বাবার সাথে কথা

প্রথমবার সমানে সমান, বাবা-ছেলে না, দুইজন মানুষ

পর্ব ৯২ · ১৩ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

রাত সাড়ে এগারোটা।

বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে গেছে। মা ঘুমিয়ে গেছেন, মিম ঘুমিয়ে গেছে, রাকিব ভাই আর ভাবি তাদের রুমে। বাড়ির পেছনে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া কোনো আওয়াজ নেই।

জাহিদ বারান্দায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল। ক্লায়েন্টের একটা ডেলিভারি বাকি, ডেডলাইন আগামীকাল। স্ক্রিনের আলো মুখে পড়ছে।

গেটের শব্দ হলো।

বাবা আজিজ ফিরেছেন। CNG-র শেষ ট্রিপ শেষ। রাত এগারোটার পর সাধারণত আর সওয়ারি পাওয়া যায় না, তাই বাবা ফিরে আসেন। কখনো দশটায়, কখনো সাড়ে এগারোটায়। আজ দেরি হয়েছে, একটা সওয়ারি স্টেশন পর্যন্ত গিয়েছিল।

বাবা গেটের তালা খুললেন। স্যান্ডেলের শব্দ। তারপর বারান্দায় এসে দেখলেন জাহিদ বসে আছে।

"তুই এখনো জাগিস?"

"হ্যাঁ, কাজ আছে।"

বাবা একটু দাঁড়ালেন। তারপর বারান্দার অন্য প্রান্তে গিয়ে বসলেন। চেয়ারটা টানলেন, কিন্তু বসার আগে একটু কোমর ধরলেন। জাহিদ দেখলো।

"কোমরে ব্যথা?"

"পুরানো। CNG-র সিট খারাপ, সারাদিন বসে থাকতে হয়। চিকিৎসা করালে কিছুদিন ভালো থাকে, আবার শুরু হয়।"

বাবা বসলেন। জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করলো।

এই মুহূর্তটা জাহিদের পরিচিত না।

সে বাবার সাথে এত রাতে একা বসেনি কখনো। বাবা সাধারণত ফিরে আসেন, খান, ঘুমিয়ে পড়েন। ভোর পাঁচটায় উঠে আবার বের হন। এটাই চক্র। পঁচিশ বছর ধরে।

আজ বাবা বসে আছেন। ঘুমাতে যাচ্ছেন না।

জাহিদ কিছু বলার আগে বাবা বললেন, "তোর কাজ কেমন চলছে?"

সাধারণত বাবা এভাবে জিজ্ঞেস করেন না। বাবার প্রশ্ন হয় "টাকা আসছে তো?" বা "ক্লায়েন্ট আছে তো?" আজ প্রশ্নটা অন্যরকম। "কাজ কেমন চলছে" মানে শুধু টাকা না, পুরোটা।

"ভালো চলছে। তিনজন কাজ করে এখন। মাসে দেড় থেকে দুই লাখ আসে।"

"দুই লাখ।" বাবা কথাটা আস্তে আস্তে বললেন। যেন চিবিয়ে খাচ্ছেন।

জাহিদ জানে বাবার জন্য দুই লাখ একটা অকল্পনীয় সংখ্যা। বাবা পঁচিশ হাজার কামান। CNG থেকে পনেরো, bKash পয়েন্ট থেকে দশ। মোট পঁচিশ। কখনো তিরিশ, ভালো মাসে। দুই লাখ মানে বাবার আট মাসের আয়।

বাবা কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। তারপর বললেন, "তুই কি সুখী?"

জাহিদ থামলো।

প্রশ্নটা অপ্রত্যাশিত ছিল। বাবা আজিজ এই ধরনের প্রশ্ন করেন না। বাবার পৃথিবীতে সুখ একটা বিলাসিতা। সুখ নিয়ে ভাবার সময় নেই যখন সকাল ছয়টা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত CNG চালাতে হয়। বাবার পৃথিবীতে প্রশ্ন একটাই: "খেতে পারছিস তো?"

কিন্তু আজ বাবা জিজ্ঞেস করলেন, "তুই কি সুখী?"

জাহিদ ভাবলো। সত্যি করে ভাবলো।

"সুখী কিনা জানি না, বাবা। কিন্তু আমি যা করতে চাই তা করি। এটা কি সুখ?"

বাবা একটু হাসলেন। হাসিটা ক্লান্ত, কিন্তু আসল। "এটা সুখ কিনা আমি জানি না। কিন্তু এটা আমার কাছে ছিল না।"

জাহিদ বুঝলো বাবা নিজের কথা বলতে চাইছেন।

বাবা আজিজ নিজের গল্প কখনো বলেননি। টুকরো টুকরো শুনেছে জাহিদ, মায়ের কাছ থেকে, চাচাদের কাছ থেকে, পাড়ার মানুষের কাছ থেকে। কিন্তু বাবার মুখ থেকে? কখনো না। বাবা গল্প বলার মানুষ না। বাবা কাজ করার মানুষ।

আজ বাবা বলতে শুরু করলেন।

"আমি ক্লাস এইটে পড়া ছেড়ে দিলাম। তোর দাদা মারা গেলেন, আমার বয়স তখন চৌদ্দ। বাড়িতে তোর দাদি, দুই বোন। জমি ছিল দুই কাঠা, সেটা বন্ধক দিতে হলো চিকিৎসার খরচ মেটাতে। পড়া আর হলো না।"

জাহিদ চুপ করে শুনছে। এই তথ্যগুলো সে জানে, কিন্তু বাবার মুখ থেকে শোনেনি।

"ষোলো বছরে শহরে এলাম। কিছু চিনি না, কাউকে চিনি না। প্রথম কাজ রিকশা চালানো। অন্যের রিকশা ভাড়া নিতাম, দিনে একশো টাকা ভাড়া দিয়ে বাকিটা আমার। কত থাকত? পঞ্চাশ টাকা, সত্তর টাকা। সেটা দিয়ে খেতাম, বাকিটা দাদির কাছে পাঠাতাম।"

বাবা থামলেন। তারপর আবার বললেন।

"বিশে বিয়ে করলাম। তোর মায়ের সাথে। মায়ের বাবা রিকশাচালকের কাছে মেয়ে দিতে চাননি, কিন্তু অন্য কোনো ছেলে ছিল না। আমি তো কোনো পাত্র না, কিন্তু আমি সৎ ছিলাম, সেটা সবাই জানতো।"

"একুশে রাকিব হলো।"

বাবা রাকিবের নাম বললেন, এবং জাহিদ দেখলো বাবার মুখটা বদলে গেলো।

"রাকিব হওয়ার পর বুঝলাম রিকশা দিয়ে হবে না। একটা ছেলে, তার খাবার লাগবে, কাপড় লাগবে, ডাক্তার লাগবে। রিকশায় দিনে একশো পঞ্চাশ কামাই, ভাড়া দিয়ে হাতে থাকে আশি। আশি টাকায় তিনজনের সংসার? অসম্ভব।"

"তখন একটা মানুষ বললো CNG-র কথা। অটোরিকশা। লাইসেন্স লাগবে, গাড়ি কিনতে হবে। লাইসেন্সের টাকা ছিল না, ধার করলাম। গাড়ি কেনার টাকা ছিল না, ভাড়ায় চালাতাম। দশ বছর ভাড়ায় চালিয়ে, তারপর একটা পুরানো গাড়ি কিনলাম কিস্তিতে।"

বাবা একটু থামলেন।

"তিরিশ বছর বয়সে CNG-তে উঠলাম। সেটা আমার প্রমোশন। আমার পুরো ক্যারিয়ারে একটাই ধাপ ছিল, রিকশা থেকে CNG। এটুকুই।"

জাহিদ কিছু বলতে পারলো না। বাবার পুরো ক্যারিয়ার একটা বাক্যে বলা যায়: রিকশা থেকে CNG। চৌদ্দ বছর রিকশা, তারপর বিশ বছর CNG। এর মধ্যে কোনো ট্রেনিং নেই, কোনো সার্টিফিকেট নেই, কোনো ইন্টারভিউ নেই, কোনো CV নেই। শুধু প্যাডেল থেকে ইঞ্জিন। মানুষের শক্তি থেকে গ্যাসের শক্তি। এটাই পুরো গল্প।

"তুই জানিস আমি কখনো ভাবিনি কী করতে চাই?"

জাহিদ তাকালো।

"কখনো না। একবারও না। আমি শুধু ভেবেছি কীভাবে খাওয়াবো। আজ কী রান্না হবে, মাস শেষে বাড়ি ভাড়া দেবো কী দিয়ে, রাকিবের স্কুলের বেতন কোথা থেকে আসবে, তোর মায়ের ওষুধ কেনার টাকা আছে কিনা। এই ছিল আমার চিন্তা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত।"

বাবা একটু সামনে ঝুঁকলেন।

"তুই যে 'কী করতে চাই' এটা নিয়ে ভাবতে পারিস, এটাই তোর সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমার সেটা ছিল না।"

কথাটা জাহিদের ভেতরে গিয়ে লাগলো।

সে এতদিন ভেবেছে তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার স্কিল, তার ক্লায়েন্ট, তার ইংরেজি, তার ইন্টারনেট কানেকশন। কিন্তু বাবা বলছেন, সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো চয়েস। পছন্দ করার ক্ষমতা। "আমি এটা করতে চাই" বলতে পারার সুযোগ।

বাবার সেই সুযোগ ছিল না। বাবার জীবনে কোনো চয়েস ছিল না। রিকশা চালানো চয়েস ছিল না, বাধ্যতা ছিল। CNG চালানো চয়েস ছিল না, আপগ্রেড ছিল। বিয়ে করা চয়েস ছিল, হ্যাঁ, কিন্তু সেটাও একটা সীমিত মেনু থেকে। বাবা কখনো বসে ভাবেননি, "আমি কী হতে চাই?" কারণ সেই প্রশ্নটা করার বিলাসিতা বাবার ছিল না।

জাহিদ বললো, "বাবা, তুমি কি কখনো আফসোস করো?"

বাবা উত্তর দিতে একটু সময় নিলেন।

"আফসোস? আমার জীবন নিয়ে না। আমি যা পেয়েছি তার চেয়ে বেশি পাওয়ার কথা ছিল না। ক্লাস এইট পাস ছেলে, বাবা নেই, জমি নেই, টাকা নেই। আমি যে বেঁচে আছি, সংসার চালিয়ে যাচ্ছি, এটাই অনেক।"

তারপর বাবার গলা একটু বদলালো।

"কিন্তু একটা আফসোস আছে।"

জাহিদ জানতো কী আসবে।

"রাকিবকে পড়াতে পারলাম না।"

রাকিব। বড় ভাই।

রাকিব ক্লাস নাইনে পড়া ছেড়ে দিয়েছিল। পড়া ছেড়ে দেওয়া বললে ভুল হবে, পড়া ছাড়তে হয়েছিল। বাবার CNG একবার বড় অ্যাক্সিডেন্ট করেছিল, গাড়ি মেরামত করতে ত্রিশ হাজার টাকা লেগেছিল। সেই ত্রিশ হাজার টাকা কোথা থেকে আসবে? রাকিব স্কুল ছেড়ে একটা মোবাইল ফোনের দোকানে কাজ নিলো। মাসে পাঁচ হাজার টাকা। সেই পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে গাড়ি মেরামতের কিস্তি দেওয়া হলো।

রাকিব আর স্কুলে ফিরে যায়নি।

জাহিদ তখন ক্লাস ফোরে। সে জানতো না এই হিসাবটা। সে জানতো না যে রাকিব ভাইয়ের পড়া ছাড়ার কারণে সে পড়তে পেরেছে। রাকিবের পাঁচ হাজার টাকা না থাকলে বাবার CNG চলতো না, CNG না চললে সংসার চলতো না, সংসার না চললে জাহিদের স্কুলের বেতনও দেওয়া যেত না।

এই হিসাবটা জাহিদ বুঝেছে অনেক পরে।

বাবা বললেন, "রাকিব কিছু বলেনি কখনো। অভিযোগ করেনি। কিন্তু আমি জানি, ছেলেটার ভেতরে একটা ক্ষত আছে। সে পড়তে চেয়েছিল। মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করতো। কিন্তু পারলো না।"

বাবার চোখে কিছু একটা চমকালো। অন্ধকারে জাহিদ নিশ্চিত না, কিন্তু মনে হলো বাবার চোখ ভেজা।

"তোকে আমি পড়িয়েছি। মিমকে পড়াচ্ছি। কিন্তু রাকিব? রাকিবকে আমি কী দিলাম?"

জাহিদ চুপ করে ছিল কিছুক্ষণ।

তারপর বললো, "বাবা, রাকিব ভাইয়ের ঋণ আমি শোধ করতে পারবো না। কেউ পারবে না। কিন্তু চেষ্টা করবো।"

বাবা তাকালেন।

"রাকিব ভাই এখন মোবাইল সার্ভিসিং জানে, হার্ডওয়্যার জানে। আমি ভাবছি ওকে আমার এজেন্সিতে আনবো। হার্ডওয়্যার না, কিন্তু ওকে শেখাবো বেসিক জিনিস। ডাটা এন্ট্রি, সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট। ওর হাত ভালো, ডিটেইলে নজর আছে, ধৈর্য আছে। ফ্রিল্যান্সিংয়ে এগুলোই লাগে।"

বাবা কিছু বললেন না। শুধু শুনলেন।

"আর মিম। মিম তো এখনো স্কুলে, কিন্তু ও যা চায় তাই করবে। আমি নিশ্চিত করবো ওর সামনে চয়েস থাকে। তুমি আমাকে যেটা দিয়েছো, আমি ওকে সেটা দেবো। আর যেটা রাকিব ভাই পায়নি, সেটাও দেওয়ার চেষ্টা করবো।"

১০

বাবা আজিজ পঞ্চাশ বছরের মানুষ।

কিন্তু দেখতে ষাটের মতো। চুল সাদা হয়ে গেছে, মুখে বয়সের চেয়ে বেশি দাগ। হাতের চামড়া রোদে পুড়ে কালো হয়ে গেছে, CNG-র স্টিয়ারিং ধরে ধরে হাতের তালুতে কড়া পড়েছে। কোমরে ব্যথা, হাঁটুতে ব্যথা, কাঁধে ব্যথা। শরীরটা ক্ষয়ে যাচ্ছে।

পঁচিশ হাজার টাকায় মাস চলে। আগে চলতো না, এখন চলে। কারণ জাহিদ বাড়িতে টাকা দেয়, বিদ্যুৎ বিল দেয়, বাজারের বড় অংশটা দেয়। বাবার আয় এখন বাবার নিজের জন্য, মায়ের ওষুধের জন্য, আর কিছু সঞ্চয়ের জন্য। আগে সব খরচ বাবার ঘাড়ে ছিল। এখন ভাগ হয়ে গেছে।

এটাও একটা জেনারেশনাল শিফট।

বাবা সারভাইভ করেছেন। তিরিশ বছর ধরে সারভাইভ করেছেন। প্রতিদিন সকালে উঠে একটাই কাজ করেছেন: পরিবারকে খাওয়ানো। কোনো স্বপ্ন ছিল না, কোনো প্ল্যান ছিল না, কোনো ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ছিল না। শুধু সারভাইভাল।

জাহিদ চুজ করেছে। সে ভেবেছে, পড়ালেখা করেছে, ভুল করেছে, শিখেছে, পথ বদলেছে, নিজের পথ তৈরি করেছে। বাবার তুলনায় জাহিদের জীবন অসীম সম্ভাবনায় ভরা। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাবার ত্যাগের উপর দাঁড়িয়ে আছে।

আর মিম? মিম ডিজাইন করবে। মিম শুধু চুজ করবে না, মিম ডিজাইন করবে তার জীবন। কারণ মিমের সামনে জাহিদ আছে রোল মডেল হিসেবে, জাহিদের টাকায় পড়ালেখা হচ্ছে, ইন্টারনেট আছে, পৃথিবী দেখার জানালা আছে। মিম যখন বড় হবে, তখন সে শুধু "কী করতে চাই" ভাববে না, সে ভাববে "কীভাবে করতে চাই, কোথায় করতে চাই, কার সাথে করতে চাই।"

তিন জেনারেশন। তিনটে ধাপ।

বাবা: সারভাইভাল। রিকশা থেকে CNG। চয়েস ছিল না।

জাহিদ: চয়েস। HSC-র পর নিজে পথ বেছেছে। ভুল করেছে, কিন্তু নিজের ভুল।

মিম: ডিজাইন। পথ শুধু বাছবে না, তৈরি করবে।

১১

বাবা উঠে দাঁড়ালেন।

জাহিদও উঠলো।

বাবা জাহিদের দিকে তাকালেন। একটু দাঁড়ালেন। তারপর হাত বাড়িয়ে জাহিদের মাথায় হাত রাখলেন।

জাহিদ চব্বিশ বছরের ছেলে। লম্বা, বাবার চেয়ে এক ইঞ্চি বেশি। এজেন্সি চালায়, ক্লায়েন্ট ম্যানেজ করে, মানুষের বেতন দেয়। কিন্তু বাবা যখন মাথায় হাত রাখলেন, জাহিদ আবার সেই ছোট ছেলেটা হয়ে গেলো। যে ছেলেটা বাবার কোলে উঠে ঘুমাতো, যে ছেলেটা বাবার রিকশার পেছনে বসে স্কুলে যেত।

বাবা বললেন, "তুই আমাকে ছাড়িয়ে গেছিস। এটা আমার সবচেয়ে বড় সাফল্য।"

তারপর বাবা ভেতরে চলে গেলেন।

১২

জাহিদ বারান্দায় একা বসে রইলো।

রাতের বাতাসে একটা শীতলতা আছে। মার্চের শেষ, গরম আসছে, কিন্তু রাতে এখনো একটু ঠান্ডা। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। পাড়ার রাস্তায় একটাও মানুষ নেই।

জাহিদ ভাবছে বাবার কথা।

বাবা আজিজ কখনো bdfacts.org দেখবেন না। বাবা cognitive bias জানেন না, anchoring effect বোঝেন না, sunk cost fallacy চেনেন না। বাবা জানেন না availability heuristic কী, জানেন না survivorship bias কী। কিন্তু বাবা এই সবকিছুর ভেতর দিয়ে গেছেন। চৌদ্দ বছর বয়সে যখন পড়া ছাড়লেন, তখন কেউ বলেনি "তোমার সামনে অপশন আছে।" কেউ বলেনি "ভেবে দেখো, হয়তো অন্য পথ আছে।" কোনো অপশন ছিল না। একটাই পথ ছিল: বেঁচে থাকো।

আর জাহিদ? জাহিদের সামনে পথ ছিল অনেক। HSC-র পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেষ্টা, না পেয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, সেখান থেকে ফ্রিল্যান্সিং, ফ্রিল্যান্সিং থেকে এজেন্সি। প্রতিটা মোড়ে সে ভেবেছে, পড়ালেখা করেছে, তথ্য খুঁজেছে, সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোনো সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল, কোনোটা ভুল ছিল। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগটা ছিল।

সেই সুযোগটাই বাবার ছিল না।

এটাই তফাৎ। টাকার তফাৎ না, শিক্ষার তফাৎ না, স্কিলের তফাৎ না। তফাৎটা হলো চয়েসের। পছন্দের অধিকারের।

১৩

বাবার CNG-র মিটার পঁচিশ বছর ধরে চলছে।

সকাল ছয়টায় চালু হয়, রাত এগারোটায় বন্ধ হয়। প্রতিদিন। রোদে, বৃষ্টিতে, ঈদে, পূজায়, হরতালে, বন্ধের দিনে। মিটার চলে, ভাড়া জমে, দিনশেষে একটা সংখ্যা দাঁড়ায়। সেই সংখ্যা দিয়ে পরিবার চলে।

কিন্তু আজ রাতে মিটার বন্ধ।

আজ রাতে বাবা সওয়ারি বহন করেননি। আজ রাতে বাবা তার ছেলের সাথে কথা বলেছেন। সমানে সমান। বাবা-ছেলে না, দুইজন মানুষ। একজন যে সারাজীবন সারভাইভ করেছে, আরেকজন যে সারভাইভালের বাইরে গিয়ে বাঁচতে শিখেছে।

CNG-র মিটারটা একদিন চিরতরে বন্ধ হবে। বাবার শরীর আর নেবে না। হাঁটু বলবে না, কোমর বলবে না। সেদিন কী হবে?

জাহিদ জানে সেদিন কী হবে। সেদিন জাহিদ বাবার মিটার হয়ে যাবে। জাহিদের আয় বাবার আয় হয়ে যাবে। এটা দায়িত্ব না, এটা ঋণ। এটা সেই ঋণ যা কোনো টাকা দিয়ে শোধ হয় না, কিন্তু চেষ্টা করতে হয়।

রাকিব ভাইয়ের ঋণও আছে। সেটা আরো গভীর। রাকিব ভাই নিজের পড়ালেখা দিয়ে জাহিদের পড়ালেখা কিনেছেন। সেই দাম কোনো হিসাবের খাতায় নেই, কিন্তু জাহিদের বুকের ভেতরে আছে।

জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করলো। আজ আর কাজ হবে না। ডেডলাইন আছে, কিন্তু কিছু কিছু রাত কাজের জন্য না।

কিছু কিছু রাত শুধু বুঝে নেওয়ার জন্য।