প্রিলিমিনারির দিন

তিন লক্ষ মানুষ, দুইশো প্রশ্ন, দুই ঘণ্টা, একটা কলম

পর্ব ৬৩ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

পরীক্ষা সকাল দশটায়। রাশেদ পৌঁছাল আটটায়।

সেন্টার হলো শহরের সরকারি কলেজ। গেটের সামনে ভিড় শুরু হয়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে কোনো মেলা বসেছে। ছেলেমেয়েরা দাঁড়িয়ে আছে, বসে আছে, গাছের নিচে, রেলিংয়ের ধারে, ফুটপাতে। কেউ বই খুলে শেষবারের মতো কিছু পড়ছে, কেউ ফোনে নোট দেখছে, কেউ চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।

একটা ছেলে দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে ঠোঁট নাড়ছে। মুখস্থ করছে। চোখ বন্ধ, আঙুল গুনছে কিছু একটা। আরেকটা মেয়ে বেঞ্চে বসে প্রফেসর'স ডাইজেস্ট উল্টাচ্ছে। পড়ছে না আসলে, ছুঁয়ে দেখছে। যেন বইটা ধরে থাকলে তথ্যগুলো হাত দিয়ে ঢুকে যাবে মাথায়।

রাশেদ কোনো বই আনেনি। দুই বছর যা পড়েছে, পড়েছে। শেষ দুই ঘণ্টায় নতুন কিছু ঢুকবে না মাথায়। বরং আগেরটা গুলিয়ে যেতে পারে। তাই খালি হাতে এসেছে। পকেটে শুধু অ্যাডমিট কার্ড, কলম, আর জাতীয় পরিচয়পত্র।

তিন লক্ষ মানুষ আজ পরীক্ষা দিচ্ছে। সারা দেশে। আটটা বিভাগীয় শহরে কয়েকশো সেন্টার। প্রতিটায় কয়েকশো পরীক্ষার্থী।

তিন লক্ষ। সংখ্যাটা মাথায় ঢুকে না। যমুনা স্টেডিয়ামে পঞ্চাশ হাজার দর্শক ধরে। ছয়টা স্টেডিয়াম ভর্তি। সবাই কলম হাতে, দুই ঘণ্টার জন্য প্রস্তুত।

এদের মধ্যে দুই হাজার পাস করবে। বাকি দুই লাখ আটানব্বই হাজার? বাড়ি ফিরবে। পরের BCS-এর জন্য আবার পড়বে। অথবা পড়বে না। অথবা বয়সসীমা শেষ হয়ে যাবে।

রাশেদ এই তিন লক্ষের একজন।

নয়টা বেজে পঁয়তাল্লিশে গেটে ঢুকল। সিট নম্বর মিলিয়ে হলরুমে গেল। সারি সারি বেঞ্চ। কাঠের বেঞ্চ, পুরনো। কোনোটায় নাম খোদাই করা, কোনোটায় কলমের দাগ। এই বেঞ্চে কত প্রজন্ম পরীক্ষা দিয়ে গেছে, SSC, HSC, ভর্তি পরীক্ষা, BCS। বেঞ্চ একই, মানুষ বদলায়।

পাশের সিটে একটা ছেলে বসল। চোখ লাল। ঘুমায়নি হয়তো সারারাত।

"কততম BCS?" ছেলেটা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

"প্রথমবার।" রাশেদ বলল।

"আমার তৃতীয়।" ছেলেটা বলল। তারপর আর কিছু বলল না। তৃতীয়বার। মানে আগের দুইবার হয়নি। তৃতীয়বার হবে কিনা জানে না। কিন্তু এসেছে। এটাই যথেষ্ট।

দশটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। প্রশ্নপত্র এলো। সিলমোহর আঁটা খাম। ইনভিজিলেটর সামনে দাঁড়ালেন। একটু কড়া গলায় নিয়ম বললেন: OMR শিটে সঠিক বৃত্ত ভরাট করবেন, প্রতিটি সঠিক উত্তরে এক নম্বর, প্রতিটি ভুল উত্তরে 0.5 নম্বর কাটা যাবে। নেগেটিভ মার্কিং। মোবাইল বন্ধ। কথা বলা নিষেধ। সময় দুই ঘণ্টা।

দশটা বাজল। ঘণ্টা পড়ল।

খাম খুলল।

দুইশো প্রশ্ন। দুই ঘণ্টা। মানে প্রতিটা প্রশ্নে ছত্রিশ সেকেন্ড।

রাশেদ প্রথম পৃষ্ঠা খুলল। বাংলা। "চর্যাপদের কোন পদে নৌকা বিষয়ক বর্ণনা আছে?" জানে। দ্বিতীয় পদ। বৃত্ত ভরাট। "নকশী কাঁথার মাঠ কাব্যের নায়িকার নাম?" সাজু। বৃত্ত ভরাট। ইংরেজি। Synonym of ubiquitous? Omnipresent। বৃত্ত ভরাট। গণিত। তিন বাহু 6, 8, 10, ত্রিভুজটি কোন ধরনের? সমকোণী। বৃত্ত ভরাট।

এভাবে চলল। কিছু প্রশ্নে উত্তর সঙ্গে সঙ্গে মাথায় আসল। কিছু প্রশ্নে দুইটা অপশনের মধ্যে ঝুলে রইল। কিছু প্রশ্নে একদম কিছু মনে পড়ল না।

রাশেদ একটা নিয়ম মেনে চলল: জানি না, ছেড়ে দেব। অনুমান করব না। নেগেটিভ মার্কিং। ভুল উত্তরে 0.5 কাটা যাবে। অনিশ্চিত হলে ফাঁকা রাখাই নিরাপদ।

বাংলাদেশ বিষয়াবলি। এইখানেই আসল যুদ্ধ।

সংবিধানের মৌলিক অধিকার, ছয় দফার প্রথম দফা, এগুলো জানে। কিন্তু তারপর একটা প্রশ্ন এলো যেটা দুই বছর ধরে পড়েও কোথাও দেখেনি: "বাংলাদেশের তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মেয়াদ কত ছিল?" প্রথম পরিকল্পনা 1973-78, দ্বিতীয়টা 1980-85, জানে। তৃতীয়টা? 1985-90 নাকি 1986-90? নিশ্চিত না। ফাঁকা রাখল।

NATO-এর সর্বশেষ সদস্য? ফিনল্যান্ড নাকি সুইডেন? সুইডেন পরে। বৃত্ত ভরাট। DNA-এর ডাবল হেলিক্স? ওয়াটসন ও ক্রিক। বৃত্ত ভরাট। 1 কিলোবাইট কত বাইট? 1024। বৃত্ত ভরাট। সুশাসনের মূল উপাদান? জবাবদিহিতা। বৃত্ত ভরাট।

ঘড়ির কাঁটা দৌড়ায় পরীক্ষার হলে। বাইরের দুনিয়ায় সময় চলে, কিন্তু পরীক্ষার হলে সময় ছোটে। একটু আগে দশটা বেজেছিল, এখন এগারোটা বাজতে চলেছে। একশো প্রশ্ন শেষ। আরো একশো বাকি। এক ঘণ্টা বাকি।

রাশেদের হাত ঘামছে। কলম পিছলে যাচ্ছে। OMR শিটে বৃত্তগুলো ভরাট করতে হাত কাঁপছে না, কিন্তু দ্রুত করতে হচ্ছে। ভরাটটা যেন গোল হয়, যেন বাইরে না যায়, যেন মেশিন পড়তে পারে।

167 নম্বর প্রশ্ন। একটা গণিত। সমীকরণ সমাধান। ক্যালকুলেটর নেই। মাথায় করল। একটা উত্তর পেল, অপশনে নেই। আবার করল, এবার অপশনে আছে। কিন্তু প্রথমবার কেন ভুল হলো? সময় নেই যাচাই করার। যেটা পেয়েছে সেটা ভরাট করল। আত্মবিশ্বাস পঞ্চাশ শতাংশ।

193 নম্বর প্রশ্ন। মানসিক দক্ষতা। সংখ্যার ধারা: 2, 6, 12, 20, ? পার্থক্য: 4, 6, 8। পরেরটা 10। উত্তর 30। বৃত্ত ভরাট।

বারোটা বাজল। ঘণ্টা পড়ল। কলম নামাও।

রাশেদ কলম নামাল।

হলরুম থেকে বের হয়ে রাশেদ দেখল সবাই কথা বলছে। সবাই। যেন বাঁধ ভেঙেছে। দুই ঘণ্টা চুপ থেকে এখন সবার মুখ খুলেছে। প্রতিটা কথা একটাই বিষয়: উত্তর।

"32 নম্বরে কী দিয়েছিস?" "67 নম্বরটা কি A ছিল?" "ওই গণিতটা 30 না 36?" "আমি তো B দিয়েছি! তুই A দিয়েছিস?"

রাশেদ একটু দূরে দাঁড়াল। উত্তর মেলানো জিনিসটা সে এড়িয়ে চলতে চায়। পরীক্ষা শেষ। এখন অন্যের সাথে মিলিয়ে ভুল দেখলে কী হবে? শুধু মাথা খারাপ হবে।

কিন্তু এড়ানো গেল না। পাশের সিটের সেই ছেলে, তৃতীয়বারের পরীক্ষার্থী, এসে ধরল। "ভাই, 89 নম্বরে কী দিয়েছেন?"

"কোনটা 89 নম্বর?"

"যেটায় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা জিজ্ঞেস করেছে।"

"ওটা ফাঁকা রেখেছি।"

"আমিও।" ছেলেটা একটু হাসল। "প্রথমবারের পরীক্ষায় আমি এটা ভুল দিয়েছিলাম। 0.5 কাটা গিয়েছিল। এবার ফাঁকা রাখলাম। শিখেছি।"

তিনবারের অভিজ্ঞতা। প্রথমবার ভুল করেছে, দ্বিতীয়বার আরেকটা ভুল করেছে, তৃতীয়বার সেই ভুলগুলো এড়াচ্ছে। কিন্তু নতুন ভুল? সেটা তো জানা নেই এখনো।

বাড়ি ফেরার পথে রাশেদ হিসাব করল।

দুইশো প্রশ্নের মধ্যে উত্তর দিয়েছে একশো আশিটায়। বিশটা ফাঁকা রেখেছে। হয় জানত না, নয়তো নিশ্চিত ছিল না।

একশো আশিটার মধ্যে কতগুলো ঠিক হবে? রাশেদের অনুমান: একশো কুড়িটা নিশ্চিত। মানে এগুলো সে জানে, পড়েছে, মুখস্থ আছে, ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম। বাকি ষাটটা? পঞ্চাশ-পঞ্চাশ। কিছু ঠিক হবে, কিছু ভুল হবে।

ভালো পরিস্থিতিতে: 120 + 40 ঠিক = 160, ভুল 20, নেগেটিভ 10, মোট 150। মোটামুটি পরিস্থিতিতে: 135। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে: 120। কাটঅফ সাধারণত 105 থেকে 115। মানে তাত্ত্বিকভাবে রাশেদ কাটঅফের ওপরে।

কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে আর বাস্তবে পার্থক্য আছে। "নিশ্চিত" 120-টাও হয়তো সব ঠিক না। ক্যারলেস মিসটেক, প্রশ্ন ভুল পড়া, OMR শিটে ভুল বৃত্ত ভরাট। কিন্তু মাথা তো থামে না। হিসাব চলতেই থাকে।

তিন মাস।

পরীক্ষা আর ফলাফলের মাঝখানে তিন মাস। একশো দিনের কাছাকাছি। এই তিন মাস রাশেদ কী করল?

পড়ল। রিটেনের প্রস্তুতি শুরু করে দিল। প্রিলিমিনারি পাস হলে রিটেনের জন্য মাত্র দুই-তিন মাস সময় পাবে। তাই এখন থেকেই শুরু।

কিন্তু পড়তে বসলে মাথায় ঢোকে না। একটাই প্রশ্ন ঘুরছে: প্রিলিমিনারি হয়েছে তো? 167 নম্বরের গণিতটা ঠিক হয়েছে তো? OMR শিটে কোথাও শিফট হয়ে যায়নি তো?

রাত তিনটায় হঠাৎ ঘুম ভাঙে। মনে হয়, 42 নম্বর প্রশ্নে কি ভুল বৃত্ত ভরাট করেছি? ঘুম আর আসে না। শুয়ে শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।

মা বলেন, "কী হয়েছে? খাচ্ছ না কেন?"

"ক্ষুধা নেই।"

বাবা বলেন, "চিন্তা করিস না। হবে।"

রাশেদ মাথা নাড়ে। হ্যাঁ, হবে। কিন্তু গণিত তো অন্য কথা বলে।

তিন লক্ষের মধ্যে বিশ হাজার পাস করবে প্রিলিমিনারি। মানে প্রতি পনেরো জনে একজন। বাকি চৌদ্দজন? বাড়ি।

১০

ফলাফল বের হলো এক মঙ্গলবার সন্ধ্যায়।

PSC-এর ওয়েবসাইট ক্র্যাশ করল। তিন লক্ষ মানুষ একসাথে ঢুকছে। সার্ভার নিল না। রাশেদ রিলোড করল, আবার রিলোড করল। পৃষ্ঠা আসে না। সাদা স্ক্রিন, ঘুরছে, ঘুরছে।

ফেসবুকে PDF আপলোড হলো কেউ একজন। রোল নম্বরের তালিকা। দীর্ঘ তালিকা।

রাশেদ তার রোল নম্বর খুঁজল। চোখ দিয়ে লাইন ধরে ধরে নামল। প্রতিটা নম্বর দেখছে, তার নম্বর না, তার নম্বর না, তার নম্বর না।

পেল।

রোল নম্বর আছে। তালিকায় আছে। পাস।

রাশেদ ফোনটা রেখে দিল। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। একটা শ্বাস নিল গভীর করে। তারপর মায়ের ঘরে গেল। "মা, প্রিলিমিনারি পাস হয়েছে।"

মা বললেন, "আলহামদুলিল্লাহ।" তারপর চোখ মুছলেন।

বাবা বাইরে ছিলেন। ফোন করলেন। "হয়েছে?"

"হ্যাঁ, বাবা। হয়েছে।"

বাবার কণ্ঠ কাঁপল। "আমি জানতাম।"

বাবা জানতেন। বাবা আসলে জানতেন না। কেউ জানত না। কিন্তু বাবা বিশ্বাস করতেন। বিশ্বাস আর জানা এক জিনিস না।

১১

নম্বর বের হলো পরে। রাশেদ পেয়েছে 118। কাটঅফ ছিল 110।

আট নম্বরের ব্যবধান। মাত্র আট নম্বর। আটটা বৃত্তের পার্থক্য। আরেকটু এদিক-ওদিক হলে 109 হতো। 109 মানে ফেল। দুই বছরের পরিশ্রম আর ব্যর্থতার মাঝখানে আট নম্বর।

রাশেদ জাহিদকে ফোন করল।

"ভাই, পাস করেছি।"

"মোবারক হো, ভাই!" জাহিদ খুশি হলো। সত্যিই খুশি।

"118 পেয়েছি। কাটঅফ 110।"

জাহিদ একটু চুপ থাকল। তারপর বলল, "এখন?"

"এখন রিটেনের প্রস্তুতি। 900 নম্বর। ছয়টা পেপার।"

"কবে পরীক্ষা?"

"তিন মাস পর। হয়তো চার।"

একটু চুপ থাকল রাশেদ। তারপর বলল কথাটা।

"প্রিলিমিনারি পাস মানে যুদ্ধ জেতা না। মানে বেঁচে থাকা।"

জাহিদ কিছু বলল না।

তিন লক্ষ মানুষ পরীক্ষা দিয়েছিল। বিশ হাজার পাস করেছে। দুই লাখ আশি হাজারের যাত্রা প্রথম ধাপেই শেষ। রাশেদ সেই দুই লাখ আশি হাজারে নেই। সেটাই এখনকার জয়। ছোট জয়। অস্থায়ী জয়। কারণ আসল যুদ্ধ সামনে, 900 নম্বরের রিটেন, তারপর ভাইভা, তারপর মেধাতালিকা।

রাশেদ ফোন রেখে বই খুলল। রিটেনের বই। বাংলা প্রথম পত্র। বেঁচে আছে। এখন লড়াই।

---

*সপ্তম অধ্যায়: বিসিএস: বাংলাদেশের হাঙ্গার গেমস। পর্ব ৬৩/১০০।*