ভাইভা বোর্ড
১৭ মিনিটে তিন বছরের বিচার
১
সুটটা কেনা হলো ধার করা টাকায়।
রাশেদের বাবা সহকর্মীর কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধার করলেন। প্রাইমারি স্কুলের আরেক শিক্ষক, তিনিও জানেন রাশেদ BCS দিচ্ছে। "ছেলের ভাইভা, সুট লাগবে।" এটুকু বলতেই টাকা দিয়ে দিলেন।
নিউমার্কেটে গিয়ে রাশেদ একটা ধূসর সুট কিনল। তিন হাজার আটশো টাকা। সাথে একটা টাই, চারশো। একটা সাদা শার্ট, ছয়শো। জুতা কলেজের সময়ের, পালিশ করিয়ে নিল বিশ টাকায়। মোট চার হাজার আটশো বিশ।
সুটটা পরে আয়নায় দাঁড়াল। জীবনে প্রথম সুট। টাইটা বাঁধতে পারে না। ইউটিউবে ভিডিও দেখে শিখল। উইন্ডসর নট। তিনবার চেষ্টায় মোটামুটি একটা আকৃতি হলো।
আয়নায় নিজেকে দেখে রাশেদের মনে হলো, এই মানুষটাকে সে চেনে না। মফস্বলের ছেলে, বাবা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক, দাদা কৃষক। সেই ছেলে ধূসর সুট পরে টাই বেঁধে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সামনে যাবে। পাঁচজন মানুষ প্রশ্ন করবে। দুইশো নম্বর। পনেরো থেকে বিশ মিনিট।
২
ভাইভার আগের রাত। ঘুম নেই।
মাথায় প্রশ্ন ঘুরছে। কী জিজ্ঞেস করবে? সংবিধান? মুক্তিযুদ্ধ? কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স? ভাইভার জন্য আলাদা সিলেবাস নেই। পৃথিবীর যেকোনো বিষয়ে প্রশ্ন আসতে পারে। তোমার জেলার ইতিহাস, গতকালের পত্রিকার হেডলাইন, রোহিঙ্গা সংকট, সর্বশেষ বাজেটের আকার। যেকোনো কিছু।
রাত তিনটায় উঠে বসল। পানি খেল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। অন্ধকার। পেয়ারা গাছটার ছায়া।
তিন বছর। প্রিলিমিনারি পাস করেছে। লিখিত পাস করেছে। এখন শুধু ভাইভা। শেষ ধাপ। এটা পেরোলে সব শেষ। এটা না পেরোলেও সব শেষ।
ফজরের আজান হলো। নামাজ পড়ল। সুটটা ব্যাগে ভাঁজ করে রাখল। ঢাকার বাস সকাল সাতটায়।
৩
পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ভবন, আগারগাঁও। বেলা এগারোটা।
বাইরে বারান্দায় বিশ-পঁচিশ জন বসে আছে। সবাই সুট-টাই। কেউ নোট পড়ছে, কেউ মোবাইলে কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স দেখছে, কেউ চুপচাপ চোখ বুজে।
রাশেদ চেয়ারে বসল। পাশের ছেলেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। লোক প্রশাসন। জিজ্ঞেস করল, "কোন বিশ্ববিদ্যালয়?"
"ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।"
ছেলেটা একটু মাথা নাড়ল। কিছু বলল না। কিন্তু সেই মাথা নাড়ানোর মধ্যে একটা মূল্যায়ন ছিল। NU-এর ছেলে, মানে একটু কম। অলিখিত হায়ারার্কি, কেউ মুখে বলে না, সবাই মানে।
একটা মেয়ে বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে। চোখ লাল। পাশের মেয়ে জিজ্ঞেস করল, "কেমন হলো?"
"জানি না।"
এই "জানি না" ভাইভার পর সবাই বলে। কারণ সত্যিই কেউ জানে না।
৪
দুপুর একটা পঁয়তাল্লিশে নাম ডাকা হলো।
সুটের বোতাম ঠিক করল। টাই সোজা করল। গভীর শ্বাস। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
পাঁচজন মানুষ। বড় টেবিলের ওপারে। মাঝখানে চেয়ারম্যান, দুইপাশে দুইজন করে। রাশেদের ফাইল খোলা।
"বসুন।"
রাশেদ বসল। হাত হাঁটুর ওপর। হাত ঘামছে।
নাম, বাবার নাম, পরিচয়। তারপর একজন সদস্য ফাইল থেকে মুখ তুললেন। চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন।
"বাবা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। আপনি প্রশাসন ক্যাডার চান। একটু বড় লাফ না?"
রাশেদ থামল। এই প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না। কোচিং সেন্টারের টিপসে এমন প্রশ্ন থাকে না। এটা ব্যক্তিগত। শ্রেণিগত।
"স্যার, প্রশাসন কি শুধু বড় পরিবারের সন্তানদের জন্য?"
চেয়ারম্যান হাসলেন। বাকি সদস্যরা তাকালেন।
"আমি সেটা বলছি না।" প্রশ্নকর্তা বললেন। "জানতে চাইছি, আপনি কেন মনে করেন আপনি পারবেন?"
৫
রাশেদ সোজা হয়ে বসল।
"স্যার, আমার বাবা পিয়ন নন, শিক্ষক। কিন্তু পিয়ন হলেও আমি এই চেয়ারে বসতে পারতাম। সংবিধানের অনুচ্ছেদ উনিশ, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। অনুচ্ছেদ উনত্রিশ, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের সমান সুযোগ।"
থামল।
"আমার বাবা তিরিশ বছর ধরে গ্রামের বাচ্চাদের পড়াচ্ছেন। তাঁর ছেলে যদি প্রশাসনে যেতে না পারে, তাহলে গণতন্ত্রের অর্থ কী? এটাই তো গণতন্ত্র।"
ঘরটা চুপ। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। চেয়ারম্যান কাগজে কিছু লিখলেন।
তারপর প্রশ্নের ধারা বদলাল। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা, রাশেদ তিনটা দিল: লিংকন, অ্যারিস্টটল, আমর্ত্য সেন। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। কুমিল্লার খাদি শিল্প। রোহিঙ্গা সংকটে কূটনৈতিক অবস্থান।
শেষ প্রশ্ন। চেয়ারম্যান বললেন, "আপনি যদি না পান, তখন কী করবেন?"
তিন বছর ধরে এই প্রশ্নটা এড়িয়ে গেছে রাশেদ। কিন্তু আজ পাঁচজনের সামনে এড়ানোর উপায় নেই।
"আবার চেষ্টা করব, স্যার। বয়সসীমা পর্যন্ত।"
"তারপর?"
"তারপরও বাংলাদেশে থাকব। কাজ করব। কোনো না কোনো কাজ।"
"ধন্যবাদ। যেতে পারেন।"
৬
বেরিয়ে এলো। বারান্দায়। পা কাঁপছে। হাত কাঁপছে। মুখ শুকনো।
ঘড়ি দেখল। ঢুকেছিল একটা পঁয়তাল্লিশে। বেরোল দুইটা দুইয়ে। সতেরো মিনিট। এক হাজার বিশ সেকেন্ড।
১০২০ সেকেন্ডে তিন বছরের ফলাফল।
পাশের ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, "কেমন হলো?"
"জানি না।"
৭
বাড়ি ফিরে রাশেদ জাহিদকে ফোন করল।
"ভাইভা হয়ে গেছে।"
"কেমন হলো?"
"একটা প্রশ্ন করেছিল।" রাশেদের কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু ভেতরে কিছু টগবগ করছে। "বাবা পিয়ন, আপনি প্রশাসনে? একটু বড় লাফ না?"
জাহিদ চুপ।
"শিক্ষক বলেছিলাম, পিয়ন না। কিন্তু প্রশ্নটা সেটা ছিল না। প্রশ্নটা ছিল, তুমি কোথা থেকে এসেছ। তোমার জায়গা কোথায়। তুমি কি এই টেবিলে বসার যোগ্য?"
"তুমি কী বললে?"
"বললাম, এটাই তো গণতন্ত্র।"
জাহিদ কিছুক্ষণ চুপ। তারপর বলল, "ভালো বলেছ।"
"ভালো বলেছি কিনা জানি না। কিন্তু সত্যি বলেছি।"
৮
এখন অপেক্ষা। তিন মাস। কখনো চার। কখনো বেশি।
পাবলিক সার্ভিস কমিশন ফলাফল দিতে সময় নেয়। কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নেই। একদিন হঠাৎ ওয়েবসাইটে চলে আসবে। অথবা কেউ ফোন করে বলবে, "দেখেছিস? লিস্ট বের হয়েছে।"
এই অপেক্ষাটা সবচেয়ে কঠিন। পরীক্ষার সময় অন্তত কিছু করার আছে। ভাইভার পর? কিছু নেই। শুধু প্রতিদিন PSC-এর ওয়েবসাইট চেক করা। ফেসবুক গ্রুপে "ফলাফল কবে?" পোস্ট। গুজব। "শুনেছি আগামী সপ্তাহে।" "না, আগামী মাসে।" প্রতি সপ্তাহে নতুন গুজব, একটু আশা, তারপর হতাশা।
আর মাথায় ঘুরছে ভাইভার প্রতিটা প্রশ্ন, প্রতিটা উত্তর। চেয়ারম্যান হাসলেন কেন? "বড় লাফ" বলার অর্থ কী ছিল? উত্তর কি ঠিক ছিল? বেশি বলেছি নাকি কম?
৯
তিন মাস পর। রাত এগারোটায় রাশেদ ফোন করল।
"ঘুম আসে না।"
"কেন?"
"সেই প্রশ্নটা। 'বড় লাফ না?' প্রতিদিন রাতে মাথায় আসে।"
"তিন মাস আগের কথা?"
"প্রতিটা রাতে। আমি ভাবি, গণতন্ত্রের কথা না বলে বিনীতভাবে বললে, 'জি স্যার, চেষ্টা করব,' হয়তো বেশি নম্বর পেতাম।"
"তুমি সত্যি বলেছ।"
"সত্যি বললে নম্বর পাওয়া যায় কিনা, সেটা তো প্রশ্ন।"
জাহিদ চুপ। কী বলবে? ফলাফল না আসা পর্যন্ত কেউ জানে না কোন উত্তর সঠিক ছিল।
১০
রাশেদ বলল, "একটা কথা বলি? ভাইভার দিন, ভেতরে ঢোকার আগে, একটা ছেলে বেরিয়ে আসছিল। চোখ ফাঁকা। শূন্য। কোনো ভাব নেই। জিজ্ঞেস করলাম কেমন হলো। বলল, 'এটা আমার তৃতীয় ভাইভা। আগের দুইবার হয়নি।'"
"তৃতীয়বার?"
"তিনবার প্রিলিমিনারি পাস, তিনবার লিখিত পাস, তিনবার ভাইভা। দুইবার বাদ। এবার না হলে বয়সসীমা শেষ।"
"কতদিন ধরে?"
"ছয় বছর।"
ছয় বছর। জীবনের সবচেয়ে উৎপাদনশীল ছয়টা বছর। একটা পরীক্ষার পেছনে।
"আমি সেই ছেলেটার চোখ ভুলতে পারি না। কোনো আশা নেই, কোনো ভয় নেই। শুধু অভ্যাস। যান্ত্রিকভাবে ভাইভা দিচ্ছে।"
"তুমি কি ভাবছ তুমিও সেরকম হয়ে যাবে?"
রাশেদ উত্তর দিল না। ফোন কেটে গেল।
জাহিদ বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। মেঘলা রাত। তারা নেই।
১০২০ সেকেন্ড। তিন বছরের বিচার। রাশেদ শেষ ধাপ পেরিয়ে এসেছে। কিন্তু পেরোনো আর জেতা এক জিনিস না। ফলাফল না আসা পর্যন্ত সে না জিতেছে, না হেরেছে। মাঝখানে ঝুলছে। শূন্যে।
---
*সপ্তম অধ্যায়: বিসিএস: বাংলাদেশের হাঙ্গার গেমস। পর্ব ৬৫/১০০।*