বিসিএস-এর অর্থনীতি
তিন লাখ তরুণের বিনিয়োগ, দুই হাজার চেয়ার, আর ত্রিশ কোটি টাকার এক-একটা ক্যাডার
১
মুনীরের গল্পটা জাহিদের মাথা থেকে যাচ্ছিল না।
সাত লাখ টাকা। পাঁচটা বছর। বাবা-মায়ের জমি। শেষে আঠারো হাজার টাকার চাকরি। এটা একজনের গল্প। কিন্তু একজনের গল্প দিয়ে কিছু বোঝা যায় না। পুরো দেশের হিসাবটা কেমন?
জাহিদ ল্যাপটপ খুলল। একটা স্প্রেডশিট তৈরি করল। কলামগুলোর নাম দিল: প্রার্থী সংখ্যা, গড় বিনিয়োগ, মোট বিনিয়োগ, নির্বাচিত, প্রতি ক্যাডারে খরচ।
তারপর সংখ্যা বসাতে শুরু করল।
২
প্রথম সংখ্যা: প্রার্থী।
প্রতিটা বিসিএস পরীক্ষায় আবেদন করে গড়ে তিন লাখ মানুষ। কোনো বছর সাড়ে তিন লাখ, কোনো বছর আড়াই লাখ। গড় ধরা যাক তিন লাখ।
দ্বিতীয় সংখ্যা: গড় বিনিয়োগ।
মুনীর পাঁচ বছরে সাত লাখ খরচ করেছে। সেটা শুধু সরাসরি খরচ, কোচিং-বই-থাকা-খাওয়া। কিন্তু সবচেয়ে বড় খরচটা চোখে দেখা যায় না: সুযোগ ব্যয়। এই সময়ে যদি চাকরি করত, গড়ে মাসে পনেরো হাজার টাকা আয় করতে পারত। দুই বছরে তিন লাখ ষাট হাজার। পাঁচ বছরে নয় লাখ।
সবাই পাঁচ বছর দেয় না। কেউ একবার দিয়ে ছেড়ে দেয়, কেউ তিনবার। কিন্তু গড়ে দুই-তিন বছরের প্রস্তুতি ধরলে, সরাসরি খরচ আর সুযোগ ব্যয় মিলিয়ে প্রতি প্রার্থীর মোট বিনিয়োগ প্রায় বিশ লাখ টাকা।
কেউ কম খরচ করে, কেউ বেশি। মফস্বলের ছেলে যে বাড়িতে বসে পড়ে তার খরচ কম। ঢাকায় এসে কোচিং করা ছেলের খরচ বেশি। কিন্তু সুযোগ ব্যয় সবার সমান, কারণ সবারই সময় একই দামে নষ্ট হচ্ছে।
৩
তৃতীয় সংখ্যা: মোট বিনিয়োগ।
তিন লাখ প্রার্থী। গড়ে বিশ লাখ টাকা বিনিয়োগ।
জাহিদ গুণ করল। ৩,০০,০০০ গুণ ২০,০০,০০০।
ষাট হাজার কোটি টাকা।
সে সংখ্যাটা দেখে চোখ কচলাল। আবার হিসাব করল। হ্যাঁ, ষাট হাজার কোটি। একটা বিসিএস সাইকেলে।
এটা কতটুকু বড়? পদ্মা সেতুর নির্মাণ খরচ ছিল ত্রিশ হাজার কোটি টাকা। মানে প্রতি বিসিএস সাইকেলে বাংলাদেশের তরুণরা দুইটা পদ্মা সেতুর সমান টাকা ঢালছে একটা পরীক্ষার পেছনে।
আর এই বিনিয়োগের বিনিময়ে কী পাওয়া যায়?
দুই হাজার চাকরি।
৪
চতুর্থ সংখ্যা: প্রতি ক্যাডারে জাতীয় বিনিয়োগ।
৬০,০০০ কোটি ভাগ ২,০০০ সমান ৩০ কোটি টাকা।
প্রতিটা বিসিএস ক্যাডারের পেছনে জাতি ত্রিশ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। ত্রিশ কোটি। এই টাকায় গুলশানে একটা ফ্ল্যাট কেনা যায়। একটা মাঝারি কারখানা দাঁড় করানো যায়। পঞ্চাশটা স্টার্টআপে সিড ফান্ডিং দেওয়া যায়।
কিন্তু এই ত্রিশ কোটি কে খরচ করছে? সরকার না। সরকার শুধু পরীক্ষা নেয়, নিয়োগ দেয়। এই ত্রিশ কোটি খরচ করছে পরিবারগুলো। মুনীরের বাবার মতো স্কুলশিক্ষকরা। রাশেদের বাবার মতো প্রাইমারি শিক্ষকরা। জমি বিক্রি করা মায়েরা। ধার করা টাকায় কোচিংয়ে যাওয়া তরুণরা।
এই ত্রিশ কোটি টাকা সরকারের কোনো বাজেটে নেই। কোনো পরিসংখ্যানে নেই। কোনো GDP হিসাবে নেই। কিন্তু টাকাটা খরচ হচ্ছে। প্রতিটা সাইকেলে। নিশ্চিতভাবে।
আর সেই ক্যাডারের প্রথম বেতন? ষোলো হাজার টাকা। নবম গ্রেড।
৫
ফানেলটা দেখলে বোঝা যায় বাছাইপ্রক্রিয়াটা কতটা নিষ্ঠুর।
তিন লাখ মানুষ আবেদন করে। প্রিলিমিনারিতে টিকে পঞ্চাশ হাজার। রিটেনে নামে দশ হাজার। ভাইভায় পাঁচ হাজার। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত দুই হাজার।
প্রতিটা ধাপে বিশাল সংখ্যক মানুষ ঝরে পড়ছে। প্রিলিমিনারিতে আড়াই লাখ বাদ। রিটেনে চল্লিশ হাজার বাদ। ভাইভায় তিন হাজার বাদ। শেষ মেধাতালিকায় আরো তিন হাজার বাদ।
শুরু থেকে শেষ? তিন লাখ থেকে দুই হাজার। একশো পঞ্চাশ জনে একজন। সিলেকশন রেট ০.৬৭ শতাংশ।
কিন্তু ঝরে পড়া মানে শুধু একটা পরীক্ষায় ফেল করা না। ঝরে পড়া মানে সময় গেছে, টাকা গেছে, আত্মবিশ্বাস গেছে। আর অনেকে পরের বার আবার এসে দাঁড়ায় ফানেলের মুখে। একই বিনিয়োগ। একই ফলাফল।
৬
আসল খরচটা টাকায় না। আসল খরচটা সময়ে।
তিন লাখ প্রার্থীর প্রত্যেকে গড়ে দুই বছর ব্যয় করে প্রস্তুতিতে। কেউ এক বছর, কেউ পাঁচ। গড়ে দুই।
তিন লাখ গুণ দুই বছর সমান ছয় লাখ মানব-বর্ষ।
ছয় লাখ মানব-বর্ষ। একটা পরীক্ষার জন্য।
এর কতটুকু কাজে লাগে? দুই হাজার জনের প্রস্তুতি সার্থক হয়। বাকি দুই লাখ আটানব্বই হাজার জনের প্রস্তুতি? সম্পূর্ণ অপচয়। তাদের শেখা সাধারণ জ্ঞান, মুখস্থ করা সংবিধানের অনুচ্ছেদ, মনে রাখা জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর সদর দপ্তর, কোনো কিছুরই চাকরির বাজারে কোনো মূল্য নেই। কোনো প্রাইভেট কোম্পানি ইন্টারভিউতে জিজ্ঞেস করে না, "সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে কী আছে?"
এটা জ্ঞান না। এটা তথ্যের মুখস্থবিদ্যা। পরীক্ষার হলের বাইরে সম্পূর্ণ অকেজো।
৭
এই তিন লাখ প্রার্থীর মধ্যে অনেকেই বাংলাদেশের সেরা মস্তিষ্ক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিকেল কলেজ, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম। ক্লাসের সেরা ছাত্র। প্রথম শ্রেণি, মেধাতালিকা।
তারা দুই থেকে পাঁচ বছর কী করছে?
একজন বুয়েট গ্র্যাজুয়েট, যে ব্রিজ ডিজাইন করতে পারে, সে বসে আছে NATO-র প্রতিষ্ঠার তারিখ মুখস্থ করতে। একজন মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট, যে অপারেশন করতে পারে, সে বসে আছে সংবিধানের ১৫৪তম অনুচ্ছেদ মুখস্থ করতে। একজন অর্থনীতির ছাত্র, যে অর্থনৈতিক মডেলিং করতে পারে, সে বসে আছে বীরশ্রেষ্ঠদের জন্মতারিখ মুখস্থ করতে।
অর্থনীতিতে এটাকে বলে talent misallocation। দেশের সবচেয়ে মেধাবী তরুণরা তাদের সবচেয়ে উৎপাদনশীল বছরগুলোতে সাধারণ জ্ঞান মুখস্থ করছে। তারা ব্রিজ ডিজাইন করতে পারত, রোগী বাঁচাতে পারত, সফটওয়্যার বানাতে পারত, গবেষণা করতে পারত, উদ্যোগ শুরু করতে পারত। কিন্তু তারা MCQ প্র্যাকটিস করছে।
৮
এই talent misallocation-এর GDP-তে প্রভাব কত?
সরাসরি হিসাব করা কঠিন। কিন্তু মোটা দাগে: বিসিএস, ব্যাংক পরীক্ষা, NTRCA, অন্যান্য PSC পরীক্ষা মিলিয়ে প্রতি বছর আট থেকে দশ লাখ তরুণ সরকারি চাকরির পরীক্ষার পেছনে সময় দিচ্ছে। তাদের সুযোগ ব্যয়, সরাসরি খরচ, আর হারানো উৎপাদনশীলতা মিলিয়ে বছরে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের GDP-র ০.২৫ শতাংশ।
আর যে দুই হাজার জন শেষপর্যন্ত পাস করে, তারা কী করে? অনেকে ভালো কাজ করে, সেটা সত্য। কিন্তু যে বুয়েট ইঞ্জিনিয়ার পুলিশ ক্যাডারে গেল, সে ব্রিজ ডিজাইন করছে না। যে মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট প্রশাসন ক্যাডারে গেল, সে রোগী দেখছে না। তারা ফাইল সই করছে, মিটিংয়ে যাচ্ছে, পরিদর্শন করছে।
মেধার অপচয় শুধু যারা ফেল করে তাদের না। যারা পাস করে তাদেরও।
৯
জাহিদ একটু ভিন্নভাবে ভাবল।
বিসিএস কি আসলে একটা নিয়োগ পরীক্ষা? নাকি এটা একটা জাতীয় লটারি?
লটারিতে অনেকে টিকিট কেনে, কয়েকজন জেতে। বিসিএসে অনেকে পরীক্ষা দেয়, কয়েকজন পাস করে। লটারিতে জেতার সম্ভাবনা খুব কম। বিসিএসে ০.৬৭ শতাংশ। লটারিতে হারলে টিকিটের দাম যায়। বিসিএসে হারলে বছরের পর বছর যায়, জমি যায়, যৌবন যায়।
পার্থক্য একটাই: লটারিতে সবাই জানে এটা ভাগ্যের খেলা। বিসিএসে সবাই ভাবে এটা মেধার খেলা। "আমি যথেষ্ট পড়লে পাস করব।" এই বিশ্বাসটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ এই বিশ্বাস মানুষকে বছরের পর বছর আটকে রাখে।
ইসরায়েলের জনসংখ্যা এক কোটি। বাংলাদেশের আঠারো কোটি। ইসরায়েলে প্রতি বছর প্রায় ৯০০ টেক স্টার্টআপ তৈরি হয়। বাংলাদেশে? প্রতি বছর তিন লাখ মেধাবী তরুণ বিসিএসের পেছনে দৌড়ায়।
এই তিন লাখের মধ্যে যদি দশ শতাংশও উদ্যোক্তা হতো? ত্রিশ হাজার নতুন উদ্যোক্তা। তাদের দশ শতাংশও যদি টিকে যেত? তিন হাজার নতুন ব্যবসা। প্রতিটায় গড়ে পাঁচজন কর্মী। পনেরো হাজার নতুন কর্মসংস্থান। প্রতি বছর।
কিন্তু এটা হবে না। কারণ বাংলাদেশে সবচেয়ে মেধাবীরা ঝুঁকি নিতে চায় না। তারা চায় পেনশন, গ্র্যাচুইটি, বাড়ি বরাদ্দ, সামাজিক মর্যাদা। এই প্যাকেজের সাথে কোনো স্টার্টআপ পাল্লা দিতে পারে না।
ফলে মেধা যায় আমলাতন্ত্রে। উদ্ভাবন হয় না। প্রবৃদ্ধি আটকে থাকে।
১০
জাহিদ স্প্রেডশিটটা বন্ধ করল।
সংখ্যাগুলো সামনে। ষাট হাজার কোটি টাকা প্রতি সাইকেলে। ত্রিশ কোটি টাকা প্রতি রিক্রুটে। বছরে GDP ক্ষতি এক বিলিয়ন ডলার। ছয় লাখ মানব-বর্ষ। তিন লাখ তরুণের দুই থেকে পাঁচ বছর।
এই সংখ্যাগুলো কেউ হিসাব করে না। কারণ বিসিএস একটা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। এটাকে প্রশ্ন করা মানে বাবা-মায়ের স্বপ্নকে প্রশ্ন করা। সমাজের সংজ্ঞায় "সফলতা" কী, সেটাকে প্রশ্ন করা।
কিন্তু সংখ্যা মিথ্যা বলে না।
১১
ফারুক ফোন করল সন্ধ্যায়।
"মুনীর ভাই জয়েন করেছেন। ফরিদপুরের সেই কোম্পানিতে। আঠারো হাজার টাকা।"
"কেমন আছেন?"
"বলেছেন, ভালো আছি। কাজ করছি। এটাই বাস্তবতা।"
জাহিদ ফোন রাখল।
মুনীর ভালো আছেন। আঠারো হাজার টাকায়। ঢাবির প্রথম শ্রেণি নিয়ে। পাঁচ বছরের প্রস্তুতি নিয়ে। বিক্রি হওয়া জমি নিয়ে। ঊনত্রিশ বছর বয়সে ফ্রেশার হিসেবে।
আর বাংলাদেশ? বাংলাদেশও ভালো আছে। প্রতি বছর তিন লাখ তরুণকে একটা ফানেলে ঢুকিয়ে দুই হাজার বের করে। বাকিদের কোনো হিসাব নেই। তারা পরিসংখ্যানে নেই। তারা নিউজে নেই।
তারা শুধু আছে। লাখে লাখে। নীরবে।
বিসিএসের অর্থনীতি এটাই। ষাট হাজার কোটি টাকা ঢোকে, দুই হাজার চেয়ার বের হয়। বাকি সব বাষ্প হয়ে মিলিয়ে যায়। কোনো রসিদ নেই, কোনো জবাবদিহি নেই, কোনো হিসাব নেই।
সপ্তম অধ্যায় শেষ।
---
*সপ্তম অধ্যায়: বিসিএস -- SURVIVORSHIP BIAS। পর্ব ৭০/১০০। অধ্যায় সমাপ্ত।*