মায়ের পরামর্শ
মায়ের হিসাবে কোনোদিন ভুল হয়নি
১
রাতের খাবার শেষ। বাবা শুয়ে পড়েছে। জুলি নিচতলায় নিজের রুমে ফোনে কারো সাথে কথা বলছে, গলা আস্তে, মাঝে মাঝে হাসি।
জাহিদ রান্নাঘরে ঢুকল পানি খেতে। দেখল মা হাসিনা টেবিলে বসে আছে। সামনে একটা খাতা খোলা। পুরনো খাতা, মলাটটা ছিঁড়ে গেছে, স্কচটেপ দিয়ে জোড়া লাগানো। পাশে একটা ক্যালকুলেটর, সেটাও পুরনো, Casio, বোতামগুলোর লেখা মুছে গেছে কিন্তু মা চোখ বন্ধ করেও চাপতে পারে।
"আম্মা, এত রাতে হিসাব?"
মা চশমাটা নামিয়ে রাখল। চশমাটা নতুন, জাহিদ গত মাসে বানিয়ে দিয়েছে। আগে মা চশমা ছাড়াই সেলাই করত, চোখ কুঁচকে কুঁচকে। এখন সেলাইও নেই, চশমাও আছে।
"হিসাব তো করতেই হয়। অভ্যাস ছাড়া যায় না।"
জাহিদ পানি ঢালতে ঢালতে বলল, "এখন তো আর আগের মতো হিসাব করে করে চালাতে হয় না।"
মা কিছু বলল না। শুধু খাতার পাতাটা উল্টাল।
জাহিদ পানির গ্লাস হাতে নিয়ে মায়ের পাশে বসল। খাতার দিকে তাকাল। আগে এই খাতায় শুধু খরচের কলাম থাকত। চাল কত, ডাল কত, বিদ্যুৎ কত, জুলির স্কুলের ফি কত। প্রতিটা সংখ্যা টাইট করে লেখা, যেন একটা টাকাও বাদ পড়লে সংসার ভেঙে পড়বে।
এখন খাতায় নতুন কলাম। সেভিংস।
জাহিদ কলামটার দিকে তাকিয়ে রইল। মায়ের হাতের লেখায় "জমা" শব্দটা লেখা, তার নিচে সংখ্যা। বড় সংখ্যা। আগে এই খাতায় বড় সংখ্যা থাকত শুধু বকেয়ার কলামে।
২
"আম্মা, সেলাই কবে ছাড়লেন?"
মা হিসাব থামিয়ে বলল, "ছয় মাস হলো।"
"ভালো লাগে না?"
"ভালো লাগার প্রশ্ন না। হাত আর পারে না।" মা ডান হাতটা মেলে ধরল। আঙুলগুলো একটু বাঁকা। তর্জনীর ডগায় সুইয়ের দাগ, পুরনো, শক্ত হয়ে গেছে। মাঝের আঙুলে একটা জায়গায় চামড়া মোটা, কাঁচি ধরতে ধরতে এমন হয়ে গেছে। "পঁচিশ বছর সেলাই করেছি। আঙুলগুলো বিশ্রাম পাক।"
জাহিদ মায়ের হাতের দিকে তাকাল। এই হাত দিয়ে মা হাজার হাজার সেলাই করেছে। পাড়ার মহিলাদের ব্লাউজ, পেটিকোট, বাচ্চাদের স্কুল ড্রেস। প্রতিটা সেলাইয়ে পঞ্চাশ-একশ টাকা। সেই পঞ্চাশ-একশ টাকা দিয়ে সংসার চলেছে। জাহিদের পলিটেকনিকের খরচ গেছে। জুলির স্কুলের বই কেনা হয়েছে।
"তোর ইনকাম না থাকলে আমি সেলাই ছাড়তে পারতাম না। এটা তুই জানিস তো?"
জাহিদ জানে। কিন্তু মা মুখে বলল, সেটা অন্য জিনিস। মা সাধারণত এসব বলে না।
"তোর বাবা সারাজীবন একটাই কাজ করেছে।" মা বলল। গলায় অভিযোগ নেই, পর্যবেক্ষণ আছে। "মিস্ত্রিগিরি। ভালো কাজ, সম্মানের কাজ। কিন্তু একটাই কাজ। তুই একটা কাজ করিস না।"
"মানে?"
"তোর ফ্রিল্যান্সিং আছে, কোডকারিগর আছে, টিম আছে, ক্লায়েন্ট আছে। কতকিছু। এটা ভালো, কিন্তু ভয়ও লাগে।"
"কেন ভয় লাগে?"
মা একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, "তোর বাবার কাজ একটা। সেটা গেলে আর কিছু নেই। কিন্তু সেটা যাবে না, কারণ মানুষের বাড়ি সবসময় লাগবে। তোর কাজ অনেকগুলো। কিন্তু কোনটা থাকবে, কোনটা যাবে, সেটা আমি বুঝি না।"
জাহিদ বুঝল মা কী বলতে চাইছে। ডিজিটাল দুনিয়া। আজ আছে, কাল নেই। মায়ের কাছে এটা একটা অচেনা জগত, যেখানে তার ছেলে ল্যাপটপের সামনে বসে টাকা আনে, কিন্তু সেই টাকা কোথা থেকে আসে, কেন আসে, সেটা মা ঠিক ধরতে পারে না।
"টাকা আছে আজ।" মা বলল। "কাল থাকবে তো?"
জাহিদ বলল, "থাকবে, আম্মা। ইনশাল্লাহ।"
মা মাথা নাড়ল। ইনশাল্লাহ দিয়ে মায়ের সন্তুষ্ট হওয়ার কথা না, কিন্তু ছেলের মুখে এটুকু শুনলে একটু ভরসা পায়।
৩
তারপর এলো সেই প্রশ্ন। জাহিদ জানত আসবে। প্রতিবারই আসে।
"বিয়ে করবি কবে?"
জাহিদ হাসল। "এখনো না, আম্মা। আগে কোডকারিগরকে বড় করি।"
"কোডকারিগর বড় হলে তুই কি ছোট হয়ে যাবি?"
"মানে?"
"ব্যবসা বড় হয়। মানুষ বুড়ো হয়। দুটো একসাথে চলে না।"
জাহিদ কিছু বলতে পারল না। মায়ের কথায় একটা সরল সত্য আছে যেটা তর্ক করে ভাঙা যায় না। মা ক্লাস ফাইভের বেশি পড়েনি। অর্থনীতি জানে না, ব্যবসা জানে না, টেকনোলজি জানে না। কিন্তু মানুষ জানে। সময় জানে। আর হিসাব জানে।
"তুই ভাবিস আমি বুঝি না।" মা বলল। "আমি সব বুঝি না, সত্যি। কিন্তু একটা জিনিস বুঝি। ছেলেমানুষ কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত থাকে যে নিজের কথা ভুলে যায়। তোর বাবাও এরকম ছিল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ, কাজ, কাজ। বিয়ে না করলে আমি জোর করে ধরে আনতাম না, তোর বাবা একা একাই বুড়ো হয়ে যেত।"
জাহিদ হাসল। "আম্মা, আপনি বাবাকে জোর করে ধরে এনেছিলেন?"
"ধরে আনা না। কিন্তু তোর নানা বলেছিলেন, ছেলেটা কাজ ভালো করে, মিস্ত্রি হিসেবে নাম আছে, বিয়ের কথা বললে পালাবে না। পালায়নি।" মা একটু হাসল। এই হাসি জাহিদ কমই দেখে। মা সাধারণত হাসে না, মুখে একটা সিরিয়াস ভাব থাকে সবসময়, যেন পৃথিবীর সমস্ত হিসাব তার মাথায় চলছে।
"আম্মা, আমি পালাব না। সময় হলে করব।"
"সময় কবে হবে সেটা বল।"
"আরেকটু সময় দেন।"
মা চশমাটা আবার পরল। খাতায় ফিরে গেল। জাহিদ বুঝল কথা শেষ, আপাতত।
৪
কিন্তু মা আবার থামল। খাতার পাতা উল্টাতে উল্টাতে অনেক পেছনে চলে গেল। পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে, কোণায় একটু ভাঁজ। তারিখ দেখে দেখে একটা পাতায় থামল।
"এই দেখ।"
জাহিদ ঝুঁকে দেখল। ছয় বছর আগের পাতা। মায়ের হাতের লেখায় তারিখ, মাস, বছর।
আয়: - বাবার মিস্ত্রিগিরি: ১৫,০০০ - মায়ের সেলাই: ৫,০০০ - এটা-ওটা: ৫,০০০ - মোট: ২৫,০০০
খরচ: - চাল-ডাল-তেল-মশলা: ৮,০০০ - বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি: ২,৫০০ - জুলির স্কুল: ৩,০০০ - জাহিদের পলিটেকনিক: ৪,০০০ - ওষুধ-ডাক্তার: ১,৫০০ - যাতায়াত: ১,৫০০ - মোট: ২০,৫০০
জমা: ৪,৫০০
জাহিদ সংখ্যাগুলো পড়ল। চার হাজার পাঁচশ টাকা জমা। মাসে। এই টাকা দিয়ে কিছু হয় না, কিন্তু মা জমা রাখত। প্রতি মাসে। যেটুকু বাঁচত, সেটুকু একটা আলাদা জায়গায় রাখত। কোনো মাসে বাঁচত না, তখন আগের জমা থেকে নিত। কিন্তু খাতায় লিখত, ঋণ হিসেবে, নিজের কাছে নিজের ঋণ।
"এখন দেখ।" মা পাতা উল্টে সামনের দিকে এলো। এই মাসের পাতা।
আয়: - জাহিদ (কোডকারিগর + ফ্রিল্যান্সিং): ১,৫০,০০০ - বাবার মিস্ত্রিগিরি: ২০,০০০ - বিকাশের আয় (বিভিন্ন): ৩০,০০০+ - মোট: ২,০০,০০০+
খরচ: - চাল-ডাল-তেল-মশলা: ১২,০০০ - বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি-ইন্টারনেট: ৫,০০০ - জুলির কোচিং + বই: ৪,০০০ - ওষুধ-ডাক্তার: ৩,০০০ - যাতায়াত: ৩,০০০ - বিবিধ: ৮,০০০ - মোট: ৩৫,০০০
জমা: ১,৬৫,০০০
জাহিদ দুটো পাতা পাশাপাশি দেখল। চার হাজার পাঁচশ থেকে এক লাখ পঁয়ষট্টি হাজার। ছয় বছর।
মা বলল, "ছয় বছরে তুই আমাদের জীবন বদলে দিয়েছিস।"
জাহিদ কিছু বলল না। মায়ের মুখে এই কথা শুনে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো। গর্ব? হয়তো। কিন্তু তার চেয়ে বেশি একটা চাপ। এই পরিবারটা তার ওপর ভরসা করে। পুরোটা।
"কিন্তু তুই নিজের জীবনের কথাও ভাব।" মা বলল। গলাটা নরম, কিন্তু কথাটা শক্ত। মায়ের স্টাইলই এরকম, নরম গলায় শক্ত কথা।
৫
রাত বাড়ল। মা চশমা খুলে রাখল, খাতা বন্ধ করল, ক্যালকুলেটর সরিয়ে রাখল। উঠে দাঁড়ানোর আগে বলল, "তোর জন্য একটা মেয়ে দেখতেছি।"
"আম্মা!"
"চুপ কর। দেখতেছি মানে দেখতেছি। বিয়ে দিচ্ছি বলিনি। দেখব, পছন্দ হলে বলব। না হলে বলব না।"
জাহিদ কিছু বলতে গিয়েও বলল না। মায়ের সাথে এই বিষয়ে তর্ক করা অর্থহীন। মা যা করবে বলেছে, করবে। জাহিদের মতামত নেবে, কিন্তু নিজের রিসার্চ নিজে করবে।
মা চলে গেল। ঘরে অন্ধকার। শুধু রান্নাঘরের টিউবলাইটটা জ্বলছে।
জাহিদ খাতাটা আবার খুলল।
পুরনো পাতাগুলোতে মায়ের হাতের লেখা। জায়গায় জায়গায় লেখা একটু কাঁপা, যেদিন হয়তো মা ক্লান্ত ছিল, সারাদিন সেলাই করে হাত কাঁপছিল। কিন্তু সংখ্যাগুলো পরিষ্কার। যোগ-বিয়োগ নিখুঁত। জাহিদ দুই-তিনটা পাতা র্যান্ডমলি চেক করল, ক্যালকুলেটরে মিলিয়ে দেখল। এক টাকাও এদিক-ওদিক নেই।
মায়ের হিসাবে কোনোদিন ভুল হয়নি।
ক্লাস ফাইভ পাস মানুষ। অর্থনীতির অক্ষর চেনে না। GDP কী জিনিস জানে না। কিন্তু একটা পরিবারের আয়-ব্যয়ের হিসাব এমনভাবে রাখে যে কোনো অডিটর এসে দেখলে কিছু বলতে পারবে না।
জাহিদ খাতাটা বন্ধ করল। হাত দিয়ে মলাটটা ছুঁয়ে দেখল। স্কচটেপের নিচে আসল মলাটের রঙ দেখা যায়, সবুজ ছিল, এখন বাদামী হয়ে গেছে।
এই খাতায় একটা পরিবারের পুরো ইতিহাস লেখা আছে। কোন মাসে টাকা ছিল না, কোন মাসে জুলি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেছে, কোন মাসে জাহিদের পলিটেকনিকের ফি বাকি পড়েছে। সব আছে। সংখ্যায়।
জাহিদ লাইট নিভিয়ে দিল।
নিজের ঘরে ফিরে এলো। ল্যাপটপ খুলল না। ফোন ধরল না। বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
মায়ের কথাগুলো মাথায় ঘুরছে। ব্যবসা বড় হয়। মানুষ বুড়ো হয়। দুটো একসাথে চলে না।
মা ঠিকই বলেছে। মা সবসময় ঠিক বলে। ক্লাস ফাইভ পাস, কিন্তু জীবনের হিসাবে মায়ের সমান কেউ নেই।