মুনীরের শেষ চেষ্টা

পাঁচবার চেষ্টা, সাত লাখ, পাঁচটা বছর, শূন্য

পর্ব ৬৯ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

মুনীর ভাইয়ের কথা জাহিদ শুনল ফারুকের কাছ থেকে।

ফারুক বলল, "মুনীর ভাই রেজাল্ট দেখে কিছু বলেনি। ফোন রেখে দিয়েছে। তারপর থেকে ফোন বন্ধ।"

জাহিদ মুনীরকে চেনে। ফারুকের পলিটেকনিকের সিনিয়র ভাইয়ের বন্ধু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্স। রেজাল্ট ভালো ছিল। প্রথম শ্রেণি, মেধাতালিকায় ওপরের দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই BCS-এর স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। মাস্টার্সের পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই প্রিলিমিনারির ফরম পূরণ করেছিল।

সেটা পাঁচ বছর আগে।

আজ মুনীরের বয়স ঊনত্রিশ। পঞ্চম BCS পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়েছে। তার নাম নেই। NOT RECOMMENDED।

বয়সসীমা শেষ। আর কোনো সুযোগ নেই। পাঁচবার চেষ্টা। শেষ।

পাঁচ বছরের ইতিহাসটা একবার দেখা যাক।

প্রথম BCS। মুনীর তখন চব্বিশ। সদ্য মাস্টার্স শেষ। আত্মবিশ্বাস আকাশ ছোঁয়া। ঢাবি থেকে পড়েছে, রেজাল্ট ভালো, সেকশনমেটদের মধ্যে তিনজন আগের বছর পাস করেছে। মুনীর ভেবেছিল, সে-ও পারবে। প্রিলিমিনারিতে পাস করল। রিটেনে কাটা পড়ল। নম্বর কম হয়েছে বাংলাদেশ বিষয়াবলিতে। ঠিক আছে, পরেরবার।

দ্বিতীয় BCS। বয়স পঁচিশ। এবার প্রস্তুতি আরো জোরালো। কোচিং সেন্টার বদলাল। ফার্মগেটের একটা নামি কোচিং, মাসে চার হাজার টাকা। এবার প্রিলিমিনারি আর রিটেন দুটোই পাস। ভাইভা পর্যন্ত গেল। ভাইভায় ১০০-এ পেল ৬২। মোট নম্বরে মেধাতালিকায় জায়গা হলো না। তিন নম্বরের ব্যবধান। তিনটা নম্বর। একটা MCQ-এর সমান।

তৃতীয় BCS। বয়স ছাব্বিশ। এবার মুনীর নিশ্চিত ছিল। আগেরবার তিন নম্বরের জন্য হয়নি, এবার হবেই। প্রিলিমিনারি পাস। রিটেনে ভালো করল। ভাইভায় গেল। ভাইভা বোর্ডে একজন জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি আগেও দিয়েছেন?" মুনীর বলল, "জি স্যার, তৃতীয়বার।" প্রশ্নকর্তা মাথা নাড়লেন। সেই মাথা নাড়ানোর মানে কী ছিল, মুনীর আজও জানে না।

রেজাল্ট: NOT RECOMMENDED। এবার পাঁচ নম্বরের ব্যবধান। আগেরবার তিন ছিল, এবার পাঁচ হলো। পেছনে গেছে।

এই পর্যায়ে একটা হিসাব করা যাক।

মুনীর পাঁচ বছরে BCS-এর পেছনে কত টাকা খরচ করেছে?

কোচিং: তিনটা আলাদা কোচিং সেন্টারে পড়েছে। প্রথমটা মাসে তিন হাজার, দ্বিতীয়টা চার হাজার, তৃতীয়টা পাঁচ হাজার। মোট কোচিং খরচ পাঁচ বছরে প্রায় দুই লাখ টাকা।

বই: BCS-এর বই একবার কিনলেই হয় না। প্রতি বছর নতুন সংস্করণ আসে। সাম্প্রতিক তথ্য আপডেট হয়। সংবিধানের সংশোধনী যোগ হয়। নতুন আন্তর্জাতিক ঘটনা ঢোকে। প্রতি বছর বই কিনতে পনেরো থেকে বিশ হাজার টাকা। পাঁচ বছরে আশি হাজার থেকে এক লাখ।

ঢাকায় থাকা: মুনীরের বাড়ি ফরিদপুরে। ঢাকায় থাকতে হয় কোচিং আর পরীক্ষার জন্য। মেসে ভাড়া মাসে পাঁচ হাজার। খাওয়া-দাওয়া আরো পাঁচ হাজার। যাতায়াত দুই হাজার। মাসে বারো হাজার। পাঁচ বছরে সাত লাখ বিশ হাজার, কিন্তু সবসময় ঢাকায় থাকেনি, মাঝে মাঝে বাড়ি গেছে। ধরা যাক ঢাকায় থাকার মোট খরচ চার লাখ।

মোট আর্থিক বিনিয়োগ: প্রায় সাত লাখ টাকা।

এই সাত লাখ টাকা কোথা থেকে এসেছে? মুনীরের বাবা ফরিদপুরে স্কুলশিক্ষক। মাসে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা বেতন। মুনীরের পেছনে মাসে গড়ে দশ থেকে বারো হাজার টাকা খরচ করেছেন। বাকি টাকায় পরিবার চলেছে। একটা পর্যায়ে মুনীরের মা গ্রামের বাড়ির পাশের জমিটা বিক্রি করলেন। দুই বিঘা। চার লাখ টাকা পেলেন। সেই টাকাও মুনীরের BCS প্রস্তুতিতে গেল।

জমি বিক্রির দিন মুনীরের বাবা কিছু বলেননি। মা বলেছিলেন, "ছেলের ভবিষ্যৎ। জমি আবার কেনা যাবে।"

জমি আর কেনা হয়নি।

চতুর্থ BCS। মুনীরের বয়স সাতাশ।

এতদিনে একটা জিনিস বদলে গেছে। মুনীরের সমবয়সীরা এগিয়ে গেছে। যে বন্ধু ব্যাংকে চাকরি নিয়েছিল, সে এখন সিনিয়র অফিসার। যে বন্ধু গার্মেন্টসে ঢুকেছিল, সে এখন প্রোডাকশন ম্যানেজার। যে বন্ধু একটা এনজিওতে জয়েন করেছিল, সে প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর।

মুনীর কী? মুনীর একজন BCS পরীক্ষার্থী। পেশাগত পরিচয়: নেই। আয়: নেই। সিভিতে গত পাঁচ বছরের কলামে কী লিখবে? "BCS প্রস্তুতি।"

চতুর্থ পরীক্ষায় মুনীর প্রিলিমিনারিতে পাস করল। রিটেনে পাস করল। ভাইভায় গেল। এবার ভাইভায় জিজ্ঞেস করা হলো, "চতুর্থবার দিচ্ছেন। এতদিন আর কিছু করেননি?" মুনীর বলল, "স্যার, এটাই আমার একমাত্র লক্ষ্য।"

রেজাল্ট: NOT RECOMMENDED। এবার নম্বরের ব্যবধান সাত।

একটা প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে? প্রথমবার রিটেনেই বাদ। দ্বিতীয়বার তিন নম্বরের ব্যবধান। তৃতীয়বার পাঁচ। চতুর্থবার সাত। নম্বরের ব্যবধান বাড়ছে, কমছে না।

কারণটা সহজ। BCS-এর কম্পিটিশন প্রতি বছর বাড়ছে। নতুন গ্র্যাজুয়েটরা আসছে, তারা তরুণ, তাদের মেমোরি শার্প, তারা নতুন সিলেবাস জানে। মুনীর পাঁচ বছর আগের প্রস্তুতির ওপর আপডেট যোগ করছে, কিন্তু নতুনরা শুরু থেকেই আপডেটেড।

মুনীর একটা রেসে দৌড়াচ্ছে যেখানে প্রতি বছর ফিনিশ লাইনটা আরো দূরে সরে যাচ্ছে।

পঞ্চম BCS। শেষবার। বয়সসীমা ত্রিশের কাছে।

মুনীর এবার সবকিছু ঢেলে দিল। নতুন কোচিং, নতুন বই, নতুন নোট। পুরাতন নোটগুলো ফেলে দিল। বলল, "এবার আমি নতুন করে শুরু করব।" যেন পাঁচ বছরের সব পড়া ভুল ছিল, এবার ঠিকমতো পড়বে।

প্রিলিমিনারি পাস। রিটেন পাস। ভাইভা। ভাইভায় একজন বোর্ড মেম্বার বললেন, "আপনার বয়স প্রায় ত্রিশ। এটা আপনার শেষ সুযোগ। আপনি কেন এত বছর শুধু BCS-ই দিয়ে গেলেন?"

মুনীর কী উত্তর দেবে? বলবে, কারণ আমার বাবা-মা জমি বিক্রি করেছে? বলবে, কারণ আমার জীবনে প্ল্যান বি ছিল না? বলবে, কারণ প্রতিবার মনে হয়েছে "এবার হবে?"

মুনীর বলল, "স্যার, আমি হাল ছাড়িনি।"

রেজাল্ট বের হলো একটা সন্ধ্যায়। PSC-এর ওয়েবসাইটে। মুনীর নিজের রোল নম্বর খুঁজল। পেল না। আরেকবার খুঁজল। পেল না। তৃতীয়বার Ctrl+F দিয়ে সার্চ করল। No results found।

শেষ।

ফারুক বলল, "মুনীর ভাই তিন দিন ঘর থেকে বের হননি। খাননি ঠিকমতো। ফোন ধরেননি।"

জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "এখন কেমন আছেন?"

"কেমন আছেন মানে? কী বলবে একটা লোক যে পাঁচটা বছর একটা জিনিসের পেছনে ছুটেছে, আর শেষে জানল যে দরজাটা চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে?"

জাহিদ চুপ করে রইল।

ফারুক বলল, "মুনীর ভাই এখন চাকরি খুঁজছেন। তিনদিন পর ঘুরে দাঁড়ালেন। বললেন, 'আর না। এবার অন্য কিছু করতে হবে।' গতকাল একটা ইন্টারভিউ দিয়ে এলেন।"

"কোথায়?"

"একটা প্রাইভেট কোম্পানি। ফরিদপুরে। হিসাব রক্ষক পদ। বেতন আঠারো হাজার টাকা।"

আঠারো হাজার। মুনীরের বয়স ঊনত্রিশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণি। পাঁচ বছরের BCS প্রস্তুতি। সাত লাখ টাকা খরচ। বাবা-মায়ের জমি বিক্রি।

আঠারো হাজার টাকা।

সবচেয়ে কঠিন অংশটা অন্য জায়গায়।

মুনীরের ঢাবির ব্যাচে যারা সরাসরি চাকরি নিয়েছিল, তারা পাঁচ বছর আগে বিশ হাজার টাকা বেতনে শুরু করেছিল। এখন তাদের বেতন পঁয়ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার। কেউ কেউ ষাটও পাচ্ছে। তারা প্রমোশন পেয়েছে, অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, পেশাগত নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে।

মুনীর এখন তাদের পাঁচ বছর পিছিয়ে। একই যোগ্যতা, একই বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু পাঁচ বছর কম অভিজ্ঞতা। সিভিতে পাঁচ বছরের ফাঁকা জায়গা। কোনো এমপ্লয়ার সেই ফাঁকটা দেখে ভাববে: এই লোক পাঁচ বছর কী করেছে?

"BCS দিয়েছে" এই উত্তর প্রাইভেট সেক্টরে কোনো মূল্য রাখে না। বরং এটা একটা নেতিবাচক সংকেত। মানে এই লোক সরকারি চাকরি চেয়েছিল, পায়নি, তাই এখানে এসেছে। সেকেন্ড চয়েস।

আর সবচেয়ে নির্মম ব্যাপার: মুনীর যে কোম্পানিতে আঠারো হাজারে জয়েন করবে, সেখানে তার জুনিয়ররা তার সিনিয়র। যারা তিন বছর আগে ঢুকেছে, তারা এখন মুনীরের ওপরে। মুনীর তাদের কাছে শিখবে। মুনীরের বয়স বেশি, যোগ্যতা বেশি, কিন্তু অভিজ্ঞতা কম।

ঊনত্রিশ বছর বয়সে একজন ফ্রেশার। এটাই মুনীরের পরিচয় এখন।

জাহিদ ভাবল, মুনীর কি ব্যতিক্রম?

না। মুনীর নিয়ম।

প্রতি বছর BCS-এ তিন থেকে চার লাখ মানুষ পরীক্ষা দেয়। পাস করে দুই হাজার। বাকি তিন লাখ আটানব্বই হাজার? তারা কোথায় যায়?

কেউ আবার দেয়। পরের বছর। তার পরের বছর। বয়সসীমা পর্যন্ত।

কেউ একটু পরে বুঝতে পারে। দুই-তিন বার দিয়ে ছেড়ে দেয়। চাকরি খোঁজে। দেরিতে শুরু করে, কিন্তু শুরু করে।

কেউ শেষ পর্যন্ত যায়। মুনীরের মতো। পাঁচবার দেয়। বয়সসীমা শেষ হয়। তারপর বাস্তবতা মেনে নেয়।

আর কেউ কেউ? কেউ কেউ মেনে নিতে পারে না। BCS-এর পর ব্যাংক দেয়, NTRCA দেয়, PSC-এর অন্যান্য পরীক্ষা দেয়। পরীক্ষা দেওয়াটাই জীবন হয়ে যায়। চাকরি না, পরীক্ষাই পেশা।

জাহিদ একটা সংখ্যা ভাবল।

প্রতিটা রাশেদের পেছনে, যে BCS পাস করে গৌরবের সাথে জয়েন করে, দশটা মুনীর আছে। যারা পারেনি। যাদের কথা কেউ বলে না। যাদের ছবি পত্রিকায় ছাপা হয় না। যাদের সফলতার গল্প ফেসবুকে ভাইরাল হয় না।

পাড়ায় একজন BCS পাস করলে সবাই জানে। সেই খবর মসজিদে যায়, চায়ের দোকানে যায়, বিয়ের বাজারে যায়। "অমুকের ছেলে ক্যাডার হয়েছে।" এই একটা বাক্যে সবকিছু বলা হয়ে যায়।

কিন্তু পাড়ায় দশজন BCS দিয়ে ফেল করলে কেউ জানে না। সেই খবর কোথাও যায় না। কারণ ব্যর্থতার কোনো ঘোষণা হয় না। ব্যর্থতা নীরব।

এটাই survivorship bias। আমরা শুধু বিজয়ীদের দেখি। হেরে যাওয়া মানুষগুলো অদৃশ্য। তাই আমরা ভাবি, BCS দিলে পাস করা যায়। কারণ আমরা শুধু পাস করা মানুষদের চিনি।

কিন্তু সংখ্যা বলে অন্য কথা। সংখ্যা বলে, তুমি BCS দিলে পাস না করার সম্ভাবনা ৯৯.৫ শতাংশ। দুইশো জনের মধ্যে একজন পাস করে। বাকি একশো নিরানব্বই জন? তারা মুনীর।

১০

ফারুক আরেকটা কথা বলল। চুপচাপ, যেন নিজের কাছে বলছে।

"মুনীর ভাই-এর বাবা অবসর নিয়েছেন গত বছর। পেনশন পান। জমি বিক্রি হয়ে গেছে। ছেলের বয়স ঊনত্রিশ, বেতন আঠারো হাজার।"

একটু থেমে বলল, "মুনীর ভাই আমাকে বলেছিলেন একটা কথা। বলেছিলেন, 'ফারুক, আমি পাঁচ বছর ধরে একটা দরজায় ধাক্কা দিয়েছি। দরজা খুলেনি। কিন্তু আমি পেছনে তাকাইনি। পেছনে তাকালে দেখতাম, আরো একশোটা দরজা খোলা ছিল। আমি সেগুলো দেখিনি।'"

জাহিদ কিছু বলল না।

মুনীরের গল্পটা একটা ট্র্যাজেডি। কিন্তু এটা ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি না। এটা জাতীয় ট্র্যাজেডি। প্রতি বছর হাজার হাজার মুনীর তৈরি হচ্ছে। মেধাবী, পরিশ্রমী, সৎ তরুণরা পাঁচটা বছর একটা পরীক্ষার পেছনে ব্যয় করে শেষপর্যন্ত আঠারো হাজার টাকার চাকরি নিচ্ছে।

তারা যদি সেই পাঁচটা বছর অন্য কিছুতে ব্যয় করত? একটা স্কিল শিখত? একটা ব্যবসা শুরু করত? একটা পেশায় অভিজ্ঞতা অর্জন করত?

কিন্তু তারা করেনি। কারণ BCS-এর আলো এত উজ্জ্বল যে বাকি সব পথ অন্ধকার মনে হয়। আর সেই আলো আসলে কার? সেই একজনের, যে পাস করেছে। বাকি একশো নিরানব্বই জনের অন্ধকার কেউ দেখে না।

Survivorship bias। আমরা শুধু বিজয়ীদের দেখি।

---

*সপ্তম অধ্যায়: বিসিএস — SURVIVORSHIP BIAS। পর্ব ৬৯/১০০।*