কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ

বিদেশ একটা শব্দ, কিন্তু বিদেশ হাজার রকম

পর্ব ৭৩ · ৭ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

বিদেশ।

শব্দটা বাংলাদেশে একটা মন্ত্রের মতো কাজ করে। কেউ বলল "আমার ছেলে বিদেশে," ব্যস, আর কিছু বলার দরকার নেই। কোন বিদেশ, কী করে, কেমন আছে, এসব প্রশ্ন কেউ করে না। বিদেশ মানে সফল। বিদেশ মানে টাকা। বিদেশ মানে গর্ব।

কিন্তু সেই ছেলেদের কথা কেউ জিজ্ঞেস করে না। তারা কেমন আছে, কেউ জানতে চায় না। টাকা এসেছে কি না, সেটাই আসল প্রশ্ন। মানুষটা কেমন আছে, সেটা দ্বিতীয়।

আজ রাতে জাহিদের বাড়িতে বিতর্ক। বিষয়: আরিফের ভবিষ্যৎ। আরিফ জাহিদের চাচাতো ভাই। বয়স বাইশ। SSC পাস, HSC দিতে পারেনি। তিন বছর ধরে মোবাইল ফোনের দোকানে কাজ করে। মাসে আট হাজার।

চাচা চান ছেলে বিদেশে যাক। কোন বিদেশ? যেকোনো বিদেশ। আরিফ নিজে কী চায়? কেউ জিজ্ঞেস করেনি।

রাতে জাহিদ আরিফকে ফোন করল।

"তুই কোথায় যেতে চাস?"

"ভাইয়া, আমি তো জানি না কোথায় কী আছে। সবাই বলে সৌদি। কেউ বলে কোরিয়া। আমি কনফিউজড।"

"কনফিউজড হওয়াটা স্বাভাবিক। কারণ সবাই তোকে গন্তব্যের নাম বলছে, কিন্তু পথের কথা বলছে না। বিদেশ একটা শব্দ না। বিদেশ হাজার রকম। কোরিয়া এক জিনিস, সৌদি আরেক, ইতালি আরেক, জার্মানি পুরোই আলাদা।"

"তুই কাল রাতে আমার কাছে আয়। চারটা অপশন দেখাই। চারটা পৃথিবী। চারটা দাম। চারটা ফেরত।"

পরের রাতে আরিফ এলো। জাহিদ নোটপ্যাডে পয়েন্ট গুছিয়ে রেখেছে।

"প্রথমে কোরিয়া। EPS, Employment Permit System। সরকারি চ্যানেল। প্রতি বছর আবেদন পড়ে এক লাখের বেশি, নেয় দশ-বারো হাজার। চান্স দশ পার্সেন্ট।"

"তাহলে তো লটারি।"

"লটারি। কিন্তু পেলে যা পাবি সেটা শোনো। মাসে দেড় থেকে দুই লাখ। ফ্যাক্টরি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি। কাজের ঘণ্টা নির্দিষ্ট। থাকা-খাওয়া কোম্পানি দেয়। খরচ সরকারি চ্যানেলে এক থেকে দেড় লাখ।"

"আর মর্যাদা?"

"কোরিয়ায় আইন আছে, আইন মানা হয়। ছুটি পাবি, বেতন সময়মতো পাবি। পাসপোর্ট জমা রাখে না। এটা বড় কথা। অনেক দেশে পাসপোর্ট জমা রাখে।"

"দশ পার্সেন্ট চান্সে যদি পাস, সবচেয়ে ভালো জায়গায় যাচ্ছিস। নব্বই পার্সেন্ট চান্সে যাচ্ছিসই না।"

"এবার সৌদি। তোর বাবা যেটা চান।"

"সৌদি, UAE, কাতার, কুয়েত। পুরো মধ্যপ্রাচ্য একই সিস্টেমে চলে। কাফালা। মানে স্পনসরশিপ। তোর একজন স্পনসর লাগবে। তোর ভিসা তার নামে। তোর কাজ তার হুকুমে। চাইলেই চাকরি বদলাতে পারবি না। পাসপোর্ট স্পনসর রেখে দেয়।"

আরিফের মুখটা গম্ভীর হলো।

"কাজ বেশিরভাগ কন্সট্রাকশন। রোদে ইট ভাঙা, রড বাঁকানো। তাপমাত্রা পঞ্চাশ ডিগ্রি। আয় মাসে পঞ্চাশ-ষাট হাজার। খরচ বাদে ত্রিশ-চল্লিশ পাঠাতে পারবি।"

"কিন্তু দুলাভাইয়ের ছেলে তো পঞ্চাশ হাজার পাঠায়।"

"পাঠায়। কারণ সে ঠিকমতো খায় না। যত কম খরচ, তত বেশি রেমিটেন্স। এটাই ট্র্যাপ। তুই নিজেকে না খাইয়ে পরিবারকে খাওয়াচ্ছিস। পরিবার ভাবছে তুই ভালো আছিস। তুই ভালো নেই। কিন্তু বলবি না। কারণ বললে মায়ের কষ্ট হবে। তাই হাসি পাঠাস, কান্না রাখিস।"

ঘরে পাখার আওয়াজ।

"যাওয়ার খরচ তিন থেকে পাঁচ লাখ। চার লাখ ধরো। মাসে ত্রিশ হাজার পাঠালে ঋণ শোধ হতে তেরো মাস। সেই তেরো মাস পরিবার জমি ছাড়া, টাকা ছাড়া। আর একাকীত্ব? ছুটির দিনে ছোট ঘরে বসে থাকা। ভিডিও কলে মায়ের মুখ। বাচ্চা হাঁটতে শিখেছে, তুই দেখছিস ফোনে।"

"তিন নম্বর। ইতালি। পাড়ার জামাল ভাইকে চিনিস?"

"চিনি। উনি তো ইতালিতে।"

"জামাল ভাই বারো লাখ টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে গেছেন। লিবিয়া হয়ে। লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পার। নৌকায়।"

আরিফ চুপ।

"বারো লাখ। এটা শুধু টাকার হিসাব। প্রাণের হিসাব আলাদা। ভূমধ্যসাগরে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। নৌকা ডোবে। ইঞ্জিন বন্ধ হয়। খাবার-পানি শেষ। জামাল ভাই বেঁচে গেছেন। সবাই বেঁচে যায় না।"

"কিন্তু জামাল ভাই তো ভালো আছেন।"

"ভালো আছেন? পাঁচ বছর ইতালিতে। কাগজপত্র নেই। আনডকুমেন্টেড। রেস্টুরেন্টে কাজ, কৃষিতে কাজ। ন্যূনতম মজুরির নিচে বেতন। অভিযোগ করলে ধরা পড়বেন, দেশে পাঠিয়ে দেবে। তাই চুপ করে সহ্য করেন।"

"মাসে ত্রিশ-চল্লিশ হাজার পাঠান। সৌদির সমান। কিন্তু খরচ বারো লাখ, সৌদির তিনগুণ। ঋণ শোধে তিন বছর। আর ঝুঁকি? সৌদিতে খারাপ হলে মার খাবি। ইতালির পথে খারাপ হলে মরবি।"

আরিফ উঠে দাঁড়াল। ঘরের মধ্যে হাঁটল। আবার বসল।

"চতুর্থটা কী?"

"জার্মানি। Ausbildung। জার্মান শব্দ, মানে প্রশিক্ষণ। সেখানে গিয়ে কাজ শিখবি আর কাজ করবি একসাথে। দুই-তিন বছরের প্রোগ্রাম। বেতন পাবি, সার্টিফিকেটও পাবি। শেষে জার্মানিতে থাকতে পারবি।"

"শুনতে তো ভালো।"

"শুনতে ভালো। শর্ত আছে। প্রথম শর্ত: জার্মান ভাষা। B1 লেভেল। মানে তুই জার্মান ভাষায় কথা বলতে পারবি, বুঝতে পারবি, লেখালেখি করতে পারবি। শিখতে দেড় বছর। প্রতিদিন তিন-চার ঘণ্টা।"

"দেড় বছর?"

"হ্যাঁ। খরচ সব মিলিয়ে দুই-আড়াই লাখ। সৌদির চেয়ে কম, ইতালির চেয়ে অনেক কম। কিন্তু তুই কি দেড় বছর ধৈর্য ধরে ভাষা শিখতে পারবি? B1 পরীক্ষায় ফেল করলে সব শেষ।"

"আর জার্মানি ঠান্ডা। মাইনাস দশ, মাইনাস পনেরো। একা। ভাষা পুরো পারিস না। মানুষ তোকে বুঝবে না, তুই মানুষকে বুঝবি না। প্রথম ছয় মাস শুধু টিকে থাকা।"

জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করল।

"চারটা অপশন শুনলি। কোরিয়া: সবচেয়ে ভালো, চান্স দশে একভাগ। সৌদি: সহজে যাওয়া যায়, কাফালা, গরম, মর্যাদা কম। ইতালি: বারো লাখ, জীবনের ঝুঁকি, কাগজ নেই। জার্মানি: সবচেয়ে সম্মানজনক, দেড় বছর প্রস্তুতি।"

আরিফ বলল, "কোনটাতে টাকাও আছে, সম্মানও আছে?"

জাহিদ চুপ থাকল। তারপর বলল।

"কোনো বিদেশে সম্মান আছে। কোনো বিদেশে শুধু টাকা আছে। কোনো বিদেশে দুটোই নেই।"

"দুটোই আছে, এমন জায়গাও আছে। কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে সময় লাগে, শ্রম লাগে, ধৈর্য লাগে। শর্টকাট নেই।"

পরদিন আরিফ ফোন করল। "আমি জার্মানির জন্য চেষ্টা করতে চাই।"

জাহিদ অবাক হলো না। কিন্তু জানে, আসল যুদ্ধ এখন।

"তোর বাবা রাজি হবেন?"

"আপনি বুঝান।"

সন্ধ্যায় চাচার বাড়ি। চাচা বারান্দায় পান খাচ্ছেন।

"চাচা, আরিফ জার্মানি যেতে চায়। সরকারি পথে। কাগজপত্র থাকবে। খরচ দুই-আড়াই লাখ, সৌদির চেয়ে কম।"

"কত সময়?"

"দেড় থেকে দুই বছর প্রস্তুতি।"

চাচার মুখ বদলাল। "দুই বছর? সৌদি গেলে ততদিনে আট-দশ লাখ পাঠাত।"

"সৌদিতে প্রথম বছর ঋণ শোধ। টাকা আসবে দ্বিতীয় বছর থেকে। আর পাঁচ বছর পর? সৌদি থেকে ফিরলে হাতে একটা পাকা ঘর। জার্মানি থেকে ফিরলে হাতে সার্টিফিকেট, স্কিল, ভাষা। সে চাইলে সেখানে থাকতে পারবে, চাইলে দেশে ফিরে আরো ভালো কিছু করতে পারবে।"

চাচা চুপ। চাচি বললেন, "দুই বছর কোনো টাকা আসবে না?"

"আসবে না।"

চাচা উঠে ভেতরে গেলেন। আরিফ বারান্দার কোণায় দাঁড়িয়ে। কিছু বলেনি।

সিদ্ধান্ত আজ হবে না। এই সিদ্ধান্ত পান চিবিয়ে হয় না। রাতের পর রাত ভেবে হয়।

বাড়ি ফেরার পথে জাহিদ ভাবল।

বিদেশ নিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা তথ্যের অভাব। দালাল বলে এক কথা, প্রবাসী বলে আরেক, সরকার বলে তৃতীয়। দালাল ভালো দিকটা বলে, কারণ তার ব্যবসা। প্রবাসী খারাপ দিকটা বলে না, কারণ তার লজ্জা। সরকার সংখ্যা বলে, কিন্তু সংখ্যার পেছনের মানুষটাকে দেখায় না।

সাফল্যের গল্প সবাই বলে। ব্যর্থতার গল্প কেউ বলে না। কারণ ব্যর্থতা লজ্জা। বিদেশ গিয়ে ফিরে আসা লজ্জা। তাই যারা কষ্ট পায় তারা চুপ থাকে। আর যাদের গল্প কেউ জানে না, তারা যেন নেই। ফলে পাড়ার মানুষ শুধু পাকা বাড়ি দেখে, বিকাশের নোটিফিকেশন দেখে। ভাবে, বিদেশ মানে সোনার খনি।

সোনার খনি। যেখানে সোনা আছে, সেখানে খনির অন্ধকারও আছে।

রাস্তায় কয়েকটা ছেলে আড্ডা দিচ্ছে। একজন বলছে, "ভাই, লিবিয়া হয়ে যাব। জামাল ভাই গেছে, আমিও যাব।"

ছেলেটা জানে না লিবিয়া হয়ে যাওয়া মানে কী। জানে না ভূমধ্যসাগর কত চওড়া। জানে না নৌকা কত ছোট। সে জানে শুধু জামাল ভাই ইতালিতে। এটুকু তথ্য নিয়ে জীবন বাজি রাখবে।

কোনো বিদেশে সম্মান আছে। কোনো বিদেশে শুধু টাকা আছে। কোনো বিদেশে দুটোই নেই। কিন্তু কোন বিদেশে কী আছে, সেটা জানার আগেই মানুষ রওনা দিয়ে দেয়। গন্তব্য না জেনে যাত্রা। এটাই বাংলাদেশের প্রবাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।