স্কলারশিপ খোঁজা
দরজা সবার জন্য খোলে না। কিন্তু জানালা সবার জন্য খোলা।
১
বিদেশে যাওয়ার আরেকটা রাস্তা আছে। পরিষ্কার রাস্তা। দালাল নেই, ভিসা জালিয়াতি নেই, লিবিয়ার মরুভূমি নেই। এই রাস্তার নাম স্কলারশিপ।
সুমাইয়ার মেডিকেল কলেজের জুনিয়র একজন, নাম তানভীর। মেডিকেলে ফাইনাল ইয়ারে। ছেলেটা চতুর্থ বর্ষ থেকেই বিদেশে পড়ার প্ল্যান করছে। জাহিদ তার কথা শুনল সুমাইয়ার কাছ থেকে, একটা সন্ধ্যায়, ফোনে।
সুমাইয়া বলল, "তানভীর DAAD-এ অ্যাপ্লাই করবে। জার্মানি।"
"DAAD কী?"
"Deutscher Akademischer Austauschdienst। জার্মান একাডেমিক এক্সচেঞ্জ সার্ভিস। ফুল ফান্ডেড। টিউশন ফ্রি তো জার্মানিতে আগে থেকেই, এটা তার ওপরে মাসে এক হাজার ইউরোর ওপর স্টাইপেন্ড দেয়।"
জাহিদ হিসাব করল। এক হাজার ইউরো মানে প্রায় এক লাখ বিশ হাজার টাকা। মাসে। শুধু পড়াশোনার জন্য।
"আর Chevening-এও দেখছে," সুমাইয়া যোগ করল। "সেটা UK সরকারের। মাস্টার্সের জন্য। এক বছর। পুরো খরচ দেয়।"
"Fulbright?"
"সেটাও লিস্টে আছে। আমেরিকা। সবচেয়ে প্রেস্টিজিয়াস। কিন্তু সবচেয়ে কঠিনও।"
জাহিদ চুপ করে শুনল। তানভীরের লিস্ট লম্বা। DAAD, Chevening, Fulbright, Commonwealth Scholarship, Erasmus Mundus। পাঁচটা দেশ, পাঁচটা স্কলারশিপ, পাঁচটা স্বপ্ন। একটা পেলেই জীবন বদলে যাবে।
২
কিন্তু স্কলারশিপ পেতে কী লাগে?
জাহিদ একদিন কৌতূহলে Chevening-এর ওয়েবসাইট খুলল। Requirements পড়ল। একটা একটা করে।
IELTS: ন্যূনতম 6.5, তবে ভালো ইউনিভার্সিটিতে 7.0 লাগে। কিছু প্রোগ্রামে 7.5।
Academic record: ফার্স্ট ক্লাস বা সমমান। GPA 3.5+ (4.0 স্কেলে)।
Work experience: কমপক্ষে দুই বছরের পেশাদার অভিজ্ঞতা। Chevening-এর জন্য এটা বাধ্যতামূলক।
Leadership potential: কমিউনিটি ওয়ার্ক, এক্সট্রা-কারিকুলার, ভলান্টিয়ারিং।
Statement of Purpose: কেন তুমি, কেন এই বিষয়, কেন এই দেশ, কেন এখন। তিন-চার পৃষ্ঠার একটা জীবনী যেটা পড়ে কমিটি মনে করবে তোমাকে ছাড়া পৃথিবী অসম্পূর্ণ।
Letters of Recommendation: দুটো বা তিনটা। এমন অধ্যাপকদের কাছ থেকে যারা তোমাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, তোমার কাজ দেখেছেন, তোমার সম্ভাবনায় বিশ্বাস করেন।
Research publications: Fulbright-এর জন্য এটা প্রায় অপরিহার্য। অন্তত একটা পিয়ার-রিভিউড পেপার।
জাহিদ তালিকাটা পড়ে স্ক্রিন বন্ধ করল। তারপর আবার চালু করল। আবার পড়ল। নিশ্চিত হতে চাইল যে সে ঠিকই পড়ছে।
হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছে।
৩
তানভীর এসব পারবে। কারণ তানভীর মেডিকেলে পড়ে। মেডিকেলের ছাত্রদের কাছে রিসার্চের সুযোগ আছে। প্রফেসররা পেপার লেখেন, ছাত্রদের সহ-লেখক হিসেবে নেন। হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স হয়। রেকমেন্ডেশন লেটার দেওয়ার মতো শিক্ষক আছেন যারা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত।
আর তানভীরের পরিবার ঢাকায় থাকে। বাবা ব্যাংক ম্যানেজার। মা স্কুল শিক্ষিকা। বাসায় ইংরেজি বই আছে। ছোটবেলা থেকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েনি, কিন্তু ইংরেজি পরিবেশটা ছিল।
IELTS কোচিংয়ের জন্য তানভীর ঢাকার একটা সেন্টারে ভর্তি হয়েছে। ফি: পঁচিশ হাজার টাকা। দুই মাসের কোর্স। সপ্তাহে তিন দিন।
জাহিদ ভাবল, পঁচিশ হাজার। তার মাসিক আয়ের চেয়ে কম, এখন। Upwork থেকে সে এখন মাসে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার মতো আয় করে। কিন্তু দুই বছর আগে? দুই বছর আগে পঁচিশ হাজার টাকা মানে তিন মাসের খরচ।
আর মফস্বলে IELTS কোচিং সেন্টার কোথায়? ময়মনসিংহে দুয়েকটা আছে। কোয়ালিটি কেমন? বলা মুশকিল। ভালো সেন্টারগুলো ঢাকায়। ব্রিটিশ কাউন্সিলের নিজের কোচিং আছে, সেটা ঢাকায়। IDP-র সেন্টার আছে, সেটাও ঢাকায়।
মফস্বল থেকে IELTS দিতে হলে, প্রথমে ঢাকায় যেতে হবে। থাকতে হবে। কোচিং করতে হবে। তারপর পরীক্ষা দিতে হবে।
৪
IELTS পরীক্ষার ফি: আটাশ হাজার সাতশো টাকা।
একটা পরীক্ষা। তিন ঘণ্টা। চারটা সেকশন। একটা নম্বর।
এই একটা নম্বরের জন্য প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা।
জাহিদ ক্যালকুলেটরে হিসাব করল। পুরো খরচ, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, শুধু আবেদন করার জন্য।
IELTS কোচিং: বিশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা।
IELTS পরীক্ষার ফি: প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা।
ঢাকায় থাকার খরচ (দুই মাস কোচিংয়ের সময়): মাসে দশ হাজার করে বিশ হাজার।
অ্যাপ্লিকেশন ফি: প্রতি ইউনিভার্সিটিতে পঞ্চাশ থেকে একশো ডলার। দশটা ইউনিভার্সিটিতে আবেদন করলে ছয় থেকে বারো হাজার ডলার। না, ছয়শো থেকে বারোশো ডলার। বাংলাদেশি টাকায় সত্তর হাজার থেকে দেড় লাখ।
না, আবার হিসাব করল। পঞ্চাশ ডলার গুণ দশ সমান পাঁচশো ডলার। একশো বিশ টাকা রেটে ষাট হাজার। একশো ডলার গুণ দশ সমান এক হাজার ডলার। একশো বিশ টাকায় এক লাখ বিশ হাজার।
ঠিক আছে, ধরা যাক গড়ে পঁচাত্তর ডলার করে দশটা। সাড়ে সাত হাজার ডলার না, সাতশো পঁচাত্তর ডলার। নব্বই হাজার টাকার কাছাকাছি।
জাহিদ সব যোগ করল।
কোচিং: পঁচিশ হাজার। পরীক্ষা: ত্রিশ হাজার। থাকা-খাওয়া: বিশ হাজার। অ্যাপ্লিকেশন ফি: ষাট থেকে নব্বই হাজার।
মোট: দেড় লাখ টাকা। কম করে।
দেড় লাখ টাকা শুধু আবেদন করার জন্য। স্কলারশিপ পাওয়ার জন্য না। আবেদন করার জন্য। পাওয়ার কোনো গ্যারান্টি নেই।
৫
মফস্বলের একটা পরিবারের পক্ষে দেড় লাখ টাকা বের করা সম্ভব। কিন্তু সহজ না। জাহিদের বাবা মাসে পনেরো হাজার টাকা আয় করেন। দেড় লাখ মানে দশ মাসের আয়। পুরো দশ মাস কিছু না খেয়ে, ভাড়া না দিয়ে, বিদ্যুৎ বিল না দিয়ে, মিমের স্কুলের বেতন না দিয়ে, শুধু জমালে দেড় লাখ হবে।
বাস্তবে, তিন-চার বছর লাগবে এই টাকা জমাতে। যদি সব ঠিক থাকে। কেউ অসুস্থ না হয়। বাড়ি মেরামত না লাগে। কোনো জরুরি খরচ না আসে।
আর তারপরও, পেলে তো পেলে। না পেলে দেড় লাখ শেষ।
তানভীরের বাবা এই টাকাটা দিতে পারবেন। হয়তো একটু কষ্ট হবে, কিন্তু পারবেন। ব্যাংক ম্যানেজারের বেতন পঞ্চাশ-ষাট হাজার। স্ত্রীর আয় আরো পনেরো-বিশ হাজার। দেড় লাখ তাদের কাছে তিন মাসের সেভিংস।
জাহিদের বাবার কাছে দশ মাসের আয়।
একই স্কলারশিপ। একই ফর্ম। একই ওয়েবসাইট। কিন্তু দরজার সামনে দাঁড়ানোর খরচ সমান না।
৬
জাহিদ নিজেও ভেবেছিল। একবার। সংক্ষিপ্তভাবে।
সেটা গত বছরের কথা। Upwork-এ কাজ ভালো চলছে। কিছু টাকা জমেছে। একদিন রাতে ফেসবুকে দেখল, কেউ একজন পোস্ট দিয়েছে: "Alhamdulillah, got fully funded PhD at University of Tokyo. MEXT Scholarship. From National University."
জাহিদ পোস্টটা তিনবার পড়ল। National University। NU। তার মতো।
ছেলেটা তার জেলারই। NU থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স, তারপর মাস্টার্স। CGPA ভালো ছিল, 3.7 কিছু। কিন্তু NU-র 3.7, সেটা কি টোকিও ইউনিভার্সিটির কাছে কিছু মানে রাখে? রেখেছে তো।
MEXT। Ministry of Education, Culture, Sports, Science and Technology। জাপান সরকারের স্কলারশিপ। এটার একটা বিশেষত্ব আছে: এটা এম্বাসি রিকমেন্ডেশন দিয়েও পাওয়া যায়। মানে, ইউনিভার্সিটিতে সরাসরি আবেদন না করে, জাপানি এম্বাসির মাধ্যমে। আর এম্বাসি রিকমেন্ডেশনে অ্যাপ্লিকেশন ফি নেই।
শূন্য টাকা। আবেদন করতে কোনো টাকা লাগে না।
সেটাই ছিল ওই ছেলেটার রাস্তা। IELTS লাগেনি, কারণ জাপানে ইংরেজি ভাষার প্রমাণ সবসময় বাধ্যতামূলক না। জাপানি ভাষা পরে শেখা যায়। একাডেমিক পরীক্ষা নেয় এম্বাসি নিজে। ইন্টারভিউ হয় ঢাকায়।
খরচ? ঢাকায় যাওয়া-আসার ভাড়া। আর একটা পাসপোর্ট বানানোর খরচ। ব্যস।
জাহিদ সেই রাতে MEXT-এর ওয়েবসাইট ঘাঁটল। Requirements পড়ল। Research plan লেখার নমুনা দেখল। ভাবল, আমিও কি পারি?
৭
পরদিন সকালে উঠে ভাবল। ঠান্ডা মাথায়।
সে NU থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স করছে। CGPA খারাপ না, কিন্তু অসাধারণও না। 3.4 এর কাছাকাছি। রিসার্চ পাবলিকেশন নেই। NU-তে রিসার্চের সুযোগ কোথায়? ল্যাব নেই। ফান্ডিং নেই। যে শিক্ষকরা পড়ান তাদের বেশিরভাগের নিজেদের কোনো চলমান গবেষণা নেই।
Statement of Purpose লিখতে হবে। ইংরেজিতে। এমন ইংরেজিতে যেটা পড়ে টোকিও বা বার্লিন বা অক্সফোর্ডের কমিটি মনে করবে, এই ছেলেটা গবেষণা করতে পারবে। জাহিদ ইংরেজি লিখতে পারে। Upwork-এ ক্লায়েন্টদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলে। কিন্তু একাডেমিক ইংরেজি আর ক্লায়েন্ট কমিউনিকেশন এক জিনিস না।
আর IELTS? সেটা যদি দিতে হয়, ত্রিশ হাজার টাকা। প্র্যাকটিস পার্টনার কোথায়? মফস্বলে কে ইংরেজি স্পিকিং প্র্যাকটিস করবে তার সাথে? কলেজের বন্ধুরা? তারা নিজেরাই ইংরেজিতে কথা বলতে পারে না। "How are you, I am fine, thank you" এর বাইরে যেতে পারে না।
জাহিদের মফস্বলের বাসায় ইংরেজি বলার পরিবেশ নেই। বাবা বাংলায় কথা বলেন। মা বাংলায়। মিম ইংরেজি পড়ে স্কুলে, কিন্তু বলে বাংলায়। প্রতিবেশীরা ইংরেজি বলে না। দোকানদার ইংরেজি বলে না। চায়ের দোকানে রাজনীতির আড্ডা হয় বাংলায়।
IELTS স্পিকিং সেকশনে তোমাকে দুই মিনিট কথা বলতে হবে। fluently। কোনো থামাচোড়া ছাড়া। Examiner-এর সামনে বসে। Topic পাবে, এক মিনিট প্রস্তুতি, তারপর বলো।
ঢাকার একটা ছেলে যে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছে, সে এটা করতে পারবে ঘুমের মধ্যেও। মফস্বলের জাহিদকে ছয় মাস প্র্যাকটিস করতে হবে, একা একা, ফোনের সামনে দাঁড়িয়ে, নিজের রেকর্ডিং শুনে, নিজের উচ্চারণ শুধরে।
৮
কিন্তু সেই ছেলেটা পেরেছে তো। NU থেকে। জাহিদের জেলা থেকে। MEXT পেয়ে টোকিওতে গেছে।
জাহিদ ছেলেটাকে ফেসবুকে মেসেজ করল। বলল, ভাই, আমিও NU-তে পদার্থবিজ্ঞানে পড়ি। আপনার পোস্ট দেখলাম। কিছু জানতে চাইলে কি জিজ্ঞেস করতে পারি?
ছেলেটা রিপ্লাই দিল। বিস্তারিত বলল। তিন বছরের গল্প। প্রথমবার আবেদন করে রিজেক্ট হয়েছিল। দ্বিতীয়বার আবার করল। সেবারও এম্বাসি ইন্টারভিউ পর্যন্ত গিয়ে বাদ। তৃতীয়বার, রিসার্চ প্ল্যান পুরো বদলে লিখল। একজন জাপানি প্রফেসর খুঁজে বের করল যিনি ঠিক ওই বিষয়ে কাজ করেন। ইমেইল করল। প্রফেসর রাজি হলেন সুপারভাইজ করতে। তারপর আবেদন।
তিন বছর। তিনবার আবেদন। দুইবার ব্যর্থ। একবার সফল।
ছেলেটা বলল, "MEXT-এর advantage হলো টাকা লাগে না। কিন্তু সময় লাগে। ধৈর্য লাগে। আর সবচেয়ে বেশি লাগে, হেরে যাওয়ার পরও আবার চেষ্টা করার মানসিকতা।"
৯
জাহিদ এই কথাটা ভাবল। তারপর আরেকটা জিনিস ভাবল।
সেই ছেলেটার সাফল্যের পোস্ট সে দেখেছে। ফেসবুকে। "Alhamdulillah, MEXT scholarship!" লাইক পড়েছে তিনশো। কমেন্টে সবাই লিখেছে "Congratulations!", "Proud of you!", "NU-র মুখ উজ্জ্বল করেছ!"
কিন্তু যে দুইবার সে রিজেক্ট হয়েছিল, সেটা কেউ জানে না। সেই দুটো রাত কেউ দেখেনি, যখন সে ইমেইল খুলে "We regret to inform you" পড়ে চুপচাপ স্ক্রিন বন্ধ করেছে। সেই দুটো সপ্তাহ কেউ জানে না, যখন সে ভেবেছে আর করব না, হয়তো আমি যোগ্য না, হয়তো NU থেকে সত্যিই হয় না।
আর সে তো একজন। বাংলাদেশ থেকে MEXT-এ প্রতি বছর কতজন আবেদন করে? পাঁচশো? সাতশো? নেওয়া হয় কতজন? পঞ্চাশ-ষাট। বাকি পাঁচশো-সাড়ে পাঁচশো কোথায় যায়? তারা ফেসবুকে পোস্ট দেয় না। তারা "Alhamdulillah, rejected" লেখে না। তারা চুপ করে থাকে। পরের বছর হয়তো আবার চেষ্টা করে। হয়তো করে না। হয়তো দালালের কাছে যায়। হয়তো বিসিএসের বই কেনে।
এটাই availability heuristic।
সাফল্যের গল্প দৃশ্যমান। ব্যর্থতার গল্প অদৃশ্য। তুমি শুধু দেখো কে পেয়েছে। কে পায়নি, সেটা তোমার চোখে পড়ে না। তাই মনে হয়, স্কলারশিপ পাওয়া খুব সম্ভব। আবেদন করলেই পাবো। ওই ভাইও তো পেয়েছে, NU থেকেই তো, আমি কেন পাব না?
কিন্তু ওই ভাই একজন। আর যারা পায়নি তারা পাঁচশো।
১০
জাহিদ সেদিন রাতে অনেকক্ষণ ভাবল।
সে কি স্কলারশিপের জন্য চেষ্টা করবে? MEXT-এ আবেদন করতে টাকা লাগে না। সময় লাগে। ধৈর্য লাগে। সে কি প্রস্তুত, তিন বছর ধরে চেষ্টা করতে, দুইবার ব্যর্থ হতে, তবু আবার করতে?
হয়তো।
কিন্তু তারপর আরেকটা চিন্তা এলো।
সে এখন কী করছে? Upwork-এ কাজ করছে। আমেরিকার ক্লায়েন্টের ওয়েবসাইট বানাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার একটা স্টার্টআপের ড্যাশবোর্ড ডিজাইন করছে। কানাডার একটা কোম্পানির ডেটা ভিজুয়ালাইজেশন করছে। ডলারে আয় করছে।
সে বাংলাদেশে বসে আমেরিকান রেটে কাজ করছে। বাংলাদেশি খরচে জীবনযাপন করছে। বিদেশে যায়নি। কিন্তু বিদেশের কাজ তার ল্যাপটপে আসে। বিদেশের টাকা তার ব্যাংকে ঢোকে। বিদেশের ক্লায়েন্ট তাকে "great work, Zahid" বলে মেসেজ করে।
সে মাইগ্রেট করেছে। ডিজিটালি। শরীরটা ময়মনসিংহে, কিন্তু কাজটা গ্লোবাল।
আমি বিদেশে যাইনি। বিদেশ আমার কাছে এসেছে।
ইন্টারনেটের মাধ্যমে।
১১
এটা কি একই জিনিস? না। জাহিদ সেটা জানে।
বিদেশে গেলে শুধু টাকা পাওয়া যায় না। একটা পরিবেশ পাওয়া যায়। ল্যাব পাওয়া যায়। লাইব্রেরি পাওয়া যায়। এমন মানুষদের সঙ্গ পাওয়া যায় যারা তোমার বিষয়ে বিশ্বমানের কাজ করছে। কনফারেন্সে যাওয়া যায়। নেটওয়ার্ক তৈরি হয়।
ফ্রিল্যান্সিং সেসব দেয় না। ফ্রিল্যান্সিং দেয় টাকা, স্বাধীনতা, আর দক্ষতা। কিন্তু একটা PhD-র depth দেয় না। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোসিস্টেম দেয় না।
জাহিদ এটা বোঝে।
কিন্তু সে এটাও বোঝে যে, দরজা সবার জন্য খোলে না। স্কলারশিপ একটা দরজা। সেই দরজার সামনে দাঁড়াতে টাকা লাগে, সময় লাগে, সংযোগ লাগে, পরিবেশ লাগে। মফস্বলের একটা ছেলের কাছে এগুলোর বেশিরভাগ নেই।
আর ইন্টারনেট? ইন্টারনেট একটা জানালা। জানালা দরজার মতো বড় না। জানালা দিয়ে পুরো শরীর নিয়ে বের হওয়া যায় না। কিন্তু জানালা দিয়ে আলো আসে। বাতাস আসে। বাইরের পৃথিবী দেখা যায়। আর সবচেয়ে বড় কথা, জানালা সবার জন্য খোলা।
একটা ল্যাপটপ আর একটা ইন্টারনেট কানেকশন। ব্যস।
ঢাকার ছেলে হও, মফস্বলের ছেলে হও, গ্রামের ছেলে হও। ব্যাংক ম্যানেজারের ছেলে হও, রং মিস্ত্রির ছেলে হও। জানালা সবার জন্য একই মাপের।
১২
সুমাইয়াকে এই কথাটা বলল জাহিদ। পরদিন ফোনে।
সুমাইয়া বলল, "কিন্তু তুমি কি স্কলারশিপের চেষ্টা একদম ছেড়ে দিচ্ছ?"
জাহিদ একটু ভাবল। তারপর বলল, "ছেড়ে দিচ্ছি না। তবে এটা আমার একমাত্র পথ না। আমি যদি MEXT-এ আবেদন করি, করব। তিন বছর লাগলে তিন বছর। কিন্তু এই তিন বছর আমি বসে থাকব না। আমি কাজ করব। আয় করব। শিখব। ক্লায়েন্ট বাড়াব।"
"মানে, দুটো পথ একসাথে?"
"হ্যাঁ। দরজায় ধাক্কা দিতে থাকব। কিন্তু জানালাটা বন্ধ করব না।"
সুমাইয়া কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর বলল, "তানভীর কিন্তু পুরো সময় এটার পেছনে দিচ্ছে। সে বলে, one shot, best shot।"
"তানভীরের জন্য সেটা ঠিক। তার পরিবার সাপোর্ট দিতে পারবে। আমার জন্য ঠিক না। আমি যদি সব ছেড়ে দিয়ে শুধু স্কলারশিপের পেছনে ছুটি, আর না পাই, তাহলে আমার হাতে কিছু থাকবে না। না স্কলারশিপ, না ক্লায়েন্ট, না আয়।"
জাহিদ থামল। তারপর যোগ করল, "স্কলারশিপ একটা দরজা। কিন্তু দরজা সবার জন্য খোলে না। ইন্টারনেট একটা জানালা। জানালা সবার জন্য খোলা।"