মিমের পালা
৪.৮৯ পেয়ে পথ বেছে নেওয়া, ৪.১৭ পেয়ে পথ খুঁজে নেওয়া
১
মিম পরীক্ষা দিচ্ছে।
HSC। বোর্ড পরীক্ষা। সেই একই হল, সেই একই নম্বরযুক্ত বেঞ্চ, সেই একই পরিচিত উত্তেজনা। এই দৃশ্য বাংলাদেশের প্রতিটা পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রতি বছর ঘটে। নতুন কিছু না।
কিন্তু মিমের ভেতরে একটা জিনিস নতুন। মিম আগে থেকে জানে পরীক্ষার পরে কী হয়।
সে দেখেছে। নিজের চোখে। ভাইয়ার জীবনে।
২
মিম জাহিদের ছোট বোন। বয়সে পাঁচ বছরের ছোট। জাহিদ যখন HSC দিয়েছিল, মিম তখন ক্লাস সেভেনে। ছোট ছিল, কিন্তু বোকা ছিল না। বাসায় যা হচ্ছিল সব দেখেছে, সব শুনেছে, সব মনে রেখেছে।
4.17 আসার দিনটা মিমের মনে আছে। বাবা সারাদিন কথা বলেননি। মা রান্নাঘরে বসে কাঁদছিলেন। চাচা ফোন করেছিলেন। পাড়ার রাসেলের বাবা মিষ্টি বিলিয়েছিলেন।
মিম দেখেছে ভাইয়া পাবলিক ভার্সিটি না পেয়ে NU-তে ভর্তি হলো। দেখেছে বাবা বললেন "NU তে পড়ে কী হবে?" দেখেছে ভাইয়া রাত জেগে কাজ করে, ল্যাপটপের আলো রাত দুইটায়, তিনটায়। দেখেছে প্রথম ডলার আসার দিন ভাইয়ার মুখের হাসি, মায়ের প্রশ্ন "এটা আসল টাকা?"
দেখেছে ধীরে ধীরে বাসায় পরিবর্তন আসা। নতুন ফ্রিজ। মায়ের চিকিৎসার খরচ। বাবার চোখের ছানির অপারেশন। মিমের নিজের টিউশন ফি। সব ভাইয়ার আয় থেকে।
পাঁচ বছর ধরে মিম দেখেছে। চুপচাপ। কিন্তু প্রতিটা জিনিস নোট করেছে।
৩
মিম ভালো ছাত্রী। জাহিদ ভালো ছাত্র ছিল মফস্বলের হিসেবে, SSC-তে 4.17। মিম ভালো ছাত্রী আসল হিসেবে, SSC-তে GPA 5.00, ক্লাসে প্রথম, জেলা মেধা তালিকায় নাম।
শিক্ষকরা বলেন, "মিম পারবে।" বান্ধবীরা বলে, "তুই তো মেডিকেল পাবি।"
কিন্তু মিমের মাথায় মেডিকেল নেই। মিমের মাথায় অন্য কিছু ঘুরছে। সেটা সে কাউকে বলেনি। শুধু ভাইয়াকে বলবে ঠিক করে রেখেছে।
৪
পরীক্ষা শেষ হলো জুনে। মিম দুই সপ্তাহ কিছু করল না। ঘুমাল, খেল, নাটক দেখল।
তারপর একদিন সন্ধ্যায় জাহিদের ঘরে গেল। জাহিদ তখন ক্লায়েন্টের কাজ করছিল।
"ভাইয়া, একটু কথা আছে।"
জাহিদ ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলল। মিমের মুখে সিরিয়াস ভাব। এই ভাবটা জাহিদ চেনে।
"বল।"
মিম ভাইয়ার বিছানায় বসল। পা গুটিয়ে।
"ভাইয়া, তুমি সব নিজে নিজে শিখেছো। ফ্রিল্যান্সিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ক্লায়েন্ট ম্যানেজমেন্ট। কেউ ধরে ধরে শেখায়নি। তুমি ইউটিউব দেখে শিখেছো, ভুল করে শিখেছো, ক্লায়েন্টের বকা খেয়ে শিখেছো।"
"হ্যাঁ, তো?"
মিম একটু থামল। তারপর বলল, "আমি কী করবো?"
প্রশ্নটা সহজ। উত্তরটা না।
৫
জাহিদ চেয়ার ঘুরিয়ে মিমের দিকে ফিরল।
মিমকে উত্তর দেওয়া সহজ হতো। বলতে পারত, "তুই ফ্রিল্যান্সিং কর।" বলতে পারত, "তুই আমার পথ অনুসরণ কর।" কিন্তু জাহিদ এসব বলল না।
জাহিদ পাঁচ বছরে একটা বড় জিনিস শিখেছে: নিজের পথ কেউ কাউকে বলে দিতে পারে না। বাবা বলেছিলেন মেডিকেল পড়, সেটা জাহিদের পথ ছিল না। সমাজ বলেছিল সরকারি চাকরি কর, সেটাও না। জাহিদ নিজের পথ নিজে খুঁজেছে। মিমকেও নিজে খুঁজতে হবে।
কিন্তু একটা জিনিস জাহিদ করতে পারে। সেই তিনটা প্রশ্ন। যে তিনটা প্রশ্ন সে নিজেকে করেছিল সেই রাতে, 4.17 পাওয়ার পর, ফোনের নোটপ্যাডে।
"মিম, তিনটা প্রশ্ন করি। তুই উত্তর দে। ভেবে বল।"
মিম মাথা নাড়ল।
"এক। তুই কী করতে ভালোবাসিস?"
৬
মিম এই প্রশ্নটার জন্য প্রস্তুত ছিল। সে জানত ভাইয়া এটা জিজ্ঞেস করবে। কারণ মিম ভাইয়ার গল্প জানে, সেই তিনটা প্রশ্নের কথা জানে।
"আমি ডিজাইন ভালোবাসি।"
"ডিজাইন মানে?"
"UX/UI। ইউজার এক্সপেরিয়েন্স, ইউজার ইন্টারফেস।" মিম ফোন তুলে একটা স্ক্রিনশট দেখাল। "এটা আমি বানিয়েছি। Figma-তে।"
জাহিদ ফোনটা নিল। একটা মোবাইল অ্যাপের ডিজাইন। ক্লিন, মিনিমাল। কালার প্যালেট ভালো। এটা প্রফেশনাল কাজ না, কিন্তু একটা HSC-পড়ুয়া মেয়ের জন্য? বেশ ভালো।
"কবে থেকে শিখছিস?"
"ক্লাস ইলেভেন থেকে। তুমি যখন কাজ করতে, আমি পাশে বসে দেখতাম। একদিন ভাবলাম, কোড আমার ভালো লাগে না, কিন্তু স্ক্রিনে যা দেখাচ্ছে সেটা ভালো লাগে। মানে ডিজাইনটা। তারপর Figma শিখলাম। তোমার পুরনো ল্যাপটপে প্র্যাকটিস করতাম।"
"দুই। পরিবার কতটুকু সাপোর্ট দিতে পারবে?"
মিম হাসল। "এটার উত্তর তুমিই ভালো জানো, ভাইয়া।"
পাঁচ বছর আগে পরিবারের আয় পঁচিশ হাজার, খরচ বাদে পাঁচ-ছয় হাজার বাঁচত। ঢাকায় পড়া অসম্ভব। এখন জাহিদের আয় দেড় থেকে দুই লাখ। রাকিব ভাইয়ের চাকরি ভালো হয়েছে। পরিবার ধনী না, কিন্তু পাঁচ বছর আগের চেয়ে অনেক ভালো।
"পরিবার এখন সাপোর্ট দিতে পারবে। ঢাকায় পড়তে পারব। তোমার যেটা হয়নি, আমার সেটা হতে পারে।"
"তিন। বাংলাদেশে দশ বছর পর কী দরকার হবে?"
৭
মিম একটু সময় নিল।
"বাংলাদেশে সবকিছু ডিজিটাল হচ্ছে। সরকারি সেবা অনলাইনে যাচ্ছে। ব্যাংকিং অ্যাপে চলে গেছে। ই-কমার্স বাড়ছে। এগুলোর সবকিছুতে ডিজাইনার দরকার। অ্যাপ বানাতে ডেভেলপার লাগে, সবাই জানে। কিন্তু অ্যাপটা মানুষ ব্যবহার করতে পারবে কিনা, সেটা নির্ভর করে ডিজাইনের ওপর। বাংলাদেশে হাজার হাজার ডেভেলপার আছে। ভালো UX ডিজাইনার? হাতে গোনা।"
জাহিদ ভাবল। মিম ভুল বলছে না। জাহিদ নিজে কোডার, ডিজাইনার না। ক্লায়েন্টদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ডিজাইন। কোড কাজ করে, কিন্তু দেখতে বাজে। বাটন খুঁজে পায় না মানুষ। ফর্ম বুঝতে পারে না।
"তুই ঠিকই ভাবছিস। প্ল্যানটা কী?"
৮
মিম সোজা হয়ে বসল।
"ইউনিভার্সিটিতে পড়ব। ঢাকায়। CSE অথবা ফাইন আর্টস। না পেলে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি। কিন্তু এটা প্ল্যানের অর্ধেক।"
"বাকি অর্ধেক?"
"ইউনিভার্সিটির সাথে সাথে অনলাইনে UX/UI শিখব। গুগলের সার্টিফিকেট, ডেইলি UI চ্যালেঞ্জ, ড্রিবল-বিহ্যান্সে পোর্টফোলিও। ফার্স্ট ইয়ারেই শুরু। সেকেন্ড ইয়ারে ফ্রিল্যান্সিংয়ে ঢুকব।"
জাহিদ চুপ করে শুনল।
"তোমার ক্ষেত্রে সব accidental ছিল, ভাইয়া। পরিস্থিতি ঠেলে দিয়েছিল। আমার ক্ষেত্রে planned হবে। ডে ওয়ান থেকে।"
জাহিদ বলল, "তুই আমার চেয়ে স্মার্ট।"
মিম হাসল। "না। আমি শুধু তোমার ভুলগুলো দেখেছি।"
ভুলগুলো। জাহিদ জানে মিম কী বলতে চাইছে। প্ল্যান ছাড়া শুরু করা। দশটা জিনিস একসাথে শিখতে যাওয়া। পোর্টফোলিও না বানানো। মিমের প্ল্যানে এসব নেই। মিম জানে কী শিখবে, UX/UI, শুধু এটা। পোর্টফোলিও আগে বানাবে। ফ্রিল্যান্সিং শুরু করবে যখন আয়ের ওপর নির্ভরতা নেই।
৯
কিন্তু একটা সমস্যা আছে। এবং সেই সমস্যাটা জাহিদের জীবনে ছিল না।
মিমের মা একদিন বাজার থেকে ফিরে বললেন, "রহিমা খালা জিজ্ঞেস করল মিম কী করবে। আমি বললাম ঢাকায় পড়বে। উনি বললেন, 'মেয়ে হয়ে ঢাকায় একা?' তারপর বললেন, 'বিয়ের বয়স হয়ে গেছে, আগে বিয়ে দাও, পড়া পরে।'"
মিম রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে শুনল। কিছু বলল না।
মা বললেন, "আমি বলেছি, বিয়ে পরে, পড়া আগে।"
মিম মায়ের দিকে তাকাল। মা-ও তাকালেন। কোনো কথা হলো না, কিন্তু একটা বোঝাপড়া হলো।
মিমের মা পঞ্চম শ্রেণি পাস। বিয়ে হয়েছিল ষোলোতে। সারাজীবন অন্যের বাসায় কাজ করেছেন। তিনি জানেন পড়া না থাকলে কী হয়, নিজের আয় না থাকলে কী হয়। "বিয়ে পরে, পড়া আগে," এই কথাটা নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন। কোনো ফেমিনিস্ট তত্ত্ব পড়ে না। শুধু নিজের জীবন দেখে।
রহিমা খালা খারাপ মানুষ না। উনি যা বলেছেন সেটা পাড়ার প্রচলিত ধারণা। মেয়েদের পড়াশোনা দরকার, কিন্তু বেশি না। ফ্রিল্যান্সিং? মেয়েরা ফ্রিল্যান্সিং করবে? পাত্রপক্ষ এসে দেখলে কী ভাববে?
জাহিদ ছেলে। জাহিদ যখন ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছিল, কেউ বলেনি "ছেলে হয়ে ল্যাপটপের সামনে বসে থাকো?" বরং আয় শুরু হলে পাড়া প্রশংসা করেছে। মিম মেয়ে। মিম একই কাজ করলে একই প্রতিক্রিয়া পাবে? জাহিদ জানে, পাবে না।
কিন্তু জাহিদ এটাও জানে: পাড়ার কথায় জীবন চলে না। পাড়ার কথায় জীবন চলালে জাহিদ এখনো 4.17 নিয়ে বসে থাকত।
১০
একদিন রাতে জাহিদ মিমকে বলল।
"আমি ৪.১৭ পেয়ে পথ খুঁজেছি। তুই ৪.৮৯ পেয়ে পথ বেছে নিতে পারবি।"
মিম কিছু বলল না। ভাইয়ার কথাটা ওজন করছে।
"আমার সামনে অপশন ছিল না। NU ছাড়া কোথাও চান্স পাইনি। ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছিলাম কারণ আর কিছু করার ছিল না। পরিবারের টাকা ছিল না।"
একটু থামল।
"তোর সামনে অপশন আছে। GPA ভালো, ভার্সিটিতে চান্স পাবি। পরিবারে টাকা আছে, ঢাকায় থাকতে পারবি। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার, তুই জানিস কী করতে চাস। আমি সেটা জানতাম না।"
"তোর সুবিধা হলো, তোর আগে কেউ পথটা হেঁটেছে। সেই পথের গর্তগুলো তুই চেনিস।"
মিম হাসল। "সেই কেউটা তুমি।"
১১
রেজাল্ট বের হলো অগাস্টে। মিমের GPA: ৪.৮৯।
বাসায় কেউ কাঁদল না এবার। কেউ চুপ থাকল না। বাবা বললেন, "ভালো।" মা হাসলেন। জাহিদ বলল, "প্ল্যান অনুযায়ী চল।"
পাঁচ বছর আগে হলে এই নম্বর নিয়ে বাসায় হাহাকার হতো। "গোল্ডেন পেল না!" কিন্তু এই বাসায় সেই হাহাকার নেই। কারণ এই বাসা দেখেছে ৪.১৭ পেয়ে একটা ছেলে কোথায় পৌঁছেছে। নম্বর দিয়ে জীবন মাপার সেই সরলীকরণ এই পরিবারে আর কাজ করে না।
পাড়ায় অবশ্য কাজ করে। রাসেলের মা এসেছিলেন। "মিম গোল্ডেন পেল না? আমাদের রুমার মেয়ে পেয়েছে।" মিমের মা হেসে বললেন, "আলহামদুলিল্লাহ, ভালো।" তারপর চা বানাতে গেলেন।
রাসেলের মা চলে যাওয়ার পর মিম মাকে জিজ্ঞেস করল, "মা, তোমার খারাপ লাগেনি?"
"কিসের জন্য?"
"গোল্ডেন না পাওয়ার জন্য।"
মা পেঁয়াজ কাটতে কাটতে বললেন, "তোর ভাইয়া চার পয়েন্ট সতেরো পেয়ে বাসা চালায়। গোল্ডেন পাওয়া ছেলেদের অনেকে এখনো বাবার টাকায় চলে। গোল্ডেন দিয়ে ভাত হয় না।"
মিম হাসল। মা শিখেছেন। ধীরে ধীরে, কিন্তু শিখেছেন।
১২
ভর্তি পরীক্ষার মৌসুম শুরু হলো। মিম তিনটা ভার্সিটিতে আবেদন করল, সাথে একটা প্রাইভেটেও ব্যাকআপ হিসেবে। জাহিদ বলেছে, "ভর্তি ফি আমি দেব। তুই শুধু পরীক্ষায় ফোকাস কর।"
একটা ভাই যে পথ পেরিয়ে এসেছে, সেই ভাই এখন বোনের পথ সহজ করছে। এটা কোনো বিশেষ মহানুভবতা না। এটা পরিবার। বাংলাদেশে পরিবার এভাবেই কাজ করে।
কিন্তু এই চক্রে একটা নতুন জিনিস যোগ হয়েছে। আগে বড় ভাই সরকারি চাকরি করত, ছোট ভাইবোনকে পড়াত। এখন বড় ভাই ফ্রিল্যান্সিং করে, ডলারে আয় করে, পড়ানোর সাথে সাথে ডিজিটাল স্কিলের দিকনির্দেশনাও দিচ্ছে। চক্রটা একই, কিন্তু গতি বদলে গেছে।
পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে মিম জাহিদকে বলল, "ভাইয়া, আমি তোমার গল্প repeat করব না।"
জাহিদ তাকাল।
"তোমার গল্প হলো survive করার গল্প। আমার গল্প হবে plan করে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। তুমি পড়ে গিয়ে উঠেছো। আমি পড়ার আগেই দেখে নেব কোথায় গর্ত।"
জাহিদ কিছু বলল না। শুধু মাথা নাড়ল।
মিম ভাইয়ের গল্প শুনেছে। কিন্তু মিম ভাইয়ের গল্প repeat করবে না। সে নিজের গল্প লিখবে।
সেই গল্পটা শুরু হচ্ছে এখন। একটা মেয়ে। মফস্বলের। ৪.৮৯। হাতে একটা Figma অ্যাকাউন্ট, মাথায় একটা প্ল্যান, আর পেছনে একটা ভাই যে আগে হেঁটেছে।
পাড়ার রহিমা খালা বলবেন, "মেয়ে হয়ে ফ্রিল্যান্সিং?"
মিমের মা বলবেন, "বিয়ে পরে, পড়া আগে।"
আর মিম? মিম কিছু বলবে না। মিম করে দেখাবে।
---
*নবম অধ্যায়: হাতের কাজ, হাতের মুক্তি। পর্ব ৮৫/১০০।*