বিদেশে যাবো

একটা সাফল্যের গল্প, হাজারটা ব্যর্থতার নীরবতা

পর্ব ৭১ · ১০ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

অষ্টম অধ্যায় শুরু হচ্ছে একটা বাক্য দিয়ে। বাক্যটা বাংলাদেশের প্রতিটা পরিবার চেনে।

"বিদেশে যাবো।"

এই তিনটা শব্দ বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় স্বপ্ন। প্রথম স্বপ্ন সরকারি চাকরি। দ্বিতীয় স্বপ্ন বিদেশ। কারো কারো কাছে দ্বিতীয়টাই প্রথম। সরকারি চাকরি পাওয়া যায় না, সেটা আগের অধ্যায়ে দেখেছি। তিন লাখে দুই হাজার। তাহলে বাকি দুই লাখ আটানব্বই হাজার কী করবে?

বিদেশে যাবে।

জাহিদের বন্ধু আরিফের কথা আগেও এসেছে। ফ্রিল্যান্সিংয়ের শুরুর দিকে জাহিদের সাথে আরিফের পরিচয়। কিন্তু আরিফ ফ্রিল্যান্সিং করে না। আরিফ জাপানে। তোকানামে প্রিফেকচারের একটা ফুড প্রসেসিং ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। TITP, Technical Intern Training Program।

আরিফ জাপানে যাওয়ার আগে কী ছিল? সেই গল্পটা জাহিদ জানে।

আরিফ কুমিল্লার ছেলে। বাবা ছোট ব্যবসায়ী, বাজারে একটা মুদি দোকান। মা গৃহিণী। তিন ভাইবোনের মধ্যে আরিফ বড়। HSC-তে GPA 4.50। খারাপ না। ভালো বলা যায়। কিন্তু 4.50 দিয়ে কী হয়?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া কঠিন। BUET অসম্ভব। মেডিকেল অসম্ভব। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যায়, তিন বছর অনার্স পড়ে বের হলে সেই একই চক্র: BCS, ব্যাংক, প্রাইমারি, NTRCA। চার-পাঁচ বছর ধরে পরীক্ষা দিতে থাকো, ফলাফল অনিশ্চিত।

আরিফের বাবা হিসাব করলেন। অন্যরকম হিসাব।

হিসাবটা এরকম।

অনার্সে ভর্তি হলে চার বছর পড়া। খরচ? টিউশন ফি কম, কিন্তু থাকা-খাওয়া, বই, কোচিং, যাতায়াত মিলিয়ে বছরে এক লাখ। চার বছরে চার লাখ। তারপর চাকরির জন্য আরো দুই-তিন বছর। সেই সময়ে কোনো আয় নেই, খরচ চলছে। মোট ছয়-সাত বছর, মোট খরচ সাত-আট লাখ। তারপর চাকরি হতেও পারে, না-ও হতে পারে।

জাপানে গেলে? আট লাখ টাকা দালালকে দাও। ছয় মাস ভাষা শেখো। এক বছরের মধ্যে জাপানে। সেখানে মাসে এক লাখ বিশ হাজার টাকা আয়। তিন বছরের কন্ট্রাক্ট। তিন বছরে মোট আয় প্রায় ত্রিশ লাখ। খরচ বাদ দিয়ে বাড়িতে পাঠাতে পারবে পনেরো-বিশ লাখ।

দুটো পথের তুলনা করো। একদিকে সাত বছর খরচ করে অনিশ্চিত চাকরি। অন্যদিকে তিন বছরে বিশ লাখ টাকা।

আরিফের বাবা দোকানদার। তিনি দুটো জিনিস বোঝেন: খরচ আর আয়। এই হিসাবে জাপান জিতে যায়। সহজে জিতে যায়।

কিন্তু এই হিসাবে যা নেই, সেটাই আসল জিনিস।

আরিফের বাবা আট লাখ টাকা কোথায় পেলেন? দোকানের জমা থেকে তিন লাখ। বাকি পাঁচ লাখ? আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার। দুই লাখ চাচার কাছ থেকে, দেড় লাখ মামার কাছ থেকে, দেড় লাখ একটা NGO মাইক্রোক্রেডিট থেকে।

আট লাখ টাকা। একটা মুদি দোকানের জমানো সব টাকা। আত্মীয়দের কাছে ঋণ। মাইক্রোক্রেডিটের সুদ।

এই আট লাখ টাকা কোথায় গেল? দালালকে।

বাংলাদেশে "দালাল" শব্দটা অনেক অর্থে ব্যবহৃত। কিন্তু মাইগ্রেশনের দুনিয়ায় দালাল মানে এজেন্ট। মধ্যস্বত্বভোগী। যে তোমার পাসপোর্ট, ভিসা, টিকিট, ভাষা কোর্স, সব ম্যানেজ করে। বিনিময়ে একটা মোটা অঙ্ক নেয়।

জাপানে TITP-এর জন্য সরকারি খরচ কত? দেড়-দুই লাখ টাকা। কিন্তু সরকারি পথে গেলে সময় লাগে, অনিশ্চয়তা বেশি। কবে যেতে পারবে জানা নেই। দালালের পথে গেলে দ্রুত হয়। ছয় মাসে চলে যাওয়া যায়।

তাহলে বাকি ছয় লাখ? দালালের পকেটে। এই ছয় লাখ টাকা কোনো রসিদে নেই। কোনো চুক্তিতে নেই। কোনো হিসাবে নেই।

আরিফ একা না। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে সাত-আট লাখ মানুষ বিদেশে যায়। সবাই জাপানে যায় না। বেশিরভাগ মধ্যপ্রাচ্যে। কেউ কোরিয়া, কেউ মালয়েশিয়া, কেউ ইউরোপ। প্রতিটা গন্তব্যের আলাদা পাইপলাইন।

জাপান: TITP। Technical Intern Training Program। তিন বছরের কন্ট্রাক্ট, পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যায়। খরচ আট থেকে বারো লাখ। ভাষা শিখতে হয়। N4 লেভেল জাপানি।

দক্ষিণ কোরিয়া: EPS। Employment Permit System। সরকারি প্রোগ্রাম, তুলনামূলক স্বচ্ছ। কোরিয়ান ভাষার পরীক্ষা দিতে হয়। খরচ তিন-চার লাখ, সরকারি পথে গেলে। কিন্তু পরীক্ষায় পাস করা কঠিন, আসনসংখ্যা কম।

মধ্যপ্রাচ্য: সবচেয়ে সহজ, সবচেয়ে সস্তা, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। দুই থেকে পাঁচ লাখ। ভাষা লাগে না। কিন্তু কাজের ধরন কঠিন: নির্মাণ শ্রমিক, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, ড্রাইভার। তাপমাত্রা পঞ্চাশ ডিগ্রি। দিনে বারো ঘণ্টা।

ইউরোপ: সবচেয়ে দামি, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। দশ থেকে পনেরো লাখ। অনেক সময় অবৈধ পথ। লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইতালি। নৌকায়। এই পথে মানুষ মারা যায়। প্রতি বছর মারা যায়।

আরিফ জাপান বেছে নিয়েছিল। কুমিল্লায় একটা জাপানি ভাষা শেখার সেন্টারে ভর্তি হলো। ছয় মাসের কোর্স।

ছয় মাস ধরে আরিফ প্রতিদিন জাপানি শিখেছে। হিরাগানা, কাতাকানা, বেসিক কাঞ্জি। "ওহায়ো গোজাইমাস" থেকে শুরু করে "ওনেগাই শিমাস" পর্যন্ত।

জাহিদ একবার আরিফকে জিজ্ঞেস করেছিল, "তুই জাপানি শিখতে গিয়ে কেমন লাগছে?"

আরিফ বলেছিল, "অদ্ভুত। আমি কুমিল্লায় বসে একটা ভাষা শিখছি যেটা আমার জীবনে কোনোদিন লাগবে না, শুধু ওই তিন বছরের জন্য।"

"তাহলে?"

"তাহলে কী? শিখতে হবে। না শিখলে যেতে পারব না। না গেলে টাকা আসবে না। টাকা না আসলে বাবার ঋণ শোধ হবে না।"

এই হলো চেইন। ভাষা শেখা একটা আনন্দ হতে পারত, কিন্তু আরিফের কাছে সেটা বাধ্যবাধকতা। সে জাপানি শিখছে জাপানি সংস্কৃতি ভালোবেসে না। সে শিখছে কারণ এটা দরজা। দরজার ওপাশে টাকা। টাকা দিয়ে ঋণ শোধ। ঋণ শোধ হলে পরিবার দাঁড়াবে।

দালাল সিস্টেমটা জাহিদ আরিফের মুখে শুনে বিস্তারিত জানল।

সিস্টেমটা এরকম। প্রতিটা এলাকায় একজন "ভাই" থাকে। প্রাক্তন মাইগ্র্যান্ট, অথবা কারো আত্মীয় যে আগে বিদেশে গেছে। এই ভাই স্থানীয় পর্যায়ে মানুষ জোগাড় করে। তালিকা যায় ঢাকার রিক্রুটিং এজেন্সিতে। এজেন্সি জাপানের receiving organization-এর সাথে যুক্ত। সেখান থেকে ফ্যাক্টরিতে প্লেসমেন্ট।

প্রতিটা ধাপে কেউ না কেউ টাকা নেয়। স্থানীয় ভাই, ঢাকার এজেন্সি, জাপানের organization। পুরো চেইনের খরচ আরিফের পরিবার বহন করে।

আট লাখ টাকা।

আরিফের বাবার মুদি দোকানের বার্ষিক লাভ দুই লাখ টাকা। মানে আরিফকে বিদেশ পাঠাতে যে টাকা খরচ হয়েছে, সেটা দোকানের চার বছরের লাভ।

এই সিস্টেমটা কেন এত দামি?

চাহিদা অসীম, সরবরাহ সীমিত। কোটি কোটি তরুণ বিদেশে যেতে চায়। ভিসা সীমিত। যে বেশি টাকা দিতে পারে, সে আগে যায়।

আর তথ্যের অসমতা। পরিবারগুলো জানে না সরকারি পথে কত খরচ। জানে না দালাল কত নিচ্ছে। তারা শুধু একটা জিনিস জানে: পাশের বাড়ির ছেলে বিদেশে গেছে, মাসে টাকা পাঠাচ্ছে।

এটাই availability heuristic। তুমি সিদ্ধান্ত নাও সেই তথ্যের ভিত্তিতে যা তোমার সামনে আছে। যে ছেলে বিদেশে গিয়ে ঠকেছে, ফিরে এসেছে খালি হাতে, সে চুপ করে আছে। লজ্জায়। তার গল্প কেউ বলে না।

আরিফের ভিসা হলো ছয় মাস পর। পাসপোর্ট, ভিসা, টিকিট, সব রেডি।

যাওয়ার দিনটা জাহিদ ভোলেনি।

আরিফ জাহিদকে ফোনে জানিয়েছিল। "যাচ্ছি, ভাই। মঙ্গলবার রাতের ফ্লাইট। ঢাকা থেকে ক্যুশু।"

জাহিদ জিজ্ঞেস করেছিল, "কেমন লাগছে?"

আরিফ বলেছিল, "কিছু লাগছে না। শুধু মায়ের কান্না থামছে না।"

১০

এয়ারপোর্টের বিদায়। বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্যগুলোর একটা।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ডিপার্চার টার্মিনালের সামনে। একটা গেটের ভেতরে যাত্রী, বাইরে পরিবার। মাঝখানে একটা লোহার রেলিং। এই রেলিং-এর দুই পাশে প্রতিদিন শত শত বিদায় হয়।

আরিফের মা কাঁদছিলেন। থামছিলেন না। চোখ মুছছিলেন শাড়ির আঁচলে, আবার কাঁদছিলেন। "তুই খাবি তো? ঠিকমতো খাবি তো? ওরা ভাত খায় না, শুনেছি। তুই কী খাবি?"

আরিফ বলছিল, "মা, খাব। ভাত পাওয়া যায়। চিন্তা কোরো না।"

"চিন্তা কোরো না।" বাংলাদেশের সবচেয়ে অসার বাক্য। মা চিন্তা না করে থাকবেন কীভাবে? ছেলে যাচ্ছে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে। একা। একুশ বছর বয়সে। একটা দেশে যেখানে ভাষা জানে না, মানুষ চেনে না, খাবার চেনে না।

আরিফের বাবা দাঁড়িয়ে ছিলেন একটু দূরে। চুপচাপ। মুখে কোনো ভাব নেই। চোখ শুকনো।

কিন্তু জাহিদ লক্ষ্য করেছিল, আরিফের বাবার হাত কাঁপছিল।

১১

বাবা শেষমেশ এগিয়ে এলেন। আরিফকে জড়িয়ে ধরলেন। বাংলাদেশের গ্রামের বাবারা ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন না সাধারণত। স্নেহ দেখান অন্যভাবে। টাকা দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে, চুপচাপ থেকে। কিন্তু এয়ারপোর্টে, যাওয়ার আগের মুহূর্তে, নিয়মগুলো ভেঙে যায়।

আরিফের বাবা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "যা, বাবা। ভালো থাকিস।"

চারটা শব্দ।

"যা, বাবা। ভালো থাকিস।"

এই চারটা শব্দের ভেতরে কত কিছু আছে। অনুমতি আছে: "যা।" ভালোবাসা আছে: "বাবা।" দোয়া আছে: "ভালো থাকিস।" আর একটা অব্যক্ত কথা আছে যেটা বাবা বলেননি: "আমি পারিনি, তুই পারবি।"

আরিফ গেটের ভেতরে ঢুকে গেল। ব্যাকপ্যাক কাঁধে। একবার পেছনে তাকাল। হাত নাড়ল। তারপর ভিড়ে মিশে গেল।

মা কাঁদছিলেন।

বাবা দাঁড়িয়ে ছিলেন। একই জায়গায়। চোখ শুকনো।

হাত কাঁপছিল।

১২

আরিফ পরে ভিডিও কলে বলেছিল, "ভাই, প্লেনে বসে দেখি, পুরো ফ্লাইটে বাঙালি ছেলে। সবার চোখ লাল।"

সবার চোখ লাল। কারণ সবার পেছনে একজন মা ছিলেন। একজন বাবা ছিলেন। সবাই একই গল্প নিয়ে উড়ছে: আট লাখ টাকা ঋণ, তিন বছরের কন্ট্রাক্ট, মাসে টাকা পাঠানোর ওয়াদা।

আরিফের সিদ্ধান্তটা কি সঠিক ছিল? GPA 4.50। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারত। তিন-চার বছর পড়ে ডিগ্রি পেত। তারপর? হয়তো BCS দিত। হয়তো ব্যাংকে চাকরি পেত। হয়তো প্রাইভেট কোম্পানিতে ঢুকত।

"হয়তো" শব্দটাই সমস্যা। আরিফের বাবা "হয়তো" দিয়ে সংসার চালাতে পারেন না। জাপানে গেলে টাকা আসবে, এটা নিশ্চিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে চাকরি হবে কিনা, অনিশ্চিত।

আরিফ একবার বলেছিল, "আমি দেশে থাকলে কী হতাম? ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করে BCS দিতাম। পাঁচ বছর ধরে দিতাম। তারপর? রাশেদ ভাই-এর মতো। কিচ্ছু না।"

আরিফ রাশেদের গল্প জানে না। কিন্তু সে রাশেদের ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারে। কারণ সে এই দেশে বড় হয়েছে।

১৩

আরিফের বাবার সামনে কী তথ্য ছিল যখন তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

পাশের বাড়ির করিম সৌদিতে গেছে, মাসে ত্রিশ হাজার পাঠায়। মসজিদের ইমাম সাহেবের ছেলে কুয়েতে, বাড়ি পাকা করেছে। বাজারের কাপড়ের দোকানদারের ভাইপো মালয়েশিয়ায়, ভাই এখন SUV চালায়।

পাকা বাড়ি দৃশ্যমান। SUV দৃশ্যমান। মসজিদে দান দৃশ্যমান।

কিন্তু যে ছেলে সৌদিতে গিয়ে পাসপোর্ট জব্দ হয়ে আটকে আছে, সেটা অদৃশ্য। যে ছেলে লিবিয়ায় আটকে আছে, ভূমধ্যসাগর পার হতে পারেনি, সেটা অদৃশ্য।

সাফল্য দৃশ্যমান। ব্যর্থতা নীরব। এটাই availability heuristic। এই কারণেই "বিদেশে যাবো" বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় স্বপ্ন।

১৪

আরিফ এখন জাপানে। ফ্যাক্টরিতে কাজ করছে। বাবার ঋণ শোধ হচ্ছে ধীরে ধীরে। জাপানে কেমন আছে আরিফ? সেটা পরের পর্বে।

আপাতত, একটা ছবি মনে রাখো। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর। লোহার রেলিং। এপাশে পরিবার। ওপাশে একটা ছেলে, ব্যাকপ্যাক কাঁধে।

"যা, বাবা। ভালো থাকিস।"

এই দৃশ্য বাংলাদেশে প্রতিদিন ঘটে। এটা ব্যতিক্রম না। এটা নিয়ম।

---

*অষ্টম অধ্যায়: সাত সমুদ্র তেরো নদী -- AVAILABILITY HEURISTIC। পর্ব ৭১/১০০।*