দালালের ফাঁদ

স্বপ্ন বেচার ব্যবসা, আর তার দাম

পর্ব ৭৪ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

আরিফের গল্পটা জাহিদ আগেই জানত। কিন্তু পুরোটা জানত না।

পুরোটা জানল সেদিন রাতে। ফোনে। আরিফ কোরিয়া থেকে বলছিল, গলায় ক্লান্তি। রাত তিনটা বাজে কোরিয়ায়, কিন্তু আরিফের ঘুম নেই। ওভারটাইম শেষে ফিরেছে। কারখানার গন্ধ এখনো গায়ে লেগে আছে। বলল, "শুনবি? আট লাখ টাকার গল্প?"

জাহিদ বলল, "শুনি।"

আরিফ বলতে শুরু করল।

শুরুটা সবার মতোই। পাড়ার একজন বিদেশ থেকে ফিরেছে। নতুন বাড়ি। নতুন গাড়ি। বাবা-মায়ের চেহারায় গর্ব। মসজিদে সবাই সালাম দেয়। বাজারে সবাই চেনে। ছেলেটা দুই বছর আগে রোগা ছিল, ময়লা শার্ট পরত। এখন ফর্সা হয়ে গেছে (এটা আরিফের কথা, জাহিদ জানে রোদে না থাকলে সবাই ফর্সা হয়), পারফিউম লাগায়।

পাড়ার সবাই দেখল। পাড়ার সব মা দেখল। আরিফের মাও দেখলেন।

মা বললেন, "তোরেও পাঠামু।"

আরিফ তখন HSC পাস করে বসে আছে। ভর্তি পরীক্ষায় কোথাও হয়নি। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ার টাকা নেই। গ্রামে কাজ নেই। শহরে গিয়ে কী করবে জানে না।

বিদেশ মানে সমাধান। বিদেশ মানে সব সমস্যার একটাই উত্তর।

দালাল এল তিন দিন পরে।

দালাল শব্দটা কেউ ব্যবহার করে না। সবাই বলে "এজেন্ট ভাই।" কখনো "আজিজ ভাই", কখনো "সেলিম ভাই", কখনো "রফিক ভাই।" নামটা বদলায়, কিন্তু চরিত্র একই। সবসময় একটা ভালো ফোন। সবসময় একটু মোটা। সবসময় একটু বেশি হাসি। সবসময় একটা গল্প।

আজিজ ভাই এলেন বাড়িতে। চা খেলেন। বাবার সাথে কথা বললেন। মায়ের সাথে কথা বললেন। আরিফকে একটু দেখলেন, যেভাবে পশুর হাটে গরু দেখে।

তারপর বললেন, "কোরিয়া পাঠাতে পারি। খরচ আট লাখ।"

আট লাখ।

আরিফের বাবার মাসিক আয় বারো হাজার টাকা। আট লাখ মানে ছেষট্টি মাসের বেতন। পাঁচ বছর সাত মাস।

কিন্তু আজিজ ভাই হিসাবটা অন্যভাবে দিলেন। "কোরিয়ায় গেলে মাসে দেড় লাখ আয় করবে। এক লাখ পাঠাবে। আট মাসে টাকা উঠে যাবে। বাকি সব লাভ।"

আট মাস। সংখ্যাটা ছোট। গণিতটা সহজ। আরিফের বাবা বুঝলেন। মা বুঝলেন। আরিফ বুঝল।

কেউ জিজ্ঞেস করল না: সরকারি EPS-এ গেলে খরচ কত? কেউ জিজ্ঞেস করল না: আট লাখের মধ্যে কত টাকা আসলে ভিসার খরচ আর কত দালালের লাভ? কেউ জিজ্ঞেস করল না: যদি ভিসা না আসে?

কেউ জিজ্ঞেস করল না। কারণ আজিজ ভাই হাসছিলেন। হাসি দেখলে মানুষ প্রশ্ন ভুলে যায়।

টাকা জোগাড় হলো এভাবে:

বাবার দেড় বিঘা জমি ছিল। পৈতৃক। বিক্রি করলেন চার লাখে। বাজারদর ছয় লাখ, কিন্তু তাড়াহুড়োয় বিক্রি করলে দাম কমে। ক্রেতা জানে বিক্রেতা মরিয়া।

মা গয়না দিলেন। বিয়ের গয়না। তিন ভরি। দেড় লাখ।

বাকি আড়াই লাখ ধার। মামার কাছ থেকে এক লাখ, সুদ বিশ শতাংশ বছরে। পাড়ার মহাজনের কাছ থেকে দেড় লাখ, সুদ ত্রিশ শতাংশ।

জাহিদ ফোনে শুনতে শুনতে হিসাব করছিল। আড়াই লাখ ধার, গড় সুদ পঁচিশ শতাংশ। প্রতি বছর সুদ বাষট্টি হাজার পাঁচশো। যতদিন আসল শোধ না হয়, সুদ চলবে।

আরিফ কোরিয়া যেতে পেরেছিল। অনেকে পারে না।

অনেকে পারে না।

জাহিদ এই কথাটা বলল। আরিফ চুপ হয়ে গেল। তারপর বলল, "আমি জানি। আমার সাথে আরো তিনজন ছিল। একই দালাল।"

প্রথমজন ফয়সাল। সাত লাখ দিয়েছিল। ভিসা আসেনি। আজিজ ভাই বললেন, "একটু দেরি হবে, তিন মাস।" তিন মাস হলো ছয় মাস। ছয় মাস হলো এক বছর। এক বছর পর আজিজ ভাই ফোন ধরা বন্ধ করলেন। ফয়সালের বাবা থানায় গেলেন। থানায় বললেন, "টাকা দিয়েছিলাম, রশিদ নেই।" রশিদ নেই মানে প্রমাণ নেই। প্রমাণ নেই মানে মামলা নেই। মামলা নেই মানে বিচার নেই।

সাত লাখ টাকা। জমি গেছে। ঋণ আছে। ভিসা নেই। ছেলে গ্রামে বসে আছে। বাবার মুখে কথা নেই।

দ্বিতীয়জন রাজু। ভিসা এসেছিল। কিন্তু কোরিয়ার না। মালয়েশিয়ার। আজিজ ভাই বললেন, "কোরিয়ার ভিসায় সমস্যা হয়েছে, মালয়েশিয়া নাও। একই জিনিস।" একই জিনিস না। কোরিয়ায় মাসে এক লাখ আয় হয়, মালয়েশিয়ায় চল্লিশ হাজার। রাজু মালয়েশিয়া গেল। তিন বছরে মোট দেশে পাঠাতে পেরেছে সাড়ে তিন লাখ। বিনিয়োগ ছিল আট লাখ। ঘাটতি সাড়ে চার লাখ। সুদ আলাদা।

তৃতীয়জন সোহেল। সোহেলের গল্পটা সবচেয়ে খারাপ।

সোহেলের গল্পটা আরিফ বলতে চাইছিল না। কিন্তু বলল।

সোহেলকে বলা হয়েছিল ইতালি। ইতালি মানে ইউরোপ। ইউরোপ মানে সোনার দেশ। আট লাখ না, দশ লাখ। বাবা জমি বিক্রি করলেন, মা গয়না দিলেন, বড় ভাই গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাবার সাথে মিলে সবকিছু জোগাড় করলেন। পুরো পরিবার একটা ছেলের পেছনে সবকিছু ঢাললো।

সোহেল ঢাকায় এল। এজেন্ট তাকে একটা ফ্ল্যাটে রাখল। ফ্ল্যাটে আরো পনেরোজন। সবাই অপেক্ষায়। কেউ তিন সপ্তাহ, কেউ দুই মাস। খাওয়া-দাওয়া নিজের খরচে। প্রতিদিন খরচ দুইশো-তিনশো টাকা। কেউ প্রশ্ন করলে এজেন্ট বলে, "ধৈর্য ধরো, কাগজপত্র হচ্ছে।"

দুই মাস পর সোহেলকে বলা হলো, "চলো, ফ্লাইট।" রাতের ফ্লাইট। ঢাকা থেকে দুবাই। দুবাই থেকে কায়রো। কায়রো থেকে কোথায়? সোহেল জানত না।

কায়রো এয়ারপোর্টে একজন লোক নিয়ে গেল। গাড়িতে। সারা রাত গাড়ি চলল। সকালে সোহেল দেখল সে মরুভূমিতে। ইতালি না। লিবিয়া।

লিবিয়ায় সোহেল আটকে গেল। ছয় মাস। একটা গুদামঘরে। চল্লিশজন মানুষ। খাবার দিনে একবার। টয়লেট একটা। পানি কম। ফোন নেই। পালানোর উপায় নেই।

পরিবার থেকে আরো টাকা চাওয়া হলো। "তিন লাখ দাও, ছেলেকে ছেড়ে দেব।" বড় ভাই গ্রামে গিয়ে আবার ধার করল। তিন লাখ পাঠাল।

সোহেল শেষ পর্যন্ত ফিরে এসেছে। দেড় বছর পর। ইতালি যায়নি। কোথাও যায়নি। দশ লাখ টাকা গেছে। স্বাস্থ্য গেছে। ঘুম গেছে। রাতে চিৎকার করে ওঠে।

আরিফ বলল, "সোহেলের সাথে আমি গত ঈদে দেখা করেছিলাম। চিনতে পারিনি।"

জাহিদ ফোন রেখে অনেকক্ষণ বসে ছিল।

তারপর ল্যাপটপ খুলল। হিসাব করতে শুরু করল।

সরকারি EPS (Employment Permit System) দিয়ে কোরিয়া যেতে খরচ কত? সরকারি ওয়েবসাইটে লেখা আছে: ভাষা পরীক্ষার ফি, মেডিকেল, ট্রেনিং, ভিসা, বিমানের টিকিট, সব মিলিয়ে আড়াই থেকে তিন লাখ। বলা যাক তিন লাখ।

আরিফ দিয়েছে আট লাখ। পার্থক্য পাঁচ লাখ। এই পাঁচ লাখ কোথায় গেছে?

দালালের পকেটে।

আজিজ ভাই-এর পকেটে। আজিজ ভাই-এর উপরের আরেক ভাই-এর পকেটে। আর তার উপরের আরেক ভাই-এর পকেটে। একটা শিকল। প্রতিটা গিঁটে একজন দালাল। প্রতিটা গিঁটে একটু করে টাকা কাটে। শেষ পর্যন্ত তিন লাখের কাজ আট লাখে হয়।

মধ্যপ্রাচ্যে আরো খারাপ। সৌদি আরবে যেতে সরকারি খরচ দেড়-দুই লাখ। দালালের মাধ্যমে ছয়-সাত লাখ। পার্থক্য চার-পাঁচ লাখ। ইতালি বা অন্য ইউরোপে দালাল দশ-পনেরো লাখ নেয়। আসল খরচের তিন-চার গুণ।

জাহিদ সংখ্যাগুলো নোট করল। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ছয়-সাত লাখ মানুষ বিদেশে যায়। গড়ে প্রত্যেকে দালালকে অতিরিক্ত তিন-চার লাখ দেয়। ছয় লাখ গুণ তিন লাখ। আঠারো হাজার কোটি টাকা।

আঠারো হাজার কোটি। প্রতি বছর। শুধু দালালের লাভ।

কিন্তু টাকার হিসাব পুরো ছবি না।

পুরো ছবিটা হলো: একটা পরিবার তাদের সবকিছু বাজি রেখেছে একটা ছেলের উপর। জমি গেছে, গয়না গেছে, ঋণ এসেছে। সুদ চলছে। প্রতি মাসে।

যদি ছেলে বিদেশে গিয়ে টাকা পাঠায়, ঋণ শোধ হয়। তিন-চার বছর লাগে। তার মানে তিন-চার বছর ছেলে শুধু ঋণ শোধ করছে। নিজের জন্য কিছু জমাচ্ছে না। পরিবারের উন্নতি হচ্ছে না। শুধু যেখানে ছিল সেখানে ফিরে আসছে। পুরো তিন-চার বছর শূন্য।

যদি ছেলে না যেতে পারে? ফয়সালের মতো? তাহলে ঋণ আছে, আয় নেই। সুদ বাড়ছে। বিশ-ত্রিশ শতাংশ সুদে আড়াই লাখ এক বছরে হয় তিন লাখ, দুই বছরে সাড়ে তিন লাখ। চক্রবৃদ্ধি সুদ। গ্রামের মহাজন জানে না চক্রবৃদ্ধি শব্দটা, কিন্তু চর্চাটা জানে।

জমি গেছে। ঋণ বাড়ছে। ছেলে বেকার। বাবা ভেঙে পড়েছে। মা চুপ।

এটা একটা পরিবারের কথা। প্রতি বছর হাজার হাজার পরিবারের এই অবস্থা।

জাহিদ আরিফের সাথে একটা হিসাব করল। সরাসরি। দুজনের জীবন পাশাপাশি রাখল।

আরিফ: মোট বিনিয়োগ আট লাখ টাকা। কোরিয়ায় মাসিক আয় দেড় লাখ। থাকা-খাওয়া, ঘর ভাড়া, যাতায়াত বাদে হাতে থাকে আশি-নব্বই হাজার। দেশে পাঠায় সত্তর হাজার। নিজের জন্য রাখে দশ-কুড়ি হাজার। ডলারে হিসাব করলে মাসে নেট আয় প্রায় এক হাজার ডলার।

কিন্তু। আট লাখের ঋণ শোধ করতে লেগেছে প্রায় দুই বছর (সুদসহ প্রায় দশ লাখ হয়ে গেছে)। মানে প্রথম দুই বছর আরিফ কিছুই জমাতে পারেনি। শুধু ঋণ শোধ করেছে। তৃতীয় বছর থেকে আসল সঞ্চয় শুরু।

আর আরিফের জীবন? একটা ছোট ঘর। একা। ভাষা জানে না ভালোভাবে। বন্ধু নেই। পরিবার হাজার মাইল দূরে। ছুটি বছরে একবার, দশ দিন। বাবা-মা বুড়ো হচ্ছে, দেখতে পাচ্ছে না। প্রবাসী জীবনের একটা দাম আছে যেটা টাকায় মাপা যায় না।

জাহিদ: মোট বিনিয়োগ সত্তর হাজার টাকা। এটা ছয় বছরে। কোর্স, ইন্টারনেট, একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড ল্যাপটপ। ব্যস। কোনো ঋণ নেই। কোনো জমি বিক্রি নেই। বাবার কাছে পাঁচ হাজার ধার নিয়েছিল একবার, তিন মাসে ফেরত দিয়েছে।

মাসিক আয় এখন দেড় লাখের বেশি (ক্লায়েন্ট বাড়ছে)। ডলারে প্রায় পনেরোশো। কোনো থাকার খরচ নেই, বাবা-মায়ের বাড়ি। খাওয়ার খরচ কম, মফস্বল। হাতে থাকে মাসে এক লাখের বেশি।

আর জাহিদের জীবন? বাবা-মায়ের সাথে থাকে। বন্ধুদের কাছে। নিজের শহরে। সন্ধ্যায় কাদের চাচার দোকানে চা খায়।

১০

দুটো সংখ্যা পাশাপাশি।

আরিফ: আট লাখ বিনিয়োগ। মাসে এক হাজার ডলার নেট। প্রবাসে। জাহিদ: সত্তর হাজার বিনিয়োগ। মাসে পনেরোশো ডলার নেট। নিজের বাড়িতে।

বিনিয়োগের পার্থক্য: এগারো গুণ। আরিফ এগারো গুণ বেশি খরচ করেছে। আয়ের পার্থক্য: জাহিদ দেড় গুণ বেশি আয় করে। ঘরে বসে।

জাহিদ বলছে না যে সে জিতেছে। জাহিদ বলছে না যে আরিফ হেরেছে। প্রতিটা মানুষের পরিস্থিতি আলাদা। আরিফের কাছে ২০১৮ সালে যে তথ্য ছিল, সেটা দিয়ে সে সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

কিন্তু তথ্যটাই ভুল ছিল। তথ্য দিয়েছিল আজিজ ভাই। আজিজ ভাই-এর তথ্যে শুধু সাফল্যের গল্প ছিল। ব্যর্থতার গল্প ছিল না। খরচের পুরো হিসাব ছিল না। ঝুঁকির কথা ছিল না। বিকল্প পথের কথা ছিল না।

আজিজ ভাই স্বপ্ন বেচেন। স্বপ্নের দাম আট লাখ।

১১

জাহিদ একটা কথা ভাবল সেই রাতে।

দালাল বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল ব্যবসায়ী। সে স্বপ্ন বেচে।

পণ্যটা দেখা যায় না। ধরা যায় না। মাপা যায় না। রশিদ নেই। গ্যারান্টি নেই। রিফান্ড নেই। কিন্তু ক্রেতার অভাব নেই। কারণ স্বপ্নের চাহিদা সবসময় থাকে। যে দেশে কাজ নেই, যে দেশে বেতন কম, যে দেশে সম্মান নেই, সে দেশে স্বপ্ন সবচেয়ে দামি পণ্য।

দালাল এটা বোঝে। দালাল জানে কখন আসতে হয়। HSC-র রেজাল্টের পর। ভর্তি পরীক্ষায় না হওয়ার পর। বিয়ের আগে। ঈদের আগে। যখন মানুষের মনে হতাশা থাকে, তখন দালাল আসে। হাসি মুখে। চায়ের কাপ হাতে। গল্প মুখে।

গল্পটা সবসময় একই। "অমুকের ছেলে গেছে, এখন গাড়ি চালায়।" "তমুকের ভাই পাঠায় মাসে দুই লাখ।" "ওই বাড়ির ছেলে তিন তলা মারল।"

গল্পে শুধু সাফল্য। ব্যর্থতা নেই। ফয়সাল নেই। রাজু নেই। সোহেল নেই।

এটাকে মনোবিজ্ঞানে বলে availability heuristic। মানুষ সেটাই বিশ্বাস করে যেটা সে সহজে মনে করতে পারে। পাড়ায় একটা বাড়ি পাকা হয়েছে, সেটা সবাই দেখে। পাড়ায় তিনটা পরিবার ঋণে ডুবে আছে, সেটা কেউ দেখে না। কারণ সাফল্য জোরে কথা বলে। ব্যর্থতা চুপচাপ থাকে।

১২

আরিফকে জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "তুই কি আবার যেতি, সব জেনেও?"

আরিফ অনেকক্ষণ চুপ ছিল। তারপর বলল, "আমি জানি না। হয়তো যেতাম। কারণ গ্রামে বসে থাকার চেয়ে খারাপ কিছু নেই। অন্তত এখানে কাজ আছে। টাকা আছে। একটা উদ্দেশ্য আছে।"

"কিন্তু আট লাখ দিতাম না। তিন লাখে EPS দিয়ে আসতাম। বাকি পাঁচ লাখ বাবার জমিতে থাকত।"

একটু থেমে বলল, "জমিটার কথা ভাবলে রাতে ঘুম আসে না।"

জাহিদ কিছু বলল না। কিছু বলার ছিল না।

১৩

পরদিন সকালে জাহিদ অফিসে বসে ভাবছিল।

সে কোড লিখতে পারে। একটা ওয়েবসাইট বানাতে পারে। একটা অ্যাপ বানাতে পারে। কিন্তু দালালের সিস্টেম ভাঙতে পারে না। নীতি বানাতে পারে না। আইন করতে পারে না।

সে যেটা পারে সেটা হলো তথ্য দেওয়া। সঠিক তথ্য। পুরো তথ্য। শুধু সাফল্যের গল্প না, ব্যর্থতার গল্পও। শুধু আয়ের হিসাব না, খরচের পুরো হিসাব। শুধু গন্তব্যের কথা না, পথের ঝুঁকির কথাও।

দালালের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তথ্যের অসমতা। দালাল জানে, ক্রেতা জানে না। দালাল জানে আসল খরচ তিন লাখ, ক্রেতা জানে না। দালাল জানে ভিসা নাও আসতে পারে, ক্রেতা জানে না। দালাল জানে ইতালির বদলে লিবিয়া হতে পারে, ক্রেতা জানে না।

তথ্য দিলে দালালের ব্যবসা কমবে? হয়তো। হয়তো না। কিন্তু অন্তত একটা পরিবার জমি বিক্রির আগে একবার ভাববে। একটা মা গয়না দেওয়ার আগে একবার জিজ্ঞেস করবে। একটা ছেলে আজিজ ভাই-এর হাসি দেখে সবকিছু বিশ্বাস করবে না।

এটুকুই যথেষ্ট। একটা প্রশ্ন। একটা "সত্যিই কি?"

দালালের সবচেয়ে বড় শত্রু প্রশ্ন।