মাটির সন্তান
দেশের চল্লিশ শতাংশ মানুষ মাটি চাষ করে, কিন্তু কৃষি পড়া মানে ফেইলিওর
১
ছেলেটার নাম সাইফুল। ছাব্বিশ বছর। ময়মনসিংহের ত্রিশালের ছেলে।
জাহিদের সাথে দেখা হলো ফেসবুকে। একটা গ্রুপে। গ্রুপের নাম "মফস্বল উদ্যোক্তা নেটওয়ার্ক"। সদস্য সাত হাজার। বেশিরভাগ পোস্ট হলো: কে কোথায় দোকান দিয়েছে, কার ব্যবসা কেমন চলছে, কে কোন কোর্স করে উপকৃত হয়েছে। মাঝে মাঝে কেউ সাহায্য চায়, কেউ টিপস দেয়।
সাইফুলের পোস্টটা ছিল ভিন্ন। ছবিতে একটা ছোট দোকানঘর। সামনে সাইনবোর্ড: "সাইফুল এগ্রো সলিউশনস"। নিচে ছোট করে লেখা: বীজ, সার, কীটনাশক, মাটি পরীক্ষা। ক্যাপশনে লেখা: "কৃষি ডিপ্লোমা করে চাকরি খুঁজি নাই। নিজেই শুরু করেছি। ছয় মাস হলো।"
কমেন্ট সেকশনে কেউ লিখেছে: "ভাই, কৃষি ডিপ্লোমা দিয়ে কী করবেন? বাবাও তো চাষ করে।"
সাইফুল উত্তর দিয়েছে: "বাবা চাষ করে, তাই তো কৃষি পড়েছি। বাবা যেটা অভিজ্ঞতা দিয়ে করে, আমি সেটা science দিয়ে করি।"
জাহিদ কমেন্টটা পড়ে থামল। কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর সাইফুলকে মেসেজ দিল।
২
সাইফুলের গল্পটা শুনতে জাহিদের একটু সময় লাগল। কারণ সাইফুল কথা বলে ধীরে। ভেবে ভেবে বলে। তাড়াহুড়া নেই।
সাইফুলের বাবা ত্রিশালে চাষি। তিন বিঘা জমি। ধান, পাট, সবজি। সারাজীবন চাষ করেছে। বাবার বাবাও চাষ করতো। তার আগেও।
সাইফুল SSC-তে ভালো রেজাল্ট করেনি। GPA 3.5। HSC-তে science নেওয়ার সুযোগ ছিল না। কমার্সে ভর্তি হতে পারত, কিন্তু পরিবারে কেউ কমার্স বোঝে না। ছেলে পড়াশোনায় "খুব ভালো না" বলে বাবা ভেবেছিল চাষের কাজেই লাগাবে।
কিন্তু সাইফুলের এক চাচা, যিনি উপজেলা কৃষি অফিসে কাজ করেন, তিনি বললেন: "ছেলেকে কৃষি ডিপ্লোমায় দাও। চার বছর। সরকারি খরচ। বের হলে চাকরিও পাবে, চাষও পারবে।"
বাবা রাজি হলেন। কিন্তু গ্রামের মানুষ? গ্রামের মানুষ বলল: "কৃষি পড়ে কী হবে? সারাজীবন মাটি কামড়াবে।"
৩
কৃষি ডিপ্লোমা। চার বছরের কোর্স। Bangladesh Technical Education Board-এর অধীনে। সারাদেশে ষোলোটা কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট।
সাইফুল ভর্তি হলো ময়মনসিংহের কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে। খরচ? প্রায় নেই বললেই চলে। সরকারি ইনস্টিটিউট, ভর্তি ফি সামান্য, হোস্টেল সস্তা। বছরে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা। চার বছরে পঁচিশ হাজারের কম।
কী শিখল? মাটি বিজ্ঞান। ফসল উৎপাদন। পশুপালন। মৎস্য চাষ। কীটতত্ত্ব। সার ব্যবস্থাপনা। সেচ প্রযুক্তি। কৃষি অর্থনীতি। কৃষি সম্প্রসারণ।
সাইফুল বলল: "চার বছরে আমি যেটা শিখলাম, সেটা হলো আমার বাবা যা তিরিশ বছর ধরে করে আসছে, সেটার পেছনে একটা পুরো বিজ্ঞান আছে। বাবা জানে কখন ধান লাগাতে হয়, কারণ বাবার বাবা এটা করতো। আমি জানি কেন সেই সময়ে লাগাতে হয়, মাটির আর্দ্রতা কত থাকলে ভালো হয়, কোন জাতের ধান কোন মাটিতে ফলে, কতটুকু সার দিলে ফলন সর্বোচ্চ হয়।"
থামল। তারপর বলল: "পার্থক্যটা science।"
৪
ডিপ্লোমা শেষ করে সাইফুল চাকরি খুঁজল। ছয় মাস।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে আবেদন করল। পদ আছে, কিন্তু নিয়োগ হচ্ছে না। সরকারি নিয়োগ বন্ধ। দুই বছর ধরে বন্ধ। কবে খুলবে কেউ জানে না।
বেসরকারি কোম্পানিতে গেল। একটা বীজ কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিল। বেতন বারো হাজার। ঢাকায় থাকতে হবে। ঢাকায় বারো হাজারে কী হয়?
আরেকটা NGO-তে আবেদন করল। মাঠ কর্মী। বেতন পনেরো হাজার। প্রজেক্ট ভিত্তিক, দুই বছরের চুক্তি। তারপর? তারপর আবার বেকার।
সাইফুল বলল: "ছয় মাস চাকরি খুঁজে আমি বুঝলাম, কৃষি ডিপ্লোমা ধরে চাকরি করতে গেলে দশ-বারো হাজার পাবো। আমার বাবা তিন বিঘা জমি চাষ করে বছরে দুই লাখ আয় করে। মানে মাসে সতেরো হাজার। চাষি বাবার আয় কৃষি ডিপ্লোমাধারীর চাকরির চেয়ে বেশি। এটা কোন ধরনের সিস্টেম?"
জাহিদ কিছু বলল না। কারণ উত্তর জানা নেই।
৫
তারপর সাইফুল অন্য পথে গেল।
বাড়ি ফিরে এলো। ত্রিশাল। বাবার পাশে দাঁড়াল। কিন্তু বাবার মতো চাষ করল না। বাবার চাষকে আপগ্রেড করল।
প্রথম কাজ: বাবার তিন বিঘায় তিনটা পরিবর্তন।
এক, সার প্রয়োগ পদ্ধতি বদলাল। বাবা আন্দাজে সার দিতো। কখনো বেশি, কখনো কম। সাইফুল মাটি পরীক্ষা করল। নিজের শেখা জ্ঞান দিয়ে। মাটিতে নাইট্রোজেন বেশি, ফসফরাস কম। সেই অনুযায়ী সার দিল। ফলন বাড়ল পনেরো শতাংশ।
দুই, জাত বদলাল। বাবা যে ধানের জাত ব্যবহার করতো সেটা পুরনো। BRRI dhan28। সাইফুল BRRI dhan89 ব্যবহার করল। ফলন বাড়ল, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি।
তিন, সেচের সময় বদলাল। বাবা প্রতিদিন পানি দিতো। সাইফুল AWD (Alternate Wetting and Drying) পদ্ধতি ব্যবহার করল। পানির খরচ কমল তিরিশ শতাংশ। ফলনে তফাত হলো না।
তিন বিঘায় মোট ফলন বাড়ল প্রায় বিশ শতাংশ, খরচ কমল পনেরো শতাংশ। বাবা অবাক হলেন। গ্রামের মানুষ অবাক হলো। "সাইফুলের বাপের জমিতে এবার ধান বেশি হইছে।"
সাইফুল হাসল: "বেশি হয়নি। ঠিকমতো হয়েছে। আগে কম হতো, সেটা ছিল ভুল।"
৬
কিন্তু সাইফুলের পরিকল্পনা শুধু বাবার তিন বিঘা না। সে ভাবছে বড়।
ফেসবুক পেজ খুলল: "সাইফুল এগ্রো সলিউশনস"। ফলোয়ার এখন দুই হাজার। বেশিরভাগ ত্রিশাল, ময়মনসিংহ, আর আশেপাশের উপজেলার চাষি।
বীজ, সার, কীটনাশক বিক্রি করে ফেসবুকের মাধ্যমে। কিন্তু শুধু বিক্রি না। প্রতিটা বীজের জাত, ফলন ক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা লিখে পোস্ট দেয়। কোন ফসলে কতটুকু সার দিতে হবে বলে দেয়। বাজারের দোকানদার বেশি বিক্রি করতে চায়। সাইফুল ঠিকটুকু বিক্রি করতে চায়।
আর মাটি পরীক্ষা। পঞ্চাশ হাজার টাকার soil testing kit কিনেছে নিজের সেভিংস থেকে। pH, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম মাপে। চাষিরা নমুনা আনে, সাইফুল রিপোর্ট দেয়। ফি: তিনশো টাকা। মাসে পনেরো-কুড়িটা টেস্ট।
৭
"আমার ইনকাম কত জানো?" সাইফুল জাহিদকে বলল।
"কত?"
"চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার। মাসে।"
জাহিদ চুপ। এটা বেশ ভালো আয়। মফস্বলে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার মানে ঢাকায় আশি-নব্বই হাজারের সমান। কারণ মফস্বলে জীবনযাত্রার খরচ অর্ধেক।
"ভাঙ্গানি দাও," জাহিদ বলল।
সাইফুল হিসাব করল: বীজ-সার-কীটনাশক বিক্রি থেকে পনেরো-কুড়ি হাজার। মাটি পরীক্ষা থেকে চার-ছয় হাজার। YouTube চ্যানেল "সাইফুলের কৃষি" (পাঁচ হাজার সাবস্ক্রাইবার, কৃষি বিষয়ে ভিডিও) থেকে তিন-চার হাজার। আর নিজের তিন বিঘার ফসল থেকে গড়ে দশ-বারো হাজার।
মোট: চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ। মৌসুমে কমবেশি হয়, কিন্তু বছর ধরে গড় করলে চল্লিশের নিচে নামে না।
৮
জাহিদ ভাবল কৃষির সামগ্রিক ছবিটা।
বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের চল্লিশ শতাংশ কৃষি খাতে। দেড় কোটি কৃষি পরিবার। মানে প্রায় ছয়-সাত কোটি মানুষ সরাসরি কৃষির উপর নির্ভরশীল।
কিন্তু এই দেশেরই শিক্ষা ব্যবস্থায় কৃষি শিক্ষা কোথায়? একদম তলানিতে। SSC-তে কৃষি শিক্ষা নামে একটা বিষয় আছে। কেউ নেয় না। কারণ কৃষি শিক্ষা নিলে মানুষ ভাবে ছেলে পড়াশোনায় "কাঁচা"। science নিতে পারেনি, তাই কৃষি নিয়েছে।
কৃষি ডিপ্লোমা? সেটা আরো বেশি stigmatized। পলিটেকনিকে ইলেকট্রিক্যাল বা মেকানিক্যাল পড়লে মানুষ বলে "টেকনিক্যাল শিক্ষা পাচ্ছে।" কৃষি ডিপ্লোমা পড়লে বলে: "বাপের মতো চাষ করবে।"
জাহিদ একটা জিনিস লক্ষ্য করল। শিক্ষার hierarchy আর অর্থনীতির hierarchy সম্পূর্ণ উল্টো।
শিক্ষার hierarchy: MBBS, Engineering, BBA, Honours, Diploma, কৃষি ডিপ্লোমা। উপরে ডাক্তার, নিচে কৃষি।
অর্থনীতির hierarchy: কৃষি (40% কর্মসংস্থান), গার্মেন্টস (20%), সেবা খাত (15%), IT (2%)। উপরে কৃষি, নিচে IT।
যে খাত দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষকে খাওয়ায়, সেই খাতের শিক্ষা সবচেয়ে নিচে। আর যে খাত দেশের দুই শতাংশ কর্মসংস্থান দেয়, সেই খাতের শিক্ষা সবচেয়ে উপরে।
এটা কী ধরনের মিসম্যাচ?
৯
সাইফুল বলল: "জানো, আমি যখন কৃষি ডিপ্লোমায় ভর্তি হলাম, আমার স্কুলের বন্ধুরা হাসল। একজন বলল, তুই তো বাবার পেশাই শিখতে গেলি। আরেকজন বলল, কৃষি পড়ে কী হবে? সরকারি চাকরি পাবি না, প্রাইভেট চাকরি পাবি না, শেষে চাষই করবি।"
থামল। তারপর বলল: "ওরা ঠিক বলেছিল একটা জায়গায়। আমি চাষই করি। কিন্তু ওরা যেটা বোঝেনি, চাষ করা আর চাষ জানা এক জিনিস না।"
জাহিদ বলল: "মানে?"
"আমার বাবা জানতো কীভাবে ধান লাগাতে হয়। আমি জানি কেন ধান লাগাতে হয়, কখন লাগাতে হয়, কোন ধান লাগাতে হয়। পার্থক্যটা science। আমি জানি কেন। আর কেন জানলে, কীভাবে বদলাতে হবে সেটাও জানা যায়।"
১০
জাহিদের মাথায় একটা আইডিয়া ঘুরছিল। সাইফুলের সাথে কথা বলতে বলতে আইডিয়াটা আরো পরিষ্কার হলো।
সাইফুল যেটা করছে, সেটা মূলত তথ্য বিক্রি। কোন বীজ ভালো, কোন সার দিতে হবে, মাটির অবস্থা কী। এই তথ্য চাষিদের কাছে পৌঁছানোর জন্য সাইফুল এখন ফেসবুক ব্যবহার করছে, YouTube ব্যবহার করছে, মুখে মুখে বলছে।
কিন্তু যদি একটা অ্যাপ থাকতো?
জাহিদ বলল: "সাইফুল, তুই যদি একটা অ্যাপ বানাতে পারতি, যেটায় চাষিরা নিজের জমির তথ্য দিলে, ধরো জমির আয়তন, ফসলের ধরন, উপজেলা, তাহলে অ্যাপটা বলে দিতো কোন বীজ ব্যবহার করবে, কতটুকু সার দিবে, কখন সেচ দিবে, তাহলে?"
সাইফুল বলল: "তাহলে আমি একজনের বদলে হাজার জনকে সাহায্য করতে পারতাম।"
"ঠিক। আর আমি কোডিং জানি।"
সাইফুল চুপ। তারপর বলল: "তুই কোডিং জানিস, আমি কৃষি জানি।"
"হ্যাঁ।"
"মিলালে কী হয়?"
"Agri-tech হয়।"
১১
তারা পরিকল্পনা করতে শুরু করল। অ্যাপের নাম এখনো ঠিক হয়নি। কিন্তু ফিচার লিস্ট তৈরি হচ্ছে। ফসল পরামর্শ: চাষি জমির তথ্য দেবে, অ্যাপ বলবে কোন জাত, কতটুকু সার, কখন সেচ। মাটি পরীক্ষার ডিজিটাল রিপোর্ট। স্থানীয় বাজারদর। আবহাওয়া সতর্কতা।
জাহিদ বলল: "MVP বানাতে দুই-তিন মাস। React Native, FastAPI, SQLite।"
সাইফুল বলল: "আমি কৃষি ডেটা দেব। কোন জেলায় কোন ফসল, কোন মাটিতে কী হয়, সার ডোজ, সেচের সময়সূচি। BARI, BRRI-র গবেষণা পত্র থেকে verified ডেটা।"
কিন্তু agri-tech কি বাংলাদেশে কাজ করবে? জাহিদ রিসার্চ করল। দেড় কোটি কৃষি পরিবার। ৮৫ শতাংশ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি। বেশিরভাগ traditional পদ্ধতিতে চাষ করে। precision agriculture, ড্রিপ ইরিগেশন, সেন্সর ভিত্তিক সেচ, এগুলো গবেষণা পর্যায়ে আছে, মাঠ পর্যায়ে নেই। সরকারি ভর্তুকি আছে, কৃষি ঋণ সহজ শর্তে পাওয়া যায়। রপ্তানির সুযোগ আছে: UK-তে বাংলাদেশি শাকসবজি, মধ্যপ্রাচ্যে মাছ, জাপানে পাট পণ্য।
সুযোগ আছে। বিশাল সুযোগ। কিন্তু কেউ এই দিকে তাকাচ্ছে না। কারণ কৃষি মানে "ছোট কাজ"।
১২
জাহিদ সাইফুলকে জিজ্ঞেস করল: "তোর ব্যাচে কতজন ছিল?"
"চল্লিশজন।"
"কতজন এখন কৃষি সংক্রান্ত কাজে আছে?"
সাইফুল ভাবল। আঙুলে গুনল। "আট-দশজন।"
"বাকিরা?"
"বাকিরা? কেউ গার্মেন্টসে গেছে। কেউ দোকান দিয়েছে। কেউ মালয়েশিয়া গেছে। কেউ বিদেশ যাওয়ার জন্য এজেন্টের কাছে টাকা জমাচ্ছে। দুইজন BCS দিচ্ছে, কৃষি ক্যাডারে।"
"কেন?"
"কেন মানে? কৃষি কাজে টাকা নেই মনে করে। সরকারি চাকরি না পেলে কৃষি ডিপ্লোমা দিয়ে কী হবে? বেসরকারিতে বেতন কম। নিজে কিছু করতে গেলে মূলধন লাগে। মূলধন কোথায়?"
জাহিদ ভাবল। সাইফুল পঞ্চাশ হাজার দিয়ে soil testing kit কিনেছে। সেটাই তার মূলধন। কিন্তু সবার পক্ষে পঞ্চাশ হাজার জোগাড় করা সম্ভব না। অথচ সরকারি ভর্তুকি আছে, কৃষি ঋণ আছে, Youth Entrepreneurship Scheme আছে। চাষিরা জানে না। তথ্য পৌঁছায় না। আবার সেই গ্যাপ।
১৩
সাইফুল আরেকটা কথা বলল। কথাটা জাহিদের মনে গেঁথে গেল।
"জানো, আমাদের দেশে একটা অদ্ভুত জিনিস আছে। একজন ছেলে যদি BUET-এ পড়ে, software engineer হয়, মাসে দুই লাখ কামায়, সবাই বলে সফল। কিন্তু একজন ছেলে যদি কৃষি শিখে, আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করে, মাসে দুই লাখ কামায়, মানুষ বলবে, ভালো চাষা।"
থামল।
"চাষা। এটাই হলো সমস্যা। চাষ করলে তুমি চাষা। engineer হলে তুমি engineer। দুজনেরই আয় সমান, কিন্তু একজনের পরিচয়ে সম্মান আছে, আরেকজনের পরিচয়ে নেই।"
জাহিদ বলল: "কিন্তু দেশ চালাচ্ছে কে? ধান কে ফলাচ্ছে? মাছ কে ধরছে? সবজি কে বাড়াচ্ছে?"
"চাষা। যাকে তুমি ছোট করে দেখছ, সে-ই তোমার ভাত রান্না করার ধান ফলাচ্ছে।"
১৪
জাহিদ সেই রাতে একটু অন্যভাবে ভাবল।
কৃষি দেশের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান খাত, কিন্তু কৃষি শিক্ষা দেশের সবচেয়ে অবহেলিত শিক্ষা। এই mismatch শুধু হাস্যকর না, ক্ষতিকর। কৃষি শিক্ষাকে ছোট করলে, ভালো ছাত্ররা আসবে না। innovation হবে না। ফলন বাড়বে না। ষোলো কোটি মানুষকে খাওয়ানো কঠিন হবে।
১৫
সাইফুলের সাথে শেষ কথা হলো রাত এগারোটায়। মেসেঞ্জারে।
সাইফুল লিখল: "জাহিদ, তুই যদি সত্যিই অ্যাপটা বানাস, আমি সব ডেটা দেব। ফসল ক্যালেন্ডার, সার ডোজ চার্ট, জাত তালিকা, সেচ সূচি। সব আমার কাছে আছে। আমার চার বছরের পড়াশোনা আর দুই বছরের মাঠ অভিজ্ঞতা।"
জাহিদ লিখল: "বানাব। কিন্তু প্রথমে ছোট করে শুরু করি। একটা উপজেলা। ত্রিশাল। তোর এলাকার চাষিদের জন্য। কাজ করলে স্কেল করব।"
সাইফুল লিখল: "ঠিক আছে। একটা কথা বলি?"
"বল।"
"আমার বাবা সারাজীবন চাষ করেছে। কেউ কোনোদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করেনি, আপনি কী করেন। কারণ সবাই জানে, চাষি। কিন্তু আমি যখন কৃষি ডিপ্লোমা করলাম, মানুষ জিজ্ঞেস করল, কেন? কেন কৃষি পড়ছিস? যেন কৃষি পড়া একটা অপরাধ।"
জাহিদ কিছু বলল না।
সাইফুল লিখল: "জানো, আমার বাবা কোনো সম্মান পায়নি। কোনো পুরস্কার পায়নি। কেউ কোনোদিন বলেনি, আপনি যে ধান ফলান, সেটা একটা মূল্যবান কাজ। কিন্তু আমাদের দেশের প্রতিটা মানুষ, শহরের, গ্রামের, ধনী, গরিব, সবাই আমার বাবার ফলানো ধান খায়। প্রতিদিন। তিনবেলা।"
১৬
জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করল।
বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকাল। সাইফুলের শেষ কথাটা মাথায় ঘুরছে। চাষি বাবার কথা। ধানের কথা। তিনবেলা ভাতের কথা।
সাইফুলের বাবা মাটি চেনে। মাটিতে হাত দিলে বুঝতে পারে আর্দ্রতা কেমন। ফসলের পাতা দেখে বুঝতে পারে রোগ হয়েছে কি না। তিরিশ বছরের অভিজ্ঞতা, কোনো সার্টিফিকেটে লেখা নেই। সাইফুল সেই জ্ঞানকে science দিয়ে আপগ্রেড করেছে। বাবার হাত আর ছেলের মাথা।
কিন্তু সমাজ বলে, কৃষি পড়া মানে fail করা। কৃষক মানে গরিব।
মাটি থেকে যা ওঠে, তা দিয়ে দেশ চলে। মাটির কাজকে ছোট করলে, দেশকেও ছোট করা হয়।
জাহিদ চোখ বন্ধ করল। ঘুমানোর চেষ্টা। কিন্তু মাথায় একটা অ্যাপের wireframe ঘুরছে। ত্রিশালের চাষিদের জন্য। সাইফুলের ডেটা দিয়ে। জাহিদের কোড দিয়ে।
মাটির সন্তানদের জন্য।