দেশে vs বিদেশে

টাকার হিসাব সবাই করে। জীবনের হিসাব কেউ করে না।

পর্ব ৭৮ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

আরিফ কোরিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।

EPS-এর মাধ্যমে। লটারি হয়েছে, তার নাম উঠেছে। ভাষা পরীক্ষায় পাশ করেছে। মেডিকেল ক্লিয়ার হয়েছে। ভিসা হাতে। আর দুই সপ্তাহ পরে ফ্লাইট।

জাহিদ আরিফকে ফোনে জিজ্ঞেস করল, "কোরিয়ায় কোন ফ্যাক্টরিতে যাচ্ছিস?"

"অটো পার্টসের একটা ফ্যাক্টরি। ইনচিওনের কাছে।"

"বেতন কত?"

"এখনো ক্লিয়ার না। তবে শুনেছি প্রথম বছরে ওভারটাইম ছাড়া বেস স্যালারি প্রায় ১৫ লাখ ওয়ন। বাংলাদেশি টাকায় এক লাখের কাছাকাছি।"

এক লাখ টাকা। মাসে।

জাহিদ চুপ করে শুনল। তারপর বলল, "ভালো তো।"

"হ্যাঁ ভাই, ভালো।" আরিফের গলায় উত্তেজনা। "দেশে থেকে এত টাকা আয় করা সম্ভব না।"

জাহিদ কিছু বলল না। কারণ জাহিদ এই মুহূর্তে মাসে দেড় লাখ টাকা আয় করছে। Upwork থেকে। দেশে বসে। কিন্তু এই কথাটা বলার কোনো মানে নেই। আরিফ বিশ্বাস করবে না। অথবা করলেও বলবে, "তোর ক্ষেত্রে হয়েছে, সবার হয় না।"

সেটাও সত্যি।

আরিফ চলে গেল।

আর জাহিদ বসে একটা হিসাব করল। নিজের জন্য না, নিজেকে বোঝানোর জন্যও না। শুধু বুঝতে চাইল, সত্যিকারের তুলনাটা কেমন দেখায় যখন সবকিছু একসাথে রাখা হয়।

তিনজনের তুলনা। তিনটা পথ। তিনটা জীবন।

আরিফ। বিদেশে। কোরিয়া। ফ্যাক্টরি ওয়ার্কার।

জাহিদ নিজে। দেশে। ফ্রিল্যান্সার। ওয়েব ডেভেলপার।

ফারুক। দেশে। সরকারি চাকরি। সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার।

জাহিদ একটা খাতা বের করল। তিনটা কলাম আঁকল। উপরে তিনটা নাম।

তারপর লিখতে শুরু করল।

প্রথম সারি: আয়।

আরিফ, কোরিয়া। গ্রস ইনকাম মাসে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি টাকা। ওভারটাইম করলে আরো বিশ-পঁচিশ হাজার বাড়তে পারে। কিন্তু ওভারটাইম মানে দশ ঘণ্টার বদলে বারো-চৌদ্দ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা।

জাহিদ, দেশে। গ্রস ইনকাম দেড় লাখ থেকে এক লাখ আশি হাজার। ভালো মাসে দুই লাখ, খারাপ মাসে এক লাখ বিশ।

ফারুক, দেশে। বেতন আটাশ হাজার, ভাতা মিলিয়ে বত্রিশ-তেত্রিশ।

আয়ের দিক থেকে: জাহিদ, আরিফ, ফারুক। কিন্তু আয় দিয়ে কিছু বোঝা যায় না। আয়ের পরে আসে খরচ।

দ্বিতীয় সারি: খরচ।

আরিফ, কোরিয়া। ডরমিটরি ভাড়া কেটে রাখে ফ্যাক্টরি, পাঁচ-ছয় হাজার সমতুল্য। খাবার নিজে রান্না করলে দশ-বারো হাজার। ফোন, পরিবহন: পাঁচ হাজার। জামাকাপড়, শীতের কোট: তিন-চার হাজার। ট্যাক্স আর ইনস্যুরেন্স আলাদা। আর একটা খরচ আছে যেটা কেউ হিসাব করে না: একাকীত্বের খরচ। বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে যাওয়া, দেশি খাবার কেনা, উইকেন্ডে একটু ঘুরতে যাওয়া। এগুলো টাকায় মাপা যায়, কিন্তু কারণটা টাকা না। কারণটা হলো মনটা ভালো নেই।

সব মিলিয়ে মাসিক খরচ ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার সমতুল্য। নেট সেভিংস পঁয়ষট্টি-সত্তর হাজার। কিন্তু ত্রিশ হাজার দেশে পাঠায়। নিজের জন্য রাখে পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ।

জাহিদ, দেশে। বাড়ি ভাড়া নেই, মা রান্না করেন। ইন্টারনেট দেড় হাজার, বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাস তিন হাজার, নিজের খরচ পাঁচ-ছয় হাজার, সফটওয়্যার দুই হাজার। পরিবারকে দেয় বিশ হাজার। সব মিলিয়ে মাসিক খরচ ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার। নেট সেভিংস এক লাখ বিশ থেকে দেড় লাখ।

ফারুক, দেশে। বেতন বত্রিশ হাজার। ভাড়া আট, খাবার ছয়, পরিবহন তিন। বাকি পনেরো। বাড়িতে পাঠায় দশ। নিজের জন্য পাঁচ।

সেভিংসের দিক থেকে, জাহিদ সবার উপরে। অনেক উপরে।

কিন্তু জাহিদ জানে, এই হিসাব অসম্পূর্ণ।

টাকা দিয়ে জীবন মাপা যায় না। টাকা একটা মাত্র অক্ষ। জীবনের অন্তত আরো চারটা অক্ষ আছে।

সময়। শরীর। পরিবার। মর্যাদা।

জাহিদ খাতায় আরো চারটা সারি যোগ করল।

তৃতীয় সারি: শ্রমের ধরন।

আরিফ কোরিয়ায় দিনে দশ ঘণ্টা কাজ করে। ফ্যাক্টরিতে। অটো পার্টস অ্যাসেম্বলি লাইনে। দাঁড়িয়ে। একই কাজ বারবার। হাত দিয়ে পার্টস ফিট করা, মেশিনে ঢোকানো, বের করা, চেক করা। পিঠে ব্যথা হয়। হাঁটুতে ব্যথা হয়। প্রথম তিন মাস শরীর মানিয়ে নেয়। ছয় মাস পর শরীর অভিযোগ করতে শুরু করে। এক বছর পর শরীর চুপ হয়ে যায়। চুপ মানে মেনে নেওয়া না। চুপ মানে ক্লান্তি এত গভীর যে অনুভব করার শক্তিও নেই।

জাহিদ দিনে দশ ঘণ্টা কাজ করে। ডেস্কে। ল্যাপটপের সামনে। কোড লেখে, ডিবাগ করে, ক্লায়েন্টের সাথে কথা বলে। চোখে চাপ পড়ে। ঘাড়ে ব্যথা হয়। কিন্তু সে যেকোনো সময় উঠে চা বানাতে পারে। বারান্দায় দাঁড়াতে পারে। তার শরীরের উপর তার নিজের নিয়ন্ত্রণ আছে।

ফারুক দিনে আট ঘণ্টা অফিসে থাকে। কাজ কতটুকু করে সেটা আলাদা প্রশ্ন। সরকারি অফিসের গতি ধীর। ফারুক বলে, "অফিসে ছয় ঘণ্টা বসে থাকি, কাজ পাই দুই ঘণ্টার।" শরীরে কোনো চাপ নেই। মনে একটু আছে, বিরক্তির চাপ। কিন্তু সেটা যন্ত্রণা না, সেটা অলসতার ওজন।

একই দশ ঘণ্টা। আরিফের দশ ঘণ্টা তার শরীর থেকে কেড়ে নেয়। জাহিদের দশ ঘণ্টা তার মাথা থেকে নেয়। ফারুকের আট ঘণ্টা তার সময় থেকে নেয়, কিন্তু কিছু ফেরত দেয় না।

চতুর্থ সারি: পরিবার।

আরিফ একা থাকে। একটা ছোট ডরমিটরি রুমে তিনজন বাংলাদেশি। রাতে ফোনে মায়ের সাথে কথা বলে। কখনো ভিডিও কল। মা জিজ্ঞেস করেন, "খাইছোস?" আরিফ বলে, "হ্যাঁ।" কিন্তু সে ডিম ভাজি খেয়েছে। একা। একটা প্লেটে। একটা চেয়ারে বসে। টেবিলের ওপারে কেউ নেই।

জাহিদ মায়ের হাতের রান্না খায়। প্রতিদিন। দুপুরে ভাত, রাতে ভাত। মাঝে মাঝে মা বলেন, "আজকে শিংমাছ এনেছি।" জাহিদ বলে, "মা, আমি কাজে আছি।" মা বলেন, "কাজ তো সবসময়ই আছে। মাছ সবসময় থাকে না।" জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করে খেতে বসে। এই মুহূর্তটার কোনো অর্থনৈতিক মূল্য নেই। কিন্তু এটার মূল্য আছে। শুধু মাপার কোনো স্কেল নেই।

ফারুক পোস্টিং পেয়েছে নিজের জেলায়। বাড়ি থেকে বিশ কিলোমিটার দূরে। প্রতি শুক্রবার বাড়ি যায়। বাবা-মা দেখে খুশি হন। মা বলেন, "সরকারি চাকরি করে, কিন্তু ছুটিতে ঠিকই আসে।" ফারুকের পরিবারের কাছে তার উপস্থিতি একটা গর্ব। শুধু উপস্থিতি না, তার পদবি। "আমার ছেলে সরকারি চাকরি করে।"

আরিফ পরিবারকে ভালোবাসে দূর থেকে। জাহিদ পরিবারকে ভালোবাসে কাছ থেকে। ফারুক পরিবারকে ভালোবাসে আর পরিবার তাকে নিয়ে গর্ব করে।

কিন্তু তিনটার মধ্যে আরিফের পরিবারই সবচেয়ে বেশি টাকা পায়। তিরিশ হাজার। প্রতি মাসে। নিশ্চিত।

টাকা কি ভালোবাসার বিকল্প?

না।

কিন্তু টাকা কি ভালোবাসার শর্ত?

কখনো কখনো, হ্যাঁ।

পঞ্চম সারি: সামাজিক মর্যাদা।

এইখানে হিসাবটা উল্টে যায়।

আরিফের মা বাজারে গেলে মানুষ জিজ্ঞেস করে, "ছেলে কোথায়?" মা বলেন, "কোরিয়ায়।" মানুষ বলে, "মাশাআল্লাহ। বিদেশে।" চোখে সম্মান। গলায় ঈর্ষা। "কেমন আছে? ভালো তো? কত পাঠায়?"

ফারুকের বাবা বলেন, "আমার ছেলে সরকারি চাকরি করে।" মানুষ বলে, "খুব ভালো। সরকারি চাকরির মতো কিছু নেই।" চোখে সম্মান, কিন্তু ভিন্ন ধরনের। এটা স্থিতিশীলতার সম্মান। নিরাপত্তার স্বীকৃতি।

জাহিদের মা বলেন, "আমার ছেলে কম্পিউটারে কিছু একটা করে।"

"কী করে?"

"ওয়েব... ওয়েবসাইট বানায় মনে হয়।"

"ও, ফ্রিল্যান্সিং? হুম। ভালো।"

ব্যস। "ভালো।" না সম্মান, না ঈর্ষা। শুধু একটা অস্বস্তিকর "ভালো" যেটার মানে হলো, বুঝতে পারছি না তোমার ছেলে কী করে।

জাহিদ মাসে দেড় লাখ আয় করে। ফারুকের পাঁচ গুণ। কিন্তু সামাজিক মর্যাদায় সবার নিচে। কারণ মর্যাদা আয় দিয়ে মাপা হয় না। মর্যাদা মাপা হয় চেনা ছক দিয়ে। ফ্রিল্যান্সিং বাংলাদেশের চেনা ছকে নেই।

জাহিদ খাতা বন্ধ করল।

ষষ্ঠ সারি লেখার কথা ছিল। ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেটা লেখা গেল না। কারণ ভবিষ্যৎ কারো জানা নেই।

আরিফের চুক্তি তিন বছরের। তিন বছর পর সে ফিরে আসবে। অথবা চুক্তি নবায়ন হবে। অথবা অন্য দেশে যাবে। কিন্তু একটা জিনিস নিশ্চিত: কোরিয়ায় সে স্থায়ী হতে পারবে না। EPS ওয়ার্কাররা পারমানেন্ট রেসিডেন্সি পায় না। তার জীবন একটা ঘড়ি। তিন বছর, পাঁচ বছর, সর্বোচ্চ দশ। তারপর ফিরতেই হবে।

ফিরে এসে কী করবে?

"দেশে একটা ব্যবসা করব।" সবাই এটা বলে। কেউ কেউ করে। বেশিরভাগ পারে না। কারণ তিন বছর ফ্যাক্টরিতে অটো পার্টস ফিট করা কোনো ব্যবসায়িক দক্ষতা তৈরি করে না। টাকা জমে, কিন্তু দক্ষতা জমে না।

জাহিদের ভবিষ্যৎ অন্যরকম। তার দক্ষতা প্রতিদিন বাড়ছে। React, TypeScript, ব্যাকএন্ড। ক্লায়েন্ট বাড়ছে, রেট বাড়ছে। কিন্তু পেনশন নেই। চাকরির নিরাপত্তা নেই। Upwork অ্যাকাউন্ট বন্ধ হলে আয় শূন্য।

ফারুকের ভবিষ্যৎ সবচেয়ে নিশ্চিত। পঁচিশ বছর চাকরি, পদোন্নতি, পেনশন। ঋণ পাওয়া সহজ। বিয়ের বাজারে দাম সবচেয়ে বেশি।

তিনটা ভবিষ্যৎ, তিনটা ঝুঁকি, তিনটা পুরস্কার।

১০

কিন্তু জাহিদ যেটা বুঝতে পারল, সেটা খাতায় লেখা হয়নি।

সেটা হলো: এই তুলনাটা কেউ করে না।

মানুষ শুধু একটা লাইন বলে।

"আরিফ বিদেশে গেছে।" ব্যস। "ফারুক সরকারি চাকরি পেয়েছে।" ব্যস। "জাহিদ কম্পিউটারে কিছু করে।" ব্যস।

একটা লেবেল। সেই লেবেলের উপর পুরো জীবনের মূল্যায়ন।

১১

এটাই availability heuristic.

মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় সেই তথ্যের ভিত্তিতে যেটা সবচেয়ে সহজে মনে আসে। যেটা সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। যেটা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

বাংলাদেশে "সফলতা" বলতে কী বোঝায়?

সরকারি চাকরি। বিদেশ। ডাক্তার। ইঞ্জিনিয়ার। ব্যারিস্টার।

এই পাঁচটা শব্দ।

এই পাঁচটার বাইরে কিছু হলে মানুষ বোঝে না। সম্মান দেয় না। ঈর্ষা করে না। আগ্রহ দেখায় না।

ফ্রিল্যান্সিং এই তালিকায় নেই।

কেন নেই?

কারণ ফ্রিল্যান্সিংয়ের সফলতার গল্প ফেসবুকে কম। টিভিতে আসে না। পত্রিকায় ছাপা হয় না। "প্রবাসী বাংলাদেশি কোটিপতি" নিয়ে ডকুমেন্টারি হয়। "ঘরে বসে ফ্রিল্যান্সিং করে লাখ টাকা আয়" শুনলে মানুষ ভাবে স্ক্যাম। অথবা ইউটিউবের থাম্বনেইল।

সরকারি চাকরির সাফল্য দৃশ্যমান। ইউনিফর্ম আছে। অফিস আছে। সিল আছে। নামের আগে পদবি আছে। মানুষ দেখতে পায়।

বিদেশের সাফল্য দৃশ্যমান। টাকা আসে, পাকা বাড়ি হয়, জমি কেনা হয়, গাড়ি আসে। মানুষ দেখতে পায়।

ফ্রিল্যান্সিংয়ের সাফল্য অদৃশ্য। একটা ছেলে ঘরে বসে আছে, ল্যাপটপ খুলে আছে। কত আয় করছে, কোন দেশের কাজ করছে, কেউ জানে না। যেটা দেখা যায় না, সেটা মনে আসে না। যেটা মনে আসে না, সেটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।

১২

জাহিদ ভাবল, আরিফ কি সুখী?

আরিফ ফোনে বলে, "ভালো আছি।" কিন্তু "ভালো আছি" বাংলাদেশি পুরুষের সবচেয়ে বড় মিথ্যা। কেউ বলে না, "ভাই, আমি একা। ফ্যাক্টরিতে কেউ আমার ভাষা বোঝে না। ঘরে ফিরতে চাই, কিন্তু পারি না, কারণ সবাই আশা করছে আমি টাকা পাঠাব।"

ফারুক বলে, "চাকরি বোরিং। কিন্তু সিকিউর।" অভিযোগ আছে, ভয় নেই। মাসের শেষে বেতন আসবে, এই নিশ্চয়তার মূল্য টাকায় মাপা যায় না।

জাহিদ নিজেকে জিজ্ঞেস করল, আমি কি সুখী?

"সুখী না, কিন্তু স্বাধীন।"

স্বাধীনতা আর সুখ এক জিনিস না। স্বাধীনতা মানে নিজের সময়ের উপর নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু স্বাধীনতা মানে অনিশ্চয়তাও। আগামী মাসে কাজ পাবো কি না, জানি না। এই না-জানাটা একটা দাম। প্রতিদিন দিতে হয়।

১৩

জাহিদ খাতার শেষ পাতায় একটা লাইন লিখল।

"বিদেশে যাওয়া সহজ। বিদেশ থেকে ফেরা কঠিন।"

তারপর আরেকটা লাইন।

"দেশে থেকে বিদেশের আয় করা, এটা নতুন পথ।"

তারপর একটু থেমে লিখল।

"কিন্তু এই পথে নাম নেই।"

সরকারি চাকরির নাম আছে: "চাকুরে।" সম্মানজনক। বিদেশে যাওয়ার নাম আছে: "প্রবাসী।" গর্বের। ডাক্তারের নাম আছে, ইঞ্জিনিয়ারের নাম আছে, ব্যারিস্টারের নাম আছে।

ফ্রিল্যান্সারের নাম কী?

"ফ্রিল্যান্সার।"

ইংরেজি। বিদেশি শব্দ। বাংলায় প্রতিশব্দ নেই। "মুক্ত পেশাজীবী" কেউ বলে না। শব্দটাই বলে দিচ্ছে, এটা আমদানি করা ধারণা। এই মাটিতে সাফল্যের যে ছক, সেই ছকে এই শব্দটার কোনো ঘর নেই।

আরিফ একটা ঘরে আছে। "প্রবাসী।" ফারুক একটা ঘরে আছে। "সরকারি কর্মকর্তা।" জাহিদ ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ তাকে ভেতরে ডাকছে না। কেউ তার ঘরটা বানিয়েও দিচ্ছে না।

সে নিজে বানাচ্ছে। ধীরে ধীরে। একটা ক্লায়েন্ট, একটা প্রজেক্ট, একটা রেটিং করে।

কিন্তু যতদিন না এই পথটা একটা নাম পাচ্ছে, ততদিন জাহিদের মা বলবেন, "আমার ছেলে কম্পিউটারে কিছু একটা করে।"

আর আরিফের মা বলবেন, "আমার ছেলে বিদেশে।"

আর মানুষ দ্বিতীয়টাকেই বেশি সম্মান করবে।

কারণ সেটা বোঝা সহজ। সেটা মনে আসা সহজ। সেটা বলা সহজ।

আর যেটা সহজ, সেটাই সত্যি মনে হয়।

এটাই availability heuristic-এর জাদু। সত্য না, কিন্তু সহজলভ্য। আর সহজলভ্যতাই সত্যের মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ায়।