নতুন কারিগর

পুরনো কারিগর লোহা পেটাতো, নতুন কারিগর কোড পেটায়

পর্ব ৮৭ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

রুবিনা ফোন করল সন্ধ্যা সাতটায়।

জাহিদ তখন কোডকারিগর-এর এক ক্লায়েন্টের ওয়েবসাইটে একটা বাগ ফিক্স করছিল। ছোট বাগ, মোবাইল ভিউতে নেভবার ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু ক্লায়েন্ট মনে করছে সাইট হ্যাক হয়ে গেছে। জাহিদ তিনবার বুঝিয়েছে, CSS-এর একটা লাইন ঠিক করলেই হবে। ক্লায়েন্ট বলেছে, "ভাই, CSS-টা আবার কী?"

ফোন ধরল।

"ভাইয়া, একটা খবর আছে।" রুবিনার গলায় চাপা উত্তেজনা।

"বল।"

"আমি গত মাসে কুড়ি হাজার টাকা ইনকাম করেছি।"

জাহিদ একটু থামল। মনে মনে হিসাব করল। রুবিনা কোডকারিগর-এ যোগ দিয়েছে আট মাস আগে। তখন তার মাসিক আয় ছিল তিন-চার হাজার। ফাইভারে ছোটখাটো লোগো ডিজাইন করত। ক্যানভায় সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট বানাত। পাঁচ ডলার, দশ ডলার করে।

আট মাসে তিন-চার হাজার থেকে কুড়ি হাজার। পাঁচগুণ।

"কীভাবে?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল। সে জানে কীভাবে, কিন্তু রুবিনার মুখে শুনতে চায়।

"ভিডিও এডিটিং।" রুবিনা বলল। "আপনি বলেছিলেন তো, শুধু গ্রাফিক ডিজাইনে আটকে থাকলে সিলিং আসবে তাড়াতাড়ি। ভিডিও শিখলে মার্কেট অনেক বড়। আমি শিখেছি।"

"কোথায় শিখলি?"

"ইউটিউব। DaVinci Resolve-এর ফ্রি ভার্সন। তিন মাস প্র্যাকটিস করেছি। প্রথম মাসে নিজের পুরনো ভিডিও এডিট করেছি, কারো কাছে দেখাইনি। দ্বিতীয় মাসে ফাইভারে গিগ খুলেছি, পাঁচ ডলারে। তৃতীয় মাসে একটা ইউটিউব চ্যানেলের রেগুলার এডিটর হয়েছি। মাসে আটটা ভিডিও, প্রতিটা পনেরোশো টাকা।"

রুবিনার গল্পটা জাহিদ ভালো করে জানে। কারণ রুবিনা তার নিজের গল্পের একটা ছোট সংস্করণ।

বগুড়ার মেয়ে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটা কলেজ থেকে BBA করেছে। গ্র্যাজুয়েশনের পর দেড় বছর চাকরি খুঁজেছে। পায়নি। ঢাকায় গিয়ে ইন্টারভিউ দিয়েছে কয়েকটা, বাসভাড়ার চেয়ে বেশি খরচ হয়েছে। একটা কোম্পানি অফার দিয়েছিল, বেতন আট হাজার, ঢাকায় থাকা-খাওয়ার খরচ বারো হাজার। অঙ্কটা মেলেনি।

তারপর একদিন ফেসবুকে দেখল কেউ একটা পোস্ট দিয়েছে: "গ্রাফিক ডিজাইন শিখুন, ঘরে বসে আয় করুন।" এই ধরনের পোস্ট বাংলাদেশে হাজারটা ঘোরে, বেশিরভাগই ভুয়া কোর্স বিক্রির ফাঁদ। কিন্তু রুবিনা ওই পোস্ট থেকে কোর্স কেনেনি। পোস্টে যে সফটওয়্যারের নাম ছিল, সেটা ইউটিউবে সার্চ করল। ক্যানভা।

ক্যানভা ফ্রি। কম্পিউটারে ইনস্টল করতে হয় না, ব্রাউজারে চলে। রুবিনার কাছে কম্পিউটার ছিল না, বাবার পুরনো অ্যান্ড্রয়েড ফোনে চালাত। স্ক্রিন ছোট, কিন্তু কাজ চলে।

ছয় মাস ক্যানভায় কাজ করল। তারপর ফাইভারে অ্যাকাউন্ট খুলল। প্রথম অর্ডার পেতে দুই মাস লেগেছে। পাঁচ ডলার। তিনশো টাকার কাজে চার ঘণ্টা খেটেছে। ঘণ্টায় পঁচাত্তর টাকা। রিকশাওয়ালার চেয়ে কম।

কিন্তু সেই পাঁচ ডলারই রুবিনার জীবন বদলে দিয়েছে। কারণ সেটা প্রমাণ করেছে যে একটা মেয়ে, বগুড়ায় বসে, বাবার পুরনো ফোনে, বিদেশি ক্লায়েন্টের কাজ করতে পারে। ঢাকায় না গিয়ে। কোনো অফিসে না ঢুকে। কারো অধীনে না থেকে।

জাহিদ রুবিনাকে কোডকারিগর-এ নিয়েছিল গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে। তখন কোডকারিগর মানে জাহিদ আর সজীব, দুইজন। ক্লায়েন্টরা মাঝে মাঝে লোগো চাইত, ব্যানার চাইত, সোশ্যাল মিডিয়া কিট চাইত। জাহিদ নিজে করত, কিন্তু ডিজাইন তার শক্তি না। সে ডেভেলপার, ডিজাইনার না।

রুবিনা এসে সেই গ্যাপটা ভরাট করল। এখন কোডকারিগর-এর তিনজন সদস্য: জাহিদ (ফুলস্ট্যাক ডেভেলপমেন্ট), সজীব (ফ্রন্টএন্ড আর জুনিয়র ডেভেলপমেন্ট), রুবিনা (গ্রাফিক ডিজাইন আর ভিডিও এডিটিং)।

তিনজনই সেলফ-ট্ট। কেউ কোনো ইনস্টিটিউট থেকে শেখেনি। কারো ডিপ্লোমা নেই। কারো সার্টিফিকেট নেই। শুধু ইউটিউব, ফ্রি অনলাইন রিসোর্স, আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্র্যাকটিস।

তিনজনই মফস্বলের। জাহিদ ময়মনসিংহের। সজীব নরসিংদীর। রুবিনা বগুড়ার। কেউ ঢাকায় থাকে না। কেউ কোনো অফিসে যায় না।

তিনজনের সম্মিলিত মাসিক আয় এখন আড়াই লাখ টাকার কাছাকাছি। ডলারে প্রায় আড়াই হাজার। বাংলাদেশের মফস্বলে তিনজন তরুণের জন্য এই আয় অসাধারণ না, কিন্তু খারাপও না। জাহিদের বাবা সারাজীবনে মাসে এত টাকা দেখেননি।

সজীবের কথাও বলা দরকার।

সজীব কোডকারিগর-এ যোগ দিয়েছে এক বছর আগে। তখন সে ছিল সবে HTML-CSS শেখা একটা ছেলে। জাহিদ তাকে নিয়েছিল কারণ সজীবের মধ্যে একটা জিনিস দেখেছিল: ধৈর্য। সজীব একটা সমস্যায় আটকে গেলে ছেড়ে দেয় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে। Stack Overflow পড়ে, ইউটিউব ভিডিও দেখে, ChatGPT-কে জিজ্ঞেস করে। নিজে সমাধান বের করে।

এক বছরে সজীবের দক্ষতা অনেক বেড়েছে। HTML-CSS থেকে শুরু করে এখন React শিখেছে, Tailwind শিখেছে, API integration করতে পারে। মাসে পনেরো হাজার টাকা আয় করে। এক বছর আগে শূন্য ছিল।

কিন্তু সজীব থামতে চায় না।

গত মাসে সজীব জাহিদকে বলল, "ভাইয়া, আমি মোবাইল অ্যাপ শিখতে চাই।"

"কেন?"

"কারণ ক্লায়েন্টরা জিজ্ঞেস করে। ওয়েবসাইটের সাথে অ্যাপও চায়। আমরা বলি, আমরা অ্যাপ করি না। মানে আমরা টাকা ফেরত পাঠাই।"

জাহিদ হাসল। ছেলেটা ঠিক পয়েন্টেই আঘাত করেছে। কোডকারিগর-এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা: মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট। ক্লায়েন্টদের একটা বড় অংশ ওয়েবসাইটের পাশাপাশি অ্যাপ চায়। ফুড ডেলিভারি, ই-কমার্স, বুকিং সিস্টেম, এগুলোতে অ্যাপ ছাড়া চলে না।

"কী দিয়ে শিখবি?"

"React Native। আমি তো React জানি। React Native-এ অনেক কিছু কমন।"

"কোথায় শিখবি?"

সজীব হাসল। "ভাইয়া, আপনি জানেন কোথায়।"

ইউটিউব।

এই গল্পটা শুধু জাহিদ-রুবিনা-সজীবের না। এটা একটা বড় পরিবর্তনের ছোট একটা উদাহরণ।

বাংলাদেশে "ভোকেশনাল স্কিল" বলতে এতদিন বোঝাত হাতের কাজ। ইলেকট্রিক্যাল ওয়্যারিং, প্লাম্বিং, ওয়েল্ডিং, মোটরসাইকেল মেরামত। এগুলো এখনো দরকার, এখনো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলোর পাশাপাশি নতুন একটা ক্যাটাগরি তৈরি হচ্ছে যেটা পুরনো কোনো ছকে ফেলা যায় না।

ডিজিটাল ভোকেশনাল স্কিল। নাম নতুন, ধারণাটাও নতুন।

এগুলো কী? একটু দেখা যাক।

থ্রিডি মডেলিং আর অ্যানিমেশন। গেম ইন্ডাস্ট্রি বাংলাদেশে এখনো ছোট, কিন্তু বাড়ছে। আর্কিটেকচারাল ভিজুয়ালাইজেশনের কাজ আছে। রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো ভবনের 3D রেন্ডার চায়। একজন দক্ষ 3D আর্টিস্ট মাসে তিরিশ থেকে আশি হাজার টাকা আয় করতে পারে। ফ্রিল্যান্স মার্কেটে আরো বেশি।

ভিডিও এডিটিং। ইউটিউবে বাংলাদেশি চ্যানেলের সংখ্যা হাজারে হাজার। প্রতিটা চ্যানেলের এডিটর দরকার। মার্কেটিং এজেন্সিগুলো প্রতিদিন রিলস বানায়, শর্টস বানায়, প্রোমো ভিডিও বানায়। একজন ভিডিও এডিটর মাসে পনেরো থেকে চল্লিশ হাজার টাকা আয় করতে পারে। রুবিনা এই পথেই আছে।

ডিজিটাল মার্কেটিং। SEO, সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট, কনটেন্ট মার্কেটিং, পেইড অ্যাডস ম্যানেজমেন্ট। ছোট ব্যবসা থেকে বড় কোম্পানি, সবার দরকার। মাসে বিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব।

ডেটা এন্ট্রি আর ডেটা অ্যানোটেশন। AI ট্রেনিং ডেটা তৈরির কাজ। ইমেজ ট্যাগিং, টেক্সট ক্লাসিফিকেশন, অডিও ট্রান্সক্রিপশন। এন্ট্রি লেভেল, বেতন কম, মাসে দশ থেকে পনেরো হাজার। কিন্তু শুরু করা সহজ। কম্পিউটার চালাতে পারলেই হয়। AI কোম্পানিগুলোর এই ডেটা দরকার, ফলে কাজের অভাব নেই।

মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট। React Native, Flutter। একটা ফ্রেমওয়ার্ক শিখলে Android আর iOS দুটোর জন্যই অ্যাপ বানানো যায়। দক্ষ অ্যাপ ডেভেলপার মাসে চল্লিশ থেকে এক লাখ টাকা আয় করতে পারে। সজীব এই পথে যেতে চাইছে।

এই স্কিলগুলোর মধ্যে একটা কমন থ্রেড আছে।

কোনোটার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাগে না। পলিটেকনিক ডিপ্লোমা লাগে না। কোনো ইনস্টিটিউটের সার্টিফিকেট লাগে না। যেটা লাগে সেটা তিনটা জিনিস: একটা কম্পিউটার, ইন্টারনেট কানেকশন, আর ছয় থেকে বারো মাসের একনিষ্ঠ অনুশীলন।

ছয় থেকে বারো মাস।

একটা BBA ডিগ্রি নিতে চার বছর লাগে। একটা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং-এ চার বছর। MBBS-এ পাঁচ বছর আর ইন্টার্নশিপ। BCS-এর জন্য দুই-তিন বছর প্রস্তুতি, তারপর আরো দুই-তিন বছর প্রক্রিয়া।

আর ভিডিও এডিটিং শিখতে? ছয় মাস। নিজের ঘরে বসে। ফ্রি সফটওয়্যারে। ইউটিউবে।

এটা বলা হচ্ছে না যে ডিগ্রির দরকার নেই। একজন ডাক্তার ইউটিউব দেখে হতে পারবে না। একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ইউটিউব দেখে ব্রিজ ডিজাইন করবে না। কিন্তু একজন গ্রাফিক ডিজাইনার? একজন ভিডিও এডিটর? একজন ওয়েব ডেভেলপার? এদের জন্য চার বছরের ডিগ্রি কতটা জরুরি, সেটা প্রশ্ন করার সময় এসেছে।

জাহিদ নিজে এর প্রমাণ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে অনার্স। ওয়েব ডেভেলপমেন্টের সাথে সমাজবিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই। সে যা জানে, সব নিজে শিখেছে। অনলাইনে। ফ্রি রিসোর্স থেকে।

কোডকারিগর-এর গল্পটা জাহিদ মাঝে মাঝে ভাবে। তিনজন মানুষ। তিনটা আলাদা জেলা। কেউ কাউকে আগে চিনত না। ইন্টারনেটে পরিচয়। ফেসবুক গ্রুপে, ফ্রিল্যান্সার কমিউনিটিতে। এখন একসাথে কাজ করে। সব অনলাইনে। কোনো অফিস নেই। কোনো সাইনবোর্ড নেই।

সম্মিলিত আয় মাসে আড়াই হাজার ডলারের বেশি। বাংলাদেশি টাকায় তিন লাখের কাছাকাছি। তিনজনে ভাগ করলে গড়ে এক লাখ। মফস্বলে এক লাখ টাকা মাসিক আয় মানে অনেক ভালো জীবন।

কিন্তু এটা গড়। জাহিদের আয় সবচেয়ে বেশি, কারণ সে সবচেয়ে দক্ষ আর সবচেয়ে বেশি দিন ধরে কাজ করছে। রুবিনা কুড়ি হাজারে পৌঁছেছে এবং বাড়ছে। সজীব পনেরো হাজারে, কিন্তু মোবাইল অ্যাপ শিখলে ছয় মাসের মধ্যে দ্বিগুণ হবে।

জাহিদ ভাবে, কোডকারিগর কোনো বিশেষ কিছু না। বাংলাদেশে এরকম হাজার হাজার ছোট টিম আছে। দুইজন, তিনজন, চারজন করে। কেউ ওয়েব বানায়, কেউ গ্রাফিক করে, কেউ ভিডিও এডিট করে। কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই, কোনো অফিস অ্যাড্রেস নেই। শুধু স্কিল আছে, ক্লায়েন্ট আছে, আর ইন্টারনেট আছে।

এটা নতুন ধরনের কারিগরি। পুরনো কারিগর হাতে হাতুড়ি ধরত, লোহা পেটাত। নতুন কারিগর কিবোর্ডে আঙুল চালায়, কোড লেখে, পিক্সেল সাজায়।

স্টিগমাটা কি কমছে?

জাহিদ ভাবে, হ্যাঁ, কমছে। কিন্তু ধীরে।

রুবিনার বাবা প্রথমে বুঝতে পারেননি মেয়ে কী করে। "কম্পিউটারে কী করিস সারাদিন?" রুবিনা বলেছে, "ছবি বানাই।" বাবা ভেবেছেন আঁকাআঁকি। তারপর যখন রুবিনা প্রথম মাসে পাঁচ হাজার টাকা দিল পরিবারে, বাবা চুপ হয়ে গেলেন। দশ হাজার দেওয়ার পর বাবা পাড়ায় বলতে শুরু করলেন, "আমার মেয়ে কম্পিউটারে কাজ করে।" কুড়ি হাজারের পর বাবা গর্বিত।

"ছেলে কম্পিউটারে কাজ করে" কিংবা "মেয়ে কম্পিউটারে কাজ করে" এই কথাটা বাংলাদেশে এখন আর আগের মতো খারাপ শোনায় না। আগে এটা বলা মানে ছেলে বেকার, ঘরে বসে গেম খেলে। এখন অনেক বাবা-মা জানেন যে কম্পিউটারে কাজ মানে টাকা আসে। কত টাকা, সেটা তারা বোঝেন না। কিন্তু টাকা আসে, এটুকু বোঝেন।

সজীবের বাবা অবশ্য এখনো পুরোপুরি বোঝেননি। সজীবের বাবা স্কুল শিক্ষক। তিনি চান ছেলে সরকারি চাকরি করুক। সজীব বলে, "আমি মাসে পনেরো হাজার আয় করি।" বাবা বলেন, "সরকারি চাকরিতে পেনশন আছে।" সজীব বলে, "আমার স্কিল আছে, পেনশনের দরকার নেই।" বাবা বলেন, "স্কিল থাকলেও চাকরি থাকে না, কোম্পানি বন্ধ হয়ে যায়।" সজীব বলে, "আমি কোম্পানিতে কাজ করি না, নিজে করি।" বাবা বলেন, "নিজে করলে কে গ্যারান্টি দেবে?"

এই কথোপকথন বাংলাদেশের লাখো বাড়িতে হচ্ছে। পুরনো প্রজন্ম নিরাপত্তা চায়। নতুন প্রজন্ম স্বাধীনতা চায়। পুরনো প্রজন্ম পেনশন বোঝে, পোর্টফোলিও বোঝে না। নতুন প্রজন্ম ফাইভারের রেটিং বোঝে, সরকারি গেজেট বোঝে না।

দুই পক্ষই ঠিক। দুই পক্ষই ভুল। কিন্তু টাকাটা যখন আসতে থাকে, তখন আস্তে আস্তে পুরনো পক্ষ চুপ হয়ে যায়। পুরোপুরি মানে না, কিন্তু বলাটা বন্ধ করে দেয়।

কিন্তু একটা সমস্যা আছে। বড় সমস্যা।

ইনফ্রাস্ট্রাকচার।

জাহিদ ময়মনসিংহে থাকে। শহরের ইন্টারনেট মোটামুটি চলে। কিন্তু রুবিনা বগুড়ার যেখানে থাকে, সেখানে ব্রডব্যান্ড নেই। মোবাইল ডেটা দিয়ে কাজ করে। 4G-তে ভিডিও এডিটিংয়ের ফাইল আপলোড করতে ঘণ্টা লাগে। একটা দুই মিনিটের ভিডিও এক্সপোর্ট করতে তার পুরনো ল্যাপটপে চল্লিশ মিনিট সময় লাগে। সেই ফাইল আপলোড করতে আরো বিশ মিনিট।

সজীব নরসিংদীতে লোডশেডিং-এ ভোগে। দিনে দুই-তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। কাজের মাঝখানে কারেন্ট চলে গেলে ল্যাপটপের ব্যাটারি দুই ঘণ্টা চলে, তারপর অন্ধকার। IPS কেনার কথা ভাবছে, কিন্তু ভালো IPS-এর দাম পনেরো-বিশ হাজার। এক মাসের আয়ের সমান।

আর ল্যাপটপ। একটা ভালো ল্যাপটপ, মানে যেটায় ভিডিও এডিটিং বা 3D মডেলিং বা অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট স্মুথলি করা যায়, সেটার দাম ষাট থেকে আশি হাজার টাকা। বাংলাদেশের গড় মাসিক আয়ের চার-পাঁচগুণ। মফস্বলের একটা পরিবারের জন্য এটা বিশাল বিনিয়োগ।

জাহিদের প্রথম ল্যাপটপটা ছিল সেকেন্ডহ্যান্ড। সাড়ে বারো হাজার টাকায় কিনেছিল। র‍্যাম চার জিবি, হার্ডডিস্ক পাঁচশো জিবি। ক্রোম খুললে ফ্যান ঘুরত ঝড়ের মতো। দুটো ট্যাব খুললে হ্যাং করত। VS Code চালাতে পাঁচ মিনিট লাগত।

সেই ল্যাপটপেই সে শিখেছে। সেই ল্যাপটপেই প্রথম ক্লায়েন্টের কাজ করেছে। এখন সে একটু ভালো ল্যাপটপ কিনেছে, কিন্তু সেটাও মিডরেঞ্জ।

ইনফ্রাস্ট্রাকচারের এই গ্যাপটা বোঝা দরকার। ডিজিটাল স্কিল শেখা "ফ্রি" বলে বলা হয়। ইউটিউব ফ্রি, সফটওয়্যার ফ্রি। কিন্তু কম্পিউটার ফ্রি না। ইন্টারনেট ফ্রি না। বিদ্যুৎ ফ্রি না। যেই ছেলে বা মেয়ে সত্যিই দরিদ্র, তার কাছে একটা ল্যাপটপ কেনার টাকা নেই, তার জন্য এই "ফ্রি" শিক্ষা আসলে ফ্রি না।

১০

রাত দশটায় জাহিদ কোডকারিগর-এর গ্রুপ চ্যাটে একটা মেসেজ দিল।

"রুবিনা, কনগ্র্যাটস। কুড়ি হাজার। পরের টার্গেট ত্রিশ।"

রুবিনা রিপ্লাই দিল: "ইনশাল্লাহ। ভাইয়া, আমি মোশন গ্রাফিক্সও শিখব। After Effects।"

সজীব লিখল: "আমি React Native-এর প্রথম টিউটোরিয়াল দেখলাম। বাংলায় ভালো টিউটোরিয়াল নেই, ইংরেজিতে দেখছি।"

জাহিদ হাসল। এক বছর আগে সজীব ইংরেজি ভিডিও দেখতে ভয় পেত। বলত, "ভাইয়া, ওরা এত দ্রুত কথা বলে, কিছু বুঝি না।" এখন সাবটাইটেল অন করে দেখে। প্লেব্যাক স্পিড 0.75x করে দেখে। বোঝে। শেখে।

জাহিদ গ্রুপে লিখল: "আমরা তিনজন। তিনটা আলাদা জেলা। কেউ কোনো ইনস্টিটিউট থেকে শিখিনি। কোনো ডিপ্লোমা নেই। কিন্তু আমরা কাজ পাচ্ছি, টাকা পাচ্ছি, শিখছি। এটাই নতুন কারিগরি।"

রুবিনা লিখল: "আমার দাদা কামার ছিলেন। লোহা পেটাতেন। আমি পিক্সেল পেটাই।"

সজীব লিখল: "আমার নানা তাঁতি ছিলেন। কাপড় বুনতেন। আমি কোড বুনি।"

জাহিদ কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে টাইপ করল।

"পুরনো কারিগর লোহা পেটাতো। নতুন কারিগর কোড পেটায়। হাতিয়ার বদলেছে, কারিগরি বদলায়নি।"

---

*নবম অধ্যায়: হাতের কাজ, হাতের মুক্তি। পর্ব ৮৭/১০০।*