মেধা তালিকা
তিন বছরের উত্তর, এক লাইনে
১
PSC-র ওয়েবসাইটটা লোড হচ্ছে না।
রাশেদ রিফ্রেশ বাটন চাপছে। একবার। দুইবার। দশবার। বিশবার। স্ক্রিনে সেই একই সাদা পেজ, মাঝখানে গোল গোল ঘুরছে। কখনো "502 Bad Gateway" আসছে। কখনো "Connection timed out"।
সকাল দশটায় ফলাফল প্রকাশের কথা ছিল। এখন দুপুর একটা বাজে।
রাশেদ মেঝেতে বসে আছে। পিঠ দেয়ালে ঠেকানো। ফোনটা দুই হাতে ধরা, যেভাবে মানুষ প্রার্থনার সময় হাত জোড় করে। পার্থক্য শুধু এটুকু যে হাতে কোরআন নেই, স্মার্টফোন আছে।
ঘরে আর কেউ নেই। তিন বছরের প্রিপারেশনের ফলাফল একটা সার্ভারের পেছনে আটকে আছে, সেই সার্ভার ক্র্যাশ করে আছে, কারণ তিন লাখ মানুষের পরিবার, বন্ধু, আত্মীয়, সবাই একসাথে একটা ওয়েবসাইটে ঢুকতে চাইছে।
PSC-র বাজেট আছে পরীক্ষা নেওয়ার। সার্ভার আপগ্রেড করার বাজেট নেই।
২
দুপুর দেড়টায় পেজটা লোড হলো।
একটু। আস্তে আস্তে। প্রথমে হেডার। তারপর একটা লিংক। "৪৬তম বিসিএস চূড়ান্ত ফলাফল।" PDF ফাইল।
রাশেদের হাত কাঁপছে। আঙুল দিয়ে লিংকে ট্যাপ করল।
PDF ডাউনলোড হচ্ছে। 4.2 MB। প্রোগ্রেস বার এগোচ্ছে। 12%। 34%। 51%। আটকে গেল। আবার এগোল। 78%। 93%। 100%।
ফাইল খুলল।
মেধা তালিকা। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা নাম। রোল নম্বর। প্রাপ্ত নম্বর। সুপারিশকৃত ক্যাডার।
রাশেদ নিজের রোল নম্বর খুঁজছে। ফোনে Ctrl+F হয় না। স্ক্রল করতে লাগল। পৃষ্ঠা এক। দুই। তিন। নাম বর্ণানুক্রমিক না, মেধাক্রম অনুযায়ী। রাশেদ জানে সে প্রথম দিকে নেই। কিন্তু মাঝখানে? শেষের দিকে? যেকোনো জায়গায় থাকলেই হয়।
পঁচিশ পৃষ্ঠা পার হলো। নাম নেই।
ত্রিশ। নাম নেই।
পঁয়ত্রিশ।
চল্লিশ।
শেষ পৃষ্ঠা।
রাশেদের নাম নেই।
সে PDF-টা আবার খুলল। শুরু থেকে। প্রতিটা নাম পড়ল। চোখ ব্যথা করছে। ফোনের স্ক্রিন ছোট, PDF-এর ফন্ট আরো ছোট। জুম করে পড়ল।
নাম নেই।
৩
NOT RECOMMENDED।
BCS-এর ভাষায় এটার মানে: তুমি ভাইভা পর্যন্ত এসেছিলে। তিন লাখের মধ্যে তুমি সেই কয়েক হাজারের একজন যে তিনটা ধাপ পার করেছে। কিন্তু চূড়ান্ত মেধা তালিকায় তোমার নাম নেই। তুমি সুপারিশযোগ্য নও।
কেন? ভাইভায় নম্বর কম।
দুইশো নম্বরের ভাইভা। সতেরো মিনিট। পাঁচজন পরীক্ষকের সামনে বসেছিল রাশেদ। সতেরো মিনিটে তার তিন বছরের পড়াশোনার বিচার হয়েছিল।
লিখিতে নয়শোর মধ্যে পাঁচশো পঁচিশ। কাটলাইনের উপরে। কিন্তু ভাইভায় পেয়েছে দুইশোর মধ্যে আশি। যেখানে ক্যাডার পাওয়া মানুষরা পায় একশো বিশ, একশো ত্রিশ, একশো চল্লিশ। পার্থক্য চল্লিশ-পঞ্চাশ নম্বর। সতেরো মিনিটে।
সিস্টেম বলে, ভাইভায় ব্যক্তিত্ব যাচাই করা হয়। উপস্থাপনা। আত্মবিশ্বাস।
রাশেদ বলে, মফস্বলের ছেলেদের নম্বর কম হয়। ইংরেজি ফ্লুয়েন্ট না। পোশাক ব্র্যান্ডেড না। কথা বলার ধরন পলিশড না। পরীক্ষকরা এটা স্বীকার করবেন না। কিন্তু নম্বর তো বলে দিচ্ছে।
টোটাল সাতশো পঁচিশ হলে শিক্ষা ক্যাডার পাওয়া যেত। রাশেদের মোট ছয়শো পঁচানব্বই। ত্রিশ নম্বর। ত্রিশ নম্বরের ব্যবধানে তিন বছর নষ্ট।
৪
জাহিদ ফোন করল বিকেল চারটায়।
"ভাই, রেজাল্ট?"
ফোনের ওপাশ থেকে নীরবতা। তারপর একটা শব্দ।
"হয়নি।"
জাহিদ কিছু বলতে পারল না। কী বলবে? "আবার দিও"? "আল্লাহ ভালোই করবেন"? সব কথাই ফাঁকা লাগবে।
"আমি আসছি।"
"আসতে হবে না।"
"আসছি।"
রাশেদের ঘরে ঢুকে দেখল, সব একই আছে। বই স্তূপ করা। দেয়ালে সিলেবাসের চার্ট। টেবিলে হাইলাইটার আর পেন্সিল। তিন বছরের যুদ্ধক্ষেত্র। কিন্তু যুদ্ধটা হেরে গেছে।
রাশেদ খাটে বসে আছে। চোখ শুকনো। কাঁদেনি। কাঁদার মতো শক্তিও নেই।
৫
প্রথম দিন রাশেদ কিছু খায়নি।
মা ভাত নিয়ে এসেছিলেন। রাশেদ বলেছে, "পরে খাব।" পরে আসেনি। রাতে মা আবার এসেছিলেন। "ক্ষুধা নেই।" মা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন কিছুক্ষণ। তারপর চলে গেছেন।
দ্বিতীয় দিনও খায়নি।
বাবা স্কুল থেকে ফিরে রাশেদের ঘরে এলেন। কিছু বললেন না। শুধু একটা চেয়ার টেনে বসলেন। পাঁচ মিনিট চুপচাপ।
তারপর বললেন, "তোর মা কাঁদছে।"
রাশেদ কিছু বলল না।
"তোর জন্য না। তোর না খাওয়ার জন্য।"
সেদিন রাতে রাশেদ রান্নাঘরে গেল। প্লেটে ভাত নিল। খেতে শুরু করল। স্বাদ পাচ্ছিল না। কিন্তু খেল। মায়ের জন্য।
৬
তিন দিন পর। কাদের চাচার দোকানে বসে আছে দুজন। চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
রাশেদ বলল, "তুই জানিস, তিন বছরে তুই কত কামিয়েছিস?"
জাহিদ চুপ।
"লাখ লাখ টাকা। ক্লায়েন্ট আছে তোর। অফিস আছে। টিম আছে। তোর একটা জীবন আছে।"
"ভাই..."
"আমি? তিন বছরে আমার ইনকাম শূন্য। শূন্য টাকা। বাবার পেনশনের টাকায় খেয়েছি। বই কিনেছি বাবার টাকায়। পঁচিশ বছরের একটা ছেলে তিন বছর ধরে বাবার ঘাড়ে বসে আছে।"
"তুমি তো চেষ্টা করেছিলে।"
"চেষ্টা দিয়ে কী হয়? রেজাল্ট তো NOT RECOMMENDED।"
নীরবতা। কাদের চাচা দূর থেকে দুজনকে দেখছেন।
রাশেদ আস্তে বলল, "তিন বছরে তুই লাখ লাখ কামিয়েছিস। আমি শূন্য।"
কথাটা বাতাসে ঝুলে রইল। জাহিদ জবাব দিল না। কারণ জবাব নেই। তিন বছরের opportunity cost। রাশেদ যদি তিন বছর আগে একটা চাকরি ধরত, অথবা কোনো স্কিল শিখত, তাহলে আজ শূন্যতে থাকত না। কিন্তু এই কথা এখন বলার সময় না।
৭
এক সপ্তাহ পর।
জাহিদ ফোন করল। "ভাই, কেমন আছেন?"
"পড়ছি।"
জাহিদ ভেবেছিল ভুল শুনেছে। "কী পড়ছেন?"
"BCS-এর জন্য। পরের বার।"
ফোনের ওপাশ থেকে বইয়ের পাতা ওলটানোর শব্দ। সেই চেনা শব্দ। তিন বছর ধরে জাহিদ এই শব্দ শুনে আসছে।
"বয়সসীমা আছে আরো দুই বছর। দুইবার দেওয়া যাবে। এইবার ভুলটা বুঝেছি। ভাইভার প্রিপারেশন আলাদাভাবে নিতে হবে। স্পোকেন ইংলিশ। মক ভাইভা। এইবার হবে।"
"পরের বার।"
এই দুটো শব্দ বাংলাদেশের লাখ লাখ BCS প্রার্থীর মুখে ঘুরে বেড়ায়। পরের বার। সবসময় পরের বার।
Sunk cost fallacy। তিন বছর দিয়ে ফেলেছি, এখন ছেড়ে দিলে তিন বছর নষ্ট। তাহলে আরো দুই বছর দিই। পাঁচ বছর দিয়ে যদি না হয়? তখন বয়স আটাশ-উনত্রিশ। চাকরির বাজারে ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট হিসেবে কেউ নেবে না। ফ্রিল্যান্সিং শুরু করতে গেলে শূন্য থেকে শিখতে হবে। পুঁজি নেই, কারণ পাঁচ বছর কোনো আয় ছিল না।
রাশেদ এটা জানে। কিন্তু ভাবতে চায় না। কারণ ভাবলে বই বন্ধ করতে হয়। বই বন্ধ করলে প্রশ্নটা আসে: তাহলে আমি গত তিন বছরে কী করলাম?
সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেয়ে আবার বই খোলা সহজ।
৮
Survivorship bias আরো ভয়ংকর।
রাশেদ শুধু তাদের গল্প জানে যারা পেরেছে। সিনিয়র আলম ভাই, তৃতীয় চেষ্টায় পুলিশ ক্যাডার। তানভীর, চতুর্থ চেষ্টায় প্রশাসন। এদের গল্প ফেসবুকে ভাইরাল হয়। "রিকশাওয়ালার ছেলে BCS ক্যাডার!" এই গল্পগুলো সত্য। কিন্তু এই গল্পের পেছনে 2,98,000 গল্প আছে যেগুলো কেউ বলে না।
যে সাত-আটবার দিয়েও পায়নি, সে কোথায় গেছে? নিঃশব্দে হারিয়ে গেছে। তার গল্প কেউ বলে না। কেউ শেয়ার করে না।
রাশেদ ভাবে, আমি আলম ভাই-এর মতো হব। সে ভাবে না, আমি হয়তো সেই নিঃশব্দ হাজারদের একজন হব।
রাশেদের কাছে অপশন কম ছিল। NU-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান। প্রাইভেট সেক্টরে চাকরি প্রায় অসম্ভব। BCS একটাই রাস্তা। একটাই স্বপ্ন। সেই স্বপ্নটা ভেঙে গেলে কিছু থাকে না।
জাহিদের কাছে প্ল্যান বি ছিল। প্ল্যান সি ছিল। রাশেদের কাছে শুধু প্ল্যান এ।
৯
সন্ধ্যা হলো।
রাশেদের ঘরে বাতি জ্বলছে। টেবিলে বই খোলা। প্রফেসর'স BCS ডাইজেস্ট। পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে। কোনা ভাঁজ করা। মার্জিনে পেন্সিলের নোট। তিন বছরের ছাপ।
এই বইটা সে আবার পড়বে। আবার হাইলাইট করবে। আবার মডেল টেস্ট দেবে। আবার প্রিলিমিনারি। আবার লিখিত। আবার নয়শো নম্বরের ছয়টা পেপার। আবার সতেরো মিনিটের ভাইভা।
নোটবুকে নতুন সিলেবাস প্ল্যান। পাশে একটা কাপ চা, অর্ধেক খাওয়া।
রাশেদ পড়ছে। আবার। শুরু থেকে।
"পরের বার।"
জাহিদ জানালা বন্ধ করল। কম্পিউটারের স্ক্রিনে ফিরে তাকাল। কোড লিখতে শুরু করল।
দুজন দুটো পথে।
একজনের পথে আয় আছে, স্বাধীনতা আছে, প্রতিদিন নতুন কিছু তৈরি হচ্ছে। আরেকজনের পথে বই আছে, নোট আছে, আর একটা তারিখ। পরীক্ষার তারিখ। সেই তারিখ পর্যন্ত পড়া, তারিখের পর অপেক্ষা, অপেক্ষার পর ফলাফল, ফলাফলে হয় জীবন বদলে যাবে, নয়তো আবার "পরের বার।"
বাইরে আকাশে তারা উঠছে। মাইমনসিংয়ে এখনো তারা দেখা যায়। কিন্তু রাশেদ তারা দেখছে না। সে বই দেখছে। তিন বছর ধরে সে তারা দেখেনি। আরো দুই বছর দেখবে না।