সিদ্ধান্তের রাত
৬ বছর আগে ভাবতাম একটা 'সঠিক' পথ আছে। এখন জানি, পথটা হাঁটতে হাঁটতে তৈরি হয়।
১
ছাদ।
জাহিদ ছাদে বসে আছে। পুরনো প্লাস্টিকের চেয়ার, যেটার একটা পা ছোট, তাই বসলে একটু কাত হয়ে যায়। চেয়ারটা বাবা কিনেছিলেন ময়মনসিংহের এক হার্ডওয়্যার দোকান থেকে, দুইশো টাকায়, সাত বছর আগে। তখনও জাহিদ ছাদে বসত। তখনও তারা দেখত।
রাত সাড়ে এগারোটা। মার্চ মাস। বাতাসে একটু ঠান্ডা, কিন্তু শীত না। শীত চলে গেছে, গরম আসেনি। এই ফাঁকটুকু বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর সময়। আকাশ পরিষ্কার। তারা দেখা যাচ্ছে। শহরের আলো কম, কারণ রাত সাড়ে এগারোটায় ময়মনসিংহ ঘুমিয়ে পড়ে। ঢাকা না এটা। এখানে মানুষ ঘুমায়।
জাহিদের বয়স চব্বিশ।
সংখ্যাটা মনে হতেই একটু অদ্ভুত লাগল। চব্বিশ। আঠারোতে যা ভাবত, চব্বিশে সেটা ভাবে না। আঠারোতে যা ভয় পেত, চব্বিশে সেটা ভয় পায় না। আঠারোতে যা জানত না, চব্বিশে সেটার কিছু জানে, বেশিরভাগ এখনো জানে না।
কিন্তু পার্থক্য আছে। আঠারোতে না-জানাটা তাকে পঙ্গু করত। চব্বিশে না-জানাটা তাকে চালায়।
২
তারা।
একই তারা। ঠিক একই।
ছয় বছর আগে, HSC রেজাল্টের দিন সন্ধ্যায়, বিসমিল্লাহ টি স্টল থেকে বাসায় ফেরার পথে এই তারাগুলো দেখেছিল জাহিদ। সেদিন ভেবেছিল, প্রতিটা তারা একটা সম্ভাবনা। অথবা একটা মৃত তারা, যেটা কোটি বছর আগে নিভে গেছে, শুধু আলোটা এখনো আসছে। এখান থেকে বোঝা যায় না কোনটা জ্বলছে আর কোনটা নিভে গেছে।
আজ একই তারা দেখছে। একই আকাশ। কিন্তু দেখার চোখ বদলে গেছে।
সেদিন তারাগুলো ছিল প্রশ্নচিহ্ন। আজ তারাগুলো শুধু তারা। সুন্দর, দূর, নিরপেক্ষ। তারা জাহিদের ভবিষ্যৎ জানে না, জাহিদের অতীতও জানে না। তারা শুধু জ্বলছে। নিজের কাজ করছে। মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে।
জাহিদ একটু হাসল। আঠারো বছরে তারা দেখে দার্শনিক হওয়ার চেষ্টা করত। চব্বিশে তারা দেখে শুধু ভালো লাগে। এটা হয়তো বড় হওয়া।
৩
মোবাইল ফোনটা হাতে। পুরনোটা না। সেটা অনেকদিন আগে বদলে গেছে। এখন ভালো ফোন। নিজের কেনা। নিজের টাকায়।
নিজের টাকা।
এই শব্দদুটো ছয় বছর আগে জাহিদের শব্দভান্ডারে ছিল না। তখন সবকিছু বাবার টাকা, মায়ের টাকা, রাকিব ভাইয়ের টাকা। ভর্তি পরীক্ষার আবেদন ফি বাবার টাকা। কোচিংয়ের বই মায়ের সেলাইয়ের টাকা। ঢাকায় যাওয়ার বাসভাড়া রাকিব ভাইয়ের গার্মেন্টসের টাকা। প্রতিটা টাকার সাথে একটা ঋণ ছিল, একটা ওজন ছিল, একটা অপরাধবোধ ছিল।
এখন মাসে এক লাখ আশি হাজার টাকা আসে। এজেন্সি থেকে। পাঁচজনের টিম। ক্লায়েন্ট তিনটা দেশে। ডলারে আয়। বাবাকে মাসে ত্রিশ হাজার দেয়। মায়ের জন্য একটা সেলাই মেশিন কিনে দিয়েছে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল, যেটা দিয়ে মা এখন দোকানের অর্ডার নেয়, পুরনো পেডেল মেশিনে না। মিমের কলেজের খরচ দেয়। রাকিব ভাই এখন নিজে কিছু জমাচ্ছে।
কিন্তু টাকাটা বিষয় না। টাকা আসে, টাকা যায়। বিষয়টা হলো এজেন্সি। নিজের হাতে নিজের কাজ। কেউ বলছে না সকাল নটায় আসো, বিকেল পাঁচটায় যাও। কেউ বলছে না এই কাজটা করো, ওই কাজটা করো না। জাহিদ নিজে ঠিক করে কোন ক্লায়েন্ট নেবে, কোনটা নেবে না। কোন প্রজেক্ট করবে, কোনটা ছাড়বে।
এজেন্সি। Agency। শব্দটাই বলে দেয়।
৪
বাতাস একটু জোরে বইল। ছাদের এক কোণায় মায়ের শুকনো কাপড়গুলো দুলে উঠল। জাহিদ চোখ বন্ধ করল।
চোখ বন্ধ করলে সবকিছু ফিরে আসে।
SMS। "GPA: 4.17।" ফোনের স্ক্রিনে তিনটা অঙ্ক, একটা দশমিক। সারাজীবনের রায়।
বাবার মুখ। CNG থেকে নেমে ঘরে ঢুকে, রেজাল্ট শুনে, কিছু না বলে আবার বের হয়ে যাওয়া। সন্ধ্যায় ফিরে ভাত খাওয়া। কোনো কথা না। সেই নীরবতা শব্দের চেয়ে ভারী ছিল।
মায়ের খাতা। সেলাইয়ের হিসাবের খাতা। কত কাজ, কত টাকা, কবে দিতে হবে। মা সেই খাতায় জাহিদের পড়ার খরচও লিখত। একটা আলাদা পাতায়। উপরে লেখা: "জাহিদের পড়া।" নিচে তারিখ আর সংখ্যা। ভর্তি ফি, বই, কোচিং, বাসভাড়া। প্রতিটা সংখ্যা মায়ের হাতের লেখায়, একটু বাঁকা, একটু অসমান।
পাড়ার বিচার। "4.17 পেয়ে কী করবে?" "চাচাতো ভাই তো 5.00 পেয়েছে।" "ময়মনসিংহের কলেজে পড়বে? সেটা তো পড়া না।" প্রতিটা মন্তব্য একটা পেরেক। জাহিদের আত্মবিশ্বাসের কফিনে।
কোচিং। পলাশ স্যারের ব্যাচ। ঢাকায়। সিট ভাড়া, ঘামে ভেজা শার্ট, দুপুরে পাঁচ টাকার সিঙ্গারা, সন্ধ্যায় বাসায় ফেরা। কিছু শিখেছিল? হ্যাঁ। কিন্তু যা শিখেছিল তার বেশিরভাগ পরে কাজে লাগেনি। যেটা কাজে লাগল, সেটা কোচিংয়ে শেখেনি।
ঢাকা। ভর্তি পরীক্ষার ঢাকা। ফার্মগেটের ভিড়, মিরপুরের হোস্টেল, নীলক্ষেতের বইয়ের দোকান। ঢাকা তাকে নেয়নি। ঢাকা কাউকে নেয় না। ঢাকা শুধু সুযোগ দেয়, তারপর বলে, "এবার নিজে চেষ্টা করো।"
পরীক্ষা। পরীক্ষার পর পরীক্ষা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, গুচ্ছ। প্রতিটা পরীক্ষার আগে একটা আশা, পরে একটা ফলাফল। বেশিরভাগ ফলাফল "না।"
প্রত্যাখ্যান। "আপনার নাম তালিকায় নেই।" এই বাক্যটা কতবার পড়েছে জাহিদ। কতবার ফোনের স্ক্রিনে দেখেছে, তালিকা স্ক্রল করেছে, নিজের নাম খুঁজেছে, পায়নি। প্রতিবার একটু মরেছে। প্রতিবার একটু বেঁচে উঠেছে।
৫
তারপর NU।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। সবাই যাকে "ব্যর্থদের আশ্রয়" বলে, সেখানে গেল জাহিদ। পদার্থবিজ্ঞান। ময়মনসিংহের সেই পুরনো কলেজ। মরচে-ধরা গ্রিল, ভাঙা সাইনবোর্ড, ক্লাসে পনেরো জন। রহমান স্যার, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করে নিজের জেলায় ফিরে এসেছিলেন, কারণ "যেখানে ভালো শিক্ষক নেই, সেখানে ভালো শিক্ষক হয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে বড় কাজ।"
NU জাহিদকে কিছু শেখায়নি? শিখিয়েছে। একটা জিনিস শিখিয়েছে। সময়। NU-তে ক্লাস কম, ফাঁকা সময় বেশি। সেই ফাঁকা সময়ে জাহিদ কোড শিখল। রাকিব ভাইয়ের পুরনো ল্যাপটপে। YouTube-এ। freeCodeCamp-এ। রাত দুটো, তিনটা, চারটা পর্যন্ত।
প্রথম কোড। একটা HTML পেজ। কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে সাদা লেখা। "Hello, World." এত সাধারণ, এত তুচ্ছ। কিন্তু সেই মুহূর্তে জাহিদ প্রথমবার অনুভব করল: আমি কিছু তৈরি করতে পারি। শূন্য থেকে কিছু। আমার হাতে ক্ষমতা আছে একটা জিনিস বানানোর।
প্রথম গিগ। Upwork-এ। একটা ওয়ার্ডপ্রেস সাইটের CSS ঠিক করা। পাঁচশো টাকা। পাঁচশো টাকা। মায়ের এক দিনের সেলাইয়ের আয়। কিন্তু সেটা জাহিদের নিজের আয়। নিজের কাজের আয়। সেদিন জাহিদ বুঝল, টাকার অঙ্ক গুরুত্বপূর্ণ না। গুরুত্বপূর্ণ হলো টাকাটা কোথা থেকে আসছে। যদি নিজের দক্ষতা থেকে আসে, তাহলে পাঁচশো টাকাও এক লাখের সমান।
প্রথম ডলার। Upwork-এ। পাঁচ ডলার। চারশো কুড়ি টাকা। ক্লায়েন্ট আমেরিকান। কাজ: একটা ল্যান্ডিং পেজ। জাহিদ রাত জেগে বানিয়েছিল। ক্লায়েন্ট বলেছিল, "Good job." দুটো শব্দ। কিন্তু সেই দুটো শব্দ জাহিদের জীবনে এত মানুষের এত কথার চেয়ে বেশি দামি ছিল।
তারপর বার্নআউট। অবশ্যই বার্নআউট। রাত জেগে কোড, সকালে ক্লাস, দুপুরে ক্লায়েন্টের মেসেজ, বিকেলে আরেকটা প্রজেক্ট। ঘুম নেই, বিশ্রাম নেই, জীবন নেই। শরীর চলছে ক্যাফেইন আর জেদে। একদিন সকালে উঠতে পারল না। শরীর বলল, না। মাথা বলল, না। চোখ খুলতে চাইল না।
দুই সপ্তাহ কিছু করেনি। ল্যাপটপ খোলেনি। ফোনে Upwork-এর নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিয়েছিল। মা জিজ্ঞেস করেছিল, "কী হয়েছে?" বলেছিল, "কিছু না। একটু ক্লান্ত।" একটু ক্লান্ত। আসলে ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে ছেলেরা ভেঙে পড়ে না। ছেলেরা ক্লান্ত হয়। তফাৎ আছে।
তারপর আবার উঠে দাঁড়ানো। ধীরে ধীরে। একটু একটু করে। এবার ভিন্নভাবে। এবার একা না। এবার টিম নিয়ে। প্রথমে দুজন, তারপর তিনজন, তারপর পাঁচজন। এজেন্সি।
৬
জাহিদ চোখ খুলল।
তারা এখনো আছে। বাতাস এখনো বইছে। ছাদের এক কোণায় পানির ট্যাংকি গুরগুর করছে। পাশের বাড়ির কুকুরটা একবার ডাকল, তারপর চুপ হয়ে গেল।
ছয় বছর।
ছয় বছরে কত কিছু হলো। কত কিছু হলো না। কত মানুষ এলো, চলে গেল। কত সিদ্ধান্ত নিল, কতটা ঠিক হলো, কতটা ভুল হলো। কত রাত জেগেছে, কত রাত কেঁদেছে, কত রাত হাসেনি।
কিন্তু একটা প্রশ্ন ছয় বছর ধরে সাথে আছে।
সেই রাতে, HSC রেজাল্টের রাতে, ফোনের নোটপ্যাডে তিনটা প্রশ্ন লিখেছিল জাহিদ। প্রথম প্রশ্নটা ছিল: "আমি কিসে ভালো?" দ্বিতীয়টা: "পরিবার কত টাকা খরচ করতে পারবে?" তৃতীয়টা: "দশ বছর পর কোন কাজের চাহিদা থাকবে?"
কিন্তু এই তিনটা প্রশ্নের আগে একটা বড় প্রশ্ন ছিল, যেটা সে লেখেনি, কিন্তু যেটা পুরো যাত্রাটাকে চালিয়েছে।
"আমি কী চাই?"
আঠারোতে এই প্রশ্নের উত্তর ছিল না। একটা কুয়াশার মতো। কিছু দেখা যেত, কিন্তু স্পষ্ট না। চব্বিশেও প্রশ্নটার পুরো উত্তর নেই। কিন্তু কুয়াশা অনেকটা সরে গেছে। কিছু জিনিস স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সব না। কিন্তু কিছু।
জাহিদ জানে, "আমি কী চাই?" এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর কখনো আসে না। কারণ মানুষ বদলায়। আঠারোর জাহিদ আর চব্বিশের জাহিদ এক না। ত্রিশের জাহিদ আরেকজন হবে। প্রশ্ন একই থাকবে, উত্তর বদলে যাবে।
এটাই জীবন। প্রশ্ন স্থির, উত্তর ভ্রাম্যমাণ।
৭
কিন্তু ছয় বছরে জাহিদ কিছু জিনিস শিখেছে। পাঠ্যবইতে না। জীবনে।
সাফল্য একটা GPA না।
এটা শুনতে সহজ। বলতে সহজ। ফেসবুকে শেয়ার করা সহজ। কিন্তু হাড়ে টের পাওয়া কঠিন। জাহিদ হাড়ে টের পেয়েছে। 4.17 পেয়ে যখন পুরো পাড়া তাকে ব্যর্থ বলল, তখন সে ভেবেছিল তারা ঠিক বলছে। এখন জানে, তারা ঠিক বলেনি। তারা একটা সংখ্যা দেখেছিল, একটা মানুষ দেখেনি।
সাফল্য হলো নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ। Agency। তুমি কী করবে, কবে করবে, কার সাথে করবে, এটা তুমি ঠিক করতে পারছ কি না। যদি পারো, তুমি সফল। যদি না পারো, তুমি যত টাকাই কামাও, তুমি অন্য কারো জীবন যাপন করছ।
"সঠিক" পথ বলে কিছু নেই।
রাসেলের পথ রাসেলের জন্য। সুমাইয়ার পথ সুমাইয়ার জন্য। ফারুকের পথ ফারুকের জন্য। আরিফের পথ... আরিফের পথ কঠিন ছিল, কিন্তু আরিফের। প্রতিটা পথ সেই মানুষটার পরিস্থিতি, সীমাবদ্ধতা, সুযোগ, স্বভাব দিয়ে তৈরি। একটা পথ আরেকজনের গায়ে লাগালে ফিট করবে না। জুতোর মতো। নিজের জুতো নিজেকে পরতে হয়।
আর বায়াস। জ্ঞানীয় পক্ষপাত। সেই ফাঁদগুলো।
Anchoring। 4.17 দিয়ে পুরো জীবনের মূল্যায়ন। একটা সংখ্যা, একটা নোঙর, পুরো দিন সেই নোঙরের চারপাশে ঘোরা।
Herd mentality। সবাই মেডিকেল-ইঞ্জিনিয়ারিং-BCS বলছে, তাহলে ওটাই ঠিক। পালের সাথে যাও, নিরাপদ।
Identity bias। "আমি 4.17-র ছেলে।" "আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট।" লেবেল নিজেকে সংজ্ঞায়িত করে, তারপর সেই সংজ্ঞার বাইরে যেতে দেয় না।
Status quo bias। যা আছে তাই রাখো। ঝুঁকি নিও না। নতুন কিছু করতে যেও না। পরিচিত কষ্ট অপরিচিত সুখের চেয়ে নিরাপদ।
Certainty bias। একটা নিশ্চিত চাকরি, পনেরো হাজার টাকা, সেটা একটা অনিশ্চিত সুযোগ, হয়তো এক লাখ, তার চেয়ে ভালো। নিশ্চয়তার লোভ অনেক সম্ভাবনা মেরে ফেলে।
Present bias। এখন কষ্ট করতে চাই না। এখন শিখতে চাই না। এখন ত্যাগ করতে চাই না। ভবিষ্যতের জাহিদ সামলে নেবে। ভবিষ্যতের জাহিদ কিন্তু বর্তমানের জাহিদই, শুধু পুরনো।
Survivorship bias। "অমুক ভাই 5.00 পেয়ে BUET পড়ে Google-এ আছে।" হ্যাঁ। কিন্তু 5.00 পেয়ে যারা BUET পায়নি, তাদের কথা কেউ বলে না। যারা সফল তাদের গল্প শুনি, যারা ব্যর্থ তাদের নীরবতা শুনি না।
Availability bias। সামনে যে তথ্যটা আছে, সেটাকেই সত্য মনে করা। "ফ্রিল্যান্সিংয়ে কেউ টাকা কামায় না।" কেন? কারণ তুমি কাউকে কামাতে দেখোনি। তুমি না দেখলেই সেটা নেই, এটা সত্য না।
Stigma। "ডিপ্লোমা মানে ব্যর্থ।" "জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় মানে বেকার।" "ফ্রিল্যান্সিং মানে বেকারদের কাজ।" লেবেল। লেবেল। লেবেল। মানুষকে দেখো না, লেবেল দেখো। তাহলে মানুষ চিনবে না কোনোদিন।
প্রতিটা বায়াস একটা ফাঁদ। জাহিদ প্রতিটা ফাঁদে পড়েছে। কোনোটায় অনেকদিন আটকে ছিল। কোনোটা থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু কোনোটা থেকেই পুরোপুরি মুক্ত হয়নি। কারণ বায়াস থেকে পুরো মুক্তি নেই। আছে শুধু সচেতনতা। জানা যে ফাঁদটা আছে। দেখা যে ফাঁদটা কোথায়। তারপরও মাঝে মাঝে পা পড়বে। কিন্তু জানলে অন্তত তাড়াতাড়ি বের হওয়া যায়।
৮
ছাদের দরজা খুলল। পায়ের আওয়াজ। চটি।
মিম।
"ভাইয়া?"
"হুম।"
"এত রাতে ছাদে কী করছো?"
"বসে আছি।"
মিম এসে পাশে দাঁড়াল। জাহিদের দিকে তাকাল। তারপর আকাশের দিকে। ছয় বছরে মিম অনেক বড় হয়ে গেছে। তখন ক্লাস সেভেনে ছিল। এখন কলেজে। ইন্টারমিডিয়েট। সায়েন্স। মিমের GPA কত হবে জাহিদ জানে না। কিন্তু জাহিদ জানে, GPA যা-ই হোক, মিম ঠিক থাকবে। কারণ মিম ভাইয়ার গল্প দেখেছে। মিম জানে সংখ্যা দিয়ে মানুষ মাপা যায় না।
"ভাইয়া, কী ভাবছো?"
জাহিদ একটু চুপ থাকল। তারপর বলল, "ভাবছি, ৬ বছর আগে আমি কী ভাবতাম আর এখন কী ভাবি।"
"তফাৎ কী?"
জাহিদ তারাগুলোর দিকে তাকাল। সেই একই তারা। সেই একই আকাশ। সেই একই ছেলে, শুধু ছয় বছর বেশি বয়স।
"৬ বছর আগে ভাবতাম একটা 'সঠিক' পথ আছে। সবাই সেই পথের কথা বলত। মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, BCS। যেন একটা মানচিত্র আছে, সেটা ধরে হাঁটলেই গন্তব্যে পৌঁছে যাবো।"
"আর এখন?"
"এখন জানি, পথটা হাঁটতে হাঁটতে তৈরি হয়। মানচিত্র নেই। কম্পাস আছে। কম্পাসটা হলো তুমি কী পারো, তোমার সীমাবদ্ধতা কী, আর তুমি কোন দিকে যেতে চাও। বাকিটা হাঁটতে হাঁটতে বোঝা যায়।"
মিম কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর বলল, "আমার রেজাল্ট খারাপ হলে?"
"তাহলে তোর পথ আলাদা হবে। খারাপ না। আলাদা।"
"তুমি এটা তখনই জানতে?"
"না। তখন জানতাম না। তখন আমিও ভাবতাম 4.17 মানে শেষ। ছয় বছর লেগেছে বুঝতে, শেষ না, শুরু।"
৯
মিম চলে গেল। বলল, "ঘুমাও। কাল অফিস আছে।"
অফিস। মিম বলে অফিস। আসলে জাহিদের অফিস বলতে ল্যাপটপ, হেডফোন, আর এই বাড়ির দোতলার ঘরটা। কিন্তু মিমের কাছে সেটা অফিস। কারণ ভাইয়া সেখানে বসে কাজ করে, টাকা কামায়, মানুষদের সাথে কথা বলে, সমস্যা সমাধান করে। অফিস।
জাহিদ উঠল না। আরেকটু বসবে।
আকাশের দিকে তাকাল। তারা। কিছু তারা জ্বলছে, কিছু হয়তো কোটি বছর আগে নিভে গেছে। এখান থেকে বোঝা যায় না কোনটা জ্বলছে আর কোনটা নিভে গেছে।
ছয় বছর আগে এই কথাটা ভেবে ভয় পেয়েছিল।
আজ এই কথাটা ভেবে শান্তি পায়।
কারণ বোঝা গেছে, বোঝা যাওয়াটা জরুরি না। হাঁটাটা জরুরি। হাঁটতে হাঁটতে দেখা যাবে কোনটা জ্বলছে আর কোনটা নিভে গেছে। আগে থেকে জানতে হবে না। আগে থেকে জানা সম্ভবও না।
জাহিদ উঠে দাঁড়াল। চেয়ারটা ভাঁজ করল। ছাদের রেলিংয়ে হেলান দিল একটু। ময়মনসিংহ ঘুমাচ্ছে। বাতি নিভে গেছে বেশিরভাগ। একটা-দুটো জ্বলছে। কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। কোথাও একটা মোটরবাইক চলে গেল।
ছয় বছর আগে এই শহরে একটা ছেলে ছিল। GPA 4.17। কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কোনো দরজা ছিল না। শুধু একটা প্রশ্ন ছিল, আর একটা জেদ।
আজ সেই ছেলে চব্বিশ। এজেন্সির মালিক। মাসে এক লাখ আশি হাজার। পাঁচজনের টিম।
কিন্তু এগুলো সংখ্যা। সংখ্যা দিয়ে গল্প বলা যায়, মানুষ চেনা যায় না।
আসল গল্পটা হলো: একটা ছেলে যেটা জানত না সেটা জানতে চেয়েছিল। যেটা পারত না সেটা শিখেছিল। যেখানে পথ ছিল না সেখানে হেঁটেছিল। আর হাঁটতে হাঁটতে পথ তৈরি হয়ে গেছে।
জাহিদ সিঁড়ি দিয়ে নামল। ঘরে ঢুকল। ল্যাপটপ বন্ধ। ফোন সাইলেন্ট। বিছানায় শুয়ে পড়ল।
ঘুম আসতে একটু সময় লাগল। কিন্তু ছয় বছর আগের মতো না। সেদিন ঘুম আসেনি কারণ ভয় ছিল। আজ ঘুম আসতে দেরি হচ্ছে কারণ মনটা ভরা। ভয়ে না। কৃতজ্ঞতায়।
চোখ বন্ধ হলো।
তারা এখনো জ্বলছে। ছাদের ওপরে। ময়মনসিংহের ওপরে। বাংলাদেশের ওপরে।
কোনটা জ্বলছে, কোনটা নিভে গেছে, এখান থেকে বোঝা যায় না। কিন্তু সেটা ঠিক আছে।
হাঁটতে হাঁটতে বোঝা যাবে।