দ্বিতীয় চেষ্টা

পঞ্চাশ হাজার ধার, দুইশো জনের ঘর, একটাই স্বপ্ন

পর্ব ৬৭ · ৭ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

প্রথমবার BCS-এর রেজাল্ট যেদিন বের হয়েছিল, রাশেদ ফোনে জাহিদকে বলেছিল, "প্রিলিমিনারিতেই কাটা গেছি।"

জাহিদ কিছু বলতে পারেনি। দুই বছর প্রস্তুতি, চৌদ্দ ঘণ্টা পড়াশোনা, বাবার পেনশনের টাকা, আর প্রথম ধাপেই বাদ।

"কত পেয়েছি জানিস? 98। কাটমার্ক ছিল 103।"

পাঁচ নম্বর। আরো দুটো MCQ ঠিক করলে হতো। মাত্র দুটো।

জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "এখন কী করবি?"

"আবার দেব। কিন্তু এবার একটু অন্যভাবে। ঢাকায় যাব। কোচিং করব।"

"টাকা?"

"ধার করব।"

রাশেদ পঞ্চাশ হাজার টাকা ধার করল মামার কাছ থেকে।

মামা ময়মনসিংহে থাকেন। কাপড়ের দোকান। খুব বেশি আয় না, কিন্তু সচ্ছল। রাশেদের মা ফোন করে বললেন, "ভাই, ছেলেটা আবার দেবে। একটু সাহায্য করো।"

মামা প্রথমে চুপ ছিলেন। তারপর বললেন, "কতদিন এই BCS দিতেই থাকবে?"

রাশেদের মা বললেন, "এবারই শেষ। এবার না হলে আর দেবে না।"

মামা পঞ্চাশ হাজার দিলেন। "চাকরি হলে দিবি।" চাকরি কবে হবে, সেটা কেউ জানে না।

রাশেদ ঢাকায় গেল। ফার্মগেটে একটা মেসে উঠল, মাসে চার হাজার, ছোট রুমে তিনজন। কোচিং সেন্টারে ভর্তি হলো, কম্বো প্যাকেজ তিরিশ হাজার। পঞ্চাশ হাজারের মধ্যে তিরিশ কোচিংয়ে, বাকি বিশ চার-পাঁচ মাসের থাকা-খাওয়ায়। হিসাব টানটান।

কোচিং সেন্টারে তিনজনের সাথে পরিচয় হলো।

সালমা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইংরেজি বিভাগ। তৃতীয়বার দিচ্ছে। প্রথমবার রিটেনে বাদ। দ্বিতীয়বার ভাইভায় বাদ।

"ভাইভায় কী হয়েছিল?" রাশেদ জিজ্ঞেস করল।

সালমা একটু হাসল। "একজন বোর্ড মেম্বার জিজ্ঞেস করলেন, বিয়ে হয়েছে কি না। আমি বললাম হয়নি। উনি বললেন, বিয়ের পর কি চাকরি করবেন? আমি বললাম, অবশ্যই। উনি মাথা নাড়লেন। আর আমি NOT RECOMMENDED।"

জুবায়ের। বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং। দ্বিতীয়বার। প্রাইভেটে দেড় বছর কাজ করেছে, বেতন পঁয়তাল্লিশ হাজার, কিন্তু সাইটে থাকতে হয়, ছুটি নেই, শুক্রবারও কাজ। "পাবলিক ওয়ার্কস ক্যাডারে গেলে একই কাজ, কিন্তু পেনশন, বাড়ি, গাড়ি, ক্ষমতা।"

সমস্যা হলো, বুয়েটে বাংলা সাহিত্য পড়ানো হয় না। "চর্যাপদের প্রথম পদ কে লিখেছেন, পারব না। কিন্তু ব্রিজের load calculation ঘুমের মধ্যেও পারব। BCS-এ load calculation আসে না। সেটাই সমস্যা।"

আর মুনীর। পঞ্চমবার। শেষবার। বয়স ঊনত্রিশ।

রাশেদ মুনীরের কথা ফারুকের কাছে শুনেছিল। সামনাসামনি দেখে বুঝল, চেহারায় ক্লান্তি, চোখের নিচে কালি। কিন্তু বইয়ের ব্যাগ ভর্তি, নোটবুক নতুন।

"ভয় লাগে না?"

"লাগত আগে। প্রথমবারের পর ভয়, দ্বিতীয়বারের পর রাগ, তৃতীয়বারের পর হতাশা। চতুর্থবারের পর একটা শান্তি এসেছে। যা হবে হবে।"

কোচিংয়ের দিনগুলো একঘেয়ে। সকাল আটটায় ক্লাস, বিকেল পাঁচটায় শেষ, তারপর মেসে ফিরে নিজে পড়া রাত বারোটা পর্যন্ত।

মাঝে মাঝে ক্লাসের পর চারজন চা খায় ফার্মগেটের ফুটপাতে। সাত টাকার চা। চা খেতে খেতে BCS ছাড়া অন্য কথা হয়। সালমা বলল, সে শিক্ষক হতে চেয়েছিল, কিন্তু বাবা বললেন BCS দে। জুবায়ের বলল, সে ব্রিজ ডিজাইন করতে চায়, কিন্তু সরকারি ইঞ্জিনিয়ার হলে ফাইল সই করতে হয়।

রাশেদ কিছু বলল না। সে কী চায়? নিজেও জানে না। শুধু জানে BCS পাস করতে হবে। বাবা চান, মা চান, গ্রামের লোকে জিজ্ঞেস করে।

BCS একটা পরীক্ষা না। একটা সামাজিক বাধ্যবাধকতা।

চার মাস পর প্রিলিমিনারি। এবার কোচিংয়ের শিক্ষকরা বলে দিয়েছে কোন টপিক গুরুত্বপূর্ণ, কোনটা ছেড়ে দাও, কীভাবে MCQ eliminate করবে।

রেজাল্ট: চারজনই পাস। রাশেদ পেয়েছে 121। কাটমার্ক 106। প্রথমবার পাঁচ নম্বর কম পেয়ে বাদ, এবার পনেরো নম্বর বেশি। পার্থক্য? কোচিং। সেই পঞ্চাশ হাজার টাকা।

রিটেন। নয়শো নম্বর। ছয়টা পেপার। ছয়দিনে ছয়টা পরীক্ষা। হাত ব্যথা হয়ে গেল লিখে লিখে। বাংলাদেশ বিষয়াবলিতে বারো পৃষ্ঠা, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিতে দশ। সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে।

রেজাল্ট: তিনজন পাস। রাশেদ, সালমা, মুনীর। জুবায়ের বাদ। বাংলা সাহিত্যে পাস মার্ক পায়নি। সামগ্রিক নম্বর ভালো, কিন্তু একটা পেপারে পাস মার্কের নিচে মানে সব শেষ।

"চর্যাপদ আমাকে মেরে ফেলল।" জুবায়ের হাসল। চোখে হাসি ছিল না।

ভাইভা। PSC ভবন, আগারগাঁও। বাইরে লম্বা লাইন। সবার হাতে ফাইল, সার্টিফিকেট। কেউ ঠোঁট নড়াচ্ছে, কেউ ফোনে দোয়া পড়ছে।

রাশেদের নাম ডাকা হলো। পাঁচজন বোর্ড মেম্বার।

"দ্বিতীয়বার দিচ্ছেন?"

"জি স্যার।"

"এবার কী বদলেছেন?"

"কোচিং করেছি, স্যার। ঢাকায় এসে।"

"কোচিং না করলে কি পারতেন না?"

রাশেদ সত্যি কথা বলল। "কঠিন হতো, স্যার।"

তারপর প্রশ্ন। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, সর্বশেষ আদমশুমারি, SDG-তে বাংলাদেশের অবস্থান, রোহিঙ্গা সংকট। রাশেদ বেশিরভাগ পারল। কিছুতে সরাসরি বলল জানি না। ভাইভায় "জানি না" বলাটা সাহসের কাজ। অনেকে ভুল বলে। সেটা আরো খারাপ।

বিশ মিনিট। "ধন্যবাদ।"

সালমাও দিল। বের হয়ে বলল, "এবার বিয়ের কথা জিজ্ঞেস করেনি।"

মুনীরও দিল। বের হয়ে কিছু বলল না। চুপচাপ হাঁটতে লাগল। তিনজন ফার্মগেটের সেই চায়ের দোকানে বসল।

মুনীর চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, "আমাকে জিজ্ঞেস করল, পঞ্চমবার কেন দিচ্ছি। আমি বললাম, কারণ হাল ছাড়িনি। চেয়ারম্যান বললেন, হাল না ছাড়া আর জেদ করা কি এক জিনিস?"

চুপ।

"উত্তর দিতে পারিনি।"

রেজাল্ট বের হলো একটা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়। PSC-এর ওয়েবসাইটে।

রাশেদ মেসের রুমে বসে ফোনে ওয়েবসাইট খুলল। সার্ভার ডাউন। লাখ লাখ মানুষ একসাথে দেখছে। রিফ্রেশ। রিফ্রেশ। রিফ্রেশ। পনেরো মিনিট পর পেজ লোড হলো।

PDF ডাউনলোড। RECOMMENDED তালিকা। Ctrl+F। রোল নম্বর।

Found.

রাশেদের হাত কাঁপল। আবার দেখল। রোল নম্বর মিলিয়ে দেখল। নাম মিলিয়ে দেখল। ক্যাডার: Administration।

RECOMMENDED। অ্যাডমিন ক্যাডার।

ফোনটা রাখল। দেয়ালে মাথা ঠেকাল। চোখ বন্ধ করল। তারপর বাবাকে কল করল।

"বাবা, হয়ে গেছে।"

ওপাশে নীরবতা। দুই সেকেন্ড। তিন সেকেন্ড। পাঁচ সেকেন্ড।

তারপর রাশেদের বাবা কাঁদলেন। ফোনে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক, তিরিশ বছরের চাকরি, সারাজীবন কাউকে কাঁদতে দেখেনি কেউ, সেই মানুষটা ফোনে কাঁদলেন। কোনো কথা বলতে পারলেন না। শুধু কাঁদলেন।

রাশেদও কাঁদল। দুই প্রান্তে দুজন মানুষ। বাবা আর ছেলে। কোনো কথা না। শুধু কান্না।

তারপর বাবা বললেন, একটাই কথা: "তোর মা-কে খবরটা দে।"

সালমা? RECOMMENDED। শিক্ষা ক্যাডার। তৃতীয় চেষ্টায়।

মুনীর? NOT RECOMMENDED। পঞ্চমবার। শেষবার। আর কোনো সুযোগ নেই।

রাশেদ মুনীরকে ফোন করল রেজাল্টের রাতে। মুনীর ধরল না। পরদিন সকালে ধরল।

"ভাই, আপনি কেমন আছেন?"

"আছি। তোর হয়েছে শুনলাম। অভিনন্দন।"

"ভাই..."

"শোন, আমি ঠিক আছি। পাঁচবার হলো না, মানে আমার জন্য এটা ছিল না। এখন অন্য কিছু করব।"

মুনীরের গলায় কান্না নেই, অভিযোগ নেই। একটা ক্লান্ত স্বীকৃতি।

জুবায়ের ফোন করল পরে। "পরের বার আবার দেব। বাংলা সাহিত্য ভালো করে পড়ব।"

চারজন। একই কোচিং। একই চায়ের দোকান। একই স্বপ্ন। দুজন পেল। দুজন পেল না।

জাহিদ ফোনে রাশেদের খবর পেল।

"ভাই, হয়ে গেছে।"

"মোবারকবাদ। কোন ক্যাডার?"

"অ্যাডমিন।"

"অ্যাডমিন? মানে DC হবি একদিন?"

রাশেদ হাসল। "DC তো অনেক পরে। আগে ট্রেনিং, তারপর AC Land, তারপর UNO, তারপর..."

"কত বছর লাগল?"

রাশেদ গুনল। MA শেষ করে প্রিপারেশন শুরু। দুই বছর একা পড়ে ফেল। এক বছর কোচিং। তারপর পরীক্ষা, ভাইভা, ফাইনাল রেজাল্ট।

"চার বছর।"

চার বছর। শূন্য আয়ে। বাবার পেনশনে। মামার ধারে। মেসের ছোট রুমে। সাত টাকার চায়ে। কিন্তু শেষমেশ, হয়ে গেছে।

"বাবা কী বলেছেন?"

রাশেদ একটু চুপ থাকল। "বাবা কেঁদেছেন। আর কিছু বলেননি।"

জাহিদ কিছু বলল না। এই কান্নাটা চার বছরের ওজন বহন করে। প্রথমবার পাঁচ নম্বরের ব্যবধানে বাদ পড়ার রাত, পঞ্চাশ হাজার টাকা ধার করার লজ্জা, ফার্মগেটের মেসের তিনজনের রুম, ভাইভার দিন বুকের ধুকপুক। সব মিলিয়ে এক কান্না।

একজন বাবার চার বছরের অপেক্ষা তিনটা শব্দে শেষ হলো।

হয়ে গেছে।

---

*সপ্তম অধ্যায়: বিসিএস — দ্বিতীয় চেষ্টা। পর্ব ৬৭/১০০।*