কারিগরি vs সাধারণ

সমাজ যাকে ফেইলিওর বলেছিল, সে সবাইকে পেছনে ফেলেছে

পর্ব ৯০ · ১৪ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

ছয় বছর পার হয়ে গেছে। HSC-র পর ছয় বছর।

জাহিদ একদিন সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে ভাবছিল। চায়ের কাপ হাতে। মোবাইলে WhatsApp গ্রুপ স্ক্রল করছিল। "HSC 2018 Batch" গ্রুপ। দুশো সতেরোজন মেম্বার। বেশিরভাগ মিউট করা। মাঝে মাঝে কেউ একটা জোক পাঠায়, কেউ চাকরির বিজ্ঞাপন শেয়ার করে, কেউ বিয়ের দাওয়াত দেয়।

কিন্তু আজ একটা মেসেজ চোখে পড়ল।

তাহের লিখেছে: "ভাইরা, কেউ কি জানেন XYZ ব্যাংকে PO পদে সুযোগ আছে কিনা? আমার বর্তমান ব্যাংকে গ্রোথ নেই, দুই বছরে ইনক্রিমেন্ট হয়নি।"

নিচে ফারুক রিপ্লাই দিয়েছে। একটা ছবি। একটা সোলার প্যানেল ইনস্টলেশনের ছবি। ক্যাপশন: "আজ কুষ্টিয়ায় একটা ৫০ কিলোওয়াট প্ল্যান্ট কমিশন করলাম। আলহামদুলিল্লাহ।"

জাহিদ দুটো মেসেজ পাশাপাশি দেখল। দুজনের কন্ঠস্বর, দুটো জীবন। একজন চাকরি খুঁজছে, আরেকজন কাজ দিচ্ছে।

জাহিদ ফারুককে আলাদা করে মেসেজ দিল। "রে, কেমন আছিস?"

ফারুক সাথে সাথে রিপ্লাই দিল না। ঘণ্টাখানেক পর ফোন করল।

"ব্যস্ত ছিলাম। একটা সাইটে ছিলাম।" ফারুকের গলায় ক্লান্তি, কিন্তু সন্তোষ। "তুই কী করছিস?"

"কাজ করছি। তোর খবর বল। কুষ্টিয়ায় কী করছিলি?"

"একটা রাইস মিলে সোলার দিচ্ছি। পঞ্চাশ কিলোওয়াট। মালিক হিসাব করে দেখেছে বিদ্যুৎ বিল মাসে দুই লাখ টাকা বাঁচবে। দুই বছরে ইনভেস্টমেন্ট উঠে আসবে।"

"তোর বিজনেস কেমন চলছে?"

ফারুক একটু থামল। তারপর বলল, "ভালো। আলহামদুলিল্লাহ। গত মাসে এক লাখ টাকার ওপরে ছিল।"

জাহিদ চুপ করে গেল। ছয় বছর আগে ফারুক ছিল সেই ছেলে যে পলিটেকনিকে গিয়েছিল কারণ HSC-তে চান্স পায়নি। সেদিন সবাই বলেছিল: "বেচারা ফারুক। পলিটেকনিকে পড়ে কী হবে?"

জাহিদ তাহেরকেও ফোন করল। তাহের ঢাকায়, একটা প্রাইভেট ব্যাংকে কাজ করে। BBA করেছে একটা মোটামুটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে।

"কেমন আছিস?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।

"চলছে।" তাহেরের গলায় ক্লান্তি, কিন্তু সন্তোষ নেই। "ব্যাংকে সকাল নয়টা থেকে রাত আটটা। শনিবারও যেতে হয় মাঝে মাঝে। বেতন তিরিশ হাজার।"

"তিরিশ? দুই বছর হলো তো?"

"হ্যাঁ। প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে জয়েন করেছিলাম পঁচিশে। এখন তিরিশ। পরের প্রমোশন কবে হবে আল্লাহ জানেন।"

"আর পড়ার খরচ?"

তাহের হাসল। তিক্ত হাসি। "আট লাখ টাকা। বাবা জমি বিক্রি করে দিয়েছিলেন। তিনটা কাঠা। আমার BBA-র জন্য। এখন মাসে বাবাকে দশ হাজার পাঠাই। হিসাব করলে বোঝা যায়, সেই আট লাখ ফেরত দিতে আমার ছয়-সাত বছর লাগবে। শুধু আসল। সুদ ধরলে আরো বেশি।"

জাহিদ কিছু বলল না।

রাতে জাহিদ ল্যাপটপ খুলল। Google Sheets। একটা নতুন স্প্রেডশিট। নাম দিল: "ছয় বছর পর: কে কোথায়।"

তিনটা কলাম। ফারুক। তাহের। NU গড়।

ফারুক: পলিটেকনিক ডিপ্লোমা, ইলেকট্রিক্যাল। কোনো ইউনিভার্সিটি ডিগ্রি নেই। পড়ার খরচ: প্রায় আশি হাজার টাকা (চার বছরে)। বর্তমান আয়: মাসে এক লাখ+। নিজের সোলার ইনস্টলেশন ব্যবসা। পাঁচজন কর্মী। কুষ্টিয়া, রাজশাহী, রংপুর জুড়ে কাজ করে। নিজের পিকআপ ভ্যান আছে। ছোট্ট অফিস ভাড়া নিয়েছে ঝিনাইদহ শহরে।

তাহের: BBA, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি। পড়ার খরচ: আট লাখ টাকা। বর্তমান আয়: মাসে ত্রিশ হাজার। প্রাইভেট ব্যাংকে প্রবেশনারি অফিসার। সকাল নয়টা থেকে রাত আটটা। ছুটির দিন অনিশ্চিত। প্রমোশনের জন্য আরো দুই-তিন বছর অপেক্ষা। ঢাকায় ভাড়া বাসায়।

NU গড়: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস/অনার্স। দেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রায় তেইশ লাখ শিক্ষার্থী। গড় শুরুর বেতন: আঠারো থেকে পঁচিশ হাজার। চাকরি পেতে গড়ে ছয় মাস থেকে দুই বছর। অনেকে পায়ই না। যারা পায়, তারাও বেশিরভাগ এমন চাকরিতে যায় যেখানে ডিগ্রির দরকার নেই।

জাহিদ সংখ্যাগুলো পাশাপাশি দেখল।

পলিটেকনিক গ্র্যাজুয়েটের গড় শুরুর বেতন: আঠারো থেকে বাইশ হাজার। NU-এর চেয়ে একটু কম, বা সমান। কিন্তু তিন বছরের মধ্যে ছবিটা বদলে যায়।

ক্রসওভার। এটাই মূল কথা।

জাহিদ ডেটা খুঁজতে শুরু করল। BANBEIS-এর রিপোর্ট। ILO-র লেবার মার্কেট সার্ভে। BTEB-এর গ্র্যাজুয়েট ট্র্যাকিং স্টাডি। বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো ছিটানো ডেটা। পুরোপুরি পরিষ্কার ছবি কোনো একটা সূত্রে নেই। কিন্তু টুকরো টুকরো জোড়া দিলে একটা প্যাটার্ন দেখা যায়।

প্রথম তিন বছর: সাধারণ শিক্ষার গ্র্যাজুয়েটরা এগিয়ে থাকে। BBA, BSS, BA পাস করা ছেলেমেয়েরা ব্যাংকে, কর্পোরেটে, এনজিওতে ঢোকে। বেতন বেশি না, কিন্তু পলিটেকনিকের চেয়ে একটু বেশি। কারণ কর্পোরেট জগৎ "ডিগ্রি" দেখে। ডিপ্লোমা দেখলে নাক সিটকায়।

পলিটেকনিক গ্র্যাজুয়েটরা এই সময়ে ওয়ার্কশপে কাজ করে, ছোট ফার্মে ঢোকে, কারো কারো নিজের কাজ শুরু করতে এক-দুই বছর লাগে। বেতন কম। সম্মান কম। পরিবার বলে: "দেখলি, ইউনিভার্সিটিতে গেলে ভালো হতো।"

কিন্তু চতুর্থ বছরে একটা কিছু ঘটে।

চতুর্থ বছর থেকে ক্রসওভার শুরু হয়।

কেন? কারণ হাতের কাজ জানা মানুষের দাম বাড়তে থাকে। একজন ইলেকট্রিশিয়ান যে তিন বছর ফিল্ডে কাজ করেছে, সে এখন জানে কীভাবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়্যারিং করতে হয়, কীভাবে সোলার ইনভার্টার সেট করতে হয়, কীভাবে থ্রি-ফেজ মোটর ট্রাবলশুট করতে হয়। এই স্কিলের সাপ্লাই কম। ডিমান্ড বেশি।

একজন BBA গ্র্যাজুয়েট যে তিন বছর ব্যাংকে কাজ করেছে, সে জানে কীভাবে ফর্ম পূরণ করতে হয়, কীভাবে কাস্টমারকে হ্যান্ডেল করতে হয়, কীভাবে বসকে খুশি রাখতে হয়। এই স্কিলের সাপ্লাই? বিশাল। প্রতি বছর লাখ লাখ BBA গ্র্যাজুয়েট বের হয়। ডিমান্ডের চেয়ে সাপ্লাই অনেক বেশি।

সাপ্লাই আর ডিমান্ড। অর্থনীতির সবচেয়ে পুরনো নিয়ম।

বাংলাদেশে BBA গ্র্যাজুয়েট আছে লাখ লাখ। MA, BSS, BA পাস করা মানুষ আছে কোটি কোটি। কিন্তু ভালো ইলেকট্রিশিয়ান? প্লাম্বার? ওয়েল্ডার? সোলার টেকনিশিয়ান? মেরিন ইঞ্জিনিয়ার? সংখ্যা হাতে গোনা।

ফলে কী হয়? যে কাজটা কম মানুষ করতে পারে, সেই কাজের দাম বাড়ে। যে কাজটা সবাই করতে পারে, সেই কাজের দাম স্থির থাকে বা কমে।

পঞ্চম বছরে ক্রসওভার সম্পূর্ণ হয়।

একজন দক্ষ প্লাম্বার ঢাকায় মাসে পঞ্চাশ-ষাট হাজার টাকা আয় করে। দিনে দুই-তিনটা কাজ। প্রতিটায় দুই-তিন হাজার। সপ্তাহে ছয় দিন কাজ। মাসে পঁচিশ দিন। গড়ে দুই হাজার পাঁচশো করে ধরলে, পঁচিশ দিনে বাষট্টি হাজার পাঁচশো।

একজন NU থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েট? পাঁচ বছর পরও অনেকে পঁচিশ-ত্রিশে আটকে আছে। যাদের ভালো নেটওয়ার্ক আছে, তারা হয়তো চল্লিশ পেয়েছে। কিন্তু গড়? গড় করুণ।

আর ফারুকের মতো যারা নিজের ব্যবসা শুরু করেছে? তারা তো আরেক লেভেলে। ফারুক একটা রাইস মিলে সোলার দিতে গিয়ে চার-পাঁচ লাখ টাকার কাজ পায়। মার্জিন ত্রিশ শতাংশ ধরলেও দেড় লাখ। একটা প্রজেক্টে। মাসে দুই-তিনটা প্রজেক্ট করলে?

তাহের তখনো তিরিশ হাজারে আটকে আছে। প্রমোশনের জন্য লবি করছে।

চার্টটা দেখলে সব পরিষ্কার হয়ে যায়।

দুটো লাইন। একটা কারিগরি শিক্ষার গ্র্যাজুয়েট, আরেকটা সাধারণ শিক্ষার গ্র্যাজুয়েট। প্রথম দিকে সাধারণ শিক্ষার লাইন উপরে। কারিগরির লাইন নিচে। পার্থক্য বড় না, কিন্তু আছে। পরিবার দেখে, সমাজ দেখে: "দেখ, ইউনিভার্সিটিতে পড়লে বেশি পায়।"

কিন্তু লাইন দুটো এগিয়ে যেতে থাকে। চতুর্থ বছরে কারিগরির লাইন উপরে উঠতে শুরু করে। পঞ্চম বছরে দুটো লাইন মিলিত হয়। ক্রসওভার পয়েন্ট। এর পর কারিগরি উপরে, সাধারণ নিচে।

অষ্টম বছরে? পার্থক্য বিশাল। কারিগরি গ্র্যাজুয়েট যে হাতের কাজ শিখেছে, অভিজ্ঞতা যোগ করেছে, নিজের ব্যবসা দাঁড় করিয়েছে, সে এখন সত্তর-আশি-এক লাখ আয় করে। সাধারণ গ্র্যাজুয়েট? চল্লিশ-পঞ্চাশে। যদি চাকরি থাকে।

কিন্তু পরিবার ক্রসওভার পয়েন্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করে না। পরিবার দেখে প্রথম তিন বছর। আর প্রথম তিন বছরে সাধারণ শিক্ষা জেতে। ফলে পরিবার সিদ্ধান্ত নেয়: কারিগরি শিক্ষা খারাপ।

তিন বছরের ডেটা দিয়ে তিরিশ বছরের সিদ্ধান্ত নেওয়া। এটাই স্টিগমা বায়াসের ভিত্তি।

জাহিদ আরেকটা জিনিস খেয়াল করল।

কারিগরি দক্ষতা রপ্তানিযোগ্য। মানে, একজন ইলেকট্রিশিয়ান বা ওয়েল্ডার বাংলাদেশে কাজ করতে পারে, মালয়েশিয়ায়ও পারে, সৌদি আরবেও পারে, সিঙ্গাপুরেও পারে। থ্রি-ফেজ ওয়্যারিং সব দেশে একই। ওয়েল্ডিং জয়েন্ট সব দেশে একই। সোলার প্যানেল ইনস্টলেশন সব দেশে একই।

কিন্তু একটা BBA ডিগ্রি? ঢাকার প্রাইভেট ব্যাংকের অভিজ্ঞতা? সেটা সিঙ্গাপুরে কাজে লাগে না। কারণ সিঙ্গাপুরে নিজেদের BBA গ্র্যাজুয়েট আছে, অনেক ভালো ইউনিভার্সিটি থেকে। তাদের জায়গায় বাংলাদেশি BBA গ্র্যাজুয়েটকে নেওয়ার কোনো কারণ নেই।

কিন্তু সিঙ্গাপুরে ভালো ইলেকট্রিশিয়ান, ভালো ওয়েল্ডার, ভালো প্লাম্বারের ডিমান্ড আছে। কারণ সিঙ্গাপুরের নিজের ছেলেমেয়েরা এই কাজ করতে চায় না। কিন্তু কাজটা করতে হবে। বিল্ডিং বানাতে হবে, পাইপলাইন বসাতে হবে, এসি ঠিক করতে হবে।

দক্ষ টেকনিশিয়ানের পাসপোর্ট সবদেশে চলে। MA পাসের সার্টিফিকেট নিজের দেশেও চলে কিনা সন্দেহ।

১০

কিন্তু বাংলাদেশ কী করে?

বাংলাদেশ টেকনিশিয়ান আমদানি করে। ভারত থেকে, চীন থেকে।

জাহিদ এই তথ্যটা প্রথমবার শুনেছিল বিশ্বাস করেনি। কিন্তু ডেটা বলে: বাংলাদেশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোতে ভারতীয় ও শ্রীলংকান টেকনিশিয়ান আছে। পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোতে চীনা ইঞ্জিনিয়ার আছে। টেলিকম ইন্ডাস্ট্রিতে ভারতীয় নেটওয়ার্ক স্পেশালিস্ট আছে।

কেন? কারণ বাংলাদেশে যথেষ্ট দক্ষ টেকনিশিয়ান নেই।

কেন নেই? কারণ ছেলেমেয়েরা কারিগরি শিক্ষায় যায় না।

কেন যায় না? কারণ সমাজ বলে: "কারিগরি শিক্ষা মেধাবীদের জন্য না।"

একটা বৃত্ত। ঘুরে ঘুরে একই জায়গায় ফেরে।

১১

জাহিদ হিসাবটা করল।

স্টিগমা বায়াসের দাম কত? তিনটা লেভেলে।

দেশের দাম: টেকনিক্যাল জবগুলো ফিল হয় না। বিদেশ থেকে টেকনিশিয়ান আনতে হয়। তাদের বেতন ডলারে। সেই ডলার দেশ থেকে বেরিয়ে যায়। একই সাথে, দেশের নিজের যুবকরা বেকার বসে আছে MA ডিগ্রি হাতে নিয়ে। এক দিকে বিদেশি টেকনিশিয়ান আসছে কাজ করতে, অন্য দিকে দেশের ছেলেমেয়েরা বিদেশে যাচ্ছে অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে। যদি তারা দক্ষ হতো? একটা প্লাম্বার সৌদি আরবে মাসে দেড়-দুই লাখ টাকা আয় করে। একজন অদক্ষ শ্রমিক? পঞ্চাশ-ষাট হাজার। পার্থক্য তিনগুণ।

পরিবারের দাম: বাবা জমি বিক্রি করে ছেলেকে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পাঠায়। আট লাখ, দশ লাখ, বারো লাখ। ছেলে পাস করে বেরোয়। চাকরি পায় না ছয় মাস, এক বছর, দুই বছর। যে চাকরি পায় সেখানে বেতন কুড়ি-পঁচিশ হাজার। জমির দাম ফেরত আসতে আসতে বাবার বয়স হয়ে যায়।

যদি সেই ছেলে পলিটেকনিকে যেত? খরচ আশি হাজার থেকে দেড় লাখ। চার বছরে ডিপ্লোমা শেষ। হাতে একটা ট্রেড স্কিল। চাকরি পেতে তিন-ছয় মাস। প্রথম বেতন কম, কিন্তু বাবার জমি অক্ষত।

১২

ব্যক্তির দাম। এটা সবচেয়ে কষ্টের।

তাহের চার বছর ইউনিভার্সিটিতে কাটিয়েছে। BBA পড়েছে। মার্কেটিং, ফাইন্যান্স, অ্যাকাউন্টিং, ম্যানেজমেন্ট। থিওরি। কেস স্টাডি। প্রেজেন্টেশন। গ্রুপ অ্যাসাইনমেন্ট।

কিন্তু সে আসলে কী শিখেছে? কোনো নির্দিষ্ট দক্ষতা কি তার হাতে আছে? সে কি কিছু বানাতে পারে? কিছু ঠিক করতে পারে? কোনো সমস্যা সমাধান করতে পারে যেটা অন্য কেউ পারে না?

তাহের জানে এক্সেল চালাতে। পাওয়ারপয়েন্ট বানাতে। ইংরেজিতে ইমেইল লিখতে। এগুলো দরকারি স্কিল। কিন্তু এগুলো যেকোনো মানুষ ছয় মাসে শিখে ফেলতে পারে। চার বছরের ডিগ্রি লাগে না।

ফারুক চার বছরে শিখেছে সার্কিট ডিজাইন, পাওয়ার সিস্টেম, ইলেকট্রিক্যাল মেশিনারি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশন। প্র্যাকটিক্যাল স্কিল। ল্যাবে হাতে করে শিখেছে, ওয়ার্কশপে শিখেছে, ইন্টার্নশিপে শিখেছে। এই জিনিসগুলো ছয় মাসে শেখা যায় না। বছরের পর বছর লাগে।

তাহের চার বছর ব্যয় করেছে এমন কিছু শিখতে যেটা ছয় মাসে শেখা যায়। ফারুক চার বছর ব্যয় করেছে এমন কিছু শিখতে যেটা চার বছর ছাড়া শেখা যায় না।

কে বেশি দক্ষতার সাথে সময় ব্যবহার করেছে?

১৩

জাহিদ জানে এটা সরলীকরণ। সব BBA গ্র্যাজুয়েট তাহের না। সব পলিটেকনিক গ্র্যাজুয়েট ফারুক না। অনেক BBA গ্র্যাজুয়েট দারুণ ক্যারিয়ার গড়েছে। অনেক পলিটেকনিক গ্র্যাজুয়েট হারিয়ে গেছে।

কিন্তু গড়ে? গড়ে যে প্যাটার্ন দেখা যায়, সেটা পরিষ্কার।

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় বিশ লাখ ছেলেমেয়ে HSC পাস করে। তাদের মধ্যে চৌদ্দ শতাংশ কারিগরি শিক্ষায় যায়। বাকি ছিয়াশি শতাংশ সাধারণ শিক্ষায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে, কলেজে। BBA, BA, BSS, MA।

জার্মানিতে কত শতাংশ কারিগরি শিক্ষায় যায়? পঞ্চাশ শতাংশের বেশি। দক্ষিণ কোরিয়ায়? চল্লিশ শতাংশ। সিঙ্গাপুরে? পঁয়ষট্টি শতাংশ।

বাংলাদেশে? চৌদ্দ।

এই চৌদ্দ শতাংশ কোনো পরিসংখ্যান না। এটা একটা জাতীয় সিদ্ধান্ত। একটা ভুল সিদ্ধান্ত। প্রতি বছর ছিয়াশি শতাংশ তরুণকে এমন একটা পথে পাঠানো হচ্ছে যেখানে ডিমান্ডের চেয়ে সাপ্লাই অনেক বেশি। আর চৌদ্দ শতাংশকে এমন পথে পাঠানো হচ্ছে যেখানে সাপ্লাইয়ের চেয়ে ডিমান্ড অনেক বেশি।

এটা কোনো ষড়যন্ত্র না। এটা স্টিগমা। "কারিগরি শিক্ষা মেধাবীদের জন্য না।" এই একটা বাক্য প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণকে ভুল পথে পাঠায়।

১৪

জাহিদ বলল: "কারিগরি শিক্ষা মেধাবীদের জন্য না। এটা বাংলাদেশ তার তরুণদের বলে সবচেয়ে দামি মিথ্যা।"

সে ভাবল ফারুকের কথা। ফারুক কি কম মেধাবী ছিল? ক্লাস সেভেনে ফারুক গণিতে সবচেয়ে ভালো ছিল। ফারুক হাতে কিছু একটা বানাতে পারত, যেটা অন্য কেউ পারত না। মোটর ঠিক করতে পারত, রেডিও ঠিক করতে পারত, সাইকেলের চেইন খুলে আবার লাগাতে পারত। এটা কি মেধা না?

কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বলে: মেধা মানে পরীক্ষায় নম্বর। GPA 5 মানে মেধাবী। GPA 3 মানে কম মেধাবী। কম মেধাবী মানে পলিটেকনিকে যাও। এই হায়ারার্কি। এই পিরামিড।

ওপরে ইউনিভার্সিটি। বুয়েট, মেডিকেল, ঢাবি। মাঝখানে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। নিচে পলিটেকনিক, ভোকেশনাল ট্রেনিং।

কিন্তু শ্রমবাজার এই পিরামিড মানে না। শ্রমবাজারে ভালো ওয়েল্ডারের দাম NU-র MA-র চেয়ে বেশি। ভালো প্লাম্বারের দাম BSS গ্র্যাজুয়েটের চেয়ে বেশি। ভালো সোলার টেকনিশিয়ানের দাম BBA-র চেয়ে বেশি।

সমাজ যে পিরামিড বানিয়েছে, বাজার সেটা উলটে দিয়েছে। কিন্তু সমাজ দেখছে না। সমাজ এখনো সেই পুরনো পিরামিডে আটকে আছে। কারণ স্টিগমা বায়াস সংশোধন হতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম লাগে।

১৫

রাতে জাহিদ শোয়ার আগে আরেকবার WhatsApp গ্রুপটা খুলল।

ফারুকের সোলার প্যানেলের ছবিটা আবার দেখল। তাহেরের চাকরি খোঁজার মেসেজটা আবার পড়ল।

মনে পড়ল HSC-র পরের দিনগুলো। ফারুক যখন বলেছিল পলিটেকনিকে যাবে, সবাই মাথা নেড়েছিল। "ছেলেটা শেষ হয়ে গেল।" "ইউনিভার্সিটিতে চান্স পায়নি, তাই পলিটেকনিক।" "বেচারা।"

তাহের যখন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলো, সবাই খুশি হয়েছিল। "ভালো করেছে। অন্তত গ্র্যাজুয়েট তো হবে।" "BBA পড়লে ব্যাংকে চাকরি হবে।" "ভালো ছেলে।"

ছয় বছর পর।

সবচেয়ে সফল কে? ফারুক। মাসে এক লাখ+। নিজের ব্যবসা। নিজের শর্তে।

সবচেয়ে "ব্যর্থ" হিসেবে শুরু করেছিল কে? ফারুক। পলিটেকনিকে গিয়েছিল বলে সবাই তাকে ফেইলিওর ভেবেছিল।

সমাজ যাকে ফেইলিওর বলেছিল, সে সবাইকে পেছনে ফেলেছে।

১৬

জাহিদ নোটপ্যাডে লিখল:

"আমার বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে সফল কে? ফারুক। সবচেয়ে 'ব্যর্থ' হিসেবে শুরু করেছিল কে? ফারুক। সমাজ যাকে ফেইলিওর বলেছিল, সে সবাইকে পেছনে ফেলেছে।"

তারপর আরো লিখল:

"তাহের খারাপ মানুষ না। তাহের পরিশ্রমী। তাহের সৎ। কিন্তু তাহের একটা সিস্টেমের শিকার। সেই সিস্টেম তাকে বলেছিল: ইউনিভার্সিটিতে যাও, ডিগ্রি নাও, চাকরি পাবে। তাহের গেছে, ডিগ্রি নিয়েছে, চাকরি পেয়েছে। কিন্তু সেই চাকরির বেতন দিয়ে বাবার জমির দাম ফেরত দিতে পারছে না।"

"ফারুক সেই সিস্টেমের বাইরে গেছে। জেনে গেছে কিনা জানি না। হয়তো বাধ্য হয়ে গেছে। কিন্তু বাইরে গিয়ে দেখেছে, বাইরেটাই আসল দুনিয়া।"

১৭

জাহিদ শেষ একটা কথা লিখল। ধীরে ধীরে। প্রতিটা শব্দ ভেবে।

"হাতের কাজকে সম্মান দাও।"

"কারণ হাতের কাজই দেশ চালায়। যে ইলেকট্রিশিয়ান তোমার ঘরে আলো জ্বালায়, সে দেশ চালায়। যে প্লাম্বার তোমার বাথরুমের পাইপ ঠিক করে, সে দেশ চালায়। যে ওয়েল্ডার ব্রিজের গার্ডার জোড়া দেয়, সে দেশ চালায়। যে সোলার টেকনিশিয়ান ছাদে প্যানেল বসায়, সে দেশ চালায়।"

"ডিগ্রি দেয়ালে ঝোলে। হাতের কাজ মানুষের জীবন বদলায়।"

ফোন রাখল। চোখ বন্ধ করল।

বাইরে মফস্বলের রাত। কোথাও একটা জেনারেটর চলছে। হয়তো কোনো পলিটেকনিক গ্র্যাজুয়েট ঠিক করে দিয়ে গেছে। হয়তো ফারুকের মতো কেউ।

মফস্বলের রাতে জেনারেটরের শব্দ। হাতের কাজের শব্দ। দেশ চলার শব্দ।

---

*নবম অধ্যায় সমাপ্ত। দশম অধ্যায়: নতুন দিগন্ত।*