প্রস্তুতির শুরু
পনেরোটা গাইড বই, পঞ্চাশটা মডেল টেস্ট, শূন্য আয়, আর ০.৭% সম্ভাবনার দিকে দৌড়
১
রাশেদ ভাই-এর রুমে ঢুকে জাহিদ প্রথম যে জিনিসটা দেখল, সেটা বই।
চারদিকে বই। মেঝেতে বই। খাটের নিচে বই। টেবিলে বই, টেবিলের নিচে বই, টেবিলের ওপরে আরো বই। দেয়ালের পাশে বই সাজানো, কিন্তু সাজানো বলা ঠিক হবে না, স্তূপ করা। একটা তাকে ধরে না, পাশে আরেকটা স্তূপ। সেটাও উপচে পড়ছে।
জাহিদ গুনল। পনেরোটা গাইড বই। ছয়টা নিউজপেপার কাটিং ফাইল। চারটা হ্যান্ডনোট। দুটো ডিকশনারি। তিনটা সাধারণ জ্ঞানের বই। প্রফেসর'স, ওরাকল, MP3, আসসালামু আলাইকুম, জোবায়ের'স। প্রতিটা বই ট্যাগ করা, রঙিন স্টিকার দিয়ে মার্ক করা, পাশে পেন্সিলে নোট। কিছু পৃষ্ঠা এত ময়লা হয়ে গেছে বারবার উল্টানোয় যে প্রিন্ট আর পড়া যায় না।
"এগুলো কতদিনে কিনেছ?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
"দুই বছরে। একসাথে কেনার সামর্থ্য ছিল না। প্রতি মাসে দুই-তিনটা করে।"
জাহিদ একটা বইয়ের দাম দেখল পেছনে। প্রফেসর'স BCS প্রিলিমিনারি ডাইজেস্ট: 850 টাকা। ওরাকল বাংলাদেশ বিষয়াবলি: 720 টাকা। MP3 আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি: 680 টাকা।
পনেরোটা বইয়ের দাম মোটামুটি এগারো-বারো হাজার টাকা। দুই বছরে। মাসে পাঁচশো টাকার বই।
২
কিন্তু বই তো শুধু শুরু।
রাশেদ একটা খাতায় হিসাব রাখে। BCS প্রিপারেশনে কত টাকা খরচ হচ্ছে, মাসে মাসে। জাহিদকে দেখাল।
বই: মাসে 500 টাকা (গড়ে)। নিউজপেপার: দুটো দৈনিক, মাসে 600 টাকা। প্রথম আলো আর ডেইলি স্টার। সম্পাদকীয় পড়তে হয়, আন্তর্জাতিক খবর পড়তে হয়, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ পড়তে হয়। BCS-এ কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স আসে, সেটা নিউজপেপার না পড়লে হবে না। ইন্টারনেট: 800 টাকা। ইউটিউবে BCS লেকচার দেখে, অনলাইনে মডেল টেস্ট দেয়। ফটোকপি ও নোট: 300 টাকা। সিনিয়রদের কাছ থেকে হ্যান্ডনোট, কোচিং সেন্টারের শিট, পাস করা ব্যাচের টিপস, সব ফটোকপি। মোট: মাসে 2,200 টাকা।
"কোচিং?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
রাশেদ মাথা নাড়ল। "করতে পারিনি।"
"কেন?"
"ঢাকায় ভালো কোচিং সেন্টারে ভর্তি হতে 50,000 থেকে 80,000 টাকা লাগে। এক কোর্সে। কেউ কেউ দুই-তিনটা কোর্স করে। বাংলা আলাদা, ইংরেজি আলাদা, গণিত আলাদা, সাধারণ জ্ঞান আলাদা। চারটা কোর্স করলে দুই লাখ ছাড়িয়ে যায়।"
"দুই লাখ!"
"ঢাকায় থাকা-খাওয়া ধরলে মাসে আরো 15,000। এক বছরের কোচিং মানে মোট তিন-চার লাখ টাকা। শুধু BCS প্রিপারেশনের জন্য।"
রাশেদের বাবা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। মাসে চল্লিশ হাজার পান। তিন-চার লাখ টাকা কোচিংয়ে দেওয়ার সামর্থ্য নেই। তাই রাশেদ কোচিং করেনি। নিজে পড়ে। বই কিনে, ইউটিউব দেখে, ফেসবুক গ্রুপে টিপস পড়ে, সিনিয়রদের কাছ থেকে নোট জোগাড় করে।
"কোচিং না করে চান্স পাওয়া কি সম্ভব?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
"সম্ভব। কিন্তু কঠিন। ঢাকার কোচিংগুলোতে যারা পড়ায়, তারা অনেকে নিজে BCS পাস করেছে। তারা জানে কোন ধরনের প্রশ্ন আসে, কোন টপিক থেকে বেশি আসে, কীভাবে উত্তর লিখলে বেশি নম্বর পাওয়া যায়। এই ইনসাইডার নলেজটা আমার নেই।"
৩
সিলেবাসটা একবার দেখলে বোঝা যায় কেন দুই বছর সময় কম মনে হয়।
BCS প্রিলিমিনারি। 200 নম্বর। বিষয়: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য (35), ইংরেজি (35), বাংলাদেশ বিষয়াবলি (30), আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি (20), ভূগোল পরিবেশ ও দুর্যোগ (10), সাধারণ বিজ্ঞান (15), কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি (15), গাণিতিক যুক্তি (15), মানসিক দক্ষতা (15), নৈতিকতা মূল্যবোধ ও সুশাসন (10)।
দশটা বিষয়। প্রতিটায় দশ থেকে পঁয়ত্রিশ নম্বর। মানে প্রতিটা বিষয়ে তোমাকে মোটামুটি সব জানতে হবে।
বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র থেকে হুমায়ূন আহমেদ পর্যন্ত সব। কে কোন উপন্যাস লিখেছেন, কোন কবিতা কোন কবি, কোন নাটক কোন নাট্যকার। চর্যাপদ থেকে শুরু করে উত্তর-আধুনিক সাহিত্য পর্যন্ত। ব্যাকরণ: সন্ধি, সমাস, কারক, বিভক্তি, প্রকৃতি-প্রত্যয়।
ইংরেজিতে গ্রামার: টেন্স, ভয়েস, ন্যারেশন, ট্রান্সফর্মেশন, ক্লজ, ফ্রেজ। ভোকাবুলারি: সিনোনিম, অ্যান্টোনিম, ইডিয়ম, ওয়ান-ওয়ার্ড সাবস্টিটিউশন। কম্প্রিহেনশন।
বাংলাদেশ বিষয়াবলিতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সংবিধান, সরকার ব্যবস্থা, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি। কবে কোন সংশোধনী হয়েছে, কোন অনুচ্ছেদে কী আছে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র কে পাঠ করেছিলেন, সেক্টর কমান্ডারদের নাম, বীরশ্রেষ্ঠদের বীরত্বগাথা।
আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিতে জাতিসংঘ, NATO, EU, ASEAN, SAARC, BIMSTEC, WTO, IMF, World Bank। কোন দেশের রাজধানী কোথায়, কোন মুদ্রা কোন দেশের, কোন নদী কোন দেশ দিয়ে গেছে।
গণিতে সংখ্যাতত্ত্ব, বীজগণিত, জ্যামিতি, পরিমিতি।
সাধারণ বিজ্ঞানে পদার্থ, রসায়ন, জীববিজ্ঞান। আলোর প্রতিফলন থেকে DNA-এর গঠন পর্যন্ত।
এই হলো শুধু প্রিলিমিনারি। প্রথম ধাপ। এই ধাপ পাস করলে আরো 900 নম্বরের লিখিত পরীক্ষা। তারপর 200 নম্বরের ভাইভা। মোট 1300 নম্বর। তিন ধাপে।
রাশেদ প্রতিদিন চৌদ্দ ঘণ্টা পড়ে এই সিলেবাস কাভার করার চেষ্টা করছে।
৪
জাহিদ রাশেদের ঘরে বসে হিসাব করল।
রাশেদের বয়স এখন পঁচিশ। MA শেষ করেছে দুই বছর আগে, তেইশে। তখন থেকে প্রিপারেশন শুরু। দুই বছর হলো। কোনো চাকরি করেনি। কোনো আয় নেই। শূন্য। দুই বছরে শূন্য টাকা আয়।
জাহিদ নিজে এই দুই বছরে কত আয় করেছে? মোটামুটি $38,000-40,000। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪৫ লাখ। সেভিংস আছে, পরিবারকে দিয়েছে, ল্যাপটপ কিনেছে, ইন্টারনেট আপগ্রেড করেছে।
রাশেদ? একটা টাকাও আয় করেনি। বাবার ওপর নির্ভরশীল। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের বেতন থেকে ছেলের BCS প্রিপারেশনের খরচ চলছে।
"বাবা কিছু বলেন না?" জাহিদ আবার জিজ্ঞেস করল। গতবার ফোনেও জিজ্ঞেস করেছিল। কিন্তু সামনাসামনি বসে জিজ্ঞেস করতে চাইল আবার।
রাশেদ একটু হাসল। ক্লান্ত হাসি। "বাবা বলেন, 'তুই পড়। আমার পেনশন দিয়ে চলবে।'"
"পেনশন?"
"বাবা আগামী বছর রিটায়ার করবেন। তিরিশ বছর চাকরি করেছেন। পেনশন পাবেন। বাবা ভাবেন সেই পেনশন দিয়ে সংসার চলবে, আর আমি BCS পাস করে বড় চাকরি করব।"
একটু চুপ থাকল রাশেদ।
"বাবার পুরো রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান আমার BCS-এর ওপর নির্ভর করে। এটা ভাবলে রাতে ঘুম হয় না।"
জাহিদ কিছু বলল না। কী বলবে? এই চাপটা সে বোঝে। কিন্তু রাশেদের চাপটা অন্যরকম। জাহিদের ফ্রিল্যান্সিং না হলে সে অন্য কিছু করতে পারত। রাশেদের BCS না হলে কী করবে? দুই বছর কোনো কাজের অভিজ্ঞতা নেই। CV-তে ফাঁকা। "গত দুই বছর কী করেছেন?" "BCS প্রিপারেশন।" প্রাইভেট সেক্টরে এই উত্তর কেউ শুনতে চায় না।
৫
BCS-এর বয়সসীমা ত্রিশ। সাধারণ ক্যাটাগরিতে।
মানে রাশেদের হাতে আর পাঁচ বছর আছে। পঁচিশ থেকে ত্রিশ। এই পাঁচ বছরে যতগুলো BCS পরীক্ষা হবে, সেগুলো দিতে পারবে। তারপর? তারপর দরজা বন্ধ। চিরতরে।
কিন্তু পাঁচ বছরে কয়টা পরীক্ষা হবে? BCS প্রতি বছর হয় না। কখনো দুই বছর পর পর, কখনো দেড় বছর পর পর। পরীক্ষা হলেও আবেদন থেকে ফলাফল পর্যন্ত দুই-তিন বছর লেগে যায়। মানে রাশেদ হয়তো আরো দুই-তিনবার চেষ্টা করতে পারবে। ত্রিশের পর সুযোগ শেষ।
জাহিদ হিসাবটা করল মাথায়।
তিন লাখ আবেদনকারী। দুই হাজার পদ। সিলেকশন রেট 0.67%। ধরা যাক রাশেদ গড়ের চেয়ে ভালো প্রস্তুত। তাহলে তার সম্ভাবনা হয়তো 2-3%। কিন্তু 2-3% মানে কী? মানে শতকরা সাতানব্বই-আটানব্বই বার সে ফেল করবে।
ধরা যাক সে তিনবার চেষ্টা করতে পারবে। তিনবারে অন্তত একবার পাস করার সম্ভাবনা? 1 - (0.97)^3 = 8.7%। মানে দশজনের মধ্যে একজনেরও কম।
এবং এটা ভালো প্রস্তুতির হিসাব। গড় প্রার্থীর সম্ভাবনা 0.67%। তিনবার চেষ্টায় 2%।
প্রতিদিন চৌদ্দ ঘণ্টা পড়ে 0.67% সম্ভাবনা। দুই বছর শূন্য আয়ে 0.67% সম্ভাবনা। বাবার পেনশন বাজি রেখে 0.67% সম্ভাবনা।
জাহিদ এই সংখ্যাটা রাশেদকে বলল না। বলে কী হবে? রাশেদ নিজেও গণিত জানে। সে হিসাব করেনি এমন না। করেছে। কিন্তু তারপরও পড়ছে। কারণ গণিত বলে 0.67%, কিন্তু হৃদয় বলে "আমি সেই 0.67%-এ থাকব।"
৬
রাশেদ চা বানাল। দুই কাপ। চিনি কম, দুধ কম। "চিনি-দুধ কমিয়ে দিয়েছি। খরচ বাঁচাতে।"
জাহিদ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। রাশেদের বাড়ি শহরের একটু বাইরে। টিনের চাল, ইটের দেয়াল। উঠানে একটা পেয়ারা গাছ। পেছনে বাঁশঝাড়। শান্ত, নিরিবিলি। পড়ার জন্য ভালো জায়গা।
কিন্তু এই শান্ত জায়গাটাই রাশেদের সমস্যা। ঢাকায় না থাকলে কোচিং করা যায় না, স্টাডি গ্রুপে যোগ দেওয়া যায় না, লাইব্রেরিতে যাওয়া যায় না। এখানে বসে একা একা পড়তে হয়। সারাদিন। সারা রাত।
"একা একা পড়তে কেমন লাগে?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
রাশেদ একটু ভাবল। "প্রথম ছয় মাস ভালো লেগেছে। নতুন কিছু শিখছি, একটা লক্ষ্য আছে, সেদিকে এগোচ্ছি। কিন্তু ছয় মাস পর একটা সময় আসে যখন মনে হয় এই পড়া শেষ হবে না। সিলেবাস শেষ করি, আবার শুরু থেকে ভুলে যাই। রিভিশন করি, পরের সপ্তাহে আবার ভুলে যাই। মনে হয় পানিতে দাঁড়িয়ে আছি, নড়ছি, কিন্তু জায়গা থেকে সরছি না।"
"মোটিভেশন কীভাবে ধরে রাখ?"
"ধরে রাখি না।" রাশেদ সরাসরি বলল। "মোটিভেশন নেই বেশিরভাগ দিন। যান্ত্রিকভাবে পড়ি। সকালে উঠি, বই খুলি, পড়ি। ভালো লাগুক বা না লাগুক। মোটিভেশন একটা বিলাসিতা, BCS প্রিপারেশনে সেটা কাজ করে না। কাজ করে অভ্যাস। রুটিন।"
জাহিদ চা খেতে খেতে ভাবল, রাশেদের এই দুই বছর আসলে কী? একটা বিনিয়োগ। সময়ের বিনিয়োগ, মেধার বিনিয়োগ, পরিবারের অর্থের বিনিয়োগ। এবং এই বিনিয়োগের রিটার্ন হয় শতভাগ, নয়তো শূন্য। মাঝামাঝি কিছু নেই।
ফ্রিল্যান্সিংয়ে জাহিদ প্রতিদিন একটু একটু রিটার্ন পায়। প্রতিটা প্রজেক্ট শেষে কিছু টাকা, কিছু অভিজ্ঞতা, কিছু রেপুটেশন। ক্রমবর্ধমান। ইনক্রিমেন্টাল।
রাশেদের ক্ষেত্রে দুই বছরের সব বিনিয়োগ একটা দিনে নির্ধারণ হবে। পরীক্ষার দিন।
৭
রাশেদের ঘর থেকে বেরিয়ে জাহিদ বাড়ি ফিরল সন্ধ্যায়।
বাবা বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন। CNG-র রোজগার শেষে একটু বিশ্রাম। জাহিদ পাশে বসল।
"রাশেদের বাসায় গিয়েছিলি?" বাবা জিজ্ঞেস করলেন।
"হ্যাঁ।"
"ছেলেটা কেমন আছে?"
"পড়ছে। BCS।"
বাবা একটু মাথা নাড়লেন। "ও। ভালো কথা।" একটু চুপ থেকে বললেন, "রাশেদের বাবার সাথে দেখা হয়েছিল বাজারে। বলছিলেন ছেলে খুব পরিশ্রম করছে। দিনরাত পড়ছে। এবার হবে।"
"এবার হবে" শুনে জাহিদের মনে হলো, কত বাবা এই কথা বলেন। কত পরিবারে এই আশা। "এবার হবে।" কিন্তু গণিত বলে, একশো জন বাবা যদি বলেন "এবার হবে," তাহলে ভাগ্যক্রমে একজনের কথা সত্য হবে। বাকি নিরানব্বইজন? তাদের "এবার হবে" পরের বার হয়ে যাবে। তারপর তার পরের বার। তারপর বয়সসীমা শেষ।
জাহিদ কিছু বলল না। চা খেল। বাবার পাশে বসে আকাশ দেখল।
প্রতিদিন চৌদ্দ ঘণ্টা পড়ে 0.7% সম্ভাবনা। এটাই BCS।
---
*সপ্তম অধ্যায়: বিসিএস: বাংলাদেশের হাঙ্গার গেমস। পর্ব ৬২/১০০।*