রেমিটেন্সের গণিত

আরিফের তিন বছরের হিসাব কষলে দেখা যায়, প্রবাসীর জীবন একটা পারিবারিক ভর্তুকি ব্যবস্থা।

পর্ব ৭৬ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

আরিফ চলে গেল।

কোরিয়ার ভিসা পকেটে। এবার EPS, দালালের মাধ্যমে না। সরকারি প্রক্রিয়া। খরচ হয়েছে লাখ দুয়েক। জাপানে তিন বছর খেটে যা শিখেছে, তার সবটুকু নিয়ে গেছে। ভাষা, কাজের ধরন, বিদেশে টিকে থাকার কৌশল।

বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আরিফের মা কাঁদছিলেন। বাবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। বোনটা, যাকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে আরিফের টাকায়, সে স্বামীর বাড়ি থেকে ভিডিও কলে কাঁদল।

জাহিদ এয়ারপোর্টে গিয়েছিল বিদায় দিতে। শেষ মুহূর্তে আরিফ বলল, "ভাই, এইবার আর তিন বছর না। পাঁচ বছরের প্ল্যান। পাঁচ বছর পর দেশে এসে একটা ব্যবসা করব।"

জাহিদ মাথা নাড়ল। কিন্তু মনে মনে ভাবল, তিন বছর আগেও আরিফ বলেছিল "তিন বছর পর ফিরব।" ফিরেছে। দুই সপ্তাহের জন্য। তারপর আবার চলে গেল।

প্রবাসী শ্রমিকের "ফেরা" একটা কমা, ফুলস্টপ না।

আরিফ চলে যাওয়ার পর জাহিদ একটা অদ্ভুত কাজ করল।

সে হিসাব করল। আরিফের তিন বছরের পুরো হিসাব।

আরিফ জাপানে মাসে আয় করত প্রায় ৮০ হাজার টাকা বাংলাদেশি মুদ্রায়। কোনো মাসে বেশি, কোনো মাসে কম, ওভারটাইমের ওপর নির্ভর করত। কিন্তু গড়ে ৮০ হাজার ধরলে খুব একটা ভুল হবে না।

এর মধ্যে সে দেশে পাঠাত মাসে ৩০ হাজার টাকা। প্রতি মাসে। তিন বছর। একটা মাসও মিস হয়নি।

জাহিদ ক্যালকুলেটর বের করল।

৩০,০০০ গুণ ৩৬ মাস = ১০,৮০,০০০ টাকা।

দশ লাখ আশি হাজার টাকা তিন বছরে দেশে পাঠিয়েছে আরিফ।

এই টাকাটা কোথায় গেছে?

জাহিদ আরিফকে জিজ্ঞেস করেছিল ফেরার পর। আরিফ হিসাব দিয়েছিল, খুব সোজা করে।

বোনের বিয়ে: ৩ লাখ টাকা।

যৌতুক না, কিন্তু বিয়ের খরচ। গয়না, কাপড়, আসবাবপত্র, দাওয়াত। গ্রামে বিয়ে মানে পুরো পাড়াকে খাওয়ানো। আরিফের বাবা বলেছিলেন, "কম করলে লোকে কথা বলবে।" আরিফ জাপান থেকে টাকা পাঠিয়েছিল, আর লোকে কথা বলেনি।

ঘর মেরামত: ২ লাখ টাকা।

টিনের চাল বদলানো। দেয়ালে নতুন প্লাস্টার। বাথরুম ঠিক করা। বাবা বলেছিলেন, "বর্ষায় চাল দিয়ে পানি পড়ে।" আরিফ টাকা পাঠিয়েছিল, চাল বদলানো হয়েছিল। পরের বর্ষায় পানি পড়েনি।

ভাইয়ের কোচিং: ১ লাখ টাকা।

ছোট ভাই HSC দিচ্ছে। কোচিং সেন্টারের ফি, বই, গাইড, মডেল টেস্ট। আরিফ প্রতি মাসে আলাদা করে তিন হাজার টাকা পাঠাত শুধু ভাইয়ের পড়াশোনার জন্য।

বাবা-মায়ের দৈনন্দিন খরচ: ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

বাকি সব। বাজার, ওষুধ, বিদ্যুৎ বিল, মোবাইল রিচার্জ, মসজিদে দান, আত্মীয়দের ধার, অসুখ-বিসুখ। মাসে গড়ে সাড়ে তেরো হাজার টাকা। বড় অঙ্ক না। কিন্তু তিন বছর ধরে চলেছে, থামেনি।

মোট: ১০ লাখ ৮০ হাজার।

পুরো টাকাটা খরচ হয়ে গেছে। এক পয়সাও জমা হয়নি এই টাকা থেকে। কারণ এই টাকা আরিফের ছিল না। এই টাকা পরিবারের ছিল।

এবার অন্য দিকটা।

আরিফ জাপানে নিজে রেখেছিল মাসে ৫০ হাজার টাকা। ৮০ হাজার আয়, ৩০ হাজার দেশে পাঠানো, বাকি ৫০ হাজার।

কিন্তু এই ৫০ হাজারের পুরোটা সেভিংস না। জাপানে থাকা-খাওয়া আছে। কোম্পানি ডরমিটরি দিলেও কিছু খরচ আছে। খাবার, যাতায়াত, ফোন, মাঝে মাঝে একটু ঘুরতে যাওয়া। মাসে ২০-২৫ হাজার খরচ হতো।

তাহলে সেভিংস মাসে ২৫-৩০ হাজার।

তিন বছরে জমেছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা।

শুনতে ভালো লাগে। ১৫ লাখ টাকা।

কিন্তু।

জাপানে যেতে দালালকে দিয়েছিল ৮ লাখ টাকা।

১৫ লাখ বিয়োগ ৮ লাখ = ৭ লাখ টাকা।

তিন বছরের নিট ব্যক্তিগত সঞ্চয়: ৭ লাখ টাকা।

জাহিদ সংখ্যাটা আরেকবার দেখল।

৭ লাখ। ৩৬ মাস।

৭,০০,০০০ ভাগ ৩৬ = ১৯,৪৪৪ টাকা।

মাসে উনিশ হাজার টাকা।

তিন বছর বিদেশে থেকে, বারো ঘণ্টা শিফট করে, পরিবার ছেড়ে, ভাষা না জেনে, একাকীত্ব সহ্য করে, জাপানের শীত আর গরম সহ্য করে, ঈদে বাড়ি না গিয়ে, মায়ের অসুখে পাশে না থেকে, বোনের বিয়েতে ভিডিও কলে দেখে, বাবার বুকের ব্যথার খবর ফোনে শুনে, আরিফ নিজের জন্য জমিয়েছে মাসে উনিশ হাজার টাকা।

ঢাকায় একজন ব্যাংক অফিসারের শুরুর বেতন ২২-২৫ হাজার টাকা।

আরিফ তিন বছর নির্বাসনে কাটিয়ে একজন ব্যাংক অফিসারের চেয়ে কম সঞ্চয় করেছে। ব্যাংক অফিসার প্রতিদিন বাড়ি ফেরে। মায়ের রান্না খায়। শুক্রবারে ছুটি পায়।

সংখ্যাগুলো নিষ্ঠুর। কিন্তু সংখ্যা মিথ্যা বলে না।

জাহিদ ভাবল, শুধু আরিফ না। পুরো বাংলাদেশের ছবিটা কেমন?

সে ল্যাপটপ খুলে একটু খোঁজ করল।

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিটেন্স আসে। গার্মেন্টস রপ্তানির পর এটা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক আয়ের উৎস। কোনো কোনো বছর প্রথম।

এক কোটির বেশি বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করে। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা। প্রত্যেকে মাসে গড়ে ১৫০ থেকে ৫০০ ডলার পাঠায়।

এই টাকা কোথায় যায়?

পরিবারের খাবার। ছেলেমেয়ের পড়াশোনা। বাড়ি মেরামত। বিয়ের খরচ। চিকিৎসা। জমি কেনা। আর দালালের ঋণ শোধ।

জাহিদ একটা জিনিস লক্ষ করল। এই টাকার বেশিরভাগটাই ভোগ্য খরচ। বিনিয়োগ না। মানে, এই টাকা পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু পরিবারকে এগিয়ে নিয়ে যায় না।

আরিফের বোনের বিয়ে হয়েছে। ভালো কথা। কিন্তু বিয়ের টাকাটা কোনো উৎপাদনশীল কাজে যায়নি। ঘরের চাল ঠিক হয়েছে। ভালো কথা। কিন্তু চাল ঠিক করা মানে আগের অবস্থায় ফেরা, এগিয়ে যাওয়া না।

রেমিটেন্স একটা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা। উন্নয়ন ব্যবস্থা না।

জাহিদ তখন নিজের হিসাবটা করল।

সে এখন Upwork থেকে মাসে গড়ে ১,৫০০ ডলার আয় করে। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার। কোনো মাসে বেশি, কোনো মাসে কম, কিন্তু গড় এটাই।

এর মধ্যে সে পরিবারকে দেয় প্রায় ৫০০ ডলার, মানে ৬০ হাজার টাকার কাছাকাছি। বাবা-মায়ের খরচ, মিমের পড়াশোনা, বাড়ির খরচ।

বাকি ১,০০০ ডলার তার নিজের।

মাসে ১,০০০ ডলার সঞ্চয়। বাংলাদেশে বসে। নিজের ঘরে। মায়ের রান্না খেয়ে। মিমের সাথে গল্প করে। শুক্রবারে মসজিদে গিয়ে। বিকেলে মাঠে হেঁটে।

আরিফ বিদেশে গিয়ে মাসে ১৯ হাজার টাকা জমায়। জাহিদ দেশে বসে মাসে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা জমায়।

পার্থক্যটা পাঁচ গুণের বেশি।

কিন্তু জাহিদ জানে, এই তুলনাটা অন্যায়। কারণ জাহিদের যা আছে, আরিফের তা নেই। জাহিদের আছে ইন্টারনেটে বিক্রি করার মতো দক্ষতা। ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডিজাইন, কোড। এই দক্ষতা তারের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে। ল্যাপটপ থেকে সার্ভারে, সার্ভার থেকে ক্লায়েন্টের স্ক্রিনে।

আরিফের দক্ষতা? সে মেশিন চালাতে পারে, ওয়েল্ডিং করতে পারে, ভারী জিনিস তুলতে পারে, ফ্যাক্টরির লাইনে দাঁড়িয়ে বারো ঘণ্টা কাজ করতে পারে। এই দক্ষতা তারের মধ্য দিয়ে যায় না। এই দক্ষতা শুধু এয়ারপোর্টের মধ্য দিয়ে যায়।

জাহিদের স্কিল ভ্রমণ করে ইন্টারনেটে। আরিফের স্কিল ভ্রমণ করে পাসপোর্টে।

এটাই মূল পার্থক্য। এটাই একমাত্র পার্থক্য।

জাহিদ আরেকটু বড় করে ভাবল।

বাংলাদেশ থেকে এক কোটি মানুষ বিদেশে কাজ করে। ধরা যাক তাদের গড় আয় মাসে ২০০ ডলার (অনেকে কম পায়, কেউ কেউ বেশি)। তাহলে বছরে মোট রেমিটেন্স: ১ কোটি গুণ ২০০ ডলার গুণ ১২ মাস = ২৪ বিলিয়ন ডলার।

এটা বাস্তবের কাছাকাছি সংখ্যা।

এখন ভাবো অন্যভাবে।

এই এক কোটি মানুষের মধ্যে যদি ১০ শতাংশ, মানে ১০ লাখ মানুষ, ফ্রিল্যান্সিং বা রিমোট কাজ শিখত। আর তারা দেশে বসেই মাসে ৫০০ ডলার আয় করত। তাহলে?

১০ লাখ গুণ ৫০০ ডলার গুণ ১২ মাস = ৬ বিলিয়ন ডলার।

৬ বিলিয়ন ডলার। দেশে বসে। কোনো দালাল নেই। কোনো পাসপোর্ট লাগে না। কোনো ভিসা প্রসেসিং নেই। কোনো এয়ারপোর্টে কান্না নেই।

আর বাকি ৯০ লাখ? তারা বিদেশে যেতেই পারে। কিন্তু অন্তত ১০ লাখ পরিবার ভেঙে যেত না।

জাহিদ জানে, এটা সরল হিসাব। বাস্তবে এত সহজ না। সবাই কোডিং শিখতে পারে না। সবার ইন্টারনেট নেই। সবার ইংরেজি নেই। সবার ল্যাপটপ নেই।

কিন্তু সে এটাও জানে: ১০ লাখ মানুষকে ফ্রিল্যান্সিং শেখানো ১০ লাখ মানুষকে বিদেশে পাঠানোর চেয়ে সস্তা। ফ্রিল্যান্সিং শেখাতে লাগে একটা ল্যাপটপ, ইন্টারনেট, আর ছয় মাসের ট্রেনিং। বিদেশে পাঠাতে লাগে ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা, দুই বছরের কাগজপত্র, আর একটা পরিবারের চোখের জল।

চার্টটা দেখলে বোঝা যায় টাকার প্রবাহটা কেমন।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে সবচেয়ে বেশি আসে। সৌদি আরব, UAE, কুয়েত, কাতার, ওমান, বাহরাইন। এই ছয়টা দেশ মিলিয়ে মোট রেমিটেন্সের প্রায় অর্ধেক।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আসে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান, কোরিয়ার টাকা। ইউরোপ থেকে আসে ইতালি, যুক্তরাজ্যের। উত্তর আমেরিকা থেকে আসে আমেরিকা, কানাডার।

আর এই টাকা ঢুকে যায় কোথায়? পরিবারের খরচে। বাড়িঘরে। শিক্ষায়। কিছুটা সঞ্চয়ে। আর একটা বড় অংশ চলে যায় দালালের খরচে, যেটা আসলে পরবর্তী প্রবাসীকে পাঠানোর বিনিয়োগ।

একটা চক্র। শ্রমিক যায়, টাকা আসে, টাকার একটা অংশ দিয়ে আরেকজন শ্রমিক যায়, সে টাকা পাঠায়, সেই টাকার একটা অংশ দিয়ে আরেকজন...

এই চক্র থামে না। কারণ এই চক্র থেকে বের হওয়ার পথ কেউ দেখায় না।

১০

আরিফ কোরিয়া থেকে প্রথম মাসে ফোন করল।

"ভাই, এখানে আবহাওয়া ভালো। জাপানের মতো এত ঠান্ডা না।"

জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "বেতন কেমন?"

"মাসে ১ লাখ ২০ হাজার বাংলাদেশি টাকার মতো। জাপানের চেয়ে বেশি।"

"দেশে কত পাঠাবি?"

আরিফ একটু চুপ থাকল। তারপর বলল, "৪০ হাজার। ভাইয়ের ভার্সিটির খরচ শুরু হবে।"

জাহিদ মনে মনে হিসাব করল। ১ লাখ ২০ হাজার আয়। ৪০ হাজার দেশে। ৩০ হাজার নিজের খরচ। ৫০ হাজার সেভিংস।

পাঁচ বছরে: ৫০ হাজার গুণ ৬০ মাস = ৩০ লাখ টাকা।

কোরিয়ায় যেতে খরচ হয়েছে ২ লাখ (EPS, সরকারি)।

নিট সঞ্চয়: ২৮ লাখ টাকা।

এবার হিসাবটা ভালো। কারণ দালালের ৮ লাখের বদলে সরকারি প্রক্রিয়ায় ২ লাখ খরচ হয়েছে। আর বেতনও বেশি।

কিন্তু।

পাঁচ বছর। পাঁচটা ঈদ বাড়ি ছাড়া। পাঁচটা বর্ষা মায়ের কাছে ছাড়া। ভাইয়ের ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া দেখতে না পারা। বাবার বয়স বাড়া দেখতে না পারা।

২৮ লাখ টাকার বিনিময়ে।

আরিফ এই দামটা দিতে রাজি। কারণ আরিফের কাছে অন্য কোনো অপশন নেই।

১১

জাহিদ সেদিন রাতে একটা কথা ভাবল যেটা তাকে অনেকক্ষণ জাগিয়ে রাখল।

রেমিটেন্সকে সবাই বলে বাংলাদেশের "লাইফলাইন।" অর্থনীতিবিদরা বলেন, প্রবাসী আয় ছাড়া বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধসে পড়বে। সরকার বলে, প্রবাসীরা "রেমিটেন্স যোদ্ধা।" পত্রিকায় হেডলাইন হয়: "রেমিটেন্সে নতুন রেকর্ড!"

কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করে না: এই রেকর্ড কার রক্তে লেখা?

প্রতিটা ডলারের পেছনে একটা আরিফ আছে। যে ভোর চারটায় উঠে ফ্যাক্টরিতে যায়। যে রাতে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদে। যে ঈদের দিন ফোনে পরিবারের মুখ দেখে, কিন্তু জড়িয়ে ধরতে পারে না। যে দালালের কাছে জমির দলিল রেখে টাকা ধার করেছিল।

রেমিটেন্স বাংলাদেশের রক্তনালী। কিন্তু এই রক্ত বিদেশে গিয়ে তৈরি হয়।

প্রশ্নটা হলো: দেশেই তৈরি করা গেলে?

১২

জাহিদ জানে, সে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। সে একজন ফ্রিল্যান্সার, অর্থনীতিবিদ না। কিন্তু সে একটা জিনিস বোঝে।

সে নিজে প্রমাণ যে দেশে বসে ডলার আয় করা সম্ভব।

আরিফ প্রমাণ যে বিদেশে গিয়ে ডলার আয় করা সম্ভব।

দুটোই সত্য। কিন্তু দুটোর দাম এক না।

জাহিদের দাম: সময়, ধৈর্য, অনিশ্চয়তা, আর ক্লায়েন্টের মেজাজের ওপর নির্ভরশীলতা।

আরিফের দাম: পরিবার, ঘর, দেশ, আর নিজের যৌবনের সেরা বছরগুলো।

জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। রাত গভীর। পাশের ঘর থেকে মিমের শ্বাসের আওয়াজ আসছে। রান্নাঘরে মায়ের রেখে যাওয়া একটা বাতি জ্বলছে।

সব কিছু কাছে। সব কিছু নিজের।

আরিফের ঘরে এখন কে আছে? একটা খালি বিছানা। দেয়ালে আরিফের ছবি। আর আরিফের মা, যিনি প্রতি রাতে সেই ছবির দিকে তাকিয়ে ঘুমান।

১৯ হাজার টাকা। ২৮ লাখ টাকা। ২০ বিলিয়ন ডলার।

সংখ্যাগুলো বড় হতে থাকে। কিন্তু প্রতিটা সংখ্যার পেছনে একটা মানুষ ছোট হতে থাকে।

রেমিটেন্সের গণিতে যোগ-বিয়োগ আছে। কিন্তু মানুষটা কোন কলামে?