গার্মেন্টস থেকে সোলার
হাতের কাজ জানা মানুষ কখনো বেকার থাকে না
১
ছয় বছর।
রাকিব ভাই ছয় বছর আগে গার্মেন্টসে ঢুকেছিলেন। লাইন সুপারভাইজার হিসেবে। বেতন ছিল বারো হাজার টাকা। প্রতিদিন সকাল আটটায় ফ্যাক্টরিতে ঢুকতেন, রাত আটটায় বের হতেন। কখনো কখনো রাত দশটা। কখনো রাত বারোটা। শিপমেন্টের আগের সপ্তাহ মানে ঘুম নেই।
জাহিদের মামাতো ভাই রাকিব। HSC পাশ করেছিলেন, কিন্তু ভার্সিটিতে চান্স পাননি। কোচিংয়ে গিয়েছিলেন, দুইবার চেষ্টা করেছিলেন, হয়নি। বাবা বলেছিলেন, "আর পড়ে কী হবে? কাজে ঢোক।"
কাজে ঢুকলেন। গাজীপুরের একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে। প্রথম দিন পাঁচশো মেশিনের আওয়াজ শুনে মাথা ঘুরেছিল। দ্বিতীয় দিন একটু কম ঘুরেছিল। তৃতীয় দিন থেকে আর ঘোরেনি।
মানুষ সব কিছুতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। পাঁচশো মেশিনের আওয়াজেও।
২
ছয় বছরে রাকিব ভাই লাইন সুপারভাইজার থেকে ফ্লোর ম্যানেজার হয়েছেন।
এটা শুনতে সাধারণ লাগে। কিন্তু সাধারণ না। একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির ফ্লোর ম্যানেজার মানে পাঁচশো জন শ্রমিকের দায়িত্ব। প্রোডাকশন টার্গেট, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, মেশিন মেইনটেন্যান্স, শ্রমিকদের শিফট ম্যানেজমেন্ট, বায়ারদের অডিট, কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট। সব একসাথে।
বেতন এখন পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা। ছয় বছরে বারো থেকে পঁয়ত্রিশ।
একদিন ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলেন রাকিব ভাই। জাহিদের বাবা জিজ্ঞেস করলেন, "ফ্যাক্টরিতে কেমন চলছে?"
রাকিব ভাই হাসলেন। একটু ক্লান্ত হাসি। "চাচা, BBA-র বইয়ে যা পড়ায়, আমি ফ্লোরে শিখেছি। পাঁচশো জন মানুষ ম্যানেজ করি। প্রতিদিন। কোনো প্রফেসর আমাকে শেখায়নি কীভাবে একজন শ্রমিক যখন কাঁদছে তখন তাকে সামলাতে হয়, আর ঠিক পাশের মেশিনে প্রোডাকশন ডেডলাইন মিট করতে হয়। এটা কোনো বই শেখায় না।"
জাহিদের বাবা কিছু বললেন না। চুপ করে চা খেলেন।
৩
জাহিদ রাকিব ভাইকে জিজ্ঞেস করল, "ভাই, গার্মেন্টসে ভবিষ্যৎ আছে?"
রাকিব ভাই বললেন, "ভবিষ্যৎ আছে কি না সেটা নির্ভর করে তুই কোন পজিশনে আছিস।"
তারপর একটা কথা বললেন যেটা জাহিদের মাথায় আটকে গেল।
"দেখ, একজন সুইং অপারেটর সারাজীবন সুইং অপারেটর থাকতে পারে। বেতন পনেরো-আঠারো হাজার। কিন্তু একজন লাইন সুপারভাইজার যদি ঠিকমতো কাজ করে, তিন-চার বছরে ফ্লোর ম্যানেজার হয়। ফ্লোর ম্যানেজার থেকে প্রোডাকশন ম্যানেজার। প্রোডাকশন ম্যানেজার মানে মাসে পঞ্চাশ থেকে আশি হাজার। তারপর অপারেশনস হেড। এক লাখ থেকে দেড় লাখ। আর জেনারেল ম্যানেজার? দুই লাখের উপরে।"
জাহিদ বলল, "কিন্তু এটা তো অনেক সময় লাগে।"
"সময় তো সব জায়গায় লাগে। ডাক্তার হতে দশ বছর লাগে। ইঞ্জিনিয়ার হতে চার বছর, তারপর আরো দুই বছর চাকরি খুঁজতে। BCS পেতে পাঁচ-ছয় বছর কোচিং। আমি ছয় বছরে ফ্লোর ম্যানেজার। আর পাঁচ বছর পর প্রোডাকশন ম্যানেজার হব, ইনশাআল্লাহ। টোটাল এগারো বছর। একজন MBBS ডাক্তারেরও এগারো বছর লাগে ইন্টার্নশিপ শেষ করতে।"
"কিন্তু ডিগ্রি নেই তো।"
রাকিব ভাই আবার হাসলেন। "বায়ার যখন ফ্যাক্টরি অডিট করতে আসে, তখন কি আমার ডিগ্রি দেখে? দেখে প্রোডাকশন রিপোর্ট। কোয়ালিটি রিপোর্ট। ডেলিভারি টাইমলাইন। আমার ফ্লোরে গত ছয় মাসে একটাও রিজেকশন হয়নি। এটাই আমার ডিগ্রি।"
৪
জাহিদ পরে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করল। বাংলাদেশের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি। চার হাজারের বেশি ফ্যাক্টরি। চল্লিশ লাখের বেশি শ্রমিক। রপ্তানি আয়ে সবচেয়ে বড় সেক্টর। পুরো দেশের ফরেন কারেন্সির আশি শতাংশের বেশি আসে এই ইন্ডাস্ট্রি থেকে।
কিন্তু কেউ যখন বলে "আমি গার্মেন্টসে কাজ করি," মানুষ কী বোঝে? সুইং মেশিন। ঘাম। ওভারটাইম। কম বেতন। রানা প্লাজা।
কেউ বোঝে না যে এই ইন্ডাস্ট্রিতে প্রোডাকশন ম্যানেজার, কোয়ালিটি কন্ট্রোল ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজার, কমপ্লায়েন্স অফিসার, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ার, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজার আছে। এরা সবাই ভালো বেতন পায়। এদের অনেকের ইউনিভার্সিটি ডিগ্রি নেই। আছে অভিজ্ঞতা।
রাকিব ভাই-ই প্রমাণ। HSC পাশ। ভার্সিটিতে চান্স পাননি। কিন্তু পাঁচশো মানুষ ম্যানেজ করেন। BBA গ্র্যাজুয়েটদের চেয়ে বেশি ম্যানেজমেন্ট জানেন। শুধু সার্টিফিকেট নেই।
আর সার্টিফিকেট? সেটা একটা কাগজ। কাগজ দিয়ে মেশিন চলে না। মেশিন চলে হাতে।
৫
ফারুকের খবরটা আরো চমকপ্রদ।
দুই বছর আগে ফারুক সরকারি চাকরিতে ঢুকেছিল। সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার। উপজেলায় পোস্টিং। বেতন আঠারো হাজার, গ্রেড আপগ্রেডের পর বিশ হাজার। পেনশন আছে, নিরাপত্তা আছে, সম্মান আছে।
কিন্তু ফারুক চাকরি ছেড়ে দিয়েছে।
জাহিদ ফোনে শুনে প্রথমে ভাবল ভুল শুনেছে। "কী বললি? ছেড়ে দিয়েছিস?"
"হ্যাঁ।"
"সরকারি চাকরি? পেনশনওয়ালা?"
"হ্যাঁ।"
"তোর বাবা কী বললেন?"
একটু চুপ থাকল ফারুক। তারপর বলল, "বাবা তিন দিন আমার সাথে কথা বলেননি।"
জাহিদ বুঝতে পারল। একজন রং মিস্ত্রি, যিনি সারাজীবন স্বপ্ন দেখেছিলেন ছেলে সরকারি চাকরি করবে, যিনি গেজেট দেখে কেঁদেছিলেন, তাঁর ছেলে সেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। তিন দিন কথা না বলা স্বাভাবিক। কিছু মানুষের জন্য এটা তিন বছরও হতে পারত।
৬
"কিন্তু কেন?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
ফারুক বলল, "সরকারি চাকরি নিরাপদ। কিন্তু বদ্ধ। আমি উপজেলায় বসে পোল গুনতাম। বৈদ্যুতিক লাইনের পোল। রাস্তায় বের হতাম, পোল দেখতাম, রিপোর্ট লিখতাম। ইন্সপেকশন করতাম। ফাইল পুশ করতাম। মাসে একটা মিটিং হতো জেলায়, সেখানে যেতাম। ব্যস।"
"মানে?"
"মানে আমি জানতাম, আজ থেকে বিশ বছর পর আমি ঠিক কোথায় থাকব। সিনিয়র সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার। বেতন বাড়বে, কিন্তু কাজ একই থাকবে। পোল গোনা। লাইন চেক করা। ফাইল সই করা।"
ফারুক থামল। তারপর বলল, "আমি পলিটেকনিকে ইলেকট্রিক্যাল পড়েছি। আমি জিনিস বানাতে চাই। সিস্টেম ইনস্টল করতে চাই। পোল গুনতে না।"
"তো কী করবি?"
"সোলার।"
৭
সোলার প্যানেল ইনস্টলেশন।
ফারুক বলল, "বাংলাদেশে সোলারের মার্কেট প্রতি বছর ত্রিশ শতাংশ হারে বাড়ছে। সরকারের টার্গেট ২০৪১ সালের মধ্যে চল্লিশ শতাংশ বিদ্যুৎ রিনিউয়েবল সোর্স থেকে আনা। এটা বিশাল একটা সুযোগ।"
জাহিদ বলল, "কিন্তু তুই এটা কোথায় শিখলি?"
"সরকারি চাকরিতে থাকতেই শিখেছি। উপজেলায় একটা সোলার প্রজেক্ট হচ্ছিল। আমি সেই প্রজেক্টের ইন্সপেকশন করতে গিয়ে দেখলাম, কন্ট্রাক্টররা কীভাবে প্যানেল বসায়, ইনভার্টার কানেক্ট করে, ব্যাটারি ব্যাংক সেট আপ করে। আমি প্রতিদিন ওদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকতাম। প্রশ্ন করতাম। নোট নিতাম।"
"সরকারি চাকরি করতে করতে প্রাইভেট বিজনেসের ট্রেনিং নিলি?"
"এটাকে ট্রেনিং বলো না। বলো শেখা। আমি শিখেছি। তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"
৮
ফারুকের সোলার বিজনেস শুরু হয়েছে আট মাস আগে।
তিনজন টেকনিশিয়ান নিয়ে কাজ করে। মাসে পাঁচ থেকে দশটা সিস্টেম ইনস্টল করে। বাড়ি, দোকান, ছোট কারখানা। গ্রামেও যায়, শহরেও যায়।
মাসিক রেভিনিউ: তিন থেকে চার লাখ টাকা।
মুনাফা: আশি হাজার থেকে এক লাখ।
জাহিদ হিসাবটা মাথায় করল। ফারুক পলিটেকনিক থেকে বের হয়ে সরকারি চাকরিতে ঢুকেছিল। সেটা ছেড়ে দিয়ে নিজের বিজনেস শুরু করেছে। আট মাসে মাসিক আয় এক লাখ টাকা।
ছয় বছর আগে ফারুক "পলিটেকনিকের ছেলে" ছিল। মানুষ বলত, "ইঞ্জিনিয়ার না, ডিপ্লোমা।" আর এখন ফারুক তিনজনের চাকরিদাতা। নিজে বস। মাসে এক লাখ কামাই। সরকারি চাকরি যেটার জন্য মানুষ পাঁচ বছর কোচিং করে, সেটা ফারুক ছেড়ে দিয়েছে। কারণ সেটা তার জন্য ছোট হয়ে গেছে।
পলিটেকনিক। "ব্যর্থদের জায়গা।" সেই ব্যর্থতা থেকে ফারুক সবচেয়ে সফল পথ বানিয়েছে। সব বন্ধুদের মধ্যে।
৯
একদিন জাহিদ ফারুককে ফোন করল।
"একটা কাজ আছে। আমাদের বাড়িতে সোলার প্যানেল লাগাতে চাই।"
ফারুক বলল, "ছাদের সাইজ কত?"
"জানি না।"
"বিদ্যুৎ বিল কত আসে?"
"মাসে দেড় হাজার টাকা।"
"দেড় হাজার বিলের জন্য একটা ছোট সিস্টেম দিলেই হবে। এক কিলোওয়াট। চারটা প্যানেল। একটা ইনভার্টার। ব্যাটারি না হলেও চলবে, গ্রিড-টাইড করে দিলে দিনের বেলা সোলার থেকে চলবে, রাতে গ্রিড থেকে।"
জাহিদ বলল, "খরচ?"
"বন্ধু রেটে করব। ষাট হাজার। মার্কেটে আশি হাজারের নিচে পাবি না।"
"পেব্যাক পিরিয়ড?"
ফারুক হাসল। "তুই Upwork করিস তাই এত ক্যালকুলেশন। দেড় হাজারের বিল দুইশো-তিনশোতে নেমে আসবে। মাসে বারোশো-তেরোশো বাঁচবে। ষাট হাজার ভাগ তেরোশো, মানে পঞ্চান্ন মাসের মধ্যে টাকা উঠে যাবে। তারপর বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ।"
"আর প্যানেলের লাইফ?"
"পঁচিশ বছর। ওয়ারেন্টিও আছে।"
১০
ফারুক নিজে এলো প্যানেল লাগাতে।
তিনজন টেকনিশিয়ান সাথে। সকাল আটটায় শুরু করল। ছাদে ফ্রেম বসালো, প্যানেল মাউন্ট করল, ওয়্যারিং টানল, ইনভার্টার লাগাল, গ্রিডের সাথে কানেক্ট করল। বিকেল চারটায় শেষ।
জাহিদের বাবা ছাদে দাঁড়িয়ে পুরো প্রক্রিয়া দেখলেন। কিছু বললেন না। শুধু দেখলেন।
ফারুক যখন সব শেষ করে সুইচ অন করল, ইনভার্টারের ডিসপ্লেতে সবুজ আলো জ্বলে উঠল। সোলার থেকে বিদ্যুৎ আসছে। মিটারে দেখাচ্ছে। প্যানেল থেকে ইনভার্টার হয়ে ঘরের লাইনে যাচ্ছে বিদ্যুৎ।
জাহিদের বাবা বললেন, "এটা কি আসলেই কাজ করছে? বিদ্যুৎ বিল কমবে?"
ফারুক বলল, "চাচা, আগামী মাসের বিল দেখবেন। আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি দুইশো টাকার নিচে আসবে।"
১১
আগামী মাসের বিল এলো। দুইশো দশ টাকা।
দেড় হাজার থেকে দুইশো দশ।
জাহিদের মা বললেন, "এটা কী করে সম্ভব?"
জাহিদের বাবা বিলটা হাতে নিয়ে দুইবার পড়লেন। তারপর বললেন, "ফারুকের হাতের কাজ।"
জাহিদ মনে মনে ভাবল, বাক্যটা কত গভীর। ফারুকের হাতের কাজ আমার বাবার বিদ্যুৎ বিল কমিয়ে দিল। এক হাজার তিনশো টাকা প্রতি মাসে বাঁচছে। বছরে পনেরো হাজার ছয়শো। পঁচিশ বছরে তিন লাখ নব্বই হাজার।
ষাট হাজার টাকার বিনিয়োগ। তিন লাখ নব্বই হাজার টাকার রিটার্ন। ফারুক যদি ফ্রিল্যান্সার হতো, এটাকে বলত ROI 550%।
কিন্তু ফারুক এসব হিসাব করে না। ফারুক প্যানেল বসায়। ওয়্যারিং করে। ইনভার্টার কানেক্ট করে। মানুষের বিদ্যুৎ বিল কমায়। ব্যস।
১২
জাহিদ একদিন বসে দুজনের কথা ভাবল। রাকিব ভাই আর ফারুক।
রাকিব ভাই HSC পাশ। ভার্সিটিতে চান্স পাননি। সমাজের চোখে "ব্যর্থ।" কিন্তু ছয় বছরে গার্মেন্টসে ফ্লোর ম্যানেজার। পাঁচশো মানুষ ম্যানেজ করেন। আগামী পাঁচ বছরে প্রোডাকশন ম্যানেজার হবেন। বেতন পঞ্চাশ থেকে আশি হাজার। তারপর অপারেশনস হেড। তারপর জিএম। দুই লাখের বেশি।
ফারুক পলিটেকনিক পাশ। সমাজের চোখে "ইঞ্জিনিয়ার না, ডিপ্লোমা।" সরকারি চাকরি পেয়েছিল, সেটাও ছেড়ে দিয়েছে। সমাজের চোখে "পাগল।" কিন্তু আট মাসে নিজের বিজনেস দাঁড় করিয়েছে। মাসে এক লাখ কামাই। তিনজনকে চাকরি দিচ্ছে। মানুষের বিদ্যুৎ বিল কমাচ্ছে।
দুজনের মধ্যে মিল কী?
হাত।
দুজনের হাতেই কাজ আছে। রাকিব ভাই-এর হাত ফ্যাক্টরির ফ্লোর চেনে। ফারুকের হাত ছাদের প্যানেল চেনে। দুজনের হাতই কোনো ইউনিভার্সিটি তৈরি করেনি। তৈরি করেছে কাজ। অভিজ্ঞতা। ভুল করা আর ভুল থেকে শেখা।
১৩
সমাজ বলে, "পলিটেকনিক মানে ফেলিয়র।" সমাজ বলে, "গার্মেন্টস মানে গরিব।" সমাজ বলে, "হাতের কাজ মানে যারা মাথার কাজ পারে না।"
সমাজ অনেক কিছু বলে। সমাজ ভুলও বলে।
ফারুকের বাবা তিন দিন কথা বলেননি। তারপর এক মাস পর যখন ফারুক প্রথম মাসের মুনাফা থেকে বিশ হাজার টাকা বাবাকে পাঠাল, বাবা ফোন করলেন।
"ফারুক।"
"জি বাবা।"
"তুই ঠিক করেছিস।"
এই চারটা শব্দ। "তুই ঠিক করেছিস।" ফারুকের জন্য এটা কোনো সার্টিফিকেটের চেয়ে বড়। কোনো গেজেটের চেয়ে বড়। বাবা বুঝেছেন।
সময় লাগে। সমাজকেও বুঝতে সময় লাগবে। কিন্তু ফারুক অপেক্ষা করছে না সমাজ বুঝুক। ফারুক প্যানেল বসাচ্ছে। ওয়্যারিং করছে। মাসে দশটা সিস্টেম ইনস্টল করছে। দশটা পরিবারের বিদ্যুৎ বিল কমাচ্ছে।
সমাজ যখন বুঝবে, ফারুক ততদিনে আরো অনেক দূর চলে যাবে।
১৪
জাহিদ সেদিন রাতে ডায়েরিতে একটা লাইন লিখল।
"হাতের কাজ জানা মানুষ কখনো বেকার থাকে না। কারণ হাত সবসময় দরকার।"
তারপর আরেকটা লাইন যোগ করল।
"রাকিব ভাই-এর হাত ফ্যাক্টরি চালায়। ফারুকের হাত বিদ্যুৎ বানায়। দুজনের হাতই কোনো ইউনিভার্সিটি তৈরি করেনি। তৈরি করেছে জীবন।"
বাইরে রাত গভীর হচ্ছে। ছাদের ওপর চারটা সোলার প্যানেল নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। সকালে সূর্য উঠলে আবার কাজ শুরু করবে। কোনো শব্দ নেই, কোনো ধোঁয়া নেই, কোনো বিল নেই। শুধু আলো থেকে বিদ্যুৎ।
ফারুকের হাতের কাজ।
জাহিদের বাবা আজ রাতে ঘুমাবেন নিশ্চিন্তে। কারণ পরের মাসের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে আর চিন্তা নেই। দেড় হাজারের জায়গায় দুইশো। বছরে পনেরো হাজার টাকা বাঁচছে।
পনেরো হাজার টাকা। একজন রং মিস্ত্রির ছেলে, যাকে সমাজ "ফেলিয়র" বলত, সে একটা পরিবারের বছরে পনেরো হাজার টাকা বাঁচাচ্ছে। আর এরকম দশটা পরিবারকে প্রতি মাসে সাহায্য করছে।
হাতের কাজ জানা মানুষ কখনো বেকার থাকে না।
কারণ হাত সবসময় দরকার।