ক্যাডার জীবন

একজন রাশেদের পেছনে তিন লাখ রাশেদ আছে যারা এই চেয়ারে বসতে পারেনি

পর্ব ৬৮ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

রাশেদ পাস করল।

খবরটা এলো একটা সন্ধ্যায়। PSC-এর ওয়েবসাইটে রোল নম্বর। রাশেদের রোল নম্বর আছে। RECOMMENDED। ক্যাডার: প্রশাসন।

জাহিদ ফোন ধরল। ওপাশে রাশেদ কিছু বলতে পারছে না। গলা ভাঙা। কাঁদছে? হাসছে? দুটোই হয়তো।

"ভাই, হয়ে গেছে।"

এই তিনটা শব্দে দুই বছর আছে। চৌদ্দ ঘণ্টা পড়া আছে। পনেরোটা গাইড বই আছে। বাবার প্রাইমারি স্কুলের বেতন থেকে কাটা টাকা আছে। কোচিং ছাড়া একা একা টিনের চালের ঘরে বসে পড়া আছে। 0.67% সম্ভাবনার মধ্যে নিজেকে ঢুকিয়ে দেওয়া আছে।

"ভাই, হয়ে গেছে।"

পরের কয়েকটা মাস ট্রেনিং। BCS Administration Academy, সাভার।

রাশেদ প্রথমবার ঢাকায় এসে এত দিন থাকল। আগে কোচিংয়ে আসত দুই-তিন দিনের জন্য। এবার মাসের পর মাস। ইউনিফর্ম, প্যারেড, ক্লাসরুম সেশন, ল-অ্যান্ড-অর্ডার ট্রেনিং, ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার, ভূমি ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আদায়। এক বছরের ট্রেনিং।

ব্যাচে দুইশো জন। সারা বাংলাদেশ থেকে। ঢাবি, জাবি, চবি, রাবি, খুবি। মেডিকেল থেকে আসা আছে, ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে আসা আছে, কেউ উকিল ছিল, কেউ ব্যাংকার ছিল। সবাই ছেড়ে এসেছে। BCS প্রশাসনের জন্য সব ছেড়ে এসেছে।

রাশেদ একটু অবাক হলো। ব্যাচের অনেকের গল্প তার চেয়ে কঠিন। একজন সাত বার দিয়েছে, বয়সসীমার শেষ চেষ্টায় পেয়েছে। আরেকজন পাঁচ বছর প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি করতে করতে পড়েছে, রাতে দুইটার পর ঘুমায়নি পাঁচ বছর। আরেকজনের বাবা মারা গেছেন প্রস্তুতির মাঝখানে, সাত দিন শোক করে আবার পড়তে বসেছে।

প্রতিটা গল্প একটা যুদ্ধের গল্প। সবাই এক যুদ্ধে জিতে এসেছে।

ট্রেনিং শেষে পোস্টিং।

রাশেদের প্রথম পোস্টিং: সহকারী কমিশনার (ভূমি)। একটা উপজেলায়। রংপুর বিভাগের একটা জেলার একটা উপজেলা। নাম বলার দরকার নেই।

ক্ষমতার কাঠামোটা বুঝে নেওয়া যাক। উপজেলায় দুইজন বড় কর্মকর্তা: উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO) আর সহকারী কমিশনার (ভূমি)। UNO হলো সার্বিক প্রশাসন, AC Land হলো ভূমি। জমির রেকর্ড, খাজনা আদায়, জমি অধিগ্রহণ, খতিয়ান সংশোধন, নামজারি। একটা কৃষিপ্রধান উপজেলায় জমিই হলো সবকিছু। আর জমির দেবতা হলো AC Land।

রাশেদের বয়স সাতাশ। সহকারী কমিশনার (ভূমি)।

সাতাশ বছর বয়সে একটা উপজেলার ভূমি প্রশাসনের দায়িত্ব।

বেতন: বাইশ হাজার টাকা।

এটা শুনলে অনেকে অবাক হয়। এত কষ্ট করে, এত পরীক্ষা দিয়ে, মাত্র বাইশ হাজার?

কিন্তু BCS ক্যাডারের বেতন দিয়ে হিসাব হয় না। বেতন হলো সংখ্যার একটা অংশ। বাকি অংশটা অদৃশ্য কিন্তু বিশাল।

সরকারি বাসা। ফ্রি। উপজেলা সদরে একটা বাংলো। তিন বেডরুম, বারান্দা, উঠান, গাছগাছালি। ঢাকায় এই বাসার ভাড়া হতো পঁচিশ-ত্রিশ হাজার। এখানে শূন্য।

সরকারি গাড়ি। জিপ। ড্রাইভার সহ। অফিসের কাজে যেকোনো জায়গায় যাওয়া আসা। তেলের বিল সরকারের।

অর্ডারলি। একজন সরকারি কর্মচারী যে বাসায় থাকে, দরকারে সাহায্য করে।

চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা, যাতায়াত ভাতা।

আর সবচেয়ে বড় জিনিস, যেটা কোনো ভাতায় মাপা যায় না: ক্ষমতা। একটা উপজেলায় ভূমি সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত তোমার হাতে। নামজারি তোমার স্বাক্ষরে হবে। খাজনা তোমার তত্ত্বাবধানে আদায় হবে। ভূমি বিরোধ তোমার কাছে আসবে। সাতাশ বছর বয়সে এই ক্ষমতা।

প্রথম দিন অফিসে ঢুকে রাশেদ দেখল একটা কাঠের চেয়ার। বড়। পেছনে উঁচু। সামনে একটা টেবিল। টেবিলে ফাইলের স্তূপ। দেয়ালে বাংলাদেশের মানচিত্র, মুজিবনগর সরকারের ছবি, প্রধানমন্ত্রীর ছবি।

চেয়ারে বসল রাশেদ। কাঠের চেয়ার, তেমন আরামদায়ক না। কিন্তু চেয়ারটা আরামদায়ক হওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। চেয়ারটা তৈরি হয়েছে ক্ষমতার জন্য।

একটু পরেই মানুষ আসা শুরু হলো। কানুনগো এলো, তহশিলদার এলো, সার্ভেয়ার এলো। সবাই সালাম দিল। "স্যার, আমি অমুক। আপনার অধীনে কাজ করি।"

রাশেদের অধীনে। এই শব্দটা কানে লাগল। দুই বছর আগে রাশেদ একা একা টিনের চালের ঘরে বসে বই পড়ত। বাবার কাছ থেকে মাসে দুই হাজার টাকা নিত প্রিপারেশনের খরচ হিসেবে। আর আজ পঁচিশ-ত্রিশ জন সরকারি কর্মচারী তাকে "স্যার" বলছে।

প্রথম সপ্তাহেই রাশেদ বুঝল, এই চেয়ারটা শুধু চেয়ার না।

একটা লোক এলো। বয়স ষাটের কাছাকাছি। হাতে কাগজপত্র। নামজারি চায়। তার বাবা মারা গেছেন, জমি বাবার নামে, এখন নিজের নামে করতে হবে। সাধারণ কেস।

লোকটা রাশেদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। হাতজোড় করে। কাঁপছে একটু। "স্যার, দয়া করে দেখেন।"

ষাট বছরের একটা মানুষ সাতাশ বছরের একটা ছেলের কাছে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ সেই ছেলেটার হাতে একটা স্ট্যাম্প আর একটা স্বাক্ষর আছে। সেই স্ট্যাম্প আর স্বাক্ষর ছাড়া লোকটার জমি তার নামে হবে না।

রাশেদ ফাইলটা দেখল। সব ঠিক আছে। স্বাক্ষর করল। লোকটা সালাম দিয়ে চলে গেল। বারান্দায় গিয়ে ফোনে কাউকে বলল, "হয়ে গেছে। স্যার সই করে দিয়েছেন।"

এইটুকু। একটা স্বাক্ষর। কিন্তু সেই লোকটার জীবনে এই স্বাক্ষরটা মাসের পর মাস অপেক্ষার ফল।

কিন্তু ক্ষমতার সাথে আসে চাপ। সেই চাপটা রাশেদ বুঝল প্রথম মাসেই।

স্থানীয় সংসদ সদস্য। MP। তিনি ফোন করলেন।

"রাশেদ সাহেব, আমি অমুক। আপনাকে অভিনন্দন, নতুন জয়েন করেছেন। একটা ছোট্ট কাজ ছিল।"

ছোট্ট কাজটা হলো একটা নামজারি। একজন স্থানীয় ব্যবসায়ীর। কাগজপত্রে গলদ আছে। দলিলের সাথে খতিয়ানের তথ্য মিলছে না। সাধারণত এই কেসে আরো তদন্ত হয়, সময় লাগে।

MP বলছেন, "দ্রুত করে দেন। আমার লোক।"

রাশেদ বলল, "স্যার, কাগজপত্র দেখতে হবে। নিয়ম মেনে করব।"

"নিয়ম তো আছেই। কিন্তু একটু তাড়াতাড়ি করে দেন।"

ফোনের ওপাশে সৌজন্যমূলক স্বর। কিন্তু সৌজন্যের নিচে একটা চাপ আছে। একটা জুনিয়র ক্যাডার অফিসারের পক্ষে স্থানীয় MP-কে "না" বলা কঠিন। MP ফোন করেন DC-কে, DC ফোন করেন AC Land-কে। চেইন অব কমান্ড। তুমি শেষ মাথায়।

রাশেদ ফাইলটা দেখল। কাগজপত্র ঠিক করা সম্ভব, কিন্তু নিয়ম ভাঙতে হবে। নিয়ম ভাঙলে কী হবে? কিছুই না। হাজার হাজার নামজারি হয় প্রতিদিন, কেউ অডিট করে না। কিন্তু নিয়ম মানলে? MP অসন্তুষ্ট হবেন। পরের বদলিতে খারাপ পোস্টিং হতে পারে। কাজে অসহযোগিতা করতে পারেন।

একটা সাধারণ নামজারি। কিন্তু এর মধ্যে পুরো সিস্টেম আছে।

রাশেদ জাহিদকে ফোন করল সেই রাতে। বলল, "ভাই, আমি দুই বছর পড়ে, পরীক্ষা দিয়ে, ট্রেনিং করে এখানে এসেছি। কিন্তু এখানে এসে দেখছি, আসল পরীক্ষা এখন শুরু হয়েছে। পরীক্ষার হলে MCQ ছিল, এখানে কোনো MCQ নেই। এখানে প্রতিটা সিদ্ধান্ত একটা ধূসর এলাকা। নিয়ম বলে একটা, রাজনীতি বলে আরেকটা। বিবেক বলে ঠিক কাজ করো। বাস্তবতা বলে টিকে থাকো।"

রাশেদের বাবা এলেন একদিন। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। তিরিশ বছর চাকরি করেছেন। বেতন চল্লিশ হাজার। সারাজীবন অন্যের ছেলেমেয়েদের পড়িয়েছেন, নিজের ছেলেকে ক্যাডার অফিসার বানানোর স্বপ্ন দেখেছেন।

অফিসে ঢুকলেন। দেখলেন, ছেলে বড় চেয়ারে বসে আছে। টেবিলে নেমপ্লেট: "রাশেদ, সহকারী কমিশনার (ভূমি)"। কানুনগো এসে ফাইল দিচ্ছে, "স্যার, এই ফাইলটা দেখেন।" রাশেদ ফাইল নিচ্ছে, পড়ছে, মন্তব্য লিখছে, স্বাক্ষর করছে।

বাবা দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছেন। কিছু বলছেন না।

একটু পরে রাশেদ দেখল বাবাকে। "বাবা, ভেতরে আসেন।"

বাবা ভেতরে এলেন। চেয়ারে বসলেন। চারদিকে তাকালেন। দেয়ালের মানচিত্র, ফাইলের স্তূপ, টেবিলে ছেলের নেমপ্লেট। বাবার চোখ ভিজে গেল।

"বাবা, কাঁদছেন কেন?"

বাবা মাথা নাড়লেন। কিছু বলতে পারলেন না। একটু পরে বললেন, গলায় কাঁপুনি, "আমি এই মুহূর্তের জন্য ত্রিশ বছর কাজ করেছি।"

ত্রিশ বছর। প্রাইমারি স্কুলে। ছোট ছোট ক্লাসরুমে। গরমে ঘেমে, শীতে কাঁপতে কাঁপতে। আঠারো হাজার থেকে শুরু করে চল্লিশ হাজারে এসেছেন ত্রিশ বছরে। সেই টাকা থেকে কেটে কেটে ছেলের পড়ার খরচ দিয়েছেন, বইয়ের খরচ দিয়েছেন, ইন্টারনেটের বিল দিয়েছেন। নিজের জন্য কিছু রাখেননি।

আর আজ সেই ছেলে এই চেয়ারে বসে আছে।

একটা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের ছেলে সহকারী কমিশনার। এই বাক্যটার ভেতরে বাংলাদেশের একটা গোটা শ্রেণি-মই আছে। একটা প্রজন্মের কষ্ট আছে। একটা বাবার আত্মত্যাগ আছে।

জাহিদ এই গল্পটা শুনল রাশেদের কাছে। ফোনে। রাত এগারোটায়।

রাশেদ বলল, "ভাই, বাবা চলে যাওয়ার পর আমি দরজা বন্ধ করে কাঁদলাম। কারণ আমি জানি, বাবা আমার জন্য কতটুকু দিয়েছেন। আর আমি জানি, আমার মতো যারা পায়নি, তাদের বাবারাও একই পরিমাণ দিয়েছেন। পার্থক্যটা মেধায় না। পার্থক্যটা ভাগ্যে।"

রাশেদ নিজে বলছে ভাগ্যে। যে জিতেছে, সে জানে কতটুকু ভাগ্য ছিল। বাইরে থেকে মনে হয় সবটাই মেধা।

১০

জাহিদ ল্যাপটপ খুলে একটা হিসাব করল।

46তম BCS-এ আবেদন করেছিল ৩,০৫,২৬২ জন। প্রিলিমিনারিতে বসেছিল ২,৬৪,৮৯৮ জন। চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত: ২,১৬৬ জন। মানে যারা আবেদন করেছিল তাদের মধ্যে 0.71% পেয়েছে।

তিন লাখ আবেদনকারী। তিন লাখ পরিবার। তিন লাখ বাবা যারা ত্রিশ বছর কাজ করেছেন ছেলের এই মুহূর্তের জন্য। তিন লাখ মা যারা দোয়া করেছেন। কত জমি বিক্রি হয়েছে, কত টাকা কোচিংয়ে গেছে, কত রাত ঘুম হারিয়ে গেছে।

আর পেয়েছে দুই হাজার।

একজন রাশেদের পেছনে তিন লাখ রাশেদ আছে।

তিন লাখ রাশেদ যারা একই রকম পড়েছে, একই রকম কষ্ট করেছে, একই রকম স্বপ্ন দেখেছে। তাদের বাবারাও ত্রিশ বছর কাজ করেছেন। তাদের মায়েরাও জমি বিক্রি করেছেন। তাদের রুমেও পনেরোটা গাইড বই ছিল, রঙিন স্টিকারে ট্যাগ করা, পেন্সিলে নোট লেখা।

কিন্তু তারা পায়নি। তাদের কথা কেউ বলে না। তাদের বাবা কোনো অফিসে ঢুকে কাঁদেননি। তাদের বাবা বাড়ি ফিরে গেছেন। চুপচাপ।

১১

Survivorship bias।

একটা মনোবৈজ্ঞানিক ত্রুটি। আমরা শুধু বিজয়ীদের দেখি। পরাজিতরা অদৃশ্য।

BCS ক্যাডার হলে পত্রিকায় খবর হয়। ফেসবুকে ভাইরাল হয়। পাড়ায় মিষ্টি বিলানো হয়। "অমুকের ছেলে BCS পাস করেছে, প্রশাসন ক্যাডার পেয়েছে।" এলাকার সবাই জানে। দশ বছর পরেও মানুষ বলবে, "ঐ বাড়ির ছেলে ক্যাডার।"

কিন্তু যে পায়নি? তার কোনো খবর নেই। সে নিঃশব্দে একটা আঠারো হাজার টাকার চাকরি নেয়। কেউ জিজ্ঞেস করে না। কেউ জানতেও চায় না।

রাশেদের সাফল্যের গল্প পুরো এলাকা জানে। রাশেদের সাথে একই কোচিংয়ে পড়া দশজনের নামও কেউ জানে না। তারা কোথায় গেছে? কী করছে? কেউ খোঁজ রাখে না।

আমরা রাশেদকে দেখে বলি, "BCS দিলে জীবন হয়ে যায়।" কিন্তু আমরা সেই তিন লাখকে দেখি না যাদের জীবন হয়নি।

১২

জাহিদ একটু ভাবল।

রাশেদের সাফল্য সত্য। রাশেদের মেধা সত্য। রাশেদের পরিশ্রম সত্য। রাশেদের বাবার আত্মত্যাগ সত্য। এসবে কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু রাশেদের গল্প দিয়ে BCS-কে বিচার করা ভুল। কারণ রাশেদ হলো সেই একজন যে বেঁচে ফিরেছে। তাকে দেখে যুদ্ধটা সহজ মনে হয়।

যুদ্ধটা বুঝতে হলে সেই তিন লাখকে দেখতে হবে যারা ফেরেনি। যাদের বাবা অফিসে ঢুকে কাঁদেননি, ঘরে ফিরে কেঁদেছেন। যাদের মা জমি বিক্রি করেছেন কিন্তু জমি আর ফেরত আসেনি। যারা ঊনত্রিশ বছর বয়সে আঠারো হাজার টাকার চাকরি নিয়ে জীবন শুরু করেছে। শূন্য থেকে।

১৩

রাশেদ এখন প্রতিদিন সকালে অফিসে যায়। বড় চেয়ারে বসে। ফাইল দেখে, স্বাক্ষর করে, মানুষের সাথে কথা বলে, রাজনৈতিক চাপ সামলায়। সন্ধ্যায় সরকারি বাংলোয় ফেরে। রাতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। উপজেলা সদরের অন্ধকার রাস্তা।

মাঝে মাঝে ভাবে, সে যদি না পেত? সে যদি সেই তিন লাখের একজন হতো?

একই পড়া, একই কষ্ট, একই মেধা, কিন্তু ভিন্ন পরীক্ষার হলে ভিন্ন MCQ, ভিন্ন ভাইভা বোর্ড, ভিন্ন দিনে ভিন্ন প্রশ্ন। তিন নম্বরের ব্যবধান। মুনীর তো তিন নম্বরের জন্য পায়নি। তিনটা নম্বর। একটা MCQ।

রাশেদ আর মুনীরের মধ্যে পার্থক্য কতটুকু? তিনটা নম্বর। কিন্তু পরিণাম? একজন AC Land, সরকারি বাংলো, গাড়ি, "স্যার" ডাক। আরেকজন আঠারো হাজার, ফরিদপুরে হিসাব রক্ষক, পাঁচ বছরের ফাঁকা সিভি।

তিন নম্বরের এপাশে আর ওপাশে দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবন।

১৪

জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করল।

একজন রাশেদের পেছনে তিন লাখ রাশেদ আছে যারা এই চেয়ারে বসতে পারেনি। এই বাক্যটা মাথায় ঘুরছে।

বাংলাদেশে BCS মানে শুধু পরীক্ষা না। BCS মানে একটা জাতীয় লটারি যেখানে তিন লাখ পরিবার দুই থেকে পাঁচ বছরের সময়, লাখ লাখ টাকা, আর একটা প্রজন্মের সম্ভাবনা বাজি ধরে। জিতে দুই হাজার। বাকি দুই লাখ আটানব্বই হাজার? তাদের সময় ফেরত আসে না। টাকা ফেরত আসে না। যৌবন ফেরত আসে না। জমি ফেরত আসে না।

আমরা শুধু রাশেদকে দেখি।

---

*সপ্তম অধ্যায়: বিসিএস -- SURVIVORSHIP BIAS। পর্ব ৬৮/১০০।*