প্রবাসীর অভিশাপ
দুই পাড়ের মাঝে ঝুলে থাকা মানুষ
১
আরিফের কোরিয়ায় ছয় মাস হলো।
ফ্যাক্টরিতে কাজ। প্লাস্টিকের পাইপ বানায়। সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা, সপ্তাহে ছয়দিন। ওভারটাইম করলে রাত আটটা। ওভারটাইম প্রায় প্রতিদিন করে, কারণ ওভারটাইম ছাড়া হিসাব মেলে না।
মাসে এক লাখ বিশ হাজার টাকার সমান কামায়। জাপানে যতটুকু পেত তার চেয়ে ভালো। ওভারটাইম ধরলে দেড় লাখ ছাড়ায়। খরচ বাদ দিলে আশি-নব্বই হাজার পাঠাতে পারে দেশে।
সংখ্যাগুলো ভালো। কাগজে-কলমে আরিফ সফল। গ্রামের হিসাবে আরিফ এখন বড়লোক। মাসে আশি হাজার টাকা পাঠায়, এই তথ্য শুনলে গ্রামের মানুষ বলে, "আরিফের জীবন বানাইছে।"
কিন্তু আরিফের জীবনটা আসলে কেমন, সেটা গ্রামের কেউ জানে না।
২
ঈদুল ফিতর। কোরিয়ায়।
আরিফ ঈদের দিন সকাল সাতটায় উঠল। বাসায় মানে একটা ছোট রুম, তিনজন থাকে। দুইজন বাংলাদেশি, একজন ভিয়েতনামি। রুমে একটা সিঙ্গেল বেড, দুইটা ম্যাট্রেস মাটিতে। একটা ছোট রান্নাঘর, বলতে গেলে একটা হটপ্লেট আর একটা সিঙ্ক।
ঈদের নামাজের জায়গা খুঁজতে হয়েছিল আগে থেকে। মসজিদ নেই। মানে কোরিয়ান শহরে মসজিদ আছে, কিন্তু আরিফের ফ্যাক্টরি যেখানে সেটা শহর না। ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া। মসজিদ চল্লিশ মিনিট বাসে।
তাই একটা ভাড়া করা গুদামঘরে ঈদের নামাজ হলো। স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি ব্যবস্থা করেছে। একটা পুরোনো ওয়্যারহাউস, ভেতরে কার্পেট বিছানো। পঞ্চাশজন বাংলাদেশি। কেউ ফ্যাক্টরি ওয়ার্কার, কেউ কনস্ট্রাকশনে, কেউ মাছের কারখানায়।
সবাই পাঞ্জাবি পরেছে। কেউ নতুন, কেউ পুরোনো, কেউ দেশ থেকে আনা, কেউ কোরিয়ান মার্কেট থেকে কেনা। আতর লাগিয়েছে। চোখে ঘুমের ছাপ, কিন্তু মুখে হাসি। ঈদের দিন হাসতে হয়। এটা নিয়ম।
ইমাম সাহেব একজন সিনিয়র ভাই। কোরিয়ায় আট বছর। নিজেও ফ্যাক্টরি ওয়ার্কার। কিন্তু আরবি জানেন, তাই ইমামতি করেন। খুতবা দিলেন বাংলায়। বললেন প্রবাসে ঈদের কষ্টের কথা। বললেন ধৈর্যের কথা। বললেন মা-বাবার কথা।
মুনাজাতের সময় পঞ্চাশজন পুরুষ মানুষ হাত তুলে দোয়া করল।
কান্না শুরু হলো।
প্রথমে একজন। তারপর আরেকজন। তারপর আরো। কেউ শব্দ করে কাঁদছে না, কিন্তু চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। কাঁধ কাঁপছে। নাক টানছে। ইমাম সাহেবের নিজের গলা ভাঙল।
আরিফও কাঁদল। চুপচাপ। হাত তোলা অবস্থায়। চোখ বন্ধ। মনে পড়ল গ্রামের ঈদ। ঈদগাহের মাঠ, হাজার হাজার মানুষ, নামাজের পর কোলাকুলি, সেমাই-পায়েস, আম্মার হাতের রান্না, ছোটভাইয়ের সাথে নতুন জামা পরে বেরোনো।
এখানে পঞ্চাশজন। একটা গুদামঘরে। হটপ্লেটে রান্না করা বিরিয়ানি। প্লাস্টিকের প্লেটে।
ঈদ মোবারক।
৩
নামাজের পর খাওয়া। কোরিয়ান চালে বাংলাদেশি মসলায় বিরিয়ানি। রাকিব ভাই রান্না করেছে, কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার, কিন্তু রান্না করে দারুণ। মুরগি হালাল মার্কেট থেকে কেনা, বাসে চল্লিশ মিনিট গিয়ে। প্লাস্টিকের প্লেটে, মেঝেতে বসে খাচ্ছে সবাই।
খেতে খেতে কথা। কিন্তু কথার ভেতরে একটা শূন্যতা।
একজন বলল, "আমার মেয়ের জন্মদিন পরশু। তিন বছর হবে। গত ভিডিও কলে আমাকে দেখে কান্না শুরু করেছে। ভাবছে অচেনা লোক।"
কেউ কিছু বলল না। কারণ এই অভিজ্ঞতা এখানে সবার। কারো মেয়ে চেনে না, কারো ছেলে চেনে না, কারো বউ অপেক্ষায় ক্লান্ত। সবার একই গল্প, শুধু চরিত্রের নাম আলাদা।
৪
আরিফ দেশে ফোন করল ঈদের দিন। দুপুরে। কোরিয়ায় তখন দুপুর, বাংলাদেশে সকাল।
আম্মা ফোন ধরলেন। "ঈদ মোবারক, বাবা।"
"ঈদ মোবারক, আম্মা।"
"খাইছস?"
"খাইছি। বিরিয়ানি।"
"কে রান্না করেছে?"
"রাকিব ভাই।"
আম্মা চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "আমি তোর জন্য সেমাই বানাইছি। তোর পছন্দের ঘি-সেমাই।"
আরিফ কিছু বলতে পারল না। গলায় কিছু একটা আটকে গেল।
আব্বা ফোন ধরলেন। "টাকাটা পাইছি। তোর আম্মাকে একটা শাড়ি কিনে দিছি। ভালো থাকিস।"
আব্বা আগে এত কম কথা বলতেন না। আগে জিজ্ঞেস করতেন কী শিখছিস, বিদেশটা কেমন। এখন শুধু, "টাকাটা পাইছি। ভালো থাকিস।" ছয় মাসে আব্বা বুড়ো হয়ে গেছেন। ভিডিও কলে দেখা যায়। চুলে পাক ধরেছে, চোখের নিচে কালি। আরিফ যখন দেশে ছিল তখন এসব খেয়াল করেনি।
ছোটভাই রিফাত ফোন ধরল। "ভাইয়া, ঈদ মোবারক।"
"ঈদ মোবারক। পরীক্ষা কেমন হইছে?"
"ভালো। ভাইয়া, আমার একটা ফোন দরকার। পুরোনোটা খুব স্লো হয়ে গেছে।"
আরিফ বলল, "পরের মাসে পাঠাব।"
রিফাত এইচএসসি দিচ্ছে। আরিফ যখন দেশ ছেড়েছিল, রিফাত তখন নবম শ্রেণিতে। ছয় মাসে রিফাত অনেক বদলে গেছে। গলার স্বর পাল্টেছে, কথা বলার ধরন পাল্টেছে। একটা ছেলে বড় হচ্ছে, আরিফ সেটা দেখছে পাঁচ ইঞ্চির স্ক্রিনে।
৫
আরিফের বোনের বিয়ে হয়ে গেছে গত মাসে।
আরিফ ছিল না।
বিয়ের সব খরচ আরিফ পাঠিয়েছে। তিন লাখ টাকা। ওভারটাইম করেছে আরো বেশি, রাত দশটা পর্যন্ত। ছুটির দিনেও কাজ করেছে। টাকা পাঠিয়েছে, কিন্তু বিয়েতে ছিল না।
বোন ফারিয়া। তিন বছরের ছোট। ছোটবেলায় আরিফের পিঠে চড়ে ঘুরত। সেই ফারিয়ার বিয়ে হলো। ভাই ছিল না।
বিয়ের দিন ভিডিও কল হয়েছিল। আরিফ দেখেছে বোনকে সাজানো হচ্ছে। লাল শাড়ি, সোনার গহনা, কাজল, আলতা। আম্মা কাঁদছেন। আব্বা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। ফারিয়া ক্যামেরার দিকে তাকাল।
"ভাইয়া..."
"হুম।"
"তুমি নেই।"
আরিফ কিছু বলতে পারল না। স্ক্রিনে বোনের চোখ থেকে পানি পড়ছে। কাজলে দাগ হচ্ছে। কেউ বলল, "কান্না করো না, মেকআপ নষ্ট হবে।"
আরিফ ফোন নামিয়ে রাখল। দেয়ালের দিকে মুখ করে বসে রইল। রুমে তখন কেউ ছিল না। রুমের জানালা দিয়ে কোরিয়ান শহরের আলো দেখা যাচ্ছে। নিয়নের আলো। পরিষ্কার রাস্তা। সুন্দর একটা দেশ।
কিন্তু এই সুন্দর দেশে আরিফের বোনের বিয়ে হলো, আরিফ ছিল না।
সাত হাজার কিলোমিটার। এই দূরত্বটা কাগজে একটা সংখ্যা। কিন্তু বোনের বিয়েতে না থাকলে বুঝবে এই সংখ্যাটা আসলে কতটা বড়।
৬
প্রবাসীর জীবনে একটা অলিখিত নিয়ম আছে। সেটাকে আরিফ বলে "success tax"।
নিয়মটা সোজা: একবার টাকা পাঠানো শুরু করলে থামা যায় না।
প্রথম মাসে আরিফ পাঠাল পঞ্চাশ হাজার। পরিবার খুশি। দ্বিতীয় মাসে আশি হাজার। পরিবার আরো খুশি। তৃতীয় মাস থেকে আশি হাজার হলো "স্বাভাবিক"। এখন আশি হাজার না পাঠালে ফোন আসে। "এই মাসে কম পাঠাইছস কেন?"
আম্মার ওষুধ লাগে, আব্বার চশমা বদলাতে হবে, রিফাতের কোচিং ফি, চাচার ছেলের স্কুলের খরচ (সেটাও কোনোভাবে আরিফের ঘাড়ে এসেছে), বাড়ির টিনের চাল বদলাতে হবে, পাশের জমিটা কিনতে হবে।
তালিকা শেষ হয় না। কারণ গ্রামের মানুষের কাছে "বিদেশ" মানে অসীম টাকার উৎস। আরিফ মাসে যা কামায়, তার পুরোটা পাঠিয়ে দিলেও তালিকা শেষ হবে না।
কোনো মাসে কম পাঠালে প্রশ্ন আসে। "কাজ ঠিক আছে তো?" "কোনো সমস্যা হয়নি তো?" এই প্রশ্নগুলোর মানে আসলে, "টাকা কম আসছে কেন?"
আরিফ বুঝে গেছে। টাকা পাঠানো বন্ধ করা মানে ব্যর্থ হওয়া। মাসে আশি হাজার থেকে ষাট হাজারে নামা মানে কিছু একটা ভুল হয়েছে। পরিবারের চোখে প্রবাসী ছেলে হলো একটা ATM মেশিন। মেশিনে কার্ড ঢোকাও, টাকা বের হয়। কার্ড ঢোকালে টাকা না বের হলে মেশিনে সমস্যা।
৭
ফ্যাক্টরিতে আরিফের সাথে কাজ করে ফয়সাল। সিলেটের ছেলে। কোরিয়ায় পাঁচ বছর।
একদিন রাতে, ওভারটাইমের পর, দুজন রুমে বসে নুডলস খাচ্ছে। কোরিয়ান ইনস্ট্যান্ট নুডলস। ঝাল। সস্তা।
ফয়সাল হঠাৎ বলল, "আরিফ, আমি পাঁচ বছর ধরে টাকা পাঠাই।"
"হুম।"
"গত মাসে পাঠাতে পারিনি।"
"কেন?"
"ফ্যাক্টরি দুই সপ্তাহ বন্ধ ছিল। অর্ডার কমে গেছে। ওভারটাইম নাই। বেসিক স্যালারি পাইছি, কিন্তু রুম ভাড়া আর খাওয়ার পর কিছু থাকেনি।"
"পরিবারকে বলছ?"
ফয়সাল চুপ করে নুডলসে চপস্টিক ঘোরাল। তারপর বলল, "আম্মা ফোন করছিলেন। বলছেন, 'তুই কি কাজ হারিয়েছিস?'"
আরিফ কিছু বলল না।
"বলছি, না আম্মা, কাজ হারাইনি। শুধু..." ফয়সাল থামল। নুডলসের বাটিতে তাকিয়ে রইল। "শুধু নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি।"
আরিফ ফয়সালের দিকে তাকাল। ফয়সালের চোখ লাল। ঘুমের অভাবে, নাকি অন্য কিছুতে, বোঝা গেল না।
"পাঁচ বছরে কত টাকা পাঠাইছি জানিস? প্রায় পঁয়ত্রিশ লাখ। বাড়ি হইছে। দোতলা। জমি কিনছি দুই বিঘা। বোনের বিয়ে দিছি। ভাইয়ের পড়ালেখার খরচ দিছি।"
"ভালো তো।"
"ভালো।" ফয়সাল মাথা নাড়ল। "কিন্তু আমি? আমার কী হইছে পাঁচ বছরে? আমি একটা ফ্যাক্টরির মেশিনের সামনে দাঁড়াইয়া আছি। সকাল থেকে রাত। আমার কোনো স্কিল নাই, কোনো ডিগ্রি নাই, কোনো ভবিষ্যৎ নাই। আমি একটা পাইপলাইন। টাকা এই দিক থেকে ঢোকে, ওই দিক দিয়ে বের হয়। পাইপের ভেতরে কিছু থাকে না।"
৮
আরিফ জানে ফয়সালের কথা ভুল না।
প্রবাসী শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কেউ কথা বলে না। বাংলাদেশে "মানসিক স্বাস্থ্য" শব্দটাই এখনো ট্যাবু। প্রবাসে সেটা আরো বেশি। কারণ প্রবাসে তুমি "সফল"। তুমি ডলার কামাচ্ছ। তোমার পরিবার ভালো আছে। তুমি কষ্টে আছ, এটা বলার অধিকার তোমার নেই।
ফ্যাক্টরিতে একজন শ্রমিক আছে, নাম মামুন। চট্টগ্রামের। কোরিয়ায় তিন বছর। গত ছয় মাস ধরে ঘুমাতে পারে না। রাতে শুয়ে থাকে, কিন্তু ঘুম আসে না। সকালে উঠে ক্লান্ত। কাজে মনোযোগ দিতে পারে না। গত মাসে মেশিনে হাত কেটেছে, মনোযোগের অভাবে।
কাউন্সেলিং? নেই। এমবাসিতে গেলে বলবে, "ওষুধ খান।" বাসায় ফোন করে বলতে পারে না, "আম্মা, আমি ভালো নেই।" সেটা বললে আম্মা চিন্তায় অসুস্থ হবেন। আব্বা বলবেন ফিরে আয়। ফিরে গেলে টাকা আসবে না। তাই চুপ থাকে। সবাই চুপ থাকে। ঘুমের ওষুধ খায়, কেউ কেউ মদ খায়, কেউ কেউ অনলাইনে জুয়া খেলে।
মানসিক অসুস্থতা মানে "পাগল"। প্রবাসী পাগল হলে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। তাই পাগল না হওয়ার ভান করে থাকে সবাই।
৯
রাত দুইটা। কোরিয়ার সময়।
আরিফের ফোন বাজল। জাহিদ।
বাংলাদেশে তখন রাত এগারোটা। জাহিদ সাধারণত এত রাতে ফোন করে না। কিন্তু আজ করল।
"কেমন আছিস?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
আরিফ একটু থামল। "কেমন আছিস" প্রশ্নটার উত্তর কী দেবে? "ভালো" বললে মিথ্যা হবে। "খারাপ" বললে জাহিদ চিন্তা করবে। তাই বলল, "আছি।"
জাহিদ বুঝল। "আছি" মানে ভালো নেই, কিন্তু বলতে চায় না।
"আরিফ, ফিরে আয়।"
আরিফ হাসল। ক্লান্ত হাসি। যে হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, শুধু একটা প্রতিক্রিয়া।
"ফিরে কী করব, জাহিদ?"
"কিছু একটা করবি। ফ্রিল্যান্সিং শিখবি। আমি শেখাব।"
"আমি ফ্যাক্টরি ওয়ার্কার। ফ্রিল্যান্সিং আমার দ্বারা হবে না।"
"তুই জাপানে ফোর্কলিফট চালাইছিস, কোরিয়ায় মেশিন অপারেট করছিস। তুই শিখতে পারিস।"
"জাহিদ, তুই বোঝ না।" আরিফের গলা নিচু হলো। "দেশে আমার কোনো স্কিল নেই। ফ্যাক্টরি ওয়ার্কার দেশে পনেরো হাজার পাবে। পনেরো হাজার দিয়ে কী হবে? আম্মার ওষুধ, রিফাতের পড়ালেখা, বাড়ির কিস্তি, এগুলোর খরচ মাসে পঞ্চাশ হাজারের কম না।"
জাহিদ চুপ করে রইল।
"আমি এখানে থাকলে আশি হাজার পাঠাতে পারি। দেশে গেলে পনেরো হাজার কামাব, পাঠানোর কিছু থাকবে না। হিসাবটা সোজা।"
"কিন্তু তুই..."
"আমি কী? আমি ঠিক আছি। সবাই থাকে, আমিও থাকব।"
১০
ফোন রেখে জাহিদ কিছুক্ষণ বসে রইল।
আরিফের কথাগুলো মাথায় ঘুরছে। "ফিরে কী করব?" এই প্রশ্নটা শুধু আরিফের না। লাখো প্রবাসী বাংলাদেশির।
প্রবাসে গেলে একটা ফাঁদে পড়ে মানুষ। বিদেশ টাকা দেয়, কিন্তু বাকি সবকিছু কেড়ে নেয়। পরিবার, সম্পর্ক, যৌবন, উৎসব, স্মৃতি, অংশগ্রহণ। তুমি টাকা পাঠাও, কিন্তু বোনের বিয়েতে থাকো না। তুমি ওষুধের খরচ পাঠাও, কিন্তু আম্মার পাশে বসো না। তুমি ছেলের স্কুলের ফি দাও, কিন্তু ছেলে তোমাকে ভিডিও কলে দেখে কাঁদে, কারণ তোমাকে চেনে না।
আর দেশে ফিরলে? দেশ সবকিছু দেয়, শুধু টাকা দেয় না। পরিবার আছে, উৎসব আছে, বন্ধু আছে, ভাষা আছে, সংস্কৃতি আছে। কিন্তু কাজ নেই। কাজ থাকলেও পনেরো-বিশ হাজার। সেটা দিয়ে সংসার চলে না।
ফাঁদটা দুইদিক থেকে বন্ধ। বিদেশে থাকলে টাকা আছে, জীবন নেই। দেশে ফিরলে জীবন আছে, টাকা নেই। মানুষ দুটোর মধ্যে টাকা বেছে নেয়। কারণ টাকা ছাড়া জীবনও চলে না।
১১
জাহিদ ভাবল, প্রবাসী মানে কী?
প্রবাসী মানে একটা সেতু।
দুই পাড়ের মাঝে ঝুলে থাকা। এক পাড়ে দেশ, যেখানে তোমার শিকড়, তোমার মানুষ, তোমার ভাষায় কথা বলা রাস্তা-ঘাট। অন্য পাড়ে বিদেশ, যেখানে তোমার রুজি, তোমার বেঁচে থাকার গণিত।
সেতু কোনো পাড়ে দাঁড়ায় না। সেতু মাঝখানে থাকে।
আরিফ মাঝখানে আছে। কোরিয়ায় সে বাংলাদেশি। বাংলাদেশে সে "প্রবাসী"। কোনো জায়গায় পুরোটা নেই। দুই জায়গায় আধা আধা। পুরোটা কোথাও না।
সাত হাজার কিলোমিটার দূরে, একটা ছোট রুমে, একটা পাতলা ম্যাট্রেসে, আরিফ শুয়ে আছে। ঘুম আসছে না। ফোনে আম্মার ছবি দেখছে। ফারিয়ার বিয়ের ছবি। রিফাতের সেলফি। আব্বার একটা পুরোনো ছবি, যেখানে আব্বার চুলে পাক ধরেনি।
প্রবাসীর অভিশাপ এটাই। তুমি সবার জন্য সবকিছু করো, কিন্তু তুমি নিজে কোথাও নেই। তুমি একটা সেতু। দুই পাড়ের মাঝে ঝুলে থাকা। কোনো পাড়ে দাঁড়ানো না।
কিন্তু কেউ থামে না। কেউ ফেরে না। কারণ সেতু ভেঙে পড়লে দুই পাড়ই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
তাই সেতু ঝুলে থাকে। ক্লান্ত, একা, নীরব। ঝুলে থাকে।
--- *অষ্টম অধ্যায়: সাত সমুদ্র তেরো নদী। পর্ব ৭৯/১০০।*