রুবিনার লড়াই

মেয়ে হলে 'রাতে ফোনে কার সাথে কথা বলে?'

পর্ব ৮৮ · ১৩ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

রুবিনার গল্পটা জাহিদ প্রথম শুনেছিল একটা টিম মিটিংয়ে।

তখন জাহিদের টিমে তিনজন। জাহিদ নিজে ফুল-স্ট্যাক, রাকিব ফ্রন্টএন্ড, আর রুবিনা গ্রাফিক ডিজাইন। রুবিনাকে জাহিদ পেয়েছিল একটা ফেসবুক গ্রুপ থেকে। কেউ একজন পোস্ট করেছিল: "একটা মেয়ে গ্রাফিক ডিজাইন শিখেছে YouTube থেকে, কাজ খুঁজছে, কেউ কি দিতে পারবেন?" জাহিদ তার পোর্টফোলিও দেখল। খারাপ না। রঙের সেন্স আছে, টাইপোগ্রাফি বোঝে, লেআউট ক্লিন। একটু রাফ, কিন্তু কাঁচা হাতের ভেতরে কিছু একটা আছে।

জাহিদ মেসেজ দিল। "কাজ করবেন?"

রুবিনা উত্তর দিল দুই ঘণ্টা পর। "কী ধরনের কাজ?"

"সোশ্যাল মিডিয়া গ্রাফিক্স, ব্যানার, লোগো। প্রতি মাসে নির্দিষ্ট কাজ থাকবে। পেমেন্ট bKash-এ।"

"কত?"

"শুরুতে বিশ হাজার। কাজ ভালো হলে বাড়বে।"

আবার দেরি। এবার চার ঘণ্টা। তারপর একটা মেসেজ: "আমি রাজি।"

রুবিনা থাকে মফস্বলে। জেলা শহর না, উপজেলা পর্যায়ের একটা ছোট শহর। মানে একটা বাসস্ট্যান্ড, দুইটা স্কুল, একটা কলেজ, একটা বাজার, আর চারপাশে ধানক্ষেত। এই হলো তার পৃথিবী।

HSC পাস করেছে। GPA 4.17। ভালো ছাত্রী ছিল, কিন্তু মফস্বলের ভালো আর ঢাকার ভালো এক জিনিস না। ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিল দুইটা পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে। দুইটাতেই হয়নি। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছিল, কিন্তু বাবা বললেন, "কলেজ ঢাকায়, থাকবে কোথায়? খরচ কে দেবে?"

প্রশ্নটা ন্যায্য ছিল। বাবা দোকানদার। উপজেলা বাজারে একটা মুদি দোকান। মাসে আয় পনেরো থেকে বিশ হাজার। পরিবারে চারজন। রুবিনা, ছোট বোন মিতু, মা, বাবা। এই আয়ে ঢাকায় মেয়ে পাঠানো সম্ভব না। ছেলে হলে হয়তো চেষ্টা করতেন। মেসে থাকতো, টিউশনি করতো। কিন্তু মেয়ে? মেয়েকে একা ঢাকায় পাঠানো মফস্বলের বাবার পক্ষে কল্পনা করাটাই কঠিন।

তো রুবিনা বাড়িতে বসে রইল। HSC পাস, কিন্তু কিছু করার নেই। বিয়ের প্রস্তাব আসতে শুরু করল। মফস্বলে মেয়ে HSC পাস করার পর বাড়িতে বসে থাকলে একটাই প্রশ্ন আসে: "বিয়ে কবে?"

রুবিনার মা চাইলেন বিয়ে দিতে। ভালো একটা প্রস্তাব এসেছিল। ছেলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মাসে তিরিশ হাজার বেতন। মফস্বলের হিসাবে এটা ভালো পাত্র।

রুবিনা বলল, "আমি বিয়ে করবো। কিন্তু আগে নিজের পায়ে দাঁড়াবো।"

মা বললেন, "পায়ে দাঁড়াবে কীভাবে? চাকরি কোথায়?"

রুবিনা সেই মুহূর্তে জানত না কীভাবে। কিন্তু সে জানত, এখন বিয়ে করলে আর কোনোদিন নিজের পায়ে দাঁড়ানো হবে না।

কম্পিউটার ছিল বাড়িতে। পুরোনো একটা ডেস্কটপ। বাবা দোকানের হিসাব রাখতে কিনেছিলেন, কিন্তু হিসাব শেষমেশ খাতাতেই রাখেন। কম্পিউটারটা ধুলো খাচ্ছিল।

ইন্টারনেট ছিল মোবাইলের হটস্পট থেকে। স্পিড ভালো না, কিন্তু YouTube চলে। ধীরে, থেমে থেমে, বাফারিং করে, কিন্তু চলে।

রুবিনা YouTube-এ গ্রাফিক ডিজাইন টিউটোরিয়াল দেখতে শুরু করল। Canva দিয়ে শুরু। তারপর Photoshop। ক্র্যাকড ভার্সন। মফস্বলে অরিজিনাল সফটওয়্যার কেনার সামর্থ্য নেই, এটা বাস্তবতা। Illustrator শিখল তারপর। প্রতিদিন চার-পাঁচ ঘণ্টা। ছয় মাস।

বাবা প্রথমে কিছু বলেননি। ভেবেছিলেন টাইমপাস করছে। কিন্তু যখন দেখলেন মেয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কম্পিউটারের সামনে বসে আছে, তখন বিরক্ত হলেন।

"সারাদিন কম্পিউটারে বসে থাকে, লোকে কী বলবে?"

এই "লোকে কী বলবে" বাক্যটা বাংলাদেশের মফস্বলে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। এটা কোনো নির্দিষ্ট লোকের কথা না। কোনো নির্দিষ্ট মন্তব্যের কথা না। এটা একটা অদৃশ্য চাপ। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়, বাজারের দোকানদার, সবার চোখ। একটা মেয়ে কী করছে, কেন করছে, কার সাথে কথা বলছে, কখন ঘর থেকে বের হচ্ছে, সব পর্যবেক্ষণে।

রুবিনা বাবাকে বলল, "আমি ডিজাইন শিখছি। এটা দিয়ে টাকা আয় করা যায়।"

বাবা বিশ্বাস করলেন না। "কম্পিউটারে ছবি এঁকে টাকা পাওয়া যায়? কে দেয়?"

রুবিনা বোঝাতে পারল না। কারণ ফ্রিল্যান্সিং কী, অনলাইনে কাজ কী, ক্লায়েন্ট কী, এসব ধারণা তার বাবার জগতে নেই। বাবার জগতে কাজ মানে দোকানে দাঁড়ানো, অফিসে যাওয়া, ক্ষেতে নামা। স্ক্রিনের সামনে বসে থাকাটা কাজ না, সেটা সময় নষ্ট।

ছয় মাস পর রুবিনা প্রথম কাজ পেল। একটা ফেসবুক গ্রুপ থেকে। একজন ছোট ব্যবসায়ী, অনলাইনে জামাকাপড় বিক্রি করে, তার জন্য দশটা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট। পেমেন্ট: দুই হাজার টাকা।

দুই হাজার টাকা। বড় অংক না। কিন্তু রুবিনার জীবনে এটা প্রথম আয়। নিজের হাতে, নিজের দক্ষতায়, কারো দয়ায় না।

সেই দুই হাজার টাকা bKash-এ এলো। রুবিনা স্ক্রিনশট নিল। তারপর কাউকে দেখাল না। নিজের কাছে রাখল।

তারপর আরো কাজ। আস্তে আস্তে। মাসে পাঁচ হাজার, তারপর আট হাজার, তারপর বারো হাজার। এক বছরের মধ্যে মাসে পনেরো হাজার টাকা আয় করতে শুরু করল। তখনই জাহিদের পোস্ট দেখল, এবং জাহিদের টিমে যোগ দিল। বিশ হাজার। তার সাথে বাইরের কাজ মিলিয়ে মাসে পঁচিশ-ত্রিশ হাজার।

কিন্তু পরিবারকে জানাল অনেক পরে।

প্রথম বড় অংকটা বাবাকে জানাল তিন মাস পর। জাহিদের কাছ থেকে প্রথম মাসের পেমেন্ট পেয়ে।

বাবা দোকান থেকে ফিরেছেন। রাতের খাবার খাচ্ছেন। রুবিনা পাশে বসল।

"বাবা, আমি চাকরি করি।"

বাবা চামচ থামালেন। "কোথায়?"

"অনলাইনে। গ্রাফিক ডিজাইন করি। মানে ছবি বানাই, লোগো বানাই, ব্যানার বানাই। কোম্পানিরা আমাকে কাজ দেয়, আমি করে দিই, তারা টাকা পাঠায়।"

বাবা চুপ করে রইলেন। এটা তার বোধগম্য জগতের বাইরে।

"কত পেলে?"

"বিশ হাজার। এই মাসে।"

নীরবতা। বাবা ভাত খেলেন। কয়েকটা গ্রাস। তারপর বললেন, "ভালো।"

এই একটা শব্দ। "ভালো।" না প্রশংসা, না উৎসাহ, না বিস্তারিত জিজ্ঞাসা। শুধু "ভালো।" কিন্তু রুবিনা বুঝল, এটা তার বাবার ভাষায় অনুমোদন। দোকানদার বাবা, যিনি সারাদিন পনেরো-বিশ হাজার টাকার জন্য দাঁড়িয়ে থাকেন, তিনি শুনলেন তার মেয়ে ঘরে বসে কম্পিউটারে কাজ করে একই টাকা আয় করছে। গণিতটা তিনি বুঝলেন। বাকিটা বোঝার দরকার নেই।

সেদিন রাতে বাবা আর "লোকে কী বলবে" বলেননি।

কিন্তু সমাজ তো বাবার মতো চুপ থাকে না।

মফস্বলে একটা মেয়ে যখন ঘরে বসে কম্পিউটারে কাজ করে, তখন চারপাশে নানা রকম প্রশ্ন ওঠে। সরাসরি জিজ্ঞেস করে না কেউ। কিন্তু ফিসফাস করে।

"মেয়ে সারাদিন কম্পিউটারে কী করে?"

"কার সাথে চ্যাট করে?"

"রাতে ফোনে কথা বলে, কার সাথে?"

রুবিনা জাহিদকে বলেছিল একদিন, "ভাই, ক্লায়েন্ট রাত দশটায় কল করে। রিভিশন চায়, জরুরি। আমি কল রিসিভ করি। এটা কাজের কল। কিন্তু পাড়ায় খবর হয়ে যায়, 'মেয়ে রাতে ফোনে কার সাথে কথা বলে?'"

জাহিদ চুপ করে শুনেছিল।

রুবিনা বলল, "ছেলে হলে সমস্যা ছিল না। ছেলে রাত দুইটায় ফোনে কথা বললেও কেউ কিছু বলে না। ক্লায়েন্টের সাথে কথা বলছে, ভালো ছেলে, কাজ করে। কিন্তু মেয়ে? মেয়ে রাতে ফোনে কথা বললে সেটা আর কাজ থাকে না। সেটা হয়ে যায় সন্দেহ।"

এটা শুধু রুবিনার সমস্যা না। বাংলাদেশের মফস্বলে যেসব মেয়ে ফ্রিল্যান্সিং করে, ঘরে বসে অনলাইনে কাজ করে, তাদের সবার এই সমস্যা। কাজের সময় নির্দিষ্ট না। ক্লায়েন্ট বিদেশে থাকলে টাইমজোন আলাদা। রাতে মিটিং হয়, রাতে কল আসে, রাতে ডেডলাইন থাকে। একটা ছেলে এগুলো সামলায় কোনো সামাজিক বাধা ছাড়া। একটা মেয়ে সামলায় প্রতিটা পদক্ষেপে জবাবদিহি করে।

রুবিনার আরো সমস্যা আছে।

ঘরে নিজের রুম নেই। ছোট বোন মিতুর সাথে একটা রুম শেয়ার করে। মিতু HSC পরীক্ষার্থী, পড়াশোনা করে রাত পর্যন্ত। রুবিনা যখন কাজ করে, মিতু বলে লাইট জ্বালিয়ে রাখতে পারবে না, ঘুমাতে পারে না। রুবিনা যখন ক্লায়েন্টের সাথে কল করে, মিতু বলে কথা বলার শব্দে পড়া হয় না।

তো রুবিনা কাজ করে বসার ঘরে। যেখানে বাবা-মাও থাকেন। টিভি চলে। মেহমান আসে। প্রাইভেসি নেই। একটা ডিজাইনে মনোযোগ দিতে গেলে কেউ না কেউ ডাকে। "রুবিনা, চা বানাও।" "রুবিনা, দরজায় কে এসেছে দেখো।" "রুবিনা, তোমার খালাম্মা ফোন করেছে।"

জাহিদ যখন কাজ করে, তার একটা রুম আছে। ছোট, কিন্তু নিজের। দরজা বন্ধ করে কাজ করতে পারে। এই সাধারণ সুবিধাটা রুবিনার নেই।

ইন্টারনেট ক্যাফে? উপজেলায় একটা আছে। সেটা অল-মেল। মানে ক্যাফেতে যারা বসে তারা সব ছেলে। গেমস খেলে, ফেসবুক চালায়। একটা মেয়ে সেখানে গিয়ে বসবে, এটা মফস্বলে চিন্তাও করা যায় না। তো রুবিনা ঘর থেকেই কাজ করে। বিকল্প নেই।

বিয়ের প্রস্তাব আসতেই থাকে।

মা মাঝে মাঝে বলেন, "ভালো ছেলে। সরকারি চাকরি।" অথবা "ছেলে প্রবাসী। মালয়েশিয়ায় থাকে।"

রুবিনা জিজ্ঞেস করে একটাই প্রশ্ন: "বিয়ের পরে কাজ করতে দেবে?"

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উত্তর আসে: "বিয়ের পরে কাজের কী দরকার? স্বামী তো আছে।"

কখনো আরো স্পষ্ট: "চাকরি ছাড়তে হবে বিয়ের পরে।"

রুবিনা জাহিদকে বলেছিল, "যে বলবে ছাড়তে হবে, সে আমার জন্য না।"

জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "পরিবার কী বলে?"

"মা বলেন, 'তোর বয়স হয়ে যাচ্ছে।' বাবা কিছু বলেন না। বাবা এখন চুপ। যেদিন থেকে টাকা পাঠাচ্ছি, বাবা বিয়ের কথা বলেন না।"

"কেন?"

"কারণ বাবা হিসাব বোঝেন। আমি প্রতি মাসে বাড়িতে দশ হাজার টাকা পাঠাই। বাবার দোকানের আয় পনেরো হাজার। আমার দশ হাজার যোগ হলে পঁচিশ হাজার। সংসার চলে। আমি বিয়ে করে চলে গেলে সেই দশ হাজার বন্ধ। বাবা এই গণিতটা বোঝেন।"

সংখ্যাগুলো একবার দেখা যাক।

বাংলাদেশে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ। মানে কর্মক্ষম নারীদের মধ্যে তিনজনের একজনও কাজ করে না, পরিসংখ্যানের ভাষায়। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৮০ শতাংশের ওপরে। পার্থক্যটা বিশাল।

IT এবং ফ্রিল্যান্সিং সেক্টরে নারীর অংশগ্রহণ আরো কম। ১৫ শতাংশের নিচে। মানে অনলাইনে যারা কাজ করে, তাদের ৮৫ শতাংশের বেশি পুরুষ।

কিন্তু একটা আশ্চর্য বিপরীত সত্য আছে।

অনলাইন কাজ আসলে বাংলাদেশের নারীদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত কাজের ধরন। কারণগুলো সরল।

এক: ঘরে বসে করা যায়। মফস্বলে মেয়েদের বাইরে যাওয়া কঠিন। অফিসে যাওয়া মানে যাতায়াত, সেটা নিরাপত্তার প্রশ্ন। বাসে হয়রানি, রাস্তায় টিটকারি, এগুলো বাংলাদেশে দৈনন্দিন বাস্তবতা। ঘরে বসে কাজ করলে এই পুরো সমস্যাটা নেই।

দুই: সময় নমনীয়। সংসারের কাজ, রান্না, সন্তান সামলানো, এসবের ফাঁকে কাজ করা যায়। অফিসে সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা বসতে হলে সংসার সামলানো কঠিন। অনলাইনে নিজের সময়ে কাজ করা যায়।

তিন: অফিস পলিটিক্স নেই। বাংলাদেশের অফিস কালচারে নারীরা অনেক সময় বৈষম্যের শিকার হয়। প্রমোশনে বঞ্চনা, হ্যারাসমেন্ট, পুরুষ সহকর্মীদের অসম্মান। অনলাইনে কাজ করলে ক্লায়েন্ট শুধু কাজ দেখে। তুমি ছেলে না মেয়ে, সেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক।

চার: প্রবেশের বাধা কম। ইউনিভার্সিটি ডিগ্রি লাগে না। সার্টিফিকেট লাগে না। একটা কম্পিউটার, ইন্টারনেট, আর দক্ষতা থাকলেই শুরু করা যায়। রুবিনা HSC পাস। কোনো ডিগ্রি নেই। কিন্তু তার কাজ দেখে কেউ জিজ্ঞেস করে না সে কোন ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করেছে।

তাহলে কেন ১৫ শতাংশের নিচে? কারণ বাধাগুলো প্রযুক্তিগত না। বাধাগুলো সামাজিক।

১০

রুবিনা এখন দুইজন মেয়েকে ট্রেনিং দিচ্ছে। পাড়ার মেয়ে। একজন সুমি, HSC পাস, বিয়ের জন্য বসে আছে। আরেকজন তানিয়া, অনার্স প্রথম বর্ষ, কিন্তু কলেজ দূরে, যাতায়াত খরচ জোগাতে পারে না, ড্রপ দিয়েছে।

রুবিনা তাদের Canva শেখাচ্ছে প্রথমে। সহজ জিনিস। সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, ইনস্টাগ্রাম স্টোরি, ফেসবুক কভার। এগুলো দিয়ে মাসে পাঁচ-আট হাজার টাকা আয় করা কঠিন না, যদি ক্লায়েন্ট পাওয়া যায়।

জাহিদ রুবিনাকে জিজ্ঞেস করেছিল, "ওদের শেখানোর সময় পাও?"

রুবিনা বলল, "সময় বের করি। সপ্তাহে তিনদিন, বিকেলে দুই ঘণ্টা। ওরা আমার বাসায় আসে।"

"কেন করো?"

রুবিনা একটু চুপ থাকল। তারপর বলল, "কারণ আমি জানি ওরা কী ফিল করে। HSC পাসের পর ঘরে বসে থাকা, বিয়ের প্রস্তাব আসা, কিছু করার না থাকা। এই ফিলিংটা আমি জানি। যদি কেউ আমাকে আগে দেখিয়ে দিত যে এভাবে আয় করা সম্ভব, তাহলে আমার এক বছর নষ্ট হতো না।"

"ওদের পরিবার কী বলে?"

"সুমির মা খুশি। ভাবছেন অন্তত কিছু একটা শিখুক। তানিয়ার বাবা সন্দেহের চোখে দেখেন। বলেন, 'ওসব দিয়ে কিছু হয় না।' কিন্তু তানিয়া যেদিন প্রথম দুই হাজার টাকা আয় করবে, সেদিন তার বাবারও মত বদলাবে।"

রুবিনা এটা বলল আত্মবিশ্বাসের সাথে। কারণ সে নিজে এই পরিবর্তনটা দেখেছে। তার নিজের বাবার মধ্যে।

১১

জাহিদ ভাবল, রুবিনা আসলে কী করছে?

সে শুধু ডিজাইন করছে না। সে শুধু টাকা আয় করছে না। সে একটা ন্যারেটিভ ভাঙছে। মফস্বলে মেয়েদের সম্পর্কে যে গল্পটা প্রচলিত, সেটা হলো: মেয়ে পড়াশোনা করবে, তারপর বিয়ে হবে, তারপর সংসার করবে। এই তিনটা ধাপ। এর বাইরে যাওয়ার কোনো পথ নেই, অন্তত মফস্বলের হিসাবে।

রুবিনা চতুর্থ একটা ধাপ তৈরি করছে: নিজে আয় করো, তারপর বাকিটা তুমি ঠিক করবে।

এটা বিপ্লব না। রুবিনা রাস্তায় নামেনি, স্লোগান দেয়নি, কোনো আন্দোলন করেনি। সে শুধু একটা কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করেছে। প্রতিটা ডিজাইন, প্রতিটা ডেলিভারি, প্রতিটা bKash নোটিফিকেশন, সেটা তার উত্তর। যারা বলে মেয়েরা পারে না, তাদের জন্য। যারা বলে কম্পিউটারে বসে টাকা হয় না, তাদের জন্য। যারা বলে বিয়েই একমাত্র পথ, তাদের জন্য।

আর এখন সে দুইজনকে শেখাচ্ছে। দুইজন থেকে চারজন হবে। চারজন থেকে আটজন। এটা ধীর, কিন্তু এটাই আসল পরিবর্তন। উপর থেকে আসে না। নিচ থেকে আসে। একজন মেয়ে আরেকজনকে দেখিয়ে দেয়: এভাবে হয়।

১২

রুবিনার লড়াই শুধু ক্লায়েন্টের সাথে না।

সমাজের সাথে। পরিবারের সাথে। নিজের সাথে। প্রতিদিন সকালে উঠে তাকে প্রমাণ করতে হয় যে তার কাজটা আসল কাজ। প্রতিদিন কাউকে না কাউকে বোঝাতে হয় যে স্ক্রিনের সামনে বসে থাকাটা অলসতা না। প্রতিদিন সে শোনে "বিয়ে কবে?" আর প্রতিদিন সে উত্তর দেয় নিজের মনে: এখনো না, এখনো না।

কিন্তু প্রতিটা ডিজাইন যা সে deliver করে, সেটা একটা প্রমাণ। প্রতিটা bKash notification যা বাজে, সেটা একটা উত্তর। প্রতিটা মেয়ে যাকে সে শেখায়, সেটা একটা বিনিয়োগ। এমন একটা ভবিষ্যতে যেখানে মফস্বলের মেয়েদের "বিয়ে কবে?" ছাড়া আরো প্রশ্ন থাকবে। "কী কাজ করো?" "কত আয়?" "কী শিখছো?"

সেই ভবিষ্যতটা এখনো আসেনি। কিন্তু রুবিনা সেটার জন্য অপেক্ষা করছে না। সে সেটা বানাচ্ছে। একটা ডিজাইন, একটা ক্লায়েন্ট, একটা ছাত্রী করে।

ধীরে। কিন্তু থামছে না।

---

*নবম অধ্যায়: হাতের কাজ, হাতের মুক্তি -- STIGMA BIAS। পর্ব ৮৮/১০০।*