
আয়।
জাহিদের আয়: গত ছয় মাসের গড় $1,700/মাস। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় 200,000। কিন্তু এটা গড়। কোনো মাসে $2,500, কোনো মাসে $900। জানুয়ারিতে একটা বড় প্রজেক্ট শেষ করে $3,200 পেয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ক্লায়েন্ট ক্যান্সেল করায় $800-তে নেমে গেছে। এই ওঠানামা প্রতি মাসে। প্রতি মাসে। কোনো মাসই আগের মাসের মতো না।
রাসেলের আয়: 45,000 টাকা। প্রতি মাসে। গত দুই বছরে একবার প্রমোশন হয়েছে, 35K থেকে 45K। পরের প্রমোশন কবে হবে জানে না। হয়তো এক বছর পর, হয়তো দুই বছর পর। কিন্তু এই মাসে 45K আসবে, এটা সে জানে। পরের মাসেও। তার পরের মাসেও।
জাহিদ সংখ্যাগুলো পাশাপাশি রাখল। মাসিক আয়ে জাহিদ চারগুণ বেশি। কিন্তু রাসেলের আয়ে কোনো রাত জাগার দরকার নেই, কোনো ক্লায়েন্ট খোঁজার দরকার নেই, কোনো রিভিউয়ের টেনশন নেই।
আর জাহিদের আয় ডলারে। ডলারের রেট বাড়লে আয় বাড়ে। কিন্তু ডলারে আয় মানে ডলারে ঝুঁকিও। Upwork-এর পলিসি বদলালে, প্ল্যাটফর্ম ফি বাড়লে, বা ক্লায়েন্ট দেশ ছেড়ে AI টুলে চলে গেলে, আয় শূন্য হতে পারে। এক মাসে।
৪
খরচ।
জাহিদ থাকে মফস্বলে। বাবা-মায়ের সাথে। ঘরভাড়া দিতে হয় না, কারণ বাবা-মায়ের বাড়ি। খাওয়ার খরচ পরিবারের সাথে ভাগ। ইন্টারনেট 1,200 টাকা। বিদ্যুৎ 2,000। নিজের খরচ মাসে 8,000-10,000 টাকা। বাকি সব সেভিংস বা পরিবারে দেওয়া।
রাসেল থাকে ঢাকায়। মিরপুরে শেয়ার্ড অ্যাপার্টমেন্ট। ভাড়া 12,000 (তিনজনে ভাগ করে 4,000 দেয়)। খাওয়া 8,000। যাতায়াত 3,000। ফোন, ইন্টারনেট 1,500। কাপড়চোপড়, গোছগাছ 2,000। মোট: প্রায় 18,500। 45K থেকে 18.5K বাদ দিলে হাতে থাকে 26,500। সেখান থেকে বাড়িতে পাঠায় 10,000। নিজের সেভিংস 16,500।
কিন্তু ঢাকার খরচ মফস্বলের চেয়ে দেড়গুণ। একই খাবার, একই জিনিস, কিন্তু দাম বেশি। আর কমিউটের সময়, সেটার তো কোনো দাম নেই স্প্রেডশিটে। কিন্তু জীবনে আছে। প্রতিদিন দুই ঘণ্টা বাসে দাঁড়িয়ে যাওয়া, ঘামে ভিজে আসা। এটা কোনো কলামে লেখা যায় না।
৫
সময়।
জাহিদ কাজ করে দিনে দশ-বারো ঘণ্টা। আগে চৌদ্দ-ষোলো ঘণ্টা করত, বার্নআউট হয়েছিল। এখন একটু শিখেছে। সকাল নয়টা থেকে রাত নয়টা। মাঝখানে দুই ঘণ্টা বিরতি। কিন্তু "বিরতি" বলতে যা বোঝায় তা না। Slack চেক করে, ইমেইল দেখে, ক্লায়েন্টের মেসেজ পড়ে। আসল বিরতি নেই। মাথা সবসময় কাজে থাকে।
কমিউট: শূন্য। বিছানা থেকে ল্যাপটপ পর্যন্ত দশ সেকেন্ড।
রাসেল কাজ করে নয়টা থেকে ছয়টা। নয় ঘণ্টা। কিন্তু তার আগে দেড় ঘণ্টা বাসে। পরে আরো দেড় ঘণ্টা। মোট বারো ঘণ্টা ঘর থেকে বেরিয়ে থাকে। ঘরে ফিরে ক্লান্ত। কিন্তু ফেরার পর কাজের কথা ভাবতে হয় না। ল্যাপটপ বন্ধ মানে বন্ধ। (সেদিনের মতো বাগ ফিক্স ছাড়া।)
জাহিদের ক্ষেত্রে ল্যাপটপ কখনো বন্ধ হয় না। ঘুমানোর আগে ক্লায়েন্টের মেসেজ চেক করে। ঘুম থেকে উঠে প্রথম কাজ ইমেইল দেখা। ছুটির দিন বলে কিছু নেই। শুক্রবার? ক্লায়েন্ট আমেরিকায়, ওদের শুক্রবার কাজের দিন। ঈদ? ক্লায়েন্ট জানে না ঈদ কী।
৬
নিরাপত্তা।
এইখানে হিসাবটা উলটে যায়।
রাসেলের কোম্পানি হেলথ ইন্স্যুরেন্স দেয়। বছরে দুই সপ্তাহ ছুটি। প্রভিডেন্ট ফান্ডে কোম্পানি ম্যাচিং কন্ট্রিবিউশন দেয়। মানে রাসেল প্রতি মাসে যা জমায়, কোম্পানি তার ওপর আরো কিছু যোগ করে। দশ বছর পর এটা একটা অঙ্ক হবে।
জাহিদের কিছু নেই। হেলথ ইন্স্যুরেন্স নিজে কিনেছে, মাসে 2,500 টাকা। ছুটি নিলে আয় বন্ধ। পেনশন বলে কিছু নেই। প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই। সেভিংস আছে, কিন্তু সেটা নিজে করতে হয়, কেউ জোর করে না, কেউ ম্যাচিং দেয় না।
রাসেল অসুস্থ হলে বেতন পায়। জাহিদ অসুস্থ হলে আয় শূন্য। রাসেলের কোম্পানি বন্ধ হলে সে আরেকটা কোম্পানিতে যেতে পারে, কারণ তার রেজ্যুমেতে অভিজ্ঞতা আছে। জাহিদের Upwork প্রোফাইল ব্যান হলে সে শূন্য থেকে শুরু।
জাহিদ স্প্রেডশিটে "নিরাপত্তা" রো-তে রাসেলের পাশে একটা সবুজ সেল দিল। নিজের পাশে লাল।
৭
স্বাধীনতা।
এইখানে হিসাবটা আবার উলটায়।
জাহিদ আজ কাজ করতে চায় না? করবে না। কেউ কিছু বলবে না। (অবশ্য পরের দিন দ্বিগুণ করতে হবে।) জাহিদ চায়ের দোকানে বসে কাজ করতে চায়? করতে পারে। জাহিদ রাত তিনটায় কাজ করতে চায়? পারে। জাহিদ এই ক্লায়েন্টকে পছন্দ করে না? ড্রপ করতে পারে। (অবশ্য আয় কমবে।)
রাসেল সকাল নয়টায় অফিসে থাকতে হবে। পাঁচ মিনিট লেট হলে ম্যানেজার তাকায়। ড্রেস কোড আছে, ফর্মাল না হলেও "প্রেজেন্টেবল" হতে হবে। বসের সাথে একমত না হলেও মাথা নাড়াতে হয়। অফিস পলিটিক্স আছে, কে কার দলে সেটা জানতে হয়। মিটিংয়ে বসে থাকতে হয় যেগুলোর কোনো মানে নেই। কিন্তু এসব করলে চাকরি থাকে। না করলে? রিস্ক।
জাহিদ "স্বাধীনতা" রো-তে নিজের পাশে সবুজ দিল। রাসেলের পাশে লাল।
কিন্তু তারপর ভাবল, স্বাধীনতা কি আসলেই সবুজ? সে তো ক্লায়েন্টের সময়ে কাজ করে। ক্লায়েন্ট যা চায় তাই বানায়। ক্লায়েন্টের রিভিউয়ের ওপর তার ক্যারিয়ার নির্ভর করে। এটা কোন ধরনের স্বাধীনতা? বস নেই, কিন্তু বসের বদলে পাঁচটা ক্লায়েন্ট আছে। একজন বসের চেয়ে পাঁচজন বস কি বেশি স্বাধীনতা?
সবুজটা একটু হলুদ করল।
৮
জাহিদ স্প্রেডশিটে আরেকটা শিট খুলল। নাম দিল "দশ বছর পর।"
ফ্রিল্যান্সার, বেস্ট কেস: জাহিদ একটা প্রোডাক্ট কোম্পানি বানিয়েছে। নিজের SaaS বা এজেন্সি। পাঁচ-ছয়জন কর্মী। মাসিক আয় $10,000+। ক্লায়েন্ট ডিপেন্ডেন্সি কমেছে, কারণ নিজের প্রোডাক্ট আছে। মফস্বল থেকেই চালায়। বাবা-মায়ের কাছে থাকে। জীবন ভালো।
ফ্রিল্যান্সার, ওয়ার্স্ট কেস: AI টুল জাহিদের কাজ খেয়ে ফেলেছে। Shopify স্টোর সেটআপ এখন ChatGPT করে দেয়। WordPress থিম কাস্টমাইজেশনের দরকার নেই, AI জেনারেট করে। জাহিদের স্কিল outdated। নতুন স্কিল শেখার সময় পেরিয়ে গেছে। সেভিংস ফুরিয়ে যাচ্ছে। পেনশন নেই। বত্রিশ বছর বয়সে আবার শূন্য।
চাকরি, বেস্ট কেস: রাসেল VP বা CTO হয়েছে একটা কোম্পানিতে। মাসে 200,000 টাকা। স্টক অপশন আছে। হেলথ ইন্স্যুরেন্স পুরো পরিবারের জন্য। দশ বছরের প্রভিডেন্ট ফান্ড, বড় অঙ্ক। ঢাকায় নিজের ফ্ল্যাট কেনার পরিকল্পনা। স্থিতিশীল।
চাকরি, ওয়ার্স্ট কেস: কোম্পানি রিস্ট্রাকচার করেছে। রাসেল লেইড অফ। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে চাকরি খুঁজছে। রেজ্যুমেতে দশ বছরের অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু মার্কেট খারাপ। ছয় মাস বেকার। সেভিংস কমছে।
জাহিদ চারটা সিনারিও পাশাপাশি রাখল। দেখল।
কোনোটাই নিশ্চিত না।
৯
চার্টটা বানাল জাহিদ। দুটো লাইন। একটা ফ্রিল্যান্সারের আয়, ওঠানামা করছে ঢেউয়ের মতো। কোনো মাসে চূড়ায়, কোনো মাসে খাদে। আরেকটা চাকরির আয়, ধীরে ধীরে উপরে উঠছে, কিন্তু সোজা লাইন, কোনো নাটক নেই।
প্রথম দুই বছরে দুটো লাইন কাছাকাছি। তারপর ফ্রিল্যান্সারের লাইন উপরে চলে যায়। কিন্তু সেই লাইনের চারপাশে একটা ব্যান্ড আছে। ধূসর। সেই ব্যান্ডটা হলো অনিশ্চয়তা। ফ্রিল্যান্সারের আয় ওই ব্যান্ডের যেকোনো জায়গায় থাকতে পারে। উপরের প্রান্তে থাকলে দারুণ। নিচের প্রান্তে নামলে চাকরির চেয়ে কম।
চাকরির লাইনের চারপাশেও একটা ব্যান্ড আছে, কিন্তু সরু। বেতন বাড়তে পারে, কিন্তু নাটকীয়ভাবে না। কমতেও পারে, কিন্তু শূন্য হওয়ার সম্ভাবনা কম।
জাহিদ চার্টটার দিকে তাকিয়ে থাকল।
গড় আয়ে ফ্রিল্যান্সিং জেতে। কিন্তু ভলাটিলিটিতে চাকরি জেতে। কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ? সেটা নির্ভর করে তুমি কে, তোমার পরিস্থিতি কী, তোমার পেটে কতজনের ভাত।
১০
রাসেলকে স্প্রেডশিটটা পাঠাল জাহিদ। WhatsApp-এ।
রাসেল দেখল। কিছুক্ষণ পর টাইপ করল:
"তুই তো আমার চেয়ে চারগুণ কামাচ্ছিস। তাহলে তো ক্লিয়ার।"
জাহিদ লিখল: "ক্লিয়ার না। তুই তো পুরো ছবিটা দেখ।"
"কোন ছবি?"
"আমার গত মাসে আয় ছিল $900। তোর মাসে 45K। ডলার রেটে আমার আয় ছিল প্রায় 108,000 টাকা। কিন্তু সেই মাসে আমি দুইটা ক্লায়েন্ট হারিয়েছি। একজন বাজেট কাট করেছে, একজন AI দিয়ে কাজ করিয়ে নিয়েছে। আমি তিন সপ্তাহ নতুন কাজ খুঁজেছি। তিন সপ্তাহে আয় শূন্য।"
রাসেল কিছুক্ষণ টাইপ করল না। তারপর লিখল:
"কিন্তু তোর তো সেভিংস আছে।"
"আছে। কিন্তু সেভিংস থাকলেও ভয় থাকে। তিন সপ্তাহ আয় শূন্য থাকলে মাথায় যে চিন্তা ঘোরে, সেটা তুই বুঝবি না। তোর মাসের প্রথম তারিখে টাকা আসে। আমার আসে কি আসে না, সেটা আমি জানি না।"
রাসেল লিখল: "কিন্তু আমি তো ফ্রিডম পাই না। সকাল নয়টায় অফিসে থাকতে হয়। বসের সামনে হাসতে হয়। মিটিংয়ে বসে ঘুমাতে ইচ্ছা করে।"
"আর আমি ঘুমাতে পারি না। ক্লায়েন্টের ডেডলাইন মাথায় ঘোরে। রাত তিনটায় উঠে কাজ করি। ফ্রিডম আছে, কিন্তু সেই ফ্রিডমের দাম ঘুম দিয়ে মেটাই।"
দুজনেই চুপ হয়ে গেল।
১১
পরদিন সকালে জাহিদ চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় বসল। ল্যাপটপ খুলল না। আজ একটু ভাবতে চায়।
চার বছর আগে সে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছিল। তখন চাকরি পাওয়ার সুযোগ ছিল না। 4.17 GPA দিয়ে যেসব জায়গায় অ্যাপ্লাই করেছিল, কোথাও ডাকেনি। একটা জায়গা ডেকেছিল, বেতন 12,000 টাকা। ঢাকায় 12,000 দিয়ে থাকা-খাওয়া চলে না। মফস্বল থেকে যাতায়াত সম্ভব না।
তখন ফ্রিল্যান্সিং ছাড়া পথ ছিল না। ফ্রিল্যান্সিং কোনো মহান সিদ্ধান্ত ছিল না। এটা ছিল বাস্তবতা।
রাসেল BUET থেকে পাস করেছে। ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্টে চাকরি পেয়েছে। Starting salary 35K। সেটাও কোনো মহান সিদ্ধান্ত ছিল না। রাসেলের সামনে চাকরির অফার ছিল, সে নিয়েছে। জাহিদের সামনে ছিল না, সে নেয়নি। এটুকুই।
কিন্তু ইন্টারনেটে যারা ফ্রিল্যান্সিং vs চাকরি নিয়ে তর্ক করে, তারা এই অংশটা বলে না। তারা বলে: "আমি ফ্রিল্যান্সিং বেছে নিয়েছি কারণ আমি স্বাধীনচেতা।" বা: "আমি চাকরি করি কারণ আমি স্থিতিশীলতা চাই।" যেন সবকিছু চয়েসের ব্যাপার। যেন সবার সামনে দুটো দরজা আছে, আর তারা সচেতনভাবে একটা বেছে নিয়েছে।
বাস্তবে বেশিরভাগ মানুষের সামনে একটাই দরজা থাকে। যেটা খোলা, সেটা দিয়ে ঢোকে।
১২
জাহিদ স্প্রেডশিটে ফিরে গেল। আরেকটা রো যোগ করল। নাম দিল "প্রেজেন্ট বায়াস।"
বায়াস শব্দটা সে শিখেছে bdfacts.org থেকে। চার বছর আগে, যেদিন রাতে ঘুম আসেনি, সেদিন।
প্রেজেন্ট বায়াস। মানে: মানুষ বর্তমানকে ভবিষ্যতের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। আজকের একশো টাকা, এক বছর পরের দুইশো টাকার চেয়ে বেশি মূল্যবান মনে হয়। যদিও দুইশো বেশি।
ফ্রিল্যান্সিং প্রেজেন্ট রিওয়ার্ড দেয়। কাজ করলে টাকা আসে। এখন। এই সপ্তাহে। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ডলার ঢোকে, bKash-এ টাকা আসে। টাকার গতিবিধি দেখা যায়, ধরা যায়, গোনা যায়। এই তাৎক্ষণিকতা একটা নেশা। জাহিদ জানে, কারণ সে এই নেশায় আসক্ত।
চাকরি ফিউচার রিওয়ার্ড দেয়। পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড, ক্যারিয়ার গ্রোথ, স্ট্যাবিলিটি। এগুলোর কোনোটাই আজ হাতে ধরা যায় না। দশ বছর পর, বিশ বছর পর, রিটায়ারমেন্টের পর। তখন বুঝবে এগুলো কত মূল্যবান ছিল। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে।
ফ্রিল্যান্সিং বলে: এখন নাও। চাকরি বলে: পরে পাবে।
কোনটা ঠিক? দুটোই। কোনটা ভুল? দুটোই।
১৩
সন্ধ্যায় মা ডাকলেন। "খাবি?"
জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করল। যাওয়ার আগে স্প্রেডশিটের দিকে শেষবার তাকাল।
সবুজ আর লালে ভরা। কিন্তু কোনো পরিষ্কার বিজয়ী নেই। ফ্রিল্যান্সিং আয়ে জেতে, চাকরি নিরাপত্তায় জেতে। ফ্রিল্যান্সিং স্বাধীনতায় জেতে, চাকরি স্থিতিশীলতায় জেতে। ফ্রিল্যান্সিং বর্তমানে জেতে, চাকরি ভবিষ্যতে জেতে।
কোনো পথই objectively ভালো না।
পথটা ভালো হয় কিনা সেটা নির্ভর করে যে হাঁটছে তার ওপর। তার পরিস্থিতির ওপর। তার সামর্থ্যের ওপর। তার ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতার ওপর।
জাহিদ ফ্রিল্যান্সিং করে কারণ চাকরি খারাপ বলে না। জাহিদ ফ্রিল্যান্সিং করে কারণ তার পরিস্থিতি তাকে এই পথে নিয়ে এসেছে। পথটা সে বেছে নিয়েছে, ঠিক। কিন্তু পরিস্থিতি না থাকলে হয়তো বেছে নিত না। 4.17 না পেলে, ঢাকায় পড়ার টাকা থাকলে, ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্টে সুযোগ পেলে, হয়তো সেও নয়টা-ছয়টা অফিস করত। হয়তো সেও মিরপুরে শেয়ার্ড অ্যাপার্টমেন্টে থাকত। হয়তো সেও বসের সামনে মাথা নাড়াত।
কে জানে?
১৫
রাতে শোয়ার আগে জাহিদ নোটপ্যাডে একটা লাইন লিখল।
"আমি চাকরি করিনি কারণ চাকরি খারাপ না। আমি চাকরি করিনি কারণ আমার পরিস্থিতি আমাকে অন্য পথে নিয়ে গেছে। পথটা আমি বেছে নিয়েছি। কিন্তু পরিস্থিতি না থাকলে হয়তো বেছে নিতাম না।"
পড়ল। মনে হলো সৎ। তারপর আরেকটা লাইন লিখল।
"ফ্রিল্যান্সিং কোনো গন্তব্য না। এটা একটা যানবাহন। গন্তব্য এখনো ঠিক হয়নি।"
এটাও সৎ। হয়তো সবচেয়ে সৎ কথা সে নিজেকে বলেছে চার বছরে।
ফোন বন্ধ করল। চোখ বন্ধ করল।
বাইরে মফস্বলের রাত। নীরবতা। এটা ফ্রিল্যান্সিং-এর একটা সুবিধা যেটা কোনো স্প্রেডশিটে লেখা যায় না। নিজের ঘরে, নিজের বিছানায়, নিজের শর্তে।
কিন্তু সেই শান্তির ভেতরেও একটা অস্থিরতা আছে। পরের প্রজেক্ট কোথা থেকে আসবে? AI কি আমার কাজ খেয়ে ফেলবে? দশ বছর পর আমি কোথায় থাকব?
এই প্রশ্নগুলো রাসেলের মাথায়ও আছে। ভিন্ন চেহারায়, কিন্তু আছে।
কেউই নিশ্চিত না। কেউই না।
---
*ষষ্ঠ অধ্যায় সমাপ্ত। সপ্তম অধ্যায়: নতুন মানচিত্র।*