নার্সিং: সেবা না চাকরি?
তিন লাখ নার্স দরকার, সত্তর হাজার আছে, আর ছেলেরা এই পেশায় গেলে লোকে হাসে
১
সুমাইয়া জাহিদকে হাসপাতালে ডেকে আনল।
ঢাকার একটা সরকারি হাসপাতাল। নাম বলার দরকার নেই। বাংলাদেশের যেকোনো সরকারি হাসপাতালে গেলে একই দৃশ্য দেখা যায়। করিডোরে রোগীর লাইন। মেঝেতে বসে আছে কেউ কেউ। দেয়ালে পোস্টার, অর্ধেক ছেঁড়া। ফ্যান ঘুরছে, কিন্তু গরম কমছে না। একটা গন্ধ, যেটা হাসপাতালের নিজস্ব, ডেটল আর ঘামের মিশ্রণ, একবার নাকে গেলে ভুলবে না।
সুমাইয়া ইন্টার্ন ডাক্তার। MBBS শেষ, এখন হাউজ অফিসার হিসেবে এক বছরের ইন্টার্নশিপ করছে। সকাল আটটায় ঢুকে রাত আটটায় বের হয়। কখনো কখনো বের হয় না। ত্রিশ ঘণ্টা একটানা ডিউটি। এটাকে বলে "অন কল।" বাইরের মানুষ শুনলে ভাববে যুদ্ধক্ষেত্র। আসলে যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়েও খারাপ, কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে অন্তত শিফট থাকে।
জাহিদ ইমার্জেন্সির সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। সুমাইয়া বের হলো পনেরো মিনিট পর। হাতে একটা চায়ের কাপ। চোখের নিচে কালি। চুল বাঁধা, কিন্তু কিছু চুল বের হয়ে এসেছে। অ্যাপ্রনে একটা দাগ, কী দাগ জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না জাহিদের।
"আয়, তোকে দুইজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই," সুমাইয়া বলল।
২
প্রথমজন তাসমিন। বয়স ছাব্বিশ। সিনিয়র স্টাফ নার্স। হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে কাজ করে।
তাসমিন ময়মনসিংহ নার্সিং ইনস্টিটিউট থেকে তিন বছরের ডিপ্লোমা করেছে। সরকারি ইনস্টিটিউট, খরচ প্রায় শূন্য। শুধু বই আর হোস্টেলের খরচ ছিল। তারপর বিএসসি ইন নার্সিং করেছে, আরো এক বছর। মোট চার বছর পড়াশোনা। এখন সরকারি হাসপাতালে চাকরি। মাসে বাইশ হাজার টাকা বেতন।
জাহিদ হিসাব করল। চার বছর পড়ে বাইশ হাজার টাকা।
"এইটুকু বেতনে চলে?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
তাসমিন হাসল। হাসিটা ক্লান্ত, কিন্তু তিক্ত না। বলল, "চলে। চলতে হয়। কিন্তু আমি এই বেতনের জন্য কাজ করি না।"
"তাহলে?"
"আমি NMC পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।"
জাহিদ চিনল না শব্দটা। "NMC মানে?"
সুমাইয়া বলল, "Nursing and Midwifery Council। UK-র নার্সিং লাইসেন্স পরীক্ষা। এটা পাস করলে UK-তে নার্স হিসেবে কাজ করা যায়।"
তাসমিন বলল, "CBT পরীক্ষা দিতে হবে আগে। Computer Based Test। তারপর OSCE, মানে প্র্যাক্টিক্যাল। দুটো পাস করলে UK-তে কাজের ভিসা পাওয়া যায়।"
"আর খরচ?"
"দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। কোচিং, পরীক্ষার ফি, ডকুমেন্ট প্রসেসিং মিলিয়ে।"
জাহিদ ভাবল। দুই লাখ টাকা। USMLE-র তুলনায় কিছুই না। ইউএসএমএলই-তে শুধু পরীক্ষার ফি পাঁচ থেকে ছয় লাখ, প্রস্তুতি খরচ আলাদা। আর NMC-তে দুই লাখে সব হয়ে যাচ্ছে।
"UK-তে গেলে বেতন কত?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
তাসমিন বলল, "ব্যান্ড ফাইভে শুরু হয়। বছরে পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার পাউন্ড। অভিজ্ঞতা বাড়লে ব্যান্ড সিক্সে উঠবে, পঁয়ত্রিশ হাজার পাউন্ড।"
জাহিদ মাথায় হিসাব করল। ত্রিশ হাজার পাউন্ড মানে বছরে প্রায় পঁয়তাল্লিশ লাখ টাকা। মাসে সাড়ে তিন লাখ। এখন পাচ্ছে বাইশ হাজার।
বাইশ হাজার থেকে সাড়ে তিন লাখ।
তাসমিন বলল, "আমার ব্যাচের তিনজন ইতিমধ্যে UK-তে চলে গেছে। একজন লন্ডনে NHS-এ কাজ করছে। একজন ম্যানচেস্টারে। আরেকজন বার্মিংহামে। তিনজনই এখন মাসে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা পাঠাচ্ছে দেশে।"
৩
দ্বিতীয়জনের সাথে পরিচয়টা একটু অন্যরকম হলো।
সুমাইয়া জাহিদকে নিয়ে গেল সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে। একজন পুরুষ নার্স ব্যান্ডেজ বদলাচ্ছে। হাতের কাজ নিপুণ, দ্রুত। রোগী একজন বয়স্ক মহিলা, ভয়ে চোখ বন্ধ করে আছেন। নার্স ধীরে ধীরে বলছে, "আম্মা, ব্যথা হবে না। একটু ঠাণ্ডা লাগবে, ব্যস।"
এই হলো রোমেল। বয়স চব্বিশ। পুরুষ। নার্স।
বাংলাদেশে এই তিনটা শব্দ পাশাপাশি বসলে মানুষ থামে। তাকায়। প্রশ্ন করে। কেউ কেউ হাসে। কেউ কেউ অবাক হয়। কেউ কেউ সরাসরি বলে, "ভাই, ডাক্তার হতে পারলেন না?"
রোমেল ব্যান্ডেজ বদলানো শেষ করে হাত ধুয়ে এলো। সুমাইয়া পরিচয় করিয়ে দিল। রোমেল জাহিদের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। হাসিটা সেই ধরনের যেটা অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে তৈরি হয়। প্র্যাকটিসড হাসি।
"আমি জানি তুমি কী জিজ্ঞেস করবে," রোমেল বলল। "সবাই একই প্রশ্ন করে।"
জাহিদ একটু লজ্জা পেল। কারণ সে সত্যিই সেই প্রশ্নটাই করতে যাচ্ছিল।
৪
রোমেল রাজশাহীর ছেলে। বাবা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। মা গৃহিণী। HSC-তে GPA ভালো ছিল, কিন্তু মেডিকেলে চান্স হয়নি। দুইবার দিয়েছে, দুইবার হয়নি। তৃতীয়বার দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না।
বাবা বলেছিলেন, "একটা কিছু কর। বসে থাকলে চলবে না।"
রোমেল ভাবল। প্রাইভেট মেডিকেলের খরচ বিশ থেকে পঁচিশ লাখ। বাবার পক্ষে অসম্ভব। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আগ্রহ নেই। ফার্মেসি ভালো অপশন, কিন্তু সেখানেও চান্স হলো না।
তখন একজন আত্মীয় বললেন, "নার্সিং কর।"
রোমেলের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল চুপ থাকা। তারপর বলল, "নার্সিং তো মেয়েদের।"
আত্মীয় বললেন, "কে বলেছে? সরকারি নার্সিং ইনস্টিটিউটে ছেলেদের জন্যও সিট আছে। আগে কম ছিল, এখন বাড়ছে। পড়ালেখা ভালো, চাকরি নিশ্চিত, বিদেশে যাওয়ার সুযোগ আছে।"
রোমেল ভর্তি হলো রাজশাহী নার্সিং ইনস্টিটিউটে। তিন বছরের ডিপ্লোমা। সরকারি, তাই খরচ প্রায় নেই।
প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকে দেখল, ষাটজনের ব্যাচে পুরুষ আটজন।
"আটজন," রোমেল বলল জাহিদকে। "বাকি বায়ান্নজন মেয়ে। প্রথম সপ্তাহে আমরা আটজন একসাথে বসতাম। মেয়েরা আলাদা বসত। কেউ কথা বলত না আমাদের সাথে। আমরাও বলতাম না। একটা অদ্ভুত দূরত্ব ছিল, যেটা সিলেবাসে নেই, কিন্তু ক্লাসরুমে আছে।"
৫
নার্সিং পড়ার সময় রোমেল বুঝল, স্টিগমা শুধু বাইরে না। ভেতরেও।
ক্লিনিক্যাল রোটেশনে হাসপাতালে গেল। প্রথমবার একজন মহিলা রোগীর ব্লাড প্রেশার মাপতে গেল। রোগীর মেয়ে বলল, "ভাইয়া, আপনি নার্স? আপা ডাকেন না একজন?"
রোমেল বলল, "আমিই নার্স।"
"না, মানে, একটু... আম্মা তো মহিলা..."
রোমেল বুঝল। ব্লাড প্রেশার মাপা। হাতে কাফ বাঁধা। এটুকুতেও সমস্যা, কারণ সে পুরুষ।
"আমি প্রথম ছয় মাসে অন্তত বিশবার এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি," রোমেল বলল। "রোগী বা রোগীর পরিবার বলেছে, ছেলে নার্স চাই না। মেয়ে নার্স দাও।"
"তুমি কী করতে?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
"চলে যেতাম। অন্য রোগী দেখতাম। মন খারাপ হতো। কিন্তু রাগ হতো না। কারণ আমি জানি, তারা খারাপ মানুষ না। তারা একটা ধারণা নিয়ে বড় হয়েছে। নার্স মানে মেয়ে। এটা তাদের দোষ না। এটা সিস্টেমের দোষ। সিস্টেম তাদের এটা শেখায়নি যে নার্সিং একটা পেশা, জেন্ডার না।"
জাহিদ কিছু বলল না। চুপ করে শুনল।
রোমেল বলল, "আর সবচেয়ে কষ্টের জায়গাটা জানো? পরিবার। আমার বাবা মেনে নিয়েছেন। মা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু আত্মীয়স্বজন, পাড়ার লোক, বাবার সহকর্মী, তারা এখনো জিজ্ঞেস করে, ছেলেটা কী করে? বাবা বলেন, নার্স। তারপর একটা নীরবতা পড়ে। সেই নীরবতাটা শুনতে কেমন জানো? শুনতে হাসির মতো। শব্দ নেই, কিন্তু অর্থ আছে।"
৬
জাহিদ সুমাইয়াকে জিজ্ঞেস করল, "বাংলাদেশে কত নার্স দরকার?"
সুমাইয়া বলল, "WHO-র স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী প্রতি দশ হাজার মানুষের জন্য তেত্রিশজন নার্স ও মিডওয়াইফ দরকার। বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় সতেরো কোটি। সেই হিসেবে দরকার তিন লাখেরও বেশি নার্স।"
"আছে কত?"
"সত্তর হাজারের মতো।"
জাহিদ চুপ করে রইল। তিন লাখ দরকার, সত্তর হাজার আছে। ঘাটতি আড়াই লাখের বেশি।
সুমাইয়া বলল, "আর শুধু বাংলাদেশ না। পুরো পৃথিবীতে নার্সের ঘাটতি। WHO বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ষাট লাখ নার্সের ঘাটতি হবে। UK-তে NHS-এ এই মুহূর্তে চল্লিশ হাজারের বেশি নার্সিং পদ খালি। কানাডায় পঞ্চাশ হাজারের বেশি। অস্ট্রেলিয়া, মিডল ইস্ট, সবাই নার্স খুঁজছে।"
"তাহলে বাংলাদেশ থেকে এত কম কেন যায়?"
"কারণ মানুষ নার্সিং পড়তে চায় না। পড়তে চায় না কারণ সমাজ বলে, নার্সিং ছোট পেশা। ডাক্তারের চেয়ে কম। আর ছেলেদের জন্য তো একদম না। ছেলে হলে ইঞ্জিনিয়ার হও, ডাক্তার হও, ব্যবসা কর। নার্স? ছেলে হয়ে নার্স?"
সুমাইয়ার গলায় তিক্ততা ছিল। কিন্তু সেটা নার্সিংয়ের প্রতি না। সেটা সিস্টেমের প্রতি।
৭
তাসমিন ফিরে এলো ব্রেকে। তিনজন মিলে হাসপাতালের ক্যান্টিনে বসল। ক্যান্টিন বলতে একটা ঘর, চারটা টেবিল, দেয়ালে মেনু লেখা। চা পাঁচ টাকা। সিঙ্গারা পাঁচ টাকা।
জাহিদ তাসমিনকে জিজ্ঞেস করল, "সরকারি নার্সিং ইনস্টিটিউটে ভর্তি খরচ কত?"
"প্রায় কিছুই না। সরকারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি ফি কয়েক হাজার টাকা। তিন বছরের ডিপ্লোমায় মোট খরচ পঞ্চাশ থেকে সত্তর হাজার, হোস্টেল, বই, ইউনিফর্ম সব মিলিয়ে।"
"আর প্রাইভেট?"
"প্রাইভেট নার্সিং ইনস্টিটিউটে দুই থেকে পাঁচ লাখ। মানের তারতম্য আছে। কিছু ভালো, কিছু শুধু টাকা খায়।"
রোমেল বলল, "সরকারি ইনস্টিটিউট ৪৩টা। প্রাইভেট আরো শ খানেক। কিন্তু সরকারিগুলোতে চান্স পাওয়া কঠিন। পরীক্ষা দিতে হয়। কম্পিটিশন আছে।"
জাহিদ বলল, "পলিটেকনিকের মতোই তাহলে।"
"হ্যাঁ। কিন্তু একটা পার্থক্য আছে। পলিটেকনিক থেকে বের হলে তোমাকে চাকরি খুঁজতে হয়। নার্সিং থেকে বের হলে চাকরি তোমাকে খোঁজে। সরকারি হাসপাতালে নিয়োগ পরীক্ষা হয়, কিন্তু পদ খালি থাকে সবসময়। প্রাইভেট হাসপাতালে তো ঢুকতেই পারবে। আর বিদেশ তো আছেই।"
৮
জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "বিদেশে যাওয়ার পথটা ঠিক কেমন?"
তাসমিন বলল, "দেশ অনুযায়ী আলাদা। কিন্তু সবচেয়ে স্পষ্ট পথ UK। কারণ UK-র NHS বাংলাদেশ থেকে সরাসরি রিক্রুট করে।"
"মানে?"
"মানে তোমাকে দালালের কাছে যেতে হবে না। মধ্যপ্রাচ্যে যেতে গেলে এজেন্ট লাগে, পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকা দিতে হয়, তারপরও ঠকার চান্স আছে। কিন্তু UK-তে NHS নিজে রিক্রুট করে। তুমি NMC পরীক্ষা পাস করবে, ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্ট পাস করবে, IELTS বা OET, তারপর NHS-এর ওয়েবসাইটে অ্যাপ্লাই করবে। তারা ইন্টারভিউ নেবে। পাস করলে ভিসা স্পনসর করবে। তোমার ফ্লাইটের টিকিটও তারা দেবে।"
জাহিদ অবাক হলো। "ফ্লাইটের টিকিটও?"
"হ্যাঁ। কিছু ট্রাস্ট রিলোকেশন প্যাকেজ দেয়। প্রথম কয়েক সপ্তাহের থাকার ব্যবস্থাও করে।"
রোমেল বলল, "কানাডাতেও যাওয়া যায়। কানাডিয়ান নার্সের বেতন বছরে পঞ্চান্ন থেকে সত্তর হাজার কানাডিয়ান ডলার। অস্ট্রেলিয়ায় আরো বেশি। মিডল ইস্টে কম, মাসে ষাট থেকে একশ হাজার টাকা বাংলাদেশি, কিন্তু থাকা-খাওয়া ফ্রি, তাই সব টাকা জমা যায়।"
তাসমিন বলল, "আমার প্ল্যান UK। দুই লাখ টাকা ইনভেস্ট করব। যদি পাস করি, দুই বছরের মধ্যে UK-তে থাকব। বছরে পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার পাউন্ড। তিন বছর কাজ করলে ILR পাব, মানে পারমানেন্ট রেসিডেন্সি। তারপর চাইলে সিটিজেনশিপ।"
সে একটু থামল। তারপর বলল, "আমি ময়মনসিংহের একটা গ্রাম থেকে এসেছি। বাবা কৃষক। আমার নার্সিং পড়ার খরচ জোগাড় করতে বাবা গরু বিক্রি করেছিলেন। এখন আমি যদি UK-তে যেতে পারি, আমার প্রথম মাসের বেতন দিয়েই বাবাকে দুটো গরু কিনে দিতে পারব।"
৯
সুমাইয়া চায়ে চুমুক দিল। তারপর জাহিদের দিকে তাকিয়ে বলল কথাটা।
"জাহিদ, আমি সাত বছর পড়েছি। পাঁচ বছর MBBS, এক বছর ইন্টার্নশিপ, আর প্রস্তুতি মিলিয়ে সাত। এখন মাসে পাই পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা।"
জাহিদ কিছু বলল না।
"তাসমিন তিন বছর পড়েছে। এখন পায় বাইশ হাজার। কিন্তু দুই বছরের মধ্যে তাসমিন UK-তে থাকবে। বছরে কামাবে পঁয়তাল্লিশ লাখ টাকা। আর আমি? আমি যদি USMLE দিতে চাই, আমেরিকায় ডাক্তারি করতে চাই, শুধু পরীক্ষার ফি ছয় লাখ। কোচিং আরো পাঁচ লাখ। ইলিজিবিলিটি পিরিয়ড, ভিসা প্রসেস, রেসিডেন্সি ম্যাচ, সব মিলিয়ে আরো তিন থেকে পাঁচ বছর লাগবে। আমার সেই টাকা নেই। সেই সময়ও নেই।"
সুমাইয়ার কণ্ঠ শান্ত ছিল। রাগ ছিল না। ছিল গণিত।
"তাসমিনের NMC-র খরচ দুই লাখ। আমার USMLE-র খরচ বারো লাখ। তাসমিনের সময় লাগবে দুই বছর। আমার লাগবে পাঁচ বছর। তাসমিন তিন বছর পড়েছে। আমি সাত বছর পড়েছি। কে বেশি বুদ্ধিমান?"
জাহিদ বলল, "এটা বুদ্ধিমত্তার প্রশ্ন না।"
"তাহলে কীসের প্রশ্ন?"
"সিস্টেমের। তোমার সিস্টেম তোমাকে সাত বছর পড়িয়ে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা দেয়। তাসমিনের সিস্টেম তাকে তিন বছর পড়িয়ে পৃথিবীর যেকোনো দেশে যাওয়ার যোগ্য করে তোলে। সমস্যা তোমার না, সমস্যা সিস্টেমের।"
সুমাইয়া কিছু বলল না। চায়ের কাপটা টেবিলে রাখল।
১০
রোমেল বলল, "আমাকে একটা জিনিস প্রতিদিন শুনতে হয়। রোগী বা রোগীর আত্মীয় জিজ্ঞেস করে, ভাই আপনি নার্স? ডাক্তার না?"
"তুমি কী বলো?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
"আমি বলি, না, আমি নার্স। তখন তারা একটু অবাক হয়। কেউ কেউ বলে, ডাক্তারি পড়তে পারলেন না? আমি বলি, পারলাম না না, পড়লাম না।"
"মানে?"
"মানে আমি এখন এটাই চাই। এটা আমার পেশা। আমি বেছে নিয়েছি। কিন্তু লোকজন বোঝে না যে নার্সিং বেছে নেওয়ার পেশা হতে পারে। তাদের ধারণায় নার্সিং হলো ডাক্তার হতে না পারার ফলাফল।"
রোমেল একটু থামল। তারপর বলল, "আমি একটা কথা বলি। ডাক্তার রোগ নির্ণয় করে। নার্স রোগী সেবা করে। ডাক্তার রোগীকে পাঁচ মিনিট দেখে প্রেসক্রিপশন লেখে। নার্স রোগীর পাশে বারো ঘণ্টা থাকে। ডাক্তার বলে কী ওষুধ দিতে হবে। নার্স সেই ওষুধ দেয়, IV লাইন বসায়, ব্লাড প্রেশার মনিটর করে, রোগী কাঁদলে পাশে বসে, রোগীর পরিবারকে আপডেট দেয়।"
"কোনটা বেশি জরুরি?"
জাহিদ উত্তর দিল না। কারণ উত্তরটা জানা, কিন্তু বলা কঠিন।
১১
হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় জাহিদ হিসাবটা করল।
নার্সিং ডিপ্লোমা: তিন বছর। সরকারি ইনস্টিটিউটে খরচ পঞ্চাশ থেকে সত্তর হাজার। প্রাইভেটে দুই থেকে পাঁচ লাখ।
চাকরি: নিশ্চিত। সরকারি হাসপাতালে আঠারো থেকে বাইশ হাজার টাকা। প্রাইভেটে বিশ থেকে ত্রিশ হাজার। ঘাটতি আড়াই লাখ, তাই চাকরি না পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
বিদেশ: UK-তে পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার পাউন্ড। কানাডায় পঞ্চান্ন থেকে সত্তর হাজার কানাডিয়ান ডলার। মিডল ইস্টে ষাট থেকে একশ হাজার টাকা, থাকা-খাওয়া ফ্রি।
ইনভেস্টমেন্ট: NMC পরীক্ষার খরচ দেড় থেকে দুই লাখ। রিটার্ন: বছরে পঁয়তাল্লিশ লাখ টাকা। ইনভেস্টমেন্ট রিকভারি: প্রথম মাসেই।
স্টিগমা: আছে। বিশেষ করে পুরুষদের জন্য। "ছেলে হয়ে নার্স?" এই প্রশ্নটা প্রতিদিন শুনতে হবে। কিন্তু UK-তে কেউ জিজ্ঞেস করবে না। কানাডায় কেউ জিজ্ঞেস করবে না। কারণ ওখানে নার্সিং পেশা, জেন্ডার না।
১২
সেদিন রাতে জাহিদ ভাবল।
সে নিজে নার্স হবে না। সেটা তার পথ না। কিন্তু রোমেলের চোখের সেই চাপা কষ্টটা সে ভুলতে পারল না। একজন মানুষ ভালো কাজ করছে, দক্ষ কাজ করছে, জরুরি কাজ করছে, অথচ সমাজ তাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দিচ্ছে, তুমি ভুল জায়গায় আছ। কারণ তুমি ছেলে। কারণ নার্সিং "ছোট" পেশা। কারণ তুমি ডাক্তার হতে পারনি।
তিনটা কারণ। তিনটাই ভুল।
নার্সিং ছোট পেশা না। তিন লাখের ঘাটতি যে পেশায়, সেটা ছোট হয় কীভাবে? UK-তে বছরে পঁয়তাল্লিশ লাখ কামায় যে পেশায়, সেটা ছোট হয় কীভাবে? রোগীর পাশে বারো ঘণ্টা থাকে যে পেশা, সেটা ছোট হয় কীভাবে?
নার্সিং মেয়েদের পেশা না। পেশার কোনো জেন্ডার নেই। ইঞ্জিনিয়ারিং ছেলেদের পেশা না। শিক্ষকতা মেয়েদের পেশা না। রান্না মেয়েদের কাজ না। গাড়ি চালানো ছেলেদের কাজ না। এগুলো সব কাজ। যে করতে চায়, যে পারে, সে করবে।
আর নার্সিং "ডাক্তার হতে না পারা" না। নার্সিং একটা আলাদা পেশা। আলাদা দক্ষতা। আলাদা প্রশিক্ষণ। ডাক্তার আর নার্স একই টিমের দুজন সদস্য। একজন ছাড়া আরেকজন কাজ করতে পারে না। কিন্তু সমাজ একজনকে উপরে রাখে আর আরেকজনকে নিচে। কেন? কারণ সমাজ পেশার মর্যাদা মাপে বেতন আর ডিগ্রি দিয়ে, কাজের গুরুত্ব দিয়ে না।
জাহিদ মনে মনে একটা লাইন লিখে রাখল। পরে কখনো কাজে লাগতে পারে।
নার্সিং পেশা না। নার্সিং টিকেট। পৃথিবীর যেকোনো দেশে ঢোকার টিকেট। শুধু দরকার একটু সাহস, আর সমাজের কথা না শোনার ক্ষমতা।