যাওয়া vs থাকা
এক কোটি মানুষ গেছে। যারা থেকেছে, তাদের গল্প কে বলে?
১
ঈদের দিন বিকেলে জাহিদ বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।
নিচে পাড়ার রাস্তায় ছেলেমেয়েরা নতুন জামা পরে ঘুরছে। পাশের বাড়ির শরিফ চাচা দাঁড়িয়ে আছেন গেটে, পাঞ্জাবি পরে, মুখে একটা তৃপ্তির হাসি। গত মাসে ওনার ছেলে কুয়েত থেকে তিন লাখ টাকা পাঠিয়েছে। সেই টাকায় বাড়ির সামনের দেয়াল নতুন করে প্লাস্টার হয়েছে, টিনের চালা বদলে ঢেউটিনের বদলে কাস্টিং হয়েছে।
পাড়ায় সবাই জানে এই গল্প। শরিফ চাচা নিজে বলেন, প্রতিবেশীরা বলে, চায়ের দোকানে আলোচনা হয়। "শরিফের ছেলে কুয়েতে আছে, পাকা বাড়ি করে ফেলেছে।"
কিন্তু পাড়ায় কেউ জানে না যে শরিফের ছেলে গত চার বছরে একবারও দেশে আসেনি। ছেলের দুই বছরের মেয়ে বাবাকে চেনে না। ভিডিও কলে দেখে, কিন্তু কোলে ওঠেনি কখনো। শরিফের ছেলের বউ একা একা সংসার চালায়, শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে থাকে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে না। আর কুয়েতে শরিফের ছেলে? আটজনের রুমে থাকে, পঞ্চাশ ডিগ্রি গরমে কাজ করে, আর রাতে ফোনের স্ক্রিনে মেয়ের ছবি দেখে ঘুমায়।
এই দ্বিতীয় অংশটা কেউ বলে না। কারণ সেটা গল্প না। গল্প হলো পাকা বাড়ি।
২
জাহিদ ছাদে দাঁড়িয়ে ভাবছিল, HSC-র পর ছয় বছর হয়ে গেছে।
ছয় বছর। এই সময়ের মধ্যে সে যাদের চিনত, যাদের সাথে একসাথে পরীক্ষা দিয়েছে, তারা সবাই কোথাও না কোথাও পৌঁছে গেছে। অথবা পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। অথবা হারিয়ে গেছে।
আরিফ। জাপানে ছিল তিন বছর, কোরিয়ায় এখন। মাসে লাখ বিশ হাজার টাকার মতো আয়। কিন্তু ভাড়া, খাওয়া, বীমা, ট্যাক্স বাদ দিলে হাতে থাকে চল্লিশ হাজার। সেটা দেশে পাঠায়। বাবা-মায়ের চিকিৎসা, বোনের পড়াশোনা, জমি কেনার কিস্তি। নিজের জন্য? প্রায় কিছু না। শরীরে ব্যথা ধরেছে, পিঠে, হাঁটুতে। ত্রিশ বছর বয়সে চল্লিশের শরীর। আর একা। এত একা যে ঈদের দিন ফ্যাক্টরির খালি ডর্মে বসে থাকে, কারণ বাইরে যাওয়ার কেউ নেই।
রাশেদ। BCS পাস করেছে, দ্বিতীয় চেষ্টায়। প্রশাসন ক্যাডার পায়নি, শিক্ষা ক্যাডার পেয়েছে। সরকারি স্কুলে সহকারী শিক্ষক। মাসে ত্রিশ হাজার টাকা বেতন, সাথে বাড়ি ভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা মিলিয়ে আটত্রিশ হাজারের মতো। ক্ষমতা আছে, মানুষ সম্মান করে, "সরকারি চাকরি" বলে চোখে তারা দেখে। কিন্তু রাশেদ ট্র্যাপড। বদলির ভয়, রাজনৈতিক চাপ, সিনিয়রদের তোষামোদ। আর বেতন বাড়ে বছরে দুই হাজার টাকা ইনক্রিমেন্টে। দশ বছর পর পঞ্চাশ হাজার হবে। বিশ বছর পর সত্তর। ক্যারিয়ারের ট্র্যাজেক্টরি আঁকা, সরলরেখা, কোনো চমক নেই।
সুমাইয়া। একসাথে HSC দিয়েছিল, মেডিকেলে চান্স পেয়েছিল। এখন MBBS শেষ করে ইন্টার্নশিপ চলছে। মাসে পয়তাল্লিশ হাজার টাকা, সরকারি হাসপাতালে। সন্ধ্যায় একটা ছোট চেম্বার শুরু করেছে, সেখান থেকে আরো পনেরো-বিশ হাজার। মোট ষাট-পঁয়ষট্টি। কিন্তু ক্লান্ত। এত ক্লান্ত যে ছুটির দিনে শুধু ঘুমায়। ছয় বছর মেডিকেলে পড়েছে, এক বছর ইন্টার্নশিপ, এখনো বিশেষজ্ঞ হতে পারেনি। FCPS করতে হবে, সেটা আরো পাঁচ বছর। FCPS-এর পর চেম্বার বড় হবে, আয় বাড়বে। কিন্তু সেই "পরে"টা এত দূরে যে মাঝে মাঝে সুমাইয়া ভাবে সে কি সঠিক পথে আছে।
রাসেল। ঢাকায় থাকে, একটা সফটওয়্যার কোম্পানিতে জুনিয়র ডেভেলপার। মাসে ষাট হাজার টাকা। মিরপুরে একটা রুম ভাড়া করে থাকে, শেয়ার্ড ফ্ল্যাট। অফিসে সকাল দশটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা, কখনো রাত নয়টা। কর্পোরেট, কিন্তু আরামদায়ক। AC অফিস, ফ্রি লাঞ্চ, ক্যাজুয়াল ফ্রাইডে। রাসেলের কোনো অভিযোগ নেই, কিন্তু কোনো উত্তেজনাও নেই। সে জানে দশ বছর পর সে হবে সিনিয়র ডেভেলপার, বেতন হবে দেড় লাখ। পনেরো বছর পর টেক লিড, দুই লাখ। তারপর? তারপর সিলিং। বাংলাদেশের IT সেক্টরে সিলিং আছে, আর সেটা ঢাকার বাইরে থাকলে আরো নিচে।
ফারুক। BUET থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস। সরকারি প্রকৌশলী, সড়ক ও জনপথ বিভাগে। মাসে বত্রিশ হাজার টাকা, ভাতা মিলিয়ে আটত্রিশ। পেনশন আছে। গভর্নমেন্ট কোয়ার্টারে থাকে। জীবন নিরাপদ, স্থিতিশীল, বোরিং। ফারুকের কোনো ঝুঁকি নেই, কিন্তু কোনো স্বপ্নও নেই। সে জানে ত্রিশ বছর পর অবসর নেবে, গ্র্যাচুইটি পাবে, গ্রামে ফিরে যাবে। এটুকুই।
আর জাহিদ? জাহিদ মফস্বলে বসে ফ্রিল্যান্সিং করে, এখন এজেন্সি চালায়। মাসে দেড় লাখ থেকে দুই লাখ আয়। কখনো আড়াই লাখ, কখনো আশি হাজার। তিনজন মানুষ কাজ করে তার আন্ডারে। সে ফ্রি, কোনো বস নেই, কোনো অফিস টাইম নেই। কিন্তু অনিশ্চিত। প্রতিটা মাস একটা নতুন যুদ্ধ। ক্লায়েন্ট চলে গেলে আয় শূন্য। পেনশন নেই, বীমা নেই, ছুটি নেই।
৩
ছয়জনের ছয়টা জীবন।
জাহিদ ছাদে দাঁড়িয়ে এই তালিকাটা মাথায় সাজাচ্ছিল। সে bdfacts.org-এ একটা জিনিস শিখেছিল: availability heuristic। মানুষ সেই তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দেয় যেটা সহজে মনে পড়ে।
পাড়ায় কার গল্প সবচেয়ে বেশি শোনা যায়?
আরিফের। "আরিফ কোরিয়ায় আছে, লাখ টাকা পাঠায়।"
শরিফের ছেলের। "কুয়েতে আছে, পাকা বাড়ি করেছে।"
পাশের গ্রামের রফিকের। "মালয়েশিয়া থেকে গাড়ি কিনেছে।"
এই গল্পগুলো সবার মুখে। চায়ের দোকানে, ঈদের জমায়েতে, বিয়ের আসরে। "বিদেশে গেলে হয়ে যায়" এই বিশ্বাসটা এত গভীর যে এটা আর বিশ্বাস না, এটা অক্সিজেন। শ্বাস নেওয়ার মতো স্বাভাবিক।
কিন্তু রাসেলের গল্প কেউ বলে না। কারণ রাসেল ঢাকায় আছে, ষাট হাজার কামায়, সেটা মফস্বলে "কিছুই না।" সুমাইয়ার গল্প বলে, কিন্তু অন্যভাবে: "ডাক্তার হয়েছে," এটুকুই। সুমাইয়া যে ক্লান্ত, সুমাইয়া যে এখনো পাঁচ বছর পড়বে, সেটা কেউ জানতে চায় না। ফারুকের গল্প? "সরকারি চাকরি।" ব্যস। বত্রিশ হাজার টাকা বেতন, সেটা কেউ বলে না।
আর জাহিদের গল্প?
জাহিদের গল্প কেউ বোঝে না। "কম্পিউটারে কিছু একটা করে।" এটাই জাহিদের পরিচয় পাড়ায়। "বিদেশে যায়নি, ঢাকায়ও যায়নি, মফস্বলে বসে ল্যাপটপে কিছু করে।" মফস্বলে এটা কোনো গল্প না। এটা কোনো সাফল্য না। পাকা বাড়ি দেখা যায়, ডলার দেখা যায়, গাড়ি দেখা যায়। কিন্তু ফাইবার অপটিক ক্যাবলের ভেতর দিয়ে আসা ডলার? সেটা অদৃশ্য।
৪
বাংলাদেশ শারীরিক মাইগ্রেশন উদযাপন করে। বিমানবন্দর, ভিসা, বোর্ডিং পাস, বিদেশি মুদ্রা। এগুলো দৃশ্যমান। একটা ছেলে বিদেশে যাচ্ছে মানে বিমানবন্দরে পরিবার যাবে, কান্নাকাটি হবে, ফেসবুকে পোস্ট হবে, পাড়ায় মিষ্টি বিলানো হবে। এটা একটা ইভেন্ট।
কিন্তু ডিজিটাল মাইগ্রেশন? জাহিদ যখন Upwork-এ একটা প্রজেক্ট পায়, সেটা কোনো ইভেন্ট না। কেউ জানে না। কোনো বিমানবন্দর নেই, কোনো কান্না নেই, কোনো মিষ্টি নেই। একটা নোটিফিকেশন আসে, "You've been hired." জাহিদ ল্যাপটপ খোলে, কাজ শুরু করে। দুই সপ্তাহ পর পেমেন্ট আসে, ডলারে। সেই ডলার বাংলাদেশি ব্যাংকে ঢোকে, টাকায় কনভার্ট হয়।
ঠিক একই জিনিস ঘটে। ডলার আসে, দেশে থাকে, পরিবারকে দেয়। কিন্তু একটায় বিমানবন্দর আছে, আরেকটায় ফাইবার অপটিক ক্যাবল আছে।
একটার খরচ আট লাখ টাকা আর একাকীত্ব। আরেকটার খরচ একটা ল্যাপটপ।
অন্তত তত্ত্বে।
৫
কিন্তু জাহিদ জানে, তত্ত্ব আর বাস্তব এক না।
ডিজিটাল মাইগ্রেশনের জন্য লাগে: ইংরেজি জানা। ইন্টারনেট থাকা। ল্যাপটপ থাকা। কোনো একটা দক্ষতা শেখা, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট হোক বা গ্রাফিক ডিজাইন হোক বা কন্টেন্ট রাইটিং হোক। আর সবচেয়ে কঠিন জিনিস: ডিসিপ্লিন। কেউ বলবে না কখন কাজ করতে হবে, কেউ পাহারা দেবে না, কেউ বকা দেবে না। নিজেকে নিজে চালাতে হবে। এটা সবার পক্ষে সম্ভব না।
শারীরিক মাইগ্রেশনের জন্য লাগে: দালালের টাকা আর কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা। ইংরেজি জানতে হয় না। ল্যাপটপ লাগে না। কম্পিউটার জানতে হয় না। শুধু শরীর লাগে, আর শরীরকে খাটানোর মানসিকতা।
আরিফ মাধ্যমিক পাস। ইংরেজিতে দুই লাইন লিখতে পারে না। কম্পিউটার বলতে ফোন চেনে। কিন্তু কোরিয়ায় ফ্যাক্টরিতে মেশিন চালায়, মাসে লাখ বিশ হাজার কামায়। আরিফের পক্ষে কি ফ্রিল্যান্সিং করা সম্ভব ছিল? না। কোনোভাবেই না। তার শিক্ষা নেই, ভাষা নেই, প্রযুক্তি নেই।
জাহিদের পক্ষে কি বিদেশে কায়িক শ্রম করা সম্ভব ছিল? হ্যাঁ। কিন্তু সে সেটা বেছে নেয়নি। কারণ তার কাছে অন্য অপশন ছিল।
দুটো পথ, দুটো ভিন্ন মানুষের জন্য। কেউ ভালো না, কেউ খারাপ না। শুধু ভিন্ন। বাধাগুলো ভিন্ন, সুযোগের দরজাগুলো ভিন্ন।
কিন্তু বাংলাদেশ শুধু একটা পথকে চেনে: যাওয়া। থাকাটাকে কেউ সাফল্য মনে করে না।
৬
জাহিদ ছাদ থেকে নেমে এলো। মা ডাকছিলেন, ঈদের সেমাই খেতে হবে।
টেবিলে বসে সেমাই খেতে খেতে মা বললেন, "পাশের বাড়ির রহিম চাচার ছেলে ইটালি যাচ্ছে। তোর বাবা বলছিল তুইও একবার ভেবে দেখ।"
জাহিদ চামচ নামিয়ে রাখল। "আম্মা, আমি মাসে দেড় লাখ টাকা কামাই।"
"তাও তো বিদেশ ভালো। ডলারে কামাবি।"
"আম্মা, আমি ডলারেই কামাই। Upwork থেকে ডলারে পেমেন্ট আসে।"
মা একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "তাও তো বিদেশে গেলে মানুষ কী বলবে? বলবে ছেলে বিদেশে আছে।"
এই হলো আসল কথা। টাকা না, ডলার না, আয় না। "মানুষ কী বলবে।" শরিফ চাচা বলতে পারেন, "আমার ছেলে কুয়েতে।" এই একটা বাক্য বলার জন্য শরিফের ছেলে আট লাখ টাকা খরচ করেছে, চার বছর পরিবার ছেড়ে থেকেছে, মেয়ের বড় হওয়া দেখেনি। কিন্তু বাবা বলতে পারেন, "আমার ছেলে কুয়েতে।"
জাহিদের বাবা কী বলবেন? "আমার ছেলে কম্পিউটারে কিছু করে।" এটা কোনো বাক্য না। এটায় কোনো গর্ব নেই। কোনো গল্প নেই।
৭
জাহিদ রাতে ল্যাপটপ খুলল।
একটা স্প্রেডশিট বানাল। ছয়জনের নাম, ছয়টা কলাম: আয়, সঞ্চয়, পরিবারের সময়, স্বাস্থ্য, ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ, সুখ।
আরিফ (কোরিয়া): আয় ভালো, সঞ্চয় মোটামুটি, পরিবারের সময় শূন্য, স্বাস্থ্য খারাপ হচ্ছে, ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, কারণ ভিসা শেষ হলে কী করবে সেটা জানে না। সুখ? আরিফকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে, "টাকা পাঠাচ্ছি, পরিবার ভালো আছে।" নিজের কথা বলে না।
রাশেদ (BCS): আয় কম, সঞ্চয় কম, পরিবারের সময় আছে, বদলি না হলে। স্বাস্থ্য ঠিক। ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ? পদোন্নতি হবে, ধীরে, নিয়ম মেনে। সুখ? রাশেদ বলে, "স্থিতিশীলতা আছে।" সুখ শব্দটা ব্যবহার করে না।
সুমাইয়া (ডাক্তার): আয় মোটামুটি, সঞ্চয় কম কারণ এখনো শিখছে। পরিবারের সময় কম, হাসপাতালে থাকে দিনরাত। স্বাস্থ্য? ডাক্তার হয়েও নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নেয় না। ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ সবচেয়ে ভালো, কিন্তু সেটা আরো পাঁচ-সাত বছর পর। সুখ? সুমাইয়া বলে, "রোগী ভালো হলে ভালো লাগে।" নিজের সুখের কথা ভাবার সময় নেই।
রাসেল (সফটওয়্যার): আয় ভালো, সঞ্চয় মোটামুটি, পরিবারের সময় উইকেন্ডে। স্বাস্থ্য ঠিক, AC অফিসে বসে কাজ। ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ সীমিত, সিলিং আছে। সুখ? রাসেল বলে, "অভিযোগ নেই।" উৎসাহও নেই।
ফারুক (সরকারি প্রকৌশলী): আয় কম, সঞ্চয় কম, পরিবারের সময় আছে। স্বাস্থ্য ঠিক। ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ সরলরেখা, কোনো চমক নেই, কোনো ভয়ও নেই। সুখ? ফারুক বলে, "নিরাপদ আছি।" নিরাপত্তা আর সুখ কি একই জিনিস?
জাহিদ (ফ্রিল্যান্সার/এজেন্সি): আয় সবচেয়ে বেশি, কিন্তু অনিশ্চিত। সঞ্চয় ভালো, কারণ মফস্বলে খরচ কম। পরিবারের সময় সবচেয়ে বেশি, কারণ বাড়িতেই কাজ। স্বাস্থ্য? পিঠে ব্যথা, চোখে সমস্যা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা। ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ? জানে না। হয়তো এজেন্সি বড় হবে, হয়তো ক্লায়েন্ট চলে যাবে। কোনো গ্যারান্টি নেই। সুখ? জাহিদ বলে, "স্বাধীন আছি।" স্বাধীনতা আর সুখ কি একই জিনিস?
৮
জাহিদ স্প্রেডশিটটার দিকে তাকাল।
কোনো পথ সম্পূর্ণ না। প্রতিটা পথে কিছু আছে, কিছু নেই। আরিফের টাকা আছে, পরিবার নেই। রাশেদের নিরাপত্তা আছে, স্বাধীনতা নেই। সুমাইয়ার ভবিষ্যৎ আছে, বর্তমান নেই। রাসেলের আরাম আছে, উত্তেজনা নেই। ফারুকের শান্তি আছে, স্বপ্ন নেই। জাহিদের স্বাধীনতা আছে, নিশ্চয়তা নেই।
কিন্তু পাড়ায় শুধু একটা গল্প চলে: আরিফের। "বিদেশে আছে, টাকা পাঠায়।" এই একটা গল্প বাকি পাঁচটা গল্পকে ঢেকে ফেলে। রাসেল ষাট হাজার কামায়, কেউ বলে না। সুমাইয়া ডাক্তার হয়েছে, সেটা বলে, কিন্তু তার কষ্টের কথা বলে না। জাহিদ দেড় লাখ কামায়, কেউ বিশ্বাস করে না।
Availability heuristic।
যেটা দেখা যায়, সেটাই সত্য। পাকা বাড়ি দেখা যায়, তাই বিদেশ ভালো। ল্যাপটপে কাজ দেখা যায় না, তাই সেটা কিছু না। বিমানবন্দরের ছবি ফেসবুকে যায়, তাই মাইগ্রেশন বড় ঘটনা। Upwork-এর নোটিফিকেশন কেউ দেখে না, তাই ফ্রিল্যান্সিং কোনো ঘটনাই না।
বাংলাদেশ একটা দেশ যেখানে "বিদেশে গেছে" মানে সফল, আর "দেশে আছে" মানে এখনো কিছু হয়নি।
৯
জাহিদ ভাবল, সে কখনো বিদেশে যায়নি। তার "বিদেশ" এসেছে তার কাছে। ফাইবার অপটিক ক্যাবলের ভেতর দিয়ে।
আমেরিকার একটা কোম্পানি তাকে কাজ দেয়। অস্ট্রেলিয়ার একটা স্টার্টআপ তাকে ডিজাইন করতে বলে। কানাডার একজন উদ্যোক্তা তার এজেন্সিতে প্রজেক্ট দেয়। জাহিদ মফস্বলের একটা ঘরে বসে, সামনে ল্যাপটপ, পেছনে মায়ের রান্নাঘর, আর সে কাজ করে পৃথিবীর জন্য। সে কোনো বিমানে ওঠেনি, কোনো ভিসা লাইনে দাঁড়ায়নি, কোনো দালালকে টাকা দেয়নি।
কিন্তু তার ডলার আসে। ঠিক আরিফের মতো। ঠিক শরিফের ছেলের মতো।
পার্থক্যটা কোথায়? পার্থক্যটা হলো, আরিফ শরীর দিয়ে কাজ করে, জাহিদ মাথা দিয়ে। আরিফকে যেতে হয়েছে কাজের কাছে, জাহিদের কাছে কাজ এসেছে। আরিফের জন্য বিদেশ মানে একটা জায়গা, জাহিদের জন্য বিদেশ মানে একটা সংযোগ।
কিন্তু দুজনেই প্রবাসী। একজন শরীরে, একজন তারে।
১০
রাতে শোওয়ার আগে জাহিদ ফোনে আরিফের সাথে কথা বলল। কোরিয়ায় তখন রাত এগারোটা।
"ঈদ কেমন কাটল?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
"কাটল।" আরিফের কণ্ঠ ক্লান্ত। "ফ্যাক্টরি বন্ধ ছিল একদিন। গরুর মাংস রান্না করলাম রুমে। তিনজন মিলে।"
"বাড়ির কথা মনে পড়ে?"
"প্রতিদিন।" একটু থামল। "কিন্তু বাড়ি গেলে কী করব? মাধ্যমিক পাস দিয়ে চাকরি নেই। এখানে অন্তত টাকা আসে।"
"কতদিন থাকবি?"
"জানি না। ভিসা আছে আরো দুই বছর। তারপর? তারপর দেখা যাবে। হয়তো আরেকটা দেশে যাব। হয়তো দেশে ফিরব।"
"ফিরলে কী করবি?"
আরিফ চুপ করে রইল।
জাহিদও চুপ করে রইল।
কিছুক্ষণ পর আরিফ বলল, "তুই ভালো করেছিস, জাহিদ। দেশে থেকেছিস, কিন্তু কিছু একটা বানিয়েছিস। আমি গেছি, কিন্তু কী বানিয়েছি? একটা পাকা বাড়ি। সেই বাড়িতে আমি থাকি না।"
১১
বাংলাদেশের এক কোটি মানুষ বিদেশে আছে।
এক কোটি। সংখ্যাটা এত বড় যে কল্পনা করা কঠিন। ঢাকা শহরের জনসংখ্যার সমান। প্রতি ষোলোজনে একজন বাংলাদেশি এই মুহূর্তে দেশের বাইরে। মধ্যপ্রাচ্যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, ইউরোপে, আমেরিকায়। কেউ হালাল উপায়ে, কেউ না। কেউ দক্ষ শ্রমিক, কেউ অদক্ষ। কেউ ডাক্তার, কেউ রাজমিস্ত্রি। কিন্তু সবাই একটা জিনিস করে: পাঠায়। টাকা পাঠায়। প্রতি বছর বিশ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিটেন্স আসে। বাংলাদেশের GDP-র ছয় শতাংশ।
এই এক কোটি মানুষের প্রত্যেকে একটা গল্প। কিন্তু সব গল্প একই তিনটা বাক্যে শেষ হয়:
"আমি গেছিলাম।"
"আমি পাঠিয়েছি।"
"আমি একা ছিলাম।"
এই তিনটা বাক্যের বাইরে আর কোনো সত্য নেই। কেউ বলে না চতুর্থ বাক্যটা। চতুর্থ বাক্যটা হলো: "আমি ফিরতে চাইতাম।"
আর যারা থেকেছে? যারা যায়নি? যারা মফস্বলে বসে ল্যাপটপ খুলেছে, নিজের পথ বানিয়েছে, ফাইবার অপটিকের ভেতর দিয়ে পৃথিবীর সাথে যুক্ত হয়েছে? তাদের গল্প কেউ বলে না। কারণ সেই গল্পে কোনো বিমানবন্দর নেই, কোনো বিদায়ের কান্না নেই, কোনো পাকা বাড়ির উদ্বোধন নেই। শুধু একটা ল্যাপটপ আছে, একটা ইন্টারনেট সংযোগ আছে, আর একটা মানুষ আছে যে চুপচাপ কাজ করে যাচ্ছে।
জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। মফস্বলের রাত। দূরে একটা মসজিদের মিনারে আলো জ্বলছে। পাশের বাড়ি থেকে টিভির আওয়াজ আসছে। রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই।
এই মফস্বল থেকেই সে কাজ করে। এই মফস্বল থেকেই তার "বিদেশ" আসে। আর এই মফস্বলই তাকে বলে, "তুমি কিছু হওনি।"
জাহিদ হাসল। একটু তেতো হাসি।
তারপর ঘুমিয়ে পড়ল।
---
*অষ্টম অধ্যায়: সাত সমুদ্র তেরো নদী, AVAILABILITY HEURISTIC। পর্ব ৮০/১০০।*