কারিগরি শিক্ষা কেন?

সত্তর শতাংশ চাকরিতে হাতের দক্ষতা লাগে, চৌদ্দ শতাংশ ছাত্র সেই পথে যায়

পর্ব ৮১ · ১৫ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

*নবম অধ্যায়: হাতের কাজ, হাতের মুক্তি।*

ফারুকের ফোন এলো শুক্রবার সকালে।

জাহিদ তখন চা খাচ্ছিল। ল্যাপটপ খোলা, কিন্তু কাজ শুরু করেনি। শুক্রবার একটু দেরি করে শুরু করে। অভ্যাস হয়ে গেছে। ফ্রিল্যান্সিং-এর সুবিধা, নিজের রুটিন নিজে ঠিক করা যায়। অসুবিধা, রুটিন বলে কিছু থাকে না।

"ভাই, একটু আসতে পারবে?" ফারুকের গলায় উত্তেজনা।

"কোথায়?"

"আমাদের ট্রেনিং সেন্টারে। আজ ওপেন হাউজ। তুই একবার এসে দেখ।"

ফারুক। পলিটেকনিক থেকে পাশ করে চার বছর হয়ে গেছে। সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি চাকরি। গ্রেড-১৩। মূল বেতন বত্রিশ হাজার। কিন্তু এটা ফারুকের পুরো ছবি না। সন্ধ্যার পর সে প্রাইভেট কোম্পানির একটা প্রজেক্টে কনসালট্যান্সি করে। পনেরো হাজার। মোট সাতচল্লিশ হাজার। মাসে।

জাহিদ চিনে ফারুককে স্কুল থেকে। ক্লাস নাইনে একসাথে বেঞ্চ শেয়ার করত। ফারুক পড়াশোনায় মাঝারি ছিল, কিন্তু হাতের কাজে অসাধারণ। ইলেকট্রিক ফ্যান খুলে জোড়া লাগাতে পারত ক্লাস সেভেনেই। স্কুলের ল্যাবের ভাঙা মাইক্রোস্কোপ সে ঠিক করে দিয়েছিল। টিচাররা বলত, "ফারুকের হাতে জাদু আছে।" কিন্তু সেই একই টিচাররা বলত, "পড়াশোনায় মন দে, না হলে কিছু হবে না।"

পড়াশোনা মানে কী? বই মুখস্থ করা। পরীক্ষায় লেখা। GPA তোলা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। এটাই একমাত্র পথ। এটাই একমাত্র সাফল্য। বাকি সব ব্যর্থতা।

ফারুক HSC-তে 3.50 পেয়েছিল। কেউ তাকে অভিনন্দন জানায়নি।

জাহিদ গেল।

ট্রেনিং সেন্টারটা শহরের বাইরে, পুরানো ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায়। বাইরে থেকে দেখে মনে হয় একটা গুদাম। ভেতরে ঢুকে জাহিদের চোখ বড় হয়ে গেল।

ওয়েল্ডিং বুথে একটা ছেলে স্টিলের দুটো পিস জোড়া লাগাচ্ছে। স্পার্ক উড়ছে। মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস। সে কি বিশ বছরের হবে? তার চোখে একটা ফোকাস আছে যেটা জাহিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে দেখেনি। এই ছেলে জানে সে কী করছে। এবং কেন করছে।

পাশের রুমে ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্কশপ। সোলার প্যানেল ইনস্টলেশনের ডেমো চলছে। তিনজন মেয়ে কাজ করছে। একজন মাল্টিমিটার দিয়ে ভোল্টেজ মাপছে, একজন ওয়্যারিং কানেক্ট করছে, তৃতীয়জন ডায়াগ্রামে নোট নিচ্ছে। মেয়ে তিনজনের কেউ লজ্জায় মুখ ঢাকেনি। কেউ "মেয়েদের কাজ না" বলে সরে দাঁড়ায়নি।

অটোমোবাইল সেকশনে একটা পুরানো ট্রাকের ইঞ্জিন খোলা। দশ-বারোজন ছাত্র ঘিরে দাঁড়িয়ে। ইন্সট্রাক্টর একটা একটা করে পার্টস দেখাচ্ছেন। প্রতিটা পার্টসের নাম, কাজ, কেন খারাপ হয়, কীভাবে ঠিক করে। ছাত্ররা হাত দিয়ে ধরছে, ঘুরিয়ে দেখছে। এটা পড়া না। এটা শেখা।

জাহিদ একটা জিনিস লক্ষ করল। এখানকার ছাত্রদের চোখ আলাদা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ক্লাসে বসে ফোন চালায়। এখানকার ছাত্ররা হাত নোংরা করছে, ঘামছে, ভুল করছে, আবার চেষ্টা করছে। তাদের চোখে একটা প্রশ্ন আছে: "এটা কীভাবে কাজ করে?" বিশ্ববিদ্যালয়ের চোখে যে প্রশ্ন থাকে সেটা আলাদা: "এটা পরীক্ষায় আসবে?"

ফারুক জাহিদকে ক্যান্টিনে নিয়ে গেল। চা আর সিঙাড়া। টেবিলে বসে ফারুক কথা বলতে শুরু করল। সে এই ট্রেনিং সেন্টারে পার্ট-টাইম ইন্সট্রাক্টর। সরকারি চাকরির পাশাপাশি।

"জানিস ভাই, বাংলাদেশে সত্তর শতাংশ চাকরিতে কারিগরি দক্ষতা দরকার। সত্তর শতাংশ। প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, মেশিনিস্ট, টেকনিশিয়ান, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, নার্স, এভিয়েশন মেকানিক। কিন্তু কারিগরি শিক্ষায় কত শতাংশ ছাত্র? চৌদ্দ।"

সত্তর বনাম চৌদ্দ। জাহিদ সংখ্যা দুটো মাথায় ঘোরাল।

"মানে বাকি ছাপ্পান্ন শতাংশ চাকরি খালি পড়ে আছে?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।

"খালি না। অদক্ষ মানুষ দিয়ে চলছে। ঢাকায় তোর বাড়ির ইলেকট্রিক লাইনে সমস্যা হলে কাকে ডাকবি? পাড়ার মিস্ত্রি। তার কোনো সার্টিফিকেট নেই, কোনো ট্রেনিং নেই, কোনো সেফটি জ্ঞান নেই। সে শিখেছে দেখে দেখে। তারপর তোর বাসায় শর্ট সার্কিট হলে কে দায়ী?"

ফারুক চায়ে চুমুক দিল।

"ছিয়াশি শতাংশ ছাত্র সাধারণ শিক্ষায়। BBA, MBA, MA, MSS। ডিগ্রির পর ডিগ্রি। তারপর চাকরি নেই। কারণ অর্থনীতির যে চাকরি দরকার, সেটার সাথে তাদের পড়ার কোনো সম্পর্ক নেই।"

এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মিথ্যা।

পলিটেকনিক মানে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়নি। কারিগরি শিক্ষা মানে ছেলেমেয়েদের জন্য যাদের "মাথা নেই।" ডিপ্লোমা মানে ডিগ্রির নিচে। হাতের কাজ মানে মাথার কাজের চেয়ে কম।

এই বিশ্বাসটা কোথা থেকে এসেছে? ব্রিটিশ আমলের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে। ব্রিটিশরা বাংলায় শিক্ষা দিয়েছিল কেরানি তৈরি করতে। মেধাবীরা লিখবে, হিসাব করবে, ফাইল আগাবে। হাতের কাজ? সেটা নিচু শ্রেণীর জন্য। এই মানসিকতা দেড়শো বছর পরেও বদলায়নি।

ফারুক বলল, "আমি যখন পলিটেকনিকে ভর্তি হলাম, আমাদের পাড়ার মানুষ বলত, 'আরে, বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেল না?' আম্মাকে জিজ্ঞেস করত, 'ছেলেটা কি একটু কম মেধাবী?' আম্মা কিছু বলতে পারত না। কারণ আম্মাও ভেতরে ভেতরে তাই ভাবত।"

থামল।

"চার বছর পর আমি সরকারি চাকরি পেলাম। সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার। পাড়ার সেই মানুষগুলোর ছেলেমেয়েরা তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। অনার্স শেষ করে মাস্টার্স। মাস্টার্স শেষ করে BCS কোচিং। BCS ক্লিয়ার না হলে প্রাইভেট চাকরি খোঁজা। প্রাইভেট চাকরিতে পনেরো হাজার। আমার মূল বেতন বত্রিশ।"

ফারুক হাসল। তিক্ত হাসি না। ক্লান্ত হাসি। যেটা বারবার একই কথা প্রমাণ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার হাসি।

জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "তোর মোট আয় কত?"

"সরকারি বেতন বত্রিশ হাজার। ভাতা সব মিলিয়ে আটত্রিশ। সন্ধ্যার পর একটা কনস্ট্রাকশন ফার্মে কনসালট্যান্সি করি। ইলেকট্রিক্যাল ডিজাইন রিভিউ। পনেরো হাজার। মোট তিপান্ন।"

তিপান্ন হাজার। জাহিদ ভাবল। ফারুকের বয়স ছাব্বিশ। একই বয়সে একটা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে BBA করে যে চাকরি পায়, সেটায় পনেরো থেকে বিশ হাজার। ফারুক তার প্রায় তিনগুণ আয় করছে।

"আর পেনশন?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।

"সরকারি চাকরি। পেনশন আছে। গ্র্যাচুইটি আছে। প্রভিডেন্ট ফান্ড আছে। বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা। বছরে দুবার বোনাস।"

জাহিদ চুপ করে থাকল।

ফ্রিল্যান্সিং-এ এগুলোর কোনোটা নেই। জাহিদের আয় বেশি, কিন্তু নিরাপত্তা জালটা শূন্য। ফারুকের আয় কম, কিন্তু তলায় একটা মেঝে আছে। সেই মেঝের নিচে পড়ার ভয় নেই।

ফারুক বলতে থাকল। এবার তথ্য দিয়ে।

"বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার পথ যত, মানুষ তার দশ ভাগের একটাও জানে না। সবাই শুধু পলিটেকনিক বোঝে। কিন্তু পলিটেকনিক তো শুধু শুরু।"

সে আঙুলে গুনতে শুরু করল।

"মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং। জাহাজে কাজ। শুরুতে ট্রেনি হিসেবে যায়, দুই বছরের মধ্যে মাসে আশি হাজার। অভিজ্ঞতা হলে দেড় লাখ। সিনিয়র মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হলে? দুই লাখের ওপর। ছয় মাস সমুদ্রে, ছয় মাস বাড়িতে। কেউ জানে না এই পথ আছে। কেউ বলে না।"

দ্বিতীয় আঙুল।

"নার্সিং। বাংলাদেশে পুরুষ নার্স বললে লোকে হাসে। 'ছেলে হয়ে নার্স?' কিন্তু বিশ্বজুড়ে নার্সিং-এ ছেলেদের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশে একজন রেজিস্টার্ড নার্স শুরুতে ত্রিশ হাজার পায়। সরকারি হাসপাতালে। প্রাইভেটে চল্লিশ-পঞ্চাশ। আর বিদেশে? মধ্যপ্রাচ্যে দেড় লাখ। ইউরোপে দুই লাখের ওপর। সারা পৃথিবীতে নার্সের ঘাটতি। এটা এমন একটা পেশা যেটায় বেকারত্ব নেই।"

তৃতীয় আঙুল।

"এভিয়েশন মেইনটেন্যান্স। বিমান ঠিক করা। শাহজালালে হাজার হাজার বিমান আসে-যায়। প্রতিটা বিমানের মেইনটেন্যান্স লাগে। একজন লাইসেন্সড এয়ারক্রাফট মেকানিক মাসে পঞ্চাশ হাজার থেকে শুরু করে। এক লাখ পর্যন্ত যায়। কিন্তু কেউ জানে না। কারণ কেউ বলে না।"

ফারুক থামল না।

"গার্মেন্টস ম্যানেজমেন্ট। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইন্ডাস্ট্রি। চল্লিশ লাখ মানুষ কাজ করে। কিন্তু ম্যানেজমেন্ট লেভেলে দক্ষ মানুষ নেই। ফ্লোর সুপারভাইজার, কোয়ালিটি কন্ট্রোলার, প্রোডাকশন ম্যানেজার। শুরুতে পঁচিশ, পাঁচ বছর পর ষাট। টেক্সটাইল ডিপ্লোমা করলে পথটা সোজা।"

পঞ্চম।

"ইলেকট্রিক্যাল ট্রেড। সোলার বুম। বাংলাদেশে গত পাঁচ বছরে সোলার ইনস্টলেশন তিনগুণ বেড়েছে। গ্রামে গ্রামে সোলার প্যানেল। কিন্তু ইনস্টল করবে কে? দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান নেই। যারা আছে, তারা বিদ্যুতের তার ধরে ঝুলে পড়ে। সোলারের কিছু জানে না। একজন ট্রেনড সোলার টেকনিশিয়ান মাসে পঁচিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার আয় করে। গ্রামে বসে।"

ষষ্ঠ।

"অটোমোবাইল। EV আসছে। ইলেকট্রিক রিকশা, ইলেকট্রিক বাইক, ইলেকট্রিক বাস। এগুলোর মেকানিক কে হবে? পুরানো পেট্রোল মেকানিক তো EV বোঝে না। নতুন টেকনিশিয়ান দরকার। এই চাহিদা পাঁচ বছরে পাঁচগুণ বাড়বে।"

ফারুক চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল।

"ছয়টা পথ বললাম। এর বাইরেও আছে। রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এসি, প্লাম্বিং, কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন, আইটি সাপোর্ট, মোবাইল সার্ভিসিং। কিন্তু বাংলাদেশের বাবা-মা জানে একটাই পথ: বিশ্ববিদ্যালয়। ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়লে লজ্জা।"

ওপেন হাউজের শেষে একজন টিচারের সাথে কথা হলো জাহিদের।

টিচারের নাম রহমান স্যার। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। তিরিশ বছর কারিগরি শিক্ষায়। চোখে একটা শান্ত ক্লান্তি, যেটা অনেক কিছু দেখে ফেলা মানুষের চোখে থাকে।

জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "স্যার, বিশ্ববিদ্যালয় আর কারিগরি শিক্ষার মধ্যে আসল পার্থক্যটা কী?"

রহমান স্যার একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, "বিশ্ববিদ্যালয় তোমাকে ভাবতে শেখায়। কারিগরি শিক্ষা তোমাকে করতে শেখায়। দুটোই দরকার। কিন্তু বাংলাদেশে করতে পারা মানুষের অভাব বেশি।"

থামলেন। তারপর বললেন, "একটা দেশের অর্থনীতি চালায় কারা? যারা জিনিস বানাতে পারে। যারা ঠিক করতে পারে। যারা ইনস্টল করতে পারে। যারা মেইনটেইন করতে পারে। একটা থিওরি পেপার লিখে অর্থনীতি চলে না। একটা পাওয়ার গ্রিড ঠিক করে চলে।"

জাহিদ ভাবল। সে নিজে ফ্রিল্যান্সার। সেও হাতের কাজ করে, কিন্তু ডিজিটাল হাতে। কোড লেখে, ওয়েবসাইট বানায়, সমস্যা সমাধান করে। তার দক্ষতাটাও কারিগরি। শুধু হাতুড়ি আর স্ক্রু-ড্রাইভারের বদলে কিবোর্ড আর মাউস।

পার্থক্যটা টুলে না। পার্থক্যটা মানসিকতায়।

জাহিদ সেন্টার থেকে বের হয়ে হাঁটতে শুরু করল।

রাস্তার পাশে একটা ইলেকট্রিকের দোকান। একজন মিস্ত্রি একটা মোটর ঠিক করছে। তার কোনো সার্টিফিকেট নেই, কোনো ট্রেনিং নেই। শিখেছে দেখে দেখে, করতে করতে। সে ভালো কাজ করে। কিন্তু সে জানে না কেন করছে। কোন তারে কত ভোল্ট, কোন কানেকশনে কোন ঝুঁকি, কোথায় আর্থিং দরকার। একদিন ভুল হবে। শর্ট সার্কিট। আগুন। তখন কে দায়ী?

কেউ না। কারণ দোষটা সিস্টেমের। যে সিস্টেম দক্ষ মানুষ তৈরি করে না, অদক্ষ মানুষকে কাজ করতে বাধ্য করে, সেই সিস্টেম দায়ী।

একটু দূরে একটা কনস্ট্রাকশন সাইট। ইট ভাঙছে শ্রমিকরা। ওপরে রড বাঁধছে আরেক দল। তারা কি জানে রড কীভাবে বাঁধতে হয়? কংক্রিটের অনুপাত কত হওয়া দরকার? ভূমিকম্পে কোন স্ট্রাকচার টিকবে, কোনটা ভেঙে পড়বে? জানে না। কেউ শেখায়নি। কেউ শেখাতে চায়নি। কারণ শেখানোর মানুষ তৈরি করতে হলে কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে হয়। আর বিনিয়োগ করতে হলে কারিগরি শিক্ষাকে সম্মান দিতে হয়। আর সম্মান দিতে হলে আগে এই মিথ্যাটা ভাঙতে হয়: "কারিগরি শিক্ষা মেধাবীদের জন্য না।"

১০

বাড়ি ফিরে জাহিদ ল্যাপটপ খুলল।

সার্চ করল: "Bangladesh technical education enrollment rate." তথ্য পেল। মোট ছাত্রছাত্রীর মাত্র চৌদ্দ শতাংশ কারিগরি শিক্ষায়। বাকি ছিয়াশি শতাংশ সাধারণ শিক্ষায়। জার্মানিতে এই অনুপাত প্রায় উল্টো। সেখানে পঞ্চাশ শতাংশের বেশি ছাত্র কারিগরি বা ভোকেশনাল পথে যায়। দক্ষিণ কোরিয়ায় পঁচিশ শতাংশ। এমনকি ভারতেও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি।

আরো পড়ল। বাংলাদেশে প্রতি বছর বিশ লাখের বেশি তরুণ শ্রমবাজারে ঢোকে। তাদের বেশিরভাগের কোনো কারিগরি দক্ষতা নেই। তারা সাধারণ ডিগ্রি নিয়ে আসে। BA, BBA, BSS। তারপর খোঁজে চাকরি। চাকরি নেই। কারণ বাজার যে মানুষ চায়, তারা সেই মানুষ না। বাজার চায় টেকনিশিয়ান, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, মেকানিক, নার্স, সার্ভেয়ার। তারা হয়ে এসেছে ডিগ্রিধারী বেকার।

একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি। একদিকে লাখ লাখ বেকার। অন্যদিকে লাখ লাখ চাকরি খালি। মাঝখানে একটা বিশাল ফাঁক। সেই ফাঁকের নাম skills gap।

১১

জাহিদ নোটবুকে লিখল।

কেন এই ফাঁক?

এক: পরিবারের চাপ। "আমার ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে।" এটা স্বপ্ন না, এটা সামাজিক বাধ্যবাধকতা। ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়লে বাবার মুখ কালো। পাড়ায় কথা ওঠে। মেয়ে দেখতে গেলে জিজ্ঞেস করে, "ছেলে কোথায় পড়ে?" পলিটেকনিক বললে চুপ হয়ে যায়।

দুই: তথ্যের অভাব। বেশিরভাগ পরিবার জানে না কারিগরি শিক্ষায় কী কী পথ আছে। মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং শুনলে ভাবে মাছ ধরা। এভিয়েশন মেইনটেন্যান্স শুনলে ভাবে পাইলটের পিয়ন। নার্সিং শুনলে ভাবে ওয়ার্ড বয়। তথ্য না থাকলে সিদ্ধান্ত ভুল হয়। এটা confirmation bias-এর চেয়েও বড় সমস্যা। এটা information vacuum।

তিন: সরকারি বিনিয়োগের অভাব। সাধারণ শিক্ষায় যত বিনিয়োগ হয়, কারিগরি শিক্ষায় তার ভগ্নাংশ। ভালো ল্যাব নেই, ভালো ইন্সট্রাক্টর নেই, আপডেটেড কারিকুলাম নেই। পলিটেকনিকে এখনো সিলেবাস পড়ানো হয় যেটা বিশ বছর আগের। পৃথিবী বদলে গেছে, সোলার এনার্জি এসেছে, EV এসেছে, অটোমেশন এসেছে। সিলেবাস আটকে আছে আগের জায়গায়।

১২

সন্ধ্যায় ফারুক আবার ফোন করল।

"কেমন লাগল?"

জাহিদ বলল, "চোখ খুলে গেছে।"

"জানিস, আমি যখন পলিটেকনিকে ভর্তি হই, ক্লাসে আশিজন ছিল। তার মধ্যে কতজন নিজে থেকে এসেছে জানিস? দশজন। বাকি সত্তরজন এসেছে কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়নি। তারা মনে করত এটা second choice। ব্যাকআপ প্ল্যান। তাদের চোখে লজ্জা ছিল। ক্লাসমেটদের বলত, 'পরের বার ভার্সিটিতে ট্রাই করব।'"

"কেউ ট্রাই করেছে?"

"কয়েকজন। ডিপ্লোমার পর চলে গেছে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। ডিগ্রি নিতে। কারণ ডিগ্রি না থাকলে লোকে সম্মান দেয় না।"

জাহিদ ভাবল রাকিব ভাইয়ের কথা। গার্মেন্টসে কাজ করে। তেইশ হাজার টাকা। কোনো ডিপ্লোমা নেই, কোনো ট্রেনিং নেই। যদি ফারুকের মতো পলিটেকনিক করত, আজ কোথায় থাকত?

এই "যদি"-টা অনেক বড়। লাখ লাখ রাকিবের জন্য।

১৩

রাতে জাহিদ বিছানায় শুয়ে ভাবল।

সে ফ্রিল্যান্সার। সে কোড লেখে। এটাও কারিগরি দক্ষতা। সে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শেখেনি। সে শিখেছে YouTube-এ, Udemy-তে, Stack Overflow-তে। হাতে করতে করতে। ভুল করে করে।

সে কি কারিগরি শিক্ষিত? হ্যাঁ। শুধু সে নিজেকে সেভাবে ভাবে না। কারণ তার ল্যাপটপ আছে, ডলারে আয় করে, ক্লায়েন্ট আমেরিকায়। তাই তাকে "ফ্রিল্যান্সার" বলে। কিন্তু ফারুক যদি ল্যাপটপের বদলে মাল্টিমিটার ধরে, হেলমেট পরে সাইটে যায়, তাকে বলে "মিস্ত্রি।"

একই জিনিস। একই দক্ষতা। একই হাতের কাজ। শুধু টুল আলাদা, পরিবেশ আলাদা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা।

এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই সমস্যা। এই দৃষ্টিভঙ্গিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় skills gap তৈরি করেছে। কারণ যে কাজকে সম্মান দেওয়া হয় না, সেই কাজ শিখতে কেউ যায় না। আর কেউ না গেলে দক্ষ মানুষ তৈরি হয় না। আর দক্ষ মানুষ না থাকলে অর্থনীতি ঠিকমতো চলে না। চলে, কিন্তু হোঁচট খেতে খেতে চলে।

১৪

ফারুকের কথা মাথায় ঘুরছে।

"জানিস ভাই, আমাদের দেশে একটা ছেলে BBA করে চাকরি পায় না, সে বেকার। একটা ছেলে ডিপ্লোমা করে চাকরি পায়, সে 'মিস্ত্রি।' সমাজ বেকারকে সম্মান দেয় কারণ তার ডিগ্রি আছে। মিস্ত্রিকে সম্মান দেয় না কারণ তার হাত নোংরা হয়।"

এটা ফারুক বলেছিল ক্যান্টিনে, সিঙাড়া খেতে খেতে। কিন্তু কথাটা সিঙাড়ার মতো হালকা ছিল না। কথাটা ভারী। এত ভারী যে জাহিদ সেটা গিলতে পারছে না।

কারণ সে জানে ফারুক ঠিক বলেছে।

বাংলাদেশে বেকার ডিগ্রিধারী সম্মানিত। কর্মরত কারিগর অসম্মানিত। এটা কোনো যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটা stigma। এটা গভীরে বসা একটা বিশ্বাস যেটা ডেটা দিয়ে ভাঙা যায় না, যুক্তি দিয়ে ভাঙা যায় না। শুধু সময়ে ভাঙে। আর সময় লাগে প্রজন্ম।

১৫

ঘুমের আগে জাহিদ একটা লাইন লিখল নোটপ্যাডে।

"হাতের কাজ জানা মানে হাতের মুক্তি। কারণ হাতের কাজ কেউ কেড়ে নিতে পারে না।"

পড়ল। ভাবল। রহমান স্যারের কথা মনে পড়ল। ফারুকের হাসি মনে পড়ল। সোলার প্যানেলে কাজ করা মেয়ে তিনজনের মুখ মনে পড়ল। ওয়েল্ডিং বুথের ছেলেটার চোখ মনে পড়ল।

তারপর আরেকটা লাইন লিখল।

"বিশ্ববিদ্যালয় একটা ডিগ্রি দেয়। কারিগরি শিক্ষা একটা দক্ষতা দেয়। ডিগ্রি দেওয়ালে টাঙানো যায়। দক্ষতা দিয়ে পেট চালানো যায়।"

এটা পুরো সত্য না। বিশ্ববিদ্যালয়ও দক্ষতা দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায়, এই মুহূর্তে, এই অর্থনীতিতে, এই শ্রমবাজারে, যে জিনিসটার সবচেয়ে বেশি অভাব সেটা ডিগ্রি না। সেটা হাত।

করতে পারা হাত।

ঠিক করতে পারা হাত।

বানাতে পারা হাত।

ফোন বন্ধ করল। চোখ বন্ধ করল। বাইরে শীতের হাওয়া। কাল আবার কাজ। কিবোর্ডে হাত রাখবে, কোড লিখবে, সমস্যা সমাধান করবে। সেও হাতের কাজই করে।

কিন্তু আজ থেকে সে জানে, যে হাতে হাতুড়ি ধরে, যে হাতে সোলার প্যানেল ইনস্টল করে, যে হাতে ইঞ্জিন খোলে, সেই হাতও তার হাতের মতোই মূল্যবান।

হয়তো বেশি।