মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং
সমুদ্রে ছয় মাস, বাড়িতে ছয় মাস
১
দাওয়াতটা ছিল ফুপুর বাড়িতে। ফুপুর মেয়ের বিয়ের পরদিন, বৌভাত। গ্রামের বাড়ি না, জেলা শহরে ফুপুর ভাড়া বাসায়। ছোট ফ্ল্যাট, দুই রুম। কিন্তু দাওয়াত মানে দাওয়াত, জায়গা যত ছোটই হোক, মানুষ ঠিকই ভরে যায়।
জাহিদ গিয়েছিল মায়ের সাথে। এসব দাওয়াতে যেতে তার ভালো লাগে না। পরিচিত-অপরিচিত মানুষের ভিড়, একই প্রশ্ন বারবার। "কী করো?" "চাকরি পেয়েছ?" "বিয়ে কবে?" জাহিদ ফ্রিল্যান্সার, এটা বলার পর মানুষের চোখে যে দ্বিধাটা আসে, সেটা সে চেনে। "ও, মানে বাসায় বসে কম্পিউটারে কিছু একটা করো" ধরনের চাহনি।
খাওয়ার পর বারান্দায় দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল জাহিদ। একা। ভেতরে মহিলারা গল্প করছে, পুরুষেরা বৈঠকখানায়। জাহিদের সমবয়সী কেউ নেই এই দাওয়াতে। অন্তত সে তাই ভেবেছিল।
তখন একটা ছেলে এসে দাঁড়াল পাশে। জাহিদের চেয়ে তিন-চার বছরের বড় হবে। গায়ের রঙ রোদে পোড়া, কিন্তু চেহারায় একটা আলাদা ভাব। ফিট শরীর, টানটান। পোশাক সাধারণ, একটা পোলো শার্ট আর জিন্স, কিন্তু জিনিসগুলো ভালো মানের। ঘড়িটা চোখে পড়ল জাহিদের। বড়, ভারী, স্টিলের ঘড়ি। এলাকার ছেলেরা এই ধরনের ঘড়ি পরে না।
"তুমি জাহিদ না? সালমা আন্টির ছেলে?"
জাহিদ তাকাল। চেনা মুখ, কিন্তু ঠিক মেলাতে পারছে না।
"আমি নাজমুল। মতিন চাচার ছেলে। আমরা একই পাড়ায় থাকতাম, তুমি তখন ক্লাস ফাইভ-সিক্সে পড়ো।"
জাহিদের মনে পড়ল। নাজমুল ভাই। মতিন চাচার বড় ছেলে। পাড়ার ছেলেদের সাথে ক্রিকেট খেলত। তারপর একসময় চলে গেছে, কোথায় গেছে কেউ ঠিক জানত না।
২
"আপনি এখন কোথায় থাকেন?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
নাজমুল হাসল। "কোথায় থাকি, সেটা একটু জটিল প্রশ্ন। ছয় মাস সমুদ্রে থাকি। ছয় মাস বাড়িতে।"
"সমুদ্রে?"
"আমি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। কার্গো শিপে কাজ করি। ইন্টারন্যাশনাল রুট।"
জাহিদ চা-এর কাপ নামিয়ে রাখল। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। শব্দটা শুনেছে, কিন্তু আসলে কী করে একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, সেটা জানে না। জাহাজে কাজ করে, এটুকু বোঝে। কিন্তু কীভাবে, কোথায়, কত টাকায়, এসব কিছুই জানে না।
"HSC-এর পর বাংলাদেশ মেরিন একাডেমিতে ভর্তি হয়েছিলাম। চট্টগ্রামে।" নাজমুল বলল। "চার বছরের ডিপ্লোমা। তারপর থেকে জাহাজে।"
"মেরিন একাডেমি?" জাহিদ এই নামটাও প্রথম শুনছে। চট্টগ্রামে একটা মেরিন একাডেমি আছে, এটা সে জানত না। BUET জানে, মেডিকেল জানে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জানে। কিন্তু মেরিন একাডেমি? মফস্বলে কেউ এই নাম উচ্চারণ করে না।
৩
নাজমুলের বয়স আটাশ। জাহিদের চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। HSC পাস করে সরাসরি বাংলাদেশ মেরিন একাডেমিতে ভর্তি হয়েছিল। কীভাবে জানল এই একাডেমির কথা, সেটা জিজ্ঞেস করতেই নাজমুল বলল, "আমার এক দূরসম্পর্কের মামা ছিলেন, উনি মার্চেন্ট নেভিতে। বছরে একবার বাড়ি আসতেন। উনি বললেন, তোর সায়েন্সে ভালো রেজাল্ট, একবার চেষ্টা কর।"
"আর কেউ বলেনি?"
"কেউ না।" নাজমুল মাথা নাড়ল। "স্কুলের কোনো টিচার বলেননি। কোচিং সেন্টারে কেউ বলেনি। পাড়ায় কেউ জানে না এই পথ আছে। সবাই বলে ডাক্তার হও, ইঞ্জিনিয়ার হও, BCS দাও। কেউ বলে না জাহাজে যাও।"
জাহিদ ভাবল, সত্যিই তো। সে নিজেও কখনো শোনেনি। HSC-এর পর কোন কোন পথ আছে, এই আলোচনায় মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর নাম কখনো ওঠেনি। মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, ইউনিভার্সিটি, BCS। এই চারটা ছাড়া আর কিছু যেন নেই।
"ভর্তি পরীক্ষা কেমন?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
"লিখিত পরীক্ষা আছে। ফিজিক্স, ম্যাথ, ইংলিশ। তারপর ফিজিক্যাল ফিটনেস টেস্ট। এটা গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রে কাজ করতে হবে, শরীর ফিট না হলে হবে না। চোখের দৃষ্টি ভালো থাকতে হবে। উচ্চতার রিকোয়ারমেন্ট আছে। অনেকে লিখিত পাস করেও ফিজিক্যালে বাদ পড়ে।"
৪
নাজমুল চায়ে চুমুক দিল। তারপর বলল, "একাডেমি কঠিন। খুব কঠিন। আমাদের ব্যাচে ষাটজন ভর্তি হয়েছিল। পাস করে বের হয়েছে ছত্রিশজন।"
"চব্বিশজন কী করল?"
"কেউ ছেড়ে দিয়েছে। কেউ ফেল করেছে। কেউ ফিজিক্যালি পারেনি। সমুদ্রে যেতে হয় ট্রেনিং-এর সময়। জাহাজে উঠে অনেকে বুঝতে পারে এটা তাদের জন্য না। সমুদ্রে দোলাচলে বমি হয়, ক্লোজড স্পেসে কাজ করতে হয়, ইঞ্জিন রুমে তাপমাত্রা পঞ্চাশ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়। সবাই সহ্য করতে পারে না।"
"চল্লিশ পার্সেন্ট ড্রপআউট।" জাহিদ হিসাব করল।
"হ্যাঁ। কিন্তু যারা টেকে, তারা টেকে ভালোভাবে।"
নাজমুল একটু সোজা হয়ে দাঁড়াল। "চার বছরের ট্রেনিং-এ তোমাকে শেখানো হয় ইঞ্জিন, মেশিনারি, ইলেকট্রিক্যাল সিস্টেম, নেভিগেশন, সেফটি, ফায়ার ফাইটিং, ফার্স্ট এইড, সার্ভাইভাল। একটা জাহাজ একটা ভাসমান শহর। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে পানি পরিশোধন, সব সেই জাহাজেই হয়। এবং সেই সব সিস্টেমের দেখভাল করে ইঞ্জিনিয়ার।"
৫
"এখন আপনি কোন পজিশনে?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
"ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার। জুনিয়র পজিশন।"
"বেতন?"
নাজমুল একটু হাসল। এই প্রশ্নটা সে আশা করছিল। "মাসে এক লাখ বিশ হাজার। এটা বেসিক আর অ্যালাউন্স মিলিয়ে। ডলারে পাই, ব্যাংকে জমা হয়।"
জাহিদ চুপ করে রইল। এক লাখ বিশ হাজার। আটাশ বছর বয়সে। মফস্বলের একটা ছেলে, যার বাবা ছোট ব্যবসায়ী।
"এটা ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ারের বেতন।" নাজমুল বলল। "থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হলে দেড় থেকে দুই লাখ। সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার হলে আড়াই থেকে তিন লাখ। চিফ ইঞ্জিনিয়ার হলে তিন থেকে পাঁচ লাখ। দশ-বারো বছর লাগে চিফ হতে।"
"পাঁচ লাখ টাকা?"
"মাসে।" নাজমুল ঘাড় নাড়ল। "এবং সমুদ্রে থাকার সময় কোনো খরচ নেই। খাওয়া কোম্পানির। থাকা কোম্পানির। কাপড়-চোপড়, জুতা, সব কোম্পানির। মানে পুরো বেতনটা সেভিংস।"
জাহিদ ফ্রিল্যান্সিং থেকে মাসে তিরিশ-চল্লিশ হাজার টাকা আয় করে। ভালো মাসে পঞ্চাশ হাজার। সেখান থেকে পরিবারকে দেয়, নিজের খরচ চালায়, কিছু জমায়। এক লাখ বিশ হাজার, যার পুরোটাই সেভিংস। এটা অন্য একটা জগৎ।
৬
"কিন্তু একটা জিনিস আছে।" নাজমুল বলল, কণ্ঠস্বর একটু বদলাল। "ছয় মাস সমুদ্রে মানে ছয় মাস পরিবার নেই। বন্ধু নেই। মাটি নেই।"
"ফোন করা যায় না?"
"কখনো কখনো স্যাটেলাইট ফোন পাওয়া যায়। কিন্তু খরচ অনেক। বেশিরভাগ সময় ইন্টারনেট থাকে না। পোর্টে জাহাজ ভিড়লে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়, কিন্তু পোর্ট থেকে পোর্ট যেতে দুই সপ্তাহ, তিন সপ্তাহ, কখনো এক মাস লেগে যায়। সেই সময়টায় তুমি সমুদ্রের মাঝখানে। চারদিকে পানি। কোনো সংযোগ নেই।"
জাহিদ কল্পনা করল। এক মাস। ফোন নেই, ইন্টারনেট নেই। মা-বাবার সাথে কথা বলার উপায় নেই। কোনো খবর আসে না, কোনো খবর যায় না। বাড়িতে কেউ অসুস্থ হলে জানারও উপায় নেই।
"প্রথম ভয়েজের সময় আমার সবচেয়ে কষ্ট হয়েছিল।" নাজমুল বলল। "আমার বয়স তখন বাইশ। জাহাজ ছাড়ার দিন মা কাঁদছিলেন। আমিও চোখ লুকিয়ে কেঁদেছি। প্রথম দুই সপ্তাহ ঘুম হতো না। ইঞ্জিন রুমে কাজ করতে করতে মনে হতো, আমি কোথায় আছি? এই বিশাল জাহাজে তিরিশজন মানুষ, তার মধ্যে বাংলাদেশি আমি একা। বাকি সব ফিলিপিনো, ইন্ডিয়ান, ইউক্রেনিয়ান। ভাষা বুঝি না ঠিকমতো। খাবার অচেনা। সবকিছু অচেনা।"
৭
"তাহলে কেন থাকলেন?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
নাজমুল চুপ করে তাকাল। তারপর বলল, "কারণ বিকল্প কী ছিল? আমি মফস্বলের ছেলে। বাবার দোকান আছে একটা, মাসে পনেরো-বিশ হাজার আসে। আমি NU থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং করতে পারতাম না, BUET-এ চান্স পাইনি। মেরিন একাডেমিতে সুযোগ পেয়েছিলাম। সেই সুযোগ ছাড়লে কী করতাম? প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ার টাকা নেই। BCS দিতাম? তিন লাখ মানুষের সাথে যুদ্ধ?"
একটু থামল।
"আর একটা কথা আছে।" নাজমুল বলল। "ছয় মাস সমুদ্রে থাকি, সেটা সত্য। কিন্তু বাকি ছয় মাস আমি পুরোপুরি ফ্রি। কোনো অফিস নেই। কোনো বস নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে যা ইচ্ছা তাই করি। বাড়িতে থাকি, মা-বাবার সাথে সময় কাটাই, বন্ধুদের সাথে ঘুরি। পুরো বেতন পাই ছুটির সময়েও। এটাকে বলে paid leave। ছয় মাসের paid leave।"
"আপনার ক্লাসমেটরা?"
"আমার HSC-এর ক্লাসমেটরা কী করে? কেউ ব্যাংকে চাকরি করে, মাসে পঁচিশ-তিরিশ হাজার। কেউ প্রাইভেট কোম্পানিতে। কেউ এখনো BCS-এর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা সারাবছর অফিসে বসে থাকে। সকাল নয়টা রাত আটটা। ছুটি পায় বছরে পনেরো দিন।" নাজমুল একটু হাসল। "আমি ছয় মাস সমুদ্রে থাকি। ছয় মাস বাড়িতে ঘুরি। আমার ক্লাসমেটরা সারাবছর অফিসে বসে থাকে। কে বেশি স্বাধীন?"
প্রশ্নটা শূন্যে ঝুলে রইল।
৮
জাহিদ ভাবছিল অন্য একটা জিনিস। মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং। এই পথটা কেন কেউ জানে না?
সে নিজে তেইশ বছর বয়সী। চার বছর ফ্রিল্যান্সিং করেছে। এর মধ্যে bdfacts.org থেকে বাংলাদেশের অনেক তথ্য জেনেছে, বিভিন্ন ক্যারিয়ার নিয়ে পড়েছে। কিন্তু মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং? এটা তার রাডারেই ছিল না।
কারণটা সহজ। কোনো কোচিং সেন্টার মেরিন একাডেমির ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি করায় না। কোনো গাইডবুকের দোকানে "মেরিন ভর্তি গাইড" নামে কোনো বই নেই। স্কুলের ক্যারিয়ার গাইডেন্স বলে কিছু নেই, থাকলেও সেখানে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-BCS ছাড়া কোনো পথের কথা বলা হয় না। পত্রিকায় এই নিয়ে কোনো ফিচার নেই। টিভিতে কোনো আলোচনা নেই। ইউটিউবে কিছু ভিডিও আছে, কিন্তু মফস্বলের একটা ছেলে যে ইউটিউবে "মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যারিয়ার" সার্চ করবে, তার আগে তাকে তো জানতে হবে এই জিনিসটা আছে।
যেটা জানোই না, সেটা খুঁজবে কীভাবে?
নাজমুল জানত কারণ তার একজন আত্মীয় এই লাইনে ছিলেন। সেই একজন মানুষ না থাকলে নাজমুলও জানত না। এবং নাজমুলের মতো আরো হাজার হাজার ছেলে আছে যাদের সেই একজন আত্মীয় নেই। তারা মেরিন একাডেমির নাম শোনেইনি।
৯
"মানুষ কী বলে?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল। "আপনি যখন বলেন জাহাজে কাজ করেন?"
নাজমুলের মুখে একটা তেতো হাসি ফুটল।
"বেশিরভাগ মানুষ ভাবে আমি জাহাজের শ্রমিক। মানে ডক ওয়ার্কার, বা নাবিক, বা এই টাইপের কিছু। 'জাহাজে কাজ' শুনলে মানুষের মাথায় যে ছবিটা আসে, সেটা হলো একটা লোক দড়ি ধরে টানছে, বা পোর্টে মালপত্র ওঠানামা করছে।"
"কিন্তু আপনি তো ইঞ্জিনিয়ার।"
"আমি ইঞ্জিনিয়ার। আমি একটা জাহাজের ইঞ্জিন রুম ম্যানেজ করি। সেই জাহাজ হাজার হাজার টন কার্গো নিয়ে আটলান্টিক পার হয়। কিন্তু এটা বোঝানো কঠিন। মানুষ শোনে 'জাহাজে কাজ', তারপর মাথায় একটা শ্রমিকের ছবি আঁকে।"
নাজমুল চায়ের কাপটা রেলিং-এ রাখল।
"গত বছর একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। একজন জিজ্ঞেস করলেন, 'বাবা, কোথায় চাকরি করো?' বললাম, মার্চেন্ট নেভিতে, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। উনি বললেন, 'ও, জাহাজে কাজ? সেটা তো শ্রমিকের কাজ। পড়ালেখা করে কেন জাহাজে গেলে?'"
নাজমুল একটু থামল।
"সেই ভদ্রলোক একটা সরকারি অফিসে পিয়ন। মাসে ষোলো হাজার টাকা পান। আমি মাসে এক লাখ বিশ হাজার পাই। কিন্তু উনি আমাকে দয়া করছেন কারণ আমি 'জাহাজে কাজ' করি।"
১০
স্টিগমাটা গভীর। জাহিদ বুঝতে পারল।
বাংলাদেশে পেশার একটা অলিখিত মর্যাদাক্রম আছে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, BCS ক্যাডার, এরা উপরে। ব্যাংকার, শিক্ষক, এরা মাঝামাঝি। ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সার, এরা অনিশ্চিত শ্রেণিতে। আর "জাহাজে কাজ" মানে একেবারে নিচে, কারণ মানুষ ভাবে সেটা কায়িক শ্রম।
কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। একজন মার্চেন্ট নেভি অফিসার বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি বেতন পাওয়া পেশাজীবীদের একজন। একজন চিফ ইঞ্জিনিয়ারের মাসিক আয় একজন সরকারি সচিবের চেয়ে বেশি। একজন ক্যাপ্টেনের আয় একজন জজের চেয়ে বেশি। কিন্তু সামাজিক মর্যাদায়? সচিব বা জজের ধারেকাছেও নেই মার্চেন্ট নেভি অফিসার। কারণ মানুষ বেতন দেখে না, মানুষ দেখে "কী কাজ করো?" এবং "জাহাজে কাজ" শুনলেই একটা ফিল্টার চালু হয়ে যায়।
১১
"আপনাকে কি কখনো আফসোস হয়?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
নাজমুল ভাবল কিছুক্ষণ। "দুই ধরনের আফসোস আছে। একটা হলো পরিবার থেকে দূরে থাকা। সেটা আসলেই কষ্টের। গত বছর আমার ছোট বোনের বিয়ে হয়েছে। আমি সমুদ্রে ছিলাম। ভিডিও কলে দেখেছি, সেটাও পোর্টে পৌঁছানোর পর। বিয়ের তিন দিন পর।"
"আর দ্বিতীয় আফসোস?"
"দ্বিতীয়টা হলো মানুষের বোঝাবোঝির অভাব। আমি যা করি, সেটার মূল্য মানুষ দেয় না। একজন BCS ক্যাডার বাড়ি আসলে সবাই সালাম করে। আমি বাড়ি আসি, মানুষ জিজ্ঞেস করে, 'এবার কি ভালো চাকরি খুঁজছ?'" নাজমুল হাসল। "আমি এখনো 'ভালো চাকরি' খুঁজছি মানুষের চোখে।"
জাহিদ চুপ করে শুনল। সে নিজেও এই অভিজ্ঞতা চেনে। ফ্রিল্যান্সার বললে মানুষ ভাবে বেকার। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার বললে মানুষ ভাবে শ্রমিক। মানুষের মাথায় একটা ছোট্ট তালিকা আছে: ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, BCS। এই তালিকার বাইরে যা কিছু, সেটা সন্দেহজনক।
১২
সন্ধ্যা নামছিল। বারান্দায় আলো জ্বলে উঠল। ভেতর থেকে দাওয়াতের হইচই আসছে। কিন্তু জাহিদ আর নাজমুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে। জাহিদ শুনছে, নাজমুল বলছে।
নাজমুল পকেট থেকে ফোন বের করল। "একটু দেখবে?"
গ্যালারি খুলল। একটা ছবি দেখাল। সকালবেলা। সমুদ্রের উপর সূর্য উঠছে। পানি লাল-কমলা। আকাশ একটা আগুনের ক্যানভাস। এবং সেই আগুনের মধ্যে জাহাজের ডেকের রেলিং দেখা যাচ্ছে।
"আটলান্টিক।" নাজমুল বলল। "গত বছর, জানুয়ারি। ব্রাজিল থেকে পর্তুগাল যাচ্ছিলাম।"
পরের ছবি। সিঙ্গাপুর পোর্ট। রাতের বেলা। হাজার হাজার কন্টেইনারের সারি, আর তার পেছনে সিঙ্গাপুরের স্কাইলাইন। আলোয় ঝলমল।
পরের ছবি। ভূমধ্যসাগর। নীল পানি, এত গাঢ় নীল যে মনে হয় কালি ছড়িয়ে দিয়েছে কেউ। দূরে গ্রিসের কোনো দ্বীপ দেখা যাচ্ছে, সাদা ঘরবাড়ি, পাথরের পাহাড়।
"এই দৃশ্যগুলো আমার অফিস থেকে দেখা।" নাজমুল বলল। "কোনো BCS অফিসার তার অফিসের জানালা দিয়ে এটা দেখে না।"
জাহিদ ছবিগুলো দেখল। আটলান্টিকের সূর্যোদয়, সিঙ্গাপুরের রাত, ভূমধ্যসাগরের নীল। এই দৃশ্যগুলো দেখার জন্য মানুষ লাখ লাখ টাকা খরচ করে ক্রুজে যায়। নাজমুল এগুলো দেখে প্রতিদিন। এবং তার জন্য টাকা খরচ করতে হয় না, বরং টাকা পায়।
১৩
ফোন পকেটে রাখতে রাখতে নাজমুল বলল, "আমি জানি এই জীবন সবার জন্য না। ছয় মাস পরিবার ছাড়া থাকা সবাই পারবে না। সমুদ্রের একাকীত্ব সবাই সহ্য করতে পারবে না। ইঞ্জিন রুমের গরম, শব্দ, শিফট ডিউটি, এসব সবার জন্য না।"
একটু থামল।
"কিন্তু এই পথটা অন্তত জানা দরকার। সবাই এটা বেছে নেবে, সেটা আশা করি না। কিন্তু জানবে তো? যে ছেলেটা HSC পাস করে BCS ছাড়া কোনো পথ দেখতে পাচ্ছে না, সে অন্তত জানুক এটাও একটা পথ। হয়তো তার জন্য এটাই সঠিক পথ। কিন্তু সে জানবে কীভাবে? তাকে কে বলবে?"
জাহিদ কিছু বলল না।
নাজমুল বলল, "আমার জেলায় আমিই সম্ভবত একমাত্র মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। পুরো জেলায়। দশ লাখ মানুষের জেলা। একজন।"
কথাটা শুনে জাহিদের কিছু একটা নড়ল ভেতরে। দশ লাখ মানুষের জেলায় একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। এর মানে এই না যে এই পেশায় সুযোগ কম। এর মানে হলো এই পেশার কথা কেউ জানে না।
১৪
দাওয়াত শেষ। মানুষ বিদায় নিচ্ছে। জাহিদ আর নাজমুল বারান্দা থেকে নামল।
নাজমুলকে জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "পরের ভয়েজ কবে?"
"দুই মাস পর। এবার রুট হবে সিঙ্গাপুর থেকে রটারডাম। সুয়েজ ক্যানেল দিয়ে যাব।"
সুয়েজ ক্যানেল। জাহিদ স্কুলে ভূগোলে পড়েছে। কিন্তু সেটা বইয়ের ম্যাপে। নাজমুল সেই ক্যানেল দিয়ে আসলেই যাবে। একটা জাহাজে করে। সেটা তার কাজ।
"ভাই, আপনার নম্বরটা দেন।" জাহিদ বলল। "আমি কিছু জানতে চাইতে পারি।"
নাজমুল নম্বর দিল। তারপর বলল, "তোমাকে একটা কথা বলি। আমি চট্টগ্রামে যাওয়ার আগে আমার বাবাকে বোঝাতে পারিনি কেন জাহাজে যাচ্ছি। বাবা চাইতেন আমি লোকাল কোথাও চাকরি করি। দোকানে বসি। কাছে থাকি। আজ বাবা বোঝেন। কারণ আজ আমি বাবার জন্য একটা জমি কিনেছি। দুই বিঘা। নিজের রোজগারে। বাবার সারাজীবনের স্বপ্ন ছিল একটুকরো নিজের জমি। আমি সেটা দিতে পেরেছি।"
নাজমুল হাত বাড়াল। জাহিদ হাত মেলাল।
নাজমুল হেঁটে গেল। জাহিদ দাঁড়িয়ে রইল। আটলান্টিকের সূর্যোদয়ের ছবিটা মাথায় ঘুরছে। একটা পথ যেটা কেউ জানে না। একটা পেশা যেটার নাম শুনলে মানুষ ভাবে শ্রমিকের কাজ। কিন্তু সেই "শ্রমিক" বাবার জন্য জমি কেনে, সমুদ্রের ওপর সূর্যোদয় দেখে, আর মাসে এক লাখ বিশ হাজার টাকা ব্যাংকে জমায়।
মফস্বলের ছেলেরা জানে না। কেউ বলেনি তাদের।
---
*নবম অধ্যায়: হাতের কাজ, হাতের মুক্তি। পর্ব ৮২/১০০।*