বিসিএস কী?
তিন লাখ মানুষ ঢোকে, দুই হাজার বের হয়
১
ফোনটা এলো বিকেল পাঁচটায়।
জাহিদ তখন একটা ক্লায়েন্টের ল্যান্ডিং পেজ রিভাইজ করছিল। তৃতীয় রিভিশন। ক্লায়েন্ট বলেছে বাটনের রঙ বদলাও, তারপর বলেছে আগেরটাই ভালো ছিল, তারপর বলেছে আরেকটু গাঢ় করো। জাহিদের মাথায় রঙের HEX কোড ঘুরছিল।
ফোনের স্ক্রিনে নাম: রাশেদ ভাই।
রাশেদ। কলেজের সিনিয়র। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে MA করেছে। গ্র্যাজুয়েশনের পর দুই বছর হয়ে গেছে। চাকরি করেনি একটাও। দিনরাত একটাই কাজ, BCS প্রিপারেশন।
জাহিদ ফোন ধরল।
"কেমন আছিস, জাহিদ?"
"আছি ভাই। আপনি?"
"পড়ছি।" একটু থামল। "শোন, তোর কাছে একটা জিনিস জানতে চাইছিলাম। ওয়েবসাইট বানানো কত দিনে শেখা যায়?"
জাহিদ অবাক হলো। "আপনি ওয়েবসাইট শিখবেন?"
"না না, এমনিই জিজ্ঞেস করলাম। BCS না হলে একটা প্ল্যান বি তো থাকা দরকার।"
জাহিদ কিছু বলল না। রাশেদ ভাই-এর মুখে "প্ল্যান বি" শব্দটা শুনে অদ্ভুত লাগল। কারণ গত দুই বছরে রাশেদ ভাই-এর জীবনে প্ল্যান এ ছাড়া আর কিছু ছিল না।
২
রাশেদকে জাহিদ চেনে কলেজ থেকে। মফস্বলের সরকারি কলেজ। রাশেদ জাহিদের দুই বছরের সিনিয়র। ভালো ছাত্র ছিল, কিন্তু BUET-IBA-মেডিকেল ভালো না, মফস্বলের সরকারি কলেজ ভালো। মানে ক্লাসে ফার্স্ট, কিন্তু বাইরের দুনিয়ায় সেটার দাম কতটুকু, সেটা বোঝার আগেই গ্র্যাজুয়েশন শেষ।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স, তারপর MA। রেজাল্ট ভালো। কিন্তু NU-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভালো রেজাল্ট দিয়ে চাকরির বাজারে কী হয়? কিছু হয় না। প্রাইভেট সেক্টরে কেউ NU-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান দেখে ইন্টারভিউ কার্ড পাঠায় না। ব্যাংকে অ্যাপ্লাই করা যায়, কিন্তু সেখানেও হাজার হাজার প্রার্থী। স্কুলে চাকরি, সেটাও NTRCA পরীক্ষা দিয়ে, দুই-তিন বছর অপেক্ষা।
তাহলে কী করবে?
BCS।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের জন্য এই একটা শব্দ যেন সব সমস্যার উত্তর। চাকরি নেই? BCS দাও। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত? BCS দাও। সমাজে সম্মান চাও? BCS দাও। বিয়ে হচ্ছে না? BCS দাও, তারপর পাত্রীপক্ষ লাইন দেবে।
রাশেদও দিচ্ছে। দুই বছর ধরে।
৩
সংখ্যাটা একবার দেখলে বুঝবে কেন BCS-কে হাঙ্গার গেমস বলা হয়।
প্রতি বছর BCS পরীক্ষায় আবেদন করে তিন থেকে চার লাখ মানুষ। কখনো পাঁচ লাখও ছাড়িয়ে যায়। পদ থাকে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার। কোনো কোনো বছর দুই হাজারের কম। সিলেকশন রেট এক পার্সেন্টের নিচে। শূন্য দশমিক পাঁচ থেকে শূন্য দশমিক আট পার্সেন্ট।
হার্ভার্ডে ভর্তির সিলেকশন রেট পাঁচ পার্সেন্ট। মানে হার্ভার্ডে চান্স পাওয়া BCS-এর চেয়ে দশগুণ সহজ। শুনতে হাসির মতো লাগে, কিন্তু গণিত তাই বলে।
তিন ধাপের পরীক্ষা। প্রিলিমিনারি: 200 নম্বরের MCQ, দুই ঘণ্টায়। এখানেই দুই-তিন লাখ বাদ পড়ে। রিটেন: 900 নম্বরের লিখিত পরীক্ষা, ছয়টা পেপার, প্রতিটা তিন ঘণ্টা। এটা পাস করলে ভাইভা। ভাইভায় 200 নম্বর। তিনটা ধাপ পেরোতে পারলে ক্যাডার পাওয়ার সুযোগ।
ছাব্বিশটা ক্যাডার। প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র, কাস্টমস, ট্যাক্সেশন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, তথ্য, নিরীক্ষা, পরিসংখ্যান, সমবায়, পরিবার পরিকল্পনা, খাদ্য, ডাক, রেলওয়ে, আনসার। সবার স্বপ্ন প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র, কাস্টমস। এগুলো পেতে হলে মেধাতালিকায় উপরের দিকে থাকতে হবে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটা আবেদন থেকে চূড়ান্ত নিয়োগ পর্যন্ত দুই থেকে তিন বছর লেগে যায়। কখনো চার বছর। মানে তুমি আজ আবেদন করলে, সব ঠিকঠাক গেলে, তিন বছর পর জয়েন করবে। সব ঠিকঠাক না গেলে? আবার দাও। পরের BCS-এ।
৪
রাশেদকে জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "ভাই, প্রতিদিন কত ঘণ্টা পড়েন?"
ফোনের ওপাশ থেকে একটু হাসির শব্দ। ক্লান্ত হাসি।
"সকাল ছয়টায় উঠি। নামাজ পড়ে সাতটায় বই খুলি। দুপুর একটায় খাই। আধাঘণ্টা বিশ্রাম। আবার দুইটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা। মাগরিবের পর আবার বসি। রাত বারোটায় ঘুমাই।"
জাহিদ হিসাব করল। বারো থেকে চৌদ্দ ঘণ্টা। প্রতিদিন।
"ছুটির দিন?"
"ছুটি নেই। শুক্রবারেও পড়ি। জুমার নামাজের জন্য দুই ঘণ্টা ব্রেক, বাকিটা একই।"
"কতদিন ধরে এই রুটিন?"
"দুই বছর। MA শেষ হওয়ার পর থেকে।"
দুই বছর। সাতশো তিরিশ দিন। প্রতিদিন বারো থেকে চৌদ্দ ঘণ্টা। কোনো আয় নেই। কোনো বেতন নেই। কোনো ক্লায়েন্ট নেই, কোনো বস নেই। শুধু বই, নোট, আর পরীক্ষার তারিখ।
জাহিদ ফ্রিল্যান্সিং করে, সে জানে পরিশ্রম কাকে বলে। রাত জেগে কাজ করেছে, উইকেন্ড ছাড়া মাসের পর মাস কাটিয়েছে। কিন্তু সেটার বিনিময়ে টাকা এসেছে। প্রতিটা ঘণ্টার একটা দাম ছিল, সেই দাম ডলারে ব্যাংকে ঢুকেছে।
রাশেদের দুই বছরের পরিশ্রমের বিনিময়ে কিছু আসেনি। এখনো আসেনি। হয়তো আসবে। হয়তো আসবে না।
৫
জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "ভাই, খরচ কীভাবে চালান?"
রাশেদ চুপ করে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর বলল, "বাবা-মা।"
"মানে?"
"মানে বাবা-মায়ের সাথে থাকি। খাওয়া-দাওয়া তাদের। বইপত্র কিনি, সেটাও বাবা দেন। কোচিং ফি দিতে হয়, সেটাও বাবা।" একটু থামল। "বাবা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। মাসে চল্লিশ হাজার টাকা পান। তার মধ্যে আমার পেছনে দশ হাজার খরচ হয়।"
পঁচিশ বছর বয়স। MA পাস। কিন্তু বাবার ওপর নির্ভরশীল। এটা বলতে রাশেদের কণ্ঠে কোনো লজ্জা ছিল না, কিন্তু একটা ভার ছিল। যেন এই তথ্যটা সে প্রতিদিন বহন করে, কিন্তু কাউকে বলে না।
"বাবা কিছু বলেন?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
"বলেন না। কিন্তু মা মাঝে মাঝে বলেন। 'তোমার বন্ধু ফারুক ব্যাংকে চাকরি পেয়েছে, তোমার বন্ধু সজীব গার্মেন্টসে ম্যানেজার হয়েছে।' এভাবে বলেন। সরাসরি বলেন না যে BCS ছাড়ো। কিন্তু যা বলেন তার মানে সেটাই।"
"আর বাবা?"
"বাবা বলেন, 'পড়। তোর সময় আসবে।'" রাশেদের কণ্ঠ নিচু হলো। "বাবা নিজে সারাজীবন চেয়েছিলেন সরকারি চাকরি। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হতে পেরেছেন, কিন্তু BCS দিতে পারেননি। বয়সসীমা পেরিয়ে গেছিল।"
৬
BCS কেন এত বড় স্বপ্ন?
এই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে বাংলাদেশের চাকরির বাজার বুঝতে হবে। প্রাইভেট সেক্টরে চাকরি আছে, কিন্তু সেগুলো অনিশ্চিত। কোম্পানি বন্ধ হতে পারে, ছাঁটাই হতে পারে, বেতন আটকে যেতে পারে। গার্মেন্টস সেক্টরে চাকরি আছে, কিন্তু সেটা কায়িক শ্রম, মধ্যবিত্তের ছেলেমেয়ে সেটা চায় না। IT সেক্টরে চাকরি আছে, কিন্তু সেটা ঢাকায়, আর ঢাকার বাইরের ছেলেমেয়েদের জন্য ঢাকায় থাকাটাই একটা যুদ্ধ।
সরকারি চাকরি মানে স্থায়িত্ব। একবার ঢুকলে বের করতে পারে না। পেনশন আছে। বাড়ি বরাদ্দ আছে, অন্তত সিনিয়র লেভেলে। মেডিকেল সুবিধা আছে। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার, সামাজিক মর্যাদা।
"সরকারি চাকরি।" এই দুটো শব্দ বাংলাদেশে একটা ম্যাজিক শব্দ। বিয়ের বাজারে, আত্মীয়দের মধ্যে, পাড়ায়-মহল্লায়। "ছেলেটা কী করে?" "সরকারি চাকরি।" ব্যস। আর কোনো প্রশ্ন নেই। বেতন কত, সেটা জানতে চায় না কেউ। পদবি কী, সেটাও না। "সরকারি" শব্দটাই যথেষ্ট।
আর BCS ক্যাডার মানে সরকারি চাকরির মধ্যেও সবচেয়ে উপরে। একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার পঁচিশ বছর বয়সে একটা উপজেলার দায়িত্ব পায়। একটা গোটা উপজেলা। তিন-চার লাখ মানুষের প্রশাসনিক প্রধান। DC-এর পর উপজেলায় সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি। একটা প্রাইভেট কোম্পানির কর্মচারী পঁচিশ বছর বয়সে কী করে? একটা স্প্রেডশিট ম্যানেজ করে। হয়তো একটা ছোট টিমের জুনিয়র মেম্বার।
ক্ষমতার এই পার্থক্যটা বোঝা দরকার। BCS শুধু চাকরি না। BCS হলো ক্ষমতা, মর্যাদা, নিরাপত্তা, আর সামাজিক উত্তরণ, এই চারটা জিনিস একসাথে।
৭
রাশেদের রুটিনটা জাহিদ শুনল বিস্তারিত।
সকাল ছয়টা: ঘুম থেকে ওঠা। ফজরের নামাজ। হালকা নাশতা, চা-রুটি।
সকাল সাতটা থেকে দুপুর একটা: বাংলা, ইংরেজি, গণিত। এগুলো প্রিলিমিনারির জন্য। MCQ। প্রতিদিন একশো MCQ প্র্যাকটিস। সময় ধরে। দুই মিনিটে একটা, এর বেশি সময় নেওয়া যাবে না। দুই মিনিটে উত্তর না পেলে এড়িয়ে যাও, পরেরটায় যাও।
দুপুর একটা থেকে দেড়টা: খাওয়া। ভাত, ডাল, সবজি। মাছ থাকলে মাছ। মাংস সপ্তাহে একদিন, শুক্রবার।
দেড়টা থেকে দুইটা: বিশ্রাম। তবে বিশ্রাম মানে ফোনে BCS-এর ফেসবুক গ্রুপ স্ক্রল করা। কে কোন বই পড়ছে, কার কোন কোচিং ভালো লাগছে, কে গত বছর পাস করেছে তার টিপস।
দুইটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা: সাধারণ জ্ঞান, বাংলাদেশ বিষয়াবলি, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি। বাংলাদেশের সংবিধান মুখস্থ। কত অনুচ্ছেদ, কোন অনুচ্ছেদে কী আছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সেক্টর কমান্ডারদের নাম, কোন সেক্টরে কোন জেলা। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের তারিখ, স্থান, কে পড়েছিলেন। জাতিসংঘের মহাসচিবদের তালিকা, কোন দেশ কবে জাতিসংঘে যোগ দিয়েছে। SAARC, BIMSTEC, WTO, WHO, IMF, World Bank। সংক্ষেপে সব, বিস্তারিত কিছু, মুখস্থ অনেক কিছু।
রাত আটটা থেকে বারোটা: রিটেনের প্রস্তুতি। প্রবন্ধ লেখা। দুই ঘণ্টায় একটা প্রবন্ধ। বিষয়: দুর্নীতি দমন, জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটাল বাংলাদেশ, নারীর ক্ষমতায়ন। প্রতিটা প্রবন্ধে ভূমিকা, মূল আলোচনা, উপসংহার। তথ্য-উপাত্ত দিতে হবে, সাল-তারিখ দিতে হবে, উদ্ধৃতি দিতে হবে।
রাত বারোটা: ঘুম। ঘুমানোর আগে পরদিনের পড়ার লিস্ট বানানো। তারপর চোখ বন্ধ।
এই রুটিন। প্রতিদিন। সাতশো তিরিশ দিন।
৮
জাহিদ ভাবল, সে নিজে চার বছর ফ্রিল্যান্সিং করেছে। কঠিন পরিশ্রম করেছে। কিন্তু তার পরিশ্রমের বিনিময়ে প্রতি মাসে টাকা এসেছে। কম হোক, বেশি হোক, কিছু না কিছু এসেছে। সেই টাকা দিয়ে পরিবারকে দিয়েছে, নিজের জন্য খরচ করেছে, সেভিংস করেছে। পরিশ্রমের সাথে ফলাফলের একটা সরাসরি সম্পর্ক ছিল।
রাশেদের ক্ষেত্রে সেই সম্পর্কটা নেই। দুই বছর পড়েছে, কিন্তু পরীক্ষা এখনো হয়নি। পরীক্ষা হলেও পাস করবে কিনা জানে না। পাস করলেও কোন ক্যাডার পাবে জানে না। প্রশাসন চায়, কিন্তু পুলিশ পেতে পারে, শিক্ষা পেতে পারে, পোস্টাল পেতে পারে। অথবা কিছুই পেতে পারে না।
দুই বছরের পরিশ্রমের ফলাফল: শূন্য অথবা সবকিছু। মাঝামাঝি কিছু নেই।
ফ্রিল্যান্সিং-এ জাহিদ প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়েছে। রেটিং বেড়েছে, ক্লায়েন্ট বেড়েছে, দক্ষতা বেড়েছে। প্রতিটা দিনের একটা incremental মূল্য ছিল।
BCS-এ রাশেদ হয় পুরোটা পাবে, নয়তো কিছুই পাবে না। Binary। একটা পরীক্ষার দিন সবকিছু নির্ধারণ হবে। সেই দিন মাথাব্যথা থাকলে, ঘুম না হলে, প্রশ্ন কমন না পড়লে, দুই বছরের পরিশ্রম মাটি।
৯
"ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?" জাহিদ বলল।
"কর।"
"কেন BCS?"
রাশেদ একটু চুপ থাকল। জাহিদ ভেবেছিল রাশেদ বলবে: দেশের সেবা করতে চাই। অথবা বলবে: প্রশাসনে গিয়ে পরিবর্তন আনতে চাই। এসব কথা BCS-এর ফেসবুক গ্রুপে সবাই বলে। ভাইভায় সবাই বলে। কিন্তু রাশেদ সেসব বলল না।
রাশেদ বলল, "কারণ আমার বাবা চান।"
জাহিদ কিছু বলল না।
"আমাদের পরিবারে কেউ কখনো সরকারি চাকরি পায়নি।" রাশেদের কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু ভেতরে কিছু একটা ছিল। "বাবা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। দাদা ছিলেন কৃষক। বাবার ভাই রিকশা চালান। আমার চাচাতো ভাইয়েরা গার্মেন্টসে কাজ করে।"
একটু থামল।
"আমি পরিবারের প্রথম মানুষ যে MA পাস করেছে। বাবা ভাবেন, আমি পারব। বাবা ভাবেন, তার ছেলে BCS ক্যাডার হবে। উপজেলায় হাঁটবে, মানুষ সালাম দেবে। বাবার নাম হবে।"
জাহিদ চুপ করে শুনল।
"আমি জানি না আমি পারব কিনা। তিন লাখ মানুষের মধ্যে দুই হাজার। গণিতটা আমি বুঝি। কিন্তু বাবা বোঝেন না। বাবা ভাবেন পরিশ্রম করলে সব হয়।"
"আর আপনি কী ভাবেন?"
রাশেদ আবার চুপ থাকল। তারপর বলল, "আমি ভাবি, পরিশ্রম না করলে কিছুই হয় না। কিন্তু পরিশ্রম করলেই সব হয়, এটা সত্য না। BCS-এ যারা পাস করে, তারা সবাই পরিশ্রম করেছে। কিন্তু যারা ফেল করে, তারাও পরিশ্রম করেছে। পার্থক্যটা পরিশ্রমে না। পার্থক্যটা অন্য কোথাও।"
"কোথায়?"
"জানি না। জানলে তো আর ভাবতাম না।"
১০
ফোন রেখে জাহিদ কিছুক্ষণ বসে রইল।
রাশেদের কথাগুলো মাথায় ঘুরছে। "আমাদের পরিবারে কেউ কখনো সরকারি চাকরি পায়নি।" এই একটা বাক্যের ভেতরে কত ইতিহাস লুকানো। কত প্রজন্মের হতাশা, কত অপূর্ণ স্বপ্ন। রাশেদের বাবা নিজে পারেননি, তাই ছেলেকে দিয়ে পূরণ করতে চান। এই গল্প বাংলাদেশের লাখো পরিবারের।
জাহিদ ভাবল, BCS হলো বাংলাদেশের হাঙ্গার গেমস। সবাই ঢোকে, কিন্তু বের হয় মুষ্টিমেয়। বাকিরা? বাকিরা হারিয়ে যায়। কেউ তাদের গল্প জানে না। কেউ তাদের হিসাব রাখে না। সবাই শুধু জেতা মানুষটার গল্প জানে। পাড়ার ছেলে BCS পাস করেছে, সেটা সবাই জানে। পাড়ার আরো বিশজন ছেলে BCS দিয়ে ফেল করেছে, সেটা কেউ মনে রাখে না।
সারভাইভরশিপ বায়াস। জাহিদ এই শব্দটাও জানে। bdfacts.org থেকে শিখেছে, চার বছর আগে।
সবাই জানে একজনকে যে BCS পাস করেছে। কেউ গোনে না সেই হাজার হাজার মানুষকে যারা পারেনি।
রাশেদ কি পারবে? জাহিদ জানে না। রাশেদ নিজেও জানে না।
কিন্তু রাশেদ পড়ছে। প্রতিদিন বারো ঘণ্টা। দুই বছর ধরে। কারণ বাবা চান। কারণ পরিবারে কেউ কখনো পারেনি। কারণ এই একটা পরীক্ষা পাস করলে সবকিছু বদলে যাবে।
অথবা বদলাবে না। কিন্তু সেই সম্ভাবনাটা রাশেদ এখনো ভাবতে রাজি না।
এখনো না।
---
*সপ্তম অধ্যায়: বিসিএস: বাংলাদেশের হাঙ্গার গেমস। পর্ব ৬১/১০০।*