পাঁচ বন্ধুর ঈদ
একই বেঞ্চ, একই চা, আলাদা আলাদা জীবন
১
ঈদের দিন বিকেল চারটা। নামাজ শেষ, সালামি শেষ, সেমাই শেষ। পেট ভারী, শরীর অলস। এই সময়ে সবাই বাসায় বসে থাকে, ঘুমায়, অথবা ফোনে স্ক্রল করে। কিন্তু জাহিদ বের হলো।
কলেজের গেটের পাশে সেই টং দোকান। "বিসমিল্লাহ টি স্টল"। সাইনবোর্ডটা বদলেছে। আগে "বিসমি...টি স্ট" পড়া যেত, এখন পুরোটাই পড়া যায়। কেউ নতুন করে লিখিয়েছে। সাদা তক্তায় নীল অক্ষরে। কিন্তু দোকানটা আগের মতোই। ড্রেনের ওপর তক্তা, টিনের চাল, দুটো কাঠের বেঞ্চ। বেঞ্চের রঙ আগে ধূসর ছিল, এখনো ধূসর। কিছু কিছু জিনিস রঙ বদলায় না।
জাহিদ একটা বেঞ্চে বসল। ঈদের দিন দোকান খোলা থাকবে কিনা জানত না। কিন্তু কাদের চাচা ঈদেও দোকান খোলেন। "ঈদে মানুষ বেশি চা খায়। সেমাই খেয়ে গলা মিষ্টি হয়ে যায়, তারপর চায়ের জন্য ছটফট করে।" এটা কাদের চাচার থিওরি। থিওরিটা ভুল না।
কাদের চাচা চুলার পাশে দাঁড়িয়ে। বয়স বেড়েছে। আগে পাকা দাড়ি ছিল, এখন পুরো সাদা। মাথার টুপিটা সেই একই, কিন্তু একটু হলদে হয়ে গেছে। হাতের আঙুলগুলো এখনো লম্বা, চিকন, হারমোনিয়াম বাদকের মতো। কিন্তু একটু কাঁপে। চা ঢালার সময় কাঁপুনিটা দেখা যায়। আগে উঁচু থেকে ঢালতেন, ঝর্ণার মতো। এখন একটু নিচু থেকে ঢালেন। শিল্প আগের মতোই, শুধু উচ্চতা কমেছে।
"কাদের চাচা।"
কাদের চাচা ফিরে তাকালেন। চোখ কুঁচকে দেখলেন। তারপর চিনলেন।
"জাহিদ? তুই?"
"জি।"
"ঈদ মোবারক। বড় হয়ে গেছিস তো। বিয়ে করেছিস?"
"জি।"
"ছেলেমেয়ে?"
"একটা মেয়ে। ছোট।"
কাদের চাচা মাথা নাড়লেন। "বসে থাক। চা দিচ্ছি।"
২
পাঁচটা বাজতে না বাজতে রাসেল এল। হাতে গাড়ির চাবি ঝুলছে। পরনে পাঞ্জাবি, পায়ে স্যান্ডেল। আগে রাসেল শার্ট-প্যান্ট ছাড়া কিছু পরত না। পাঞ্জাবি পরা মানে ছেলেটা সত্যিই বদলেছে।
"জাহিদ!" রাসেল জড়িয়ে ধরল। শক্ত করে। আগে রাসেল কাউকে জড়িয়ে ধরত না। 5.00 পাওয়া ছেলেরা দূরত্ব রাখে। কিন্তু জীবন কিছু দূরত্ব কমিয়ে দেয়।
"কেমন আছিস?"
"ভালো। তুই?"
"আছি। চাকরি আছে, বউ আছে, একটা পুরনো গাড়ি আছে। আর কী লাগে?"
রাসেল বসল পাশে। সেই বেঞ্চে। আগে রাসেল এই বেঞ্চের মাঝখানে বসত। এখন এক কোনায় বসল। মাঝখানে জায়গা রাখল। আরো মানুষ আসবে।
"BUET কেমন ছিল?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল। জানে উত্তরটা। কিন্তু জিজ্ঞেস করল।
রাসেল একটু হাসল। হাসিটা আগের রাসেলের না। আগের হাসিতে আত্মবিশ্বাস ছিল, এই হাসিতে অভিজ্ঞতা আছে।
"BUET হয়নি।"
"জানি।"
"জানিস? কে বলেছে?"
"সুমাইয়া।"
"হুম।" রাসেল চায়ের কাপ হাতে নিল। কাদের চাচা এরই মধ্যে দুই কাপ লিকার এনে রেখেছেন। "BUET পাইনি। ভর্তি পরীক্ষায় একশ বিশ জনের মধ্যে একশ তেইশ হয়েছিলাম। তিনজন পরে। তিনজন।" রাসেল আঙুল তিনটা দেখাল। "তিনজনের জন্য জীবন বদলে গেল। কিন্তু ঠিকই software engineer হইছি। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে CSE পড়েছি। এখন টিম লিড। সত্তর হাজার।"
জাহিদ বলল, "প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে?"
"হ্যাঁ। যেটা আগে ভাবতাম লজ্জার। প্রাইভেট মানে ফেল করা ছেলেদের জায়গা। এটা আমার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল কে? স্কুল। কোচিং। বাবা-মা। সবাই। কিন্তু ক্লায়েন্ট জিজ্ঞেস করে না তুই কোন ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করেছিস। জিজ্ঞেস করে তুই কোড পারিস কিনা।"
কাদের চাচা দূর থেকে শুনছিলেন। কিছু বললেন না। চুলায় চা নাড়লেন।
৩
ফারুক এল রিকশায়। না, সে রিকশা চালাচ্ছিল না। রিকশায় চড়ে এসেছে। এটা একটা পার্থক্য যেটা এই গল্পে বলা দরকার।
ফারুক পাঞ্জাবির বদলে পোলো শার্ট পরেছে। নতুন জুতা। হাতে একটা ছোট প্যাকেট, ঈদের মিষ্টি। সে প্যাকেটটা কাদের চাচার হাতে দিল।
"ঈদ মোবারক, চাচা।"
কাদের চাচা প্যাকেটটা হাতে নিয়ে দেখলেন। ভেতরে ভালো মিষ্টি। দোকানের মিষ্টি না, বাসায় বানানো। কাদের চাচা বললেন, "তোর নাম মনে নেই, কিন্তু মুখ চিনি। চায়ের প্লেটে ঢেলে খেতি।"
ফারুক হাসল। "ফারুক, চাচা। প্লেটে ঢেলে চা খেতাম। এখনো খাই।"
ফারুক বেঞ্চে বসল। জাহিদ আর রাসেলের মাঝখানে। আগে ফারুক সবসময় কোনায় বসত। মাঝখানে বসার সাহস ছিল না। 3.80 পাওয়া ছেলেদের মাঝখানে বসতে নেই, কোনায় থাকতে হয়। এখন মাঝখানে বসেছে। জায়গাটা নিজে নিয়েছে, কেউ ছেড়ে দেয়নি।
"সোলার ব্যবসা কেমন?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
"ভালো। পাঁচজন কাজ করে আমার সাথে। মাসে লাখ টাকা আসে। কখনো বেশি, কখনো কম। গড়ে লাখ।"
রাসেল বলল, "পলিটেকনিক থেকে?"
"পলিটেকনিক থেকে।" ফারুক চায়ে চুমুক দিল। প্লেটে ঢেলে। পুরনো অভ্যাস। "লোকে বলত, ডিপ্লোমা নিয়ে কী হবে? ডিগ্রি নাই, চাকরি নাই। আমি বললাম, চাকরি না করলেই হলো। নিজে করব।"
"বাবা কী করেন এখন?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল। জানত উত্তরটা আসবে। কিন্তু ফারুকের মুখে শুনতে চাইল।
ফারুকের চোখ একটু নরম হলো। শুধু একটু। "বাবা এখন rickshaw চালায় না। আমি চালাতে দিই না। বাড়িতে থাকে। সকালে নামাজ পড়ে, দুপুরে ঘুমায়, বিকেলে পাড়ায় আড্ডা দেয়। শরীরটা আর আগের মতো নেই।" ফারুক থামল। "ঐ যে, পলিটেকনিক failure বলত যারা, তাদের বাবারাও rickshaw চালায়নি। তাই তারা বোঝে না rickshaw থামানো মানে কী।"
কেউ কিছু বলল না।
কোণায় টেলিভিশনটা আগের মতোই আছে। আজ ক্রিকেট নেই। ঈদের অনুষ্ঠান চলছে। কেউ গান গাইছে। আওয়াজ কমিয়ে রাখা হয়েছে। টং দোকানে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বদলায়, কিন্তু ভলিউম সবসময় কম।
৪
সুমাইয়া এল হেঁটে। পরনে শাড়ি, কাঁধে একটা ছোট ব্যাগ। চোখের নিচে কালি। পলকা পড়া চশমা, আগে ছিল না।
"দেরি হলো," সে বলল। বসল অন্য বেঞ্চে। আগেও সে আলাদা বেঞ্চে বসত। মাঝে দুই ফুট ফাঁকা জায়গা রাখত। এখনো রাখল, অভ্যাসের জোরে। কিন্তু দূরত্বটা এখন সামাজিক না, ব্যক্তিগত। এখন সে নিজের জায়গা চায়, অন্যদের চাপ বলে না।
"ডাক্তারি কেমন চলছে?" রাসেল জিজ্ঞেস করল।
সুমাইয়া চশমাটা ঠিক করল। "ঢাকা মেডিকেল হয়নি। ময়মনসিংহ হয়েছিল। পড়েছি। পাস করেছি। এখন সরকারি চাকরি, মেডিকেল অফিসার। উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স। সাথে একটা চেম্বার শুরু করেছি। ছোট। শুরু।" সে থামল। "পঞ্চাশ হাজার আসে। কোনো মাসে চল্লিশও না।"
"ক্লান্ত লাগছে তোকে," জাহিদ বলল।
"ক্লান্ত তো লাগবেই। সকাল আটটায় হাসপাতাল, বিকেল পাঁচটায় চেম্বার, রাত নটায় বাসা। মাঝখানে রোগী, ফাইল, রেফারেল, ওষুধের কোম্পানির লোক।" সুমাইয়া চায়ে চুমুক দিল। দুধ চা। আগেও দুধ চা খেত। রাসেল আগে বলেছিল দুধ চা মেয়েদের চা। এখন বলে না। মানুষ কিছু কথা বলা বন্ধ করে, সেটাও একধরনের পরিপক্বতা।
"তবু?" ফারুক বলল।
"তবু করছি।" সুমাইয়া বলল। "কারণ, একদিন একটা বাচ্চাকে বাঁচিয়েছিলাম। ডায়রিয়া। গ্রামের মা বাচ্চা কোলে নিয়ে হেঁটে এসেছিল, তিন কিলোমিটর। বাচ্চাটা প্রায় নিভে যাচ্ছিল। আমি স্যালাইন দিয়েছি, ওষুধ দিয়েছি। বাচ্চা বেঁচে গেছে। মা আমার পা ধরেছিল। আমি বলেছিলাম ধরবেন না।" সুমাইয়া থামল। "ওই মুহূর্তটা একবার পেলে আর কিছু লাগে না। কিন্তু ওই মুহূর্তটা রোজ আসে না। বাকি দিনগুলো শুধু ক্লান্তি।"
৫
আরিফ এল ফোনে। জাহিদের ফোনে ভিডিও কল। জাহিদ ফোনটা বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখল, চায়ের কাপটা দিয়ে ঠেস দিল যাতে না পড়ে।
স্ক্রিনে আরিফ। পেছনে একটা ছোট ঘর। দেয়ালে কিছু ছবি, একটা ক্যালেন্ডার, কোরিয়ান ভাষায় লেখা কিছু কাগজ। আরিফ একটু রোদে পোড়া, চুল ছোট করে ছাঁটা, গালের হাড় বের হয়ে এসেছে। কিন্তু চোখ সেই একই। একটু গভীর, একটু দূরের দিকে তাকানো।
"ঈদ মোবারক সবাইকে," আরিফ বলল। গলায় একটু ইকো। ইন্টারনেট ভালো না।
"তুই কোথায়? জাপানে না?" রাসেল জিজ্ঞেস করল।
"কোরিয়া। জাপান যাইনি। দালাল ঠকিয়েছিল। সেই গল্প লম্বা।" আরিফ একটু থামল। "কোরিয়ায় ফ্যাক্টরিতে কাজ করি। মাসে দেড় লাখ পাঠাই। নিজে রাখি বাকিটা। মোট একশ বিশ হাজার।"
"বাড়িতে কেমন সবাই?" সুমাইয়া জিজ্ঞেস করল।
আরিফের মুখটা একটু ছোট হলো। "ভালো। বাবার দোকান আরেকটু বড় হয়েছে। মা ভালো আছে। বোনের বিয়ে দিয়েছি। জমি ফেরত কিনেছি। যেটা বিক্রি করে এসেছিলাম।" সে হাসল। "জমি ফেরত কেনাটা ভালো লেগেছিল। বাবার মুখটা দেখার মতো ছিল।"
"আর তুই?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল। জানত এই প্রশ্নটা দরকার। বাড়ির খবর সবাই দেয়, নিজের খবর কেউ দেয় না।
আরিফ কিছুক্ষণ চুপ। স্ক্রিনে তার মুখ স্থির। তারপর বলল, "একা। ঈদে সবচেয়ে বেশি একা লাগে। এখানে মসজিদে গেছিলাম, নামাজ পড়েছি, তারপর রুমে ফিরে এসেছি। কেউ নেই। একটা প্যাকেটের সেমাই বানিয়েছি, ইলেকট্রিক কুকারে।" সে একটু থামল। "আরো তিন বছর। তারপর ফিরবো। পাকাপাকি।"
"তিন বছর," রাসেল বলল। ধীরে।
"তিন বছর।" আরিফ মাথা নাড়ল। "টাকাটা জমাতে হবে। একটা ছোট ব্যবসা করব। বাবার সাথে। মুদি দোকান না, অন্য কিছু। এখনো ঠিক করিনি। কিন্তু ফিরব।"
৬
কাদের চাচা নতুন করে চা বানালেন। পাঁচ কাপ। চার কাপ বেঞ্চে রাখলেন, একটা নিজের হাতে। কেউ পাঁচজনের কথা বলেনি। কাদের চাচা গুনেছেন। আরিফ ফোনে আছে, তার কাপ নেই, কিন্তু কাদের চাচা পাঁচ কাপই বানিয়েছেন। পঞ্চম কাপটা বেঞ্চের এক কোনায় রাখলেন, ফোনের পাশে। যেন আরিফও এখানে বসে আছে।
"চাচা, চায়ের দাম কত এখন?" ফারুক জিজ্ঞেস করল।
"পনেরো টাকা।"
"আগে দশ টাকা ছিল।"
"আগে চিনি দশ টাকা কেজি ছিল। এখন সত্তর।" কাদের চাচা একটু থামলেন। "তোদের থেকে দশ টাকাই নেব। পুরনো দাম। পুরনো মানুষের জন্য পুরনো দাম।"
রাসেল পকেট থেকে টাকা বের করতে গেল। কাদের চাচা হাত তুলে বললেন, "পরে দিস। আগে খা। ঈদের দিন হিসাব পরে।"
জাহিদ কাপটা হাতে নিল। গরম। আঙুল পুড়ে যাচ্ছে। আগেও এমন হতো। টং দোকানের চা গরম গরম না খেলে মজা নেই। কিছু নিয়ম বদলায় না।
ফোনে আরিফ বলল, "চাচা, আমাকে একটু চায়ের গন্ধটা পাঠান।"
সবাই হাসল। হাসিটা আসল। হালকা। স্বাভাবিক। আগে এই বেঞ্চে বসে যে হাসি হতো, সেটা অন্য রকম ছিল। সেই হাসিতে ভয় ছিল। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়, পরীক্ষা নিয়ে ভয়, চাকরি নিয়ে ভয়। এই হাসিতে ভয় নেই। ক্লান্তি আছে, কিন্তু ভয় নেই। পাঁচজন মানুষ পাঁচটা আলাদা রাস্তায় হেঁটেছে। কেউ পড়ে গেছে, উঠেছে, আবার হেঁটেছে। কেউ দৌড়েছে, থেমেছে, আবার দৌড়েছে। কিন্তু পাঁচজনই হাঁটছে। এখনো হাঁটছে।
৭
"একটা কথা বল সবাই।" জাহিদ বলল। "একটা জিনিস যেটা আঠারো বছর বয়সে জানলে ভালো হতো।"
রাসেল প্রথম বলল। আগেও প্রথম বলত। কিছু অভ্যাস যায় না।
"Brand doesn't matter. Skill does।" রাসেল বলল। "BUET পাইনি, জীবন শেষ হয়ে যায়নি। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে পড়ে যা শিখেছি, সেটাই কাজে লেগেছে। ক্লায়েন্ট জিজ্ঞেস করে না তুমি কোত্থেকে পড়ছো। জিজ্ঞেস করে তুমি কী পারো।"
ফারুক বলল, "Stigma হলো অন্য মানুষের সমস্যা।" সে প্লেটে চা ঢেলে একটা চুমুক দিল। "পলিটেকনিক, ডিপ্লোমা, ব্যবসা, এগুলোর সাথে লজ্জা লাগিয়ে দেয় সমাজ। কিন্তু লজ্জাটা সমাজের, আমার না। আমি জানি আমি কী করছি। আমার বাবা জানে। ব্যাস।"
সুমাইয়া চশমাটা আবার ঠিক করল। "স্বপ্নের দাম হিসাব করা উচিত স্বপ্ন দেখার আগে।" সে বলল। "মেডিকেলে পড়তে কত খরচ, কত সময়, কত শ্রম, কত ঘুম, কত সম্পর্ক, এসব কেউ বলেনি। শুধু বলেছে ডাক্তার হলে জীবন সোনা। সোনা হয় হয়তো। কিন্তু সোনা গলাতে আগুন লাগে, সেটা কেউ বলেনি।"
ফোনে আরিফ বলল, "বিদেশ গেলে টাকার সমস্যা মেটে। একাকীত্বের সমস্যা শুরু হয়।" সে জানালার দিকে তাকাল। কোরিয়ার আকাশ দেখা যাচ্ছে, ধূসর। "টাকা পাঠাচ্ছি মাসে মাসে। বাড়ি হচ্ছে, দোকান বড় হচ্ছে, বোনের সংসার চলছে। কিন্তু ঈদে একা সেমাই বানিয়ে খাচ্ছি প্যাকেট থেকে। এটা কেউ বলেনি। বলবেই বা কে? যারা গেছে তারা ফিরে এসে সুখের গল্প করে। কষ্টের গল্প বলে না। কারণ কষ্টের গল্প বললে পরের জন রাস্তা পাবে না।"
সবাই জাহিদের দিকে তাকাল।
জাহিদ চায়ের কাপে তাকাল। চায়ের রঙ গাঢ় বাদামি। আগেও এমনই ছিল। সেই সন্ধ্যায়, যখন সবাই জিজ্ঞেস করেছিল "এরপর কী?", তখনও জাহিদ চায়ের কাপে তাকিয়েছিল। সেদিন উত্তর ছিল না।
"সঠিক রাস্তা বলে কিছু নেই," জাহিদ বলল। "তোর রাস্তা আছে, আর সেটাই একমাত্র রাস্তা।" সে একটু থামল। "আমি কোথাও যাইনি। ঢাকায় যাইনি, বিদেশে যাইনি, বড় ইউনিভার্সিটিতে পড়িনি। এই মফস্বল থেকে বের হইনি। কোডকারিগর এখানে বসেই চালাচ্ছি। পাঁচজন কাজ করে। মাসে একশ আশি হাজার আসে। কোথাও যেতে হয়নি। কোথাও যেতে হয়ওনি।"
কাদের চাচা চুলার পাশ থেকে বললেন, "তোমরা বড় হয়ে গেছো।" চায়ে চুমুক দিলেন। "কিন্তু চা তো একই দামে।"
৮
সন্ধ্যা নামছে। আকাশে ঈদের চাঁদ পাতলা হয়ে আছে। আগামীকাল দ্বিতীয় ঈদ। তারপর আবার সবাই নিজের নিজের জীবনে ফিরে যাবে। রাসেল ঢাকায়, সফটওয়্যার কোম্পানিতে। ফারুক এই শহরেই, সোলার প্যানেলের কাজে। সুমাইয়া উপজেলায়, হাসপাতালে। আরিফ কোরিয়ায়, ফ্যাক্টরিতে। জাহিদ এখানেই, কোডকারিগরে।
কিন্তু এই মুহূর্তে পাঁচজন একসাথে। এই বেঞ্চে। এই চায়ের কাপে।
"পরের ঈদে আবার দেখা হবে?" ফারুক বলল।
"হবে," সবাই বলল। ফোনে আরিফও বলল। গলা একটু ভাঙা। ইন্টারনেটের দোষ, নাকি অন্যকিছু, বোঝা গেল না।
কাদের চাচা কাপ গুলো তুলে নিলেন। প্লাস্টিকের বালতিতে ডুবিয়ে ধুলেন। গরম পানি না, ঠান্ডা পানি। আগেও এমনই ধুতেন। স্বাস্থ্যবিধি টং দোকানে এখনো খাটে না। কিন্তু কেউ অসুস্থ হয় না।
জাহিদ হিসাব করল। চার কাপ লিকার, এক কাপ দুধ চা। দশ টাকা করে, পঞ্চাশ টাকা। পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকা বের করল। কাদের চাচা নিলেন। এবার ছেঁড়া নোট নেই। ভালো নোট। কিন্তু কাদের চাচা ছেঁড়া নোটও নিতেন। টং দোকানে ছেঁড়া নোট চলে। এটাও একটা অলিখিত নিয়ম।
সবাই উঠল। আরিফ ফোনে হাত নাড়ল। "আবার দেখা হবে। ইনশাল্লাহ।" স্ক্রিন বন্ধ হলো।
রাসেল গাড়ির দিকে হাঁটল। ফারুক রিকশা ডাকল। সুমাইয়া হেঁটে গেল। জাহিদ একটু বসে রইল।
আগে এই সন্ধ্যায় চারটা রাস্তা চারদিকে চলে গিয়েছিল। সবার একটা পরিকল্পনা ছিল, জাহিদের ছিল না। এখন সবার একটা জীবন আছে। পরিকল্পনামতো হয়নি কারোরই, কিন্তু জীবন হয়েছে।
জাহিদ উঠে দাঁড়াল।
কাদের চাচা বললেন, "যাচ্ছিস?"
"জি, চাচা।"
"আবার আসবি?"
"আসব।"
কাদের চাচা মাথা নাড়লেন। চুলার দিকে ফিরে গেলেন। আরেকটা অর্ডার এসেছে। পাশের টেবিলে দুজন বসেছে। তরুণ, বছর আঠারো-উনিশ হবে। হয়তো তাদেরও কোনো পরীক্ষার রেজাল্ট এসেছে। হয়তো তারাও ভাবছে, "এরপর কী?"
জাহিদ হাঁটতে শুরু করল। রাস্তায় আলো আগের চেয়ে বেশি। ল্যাম্পপোস্ট সব জ্বলছে। আগে দুটোর মধ্যে একটা নষ্ট থাকত। এখন সব ঠিক। পোকা উড়ছে আলোর চারপাশে। সেটা আগের মতোই।
পেছনে টং দোকানে চায়ের গন্ধ। আদা, এলাচ, চিনি, আর পোড়া দুধ। এই গন্ধটা বদলায়নি। বদলাবে না।
চায়ের কাপ ফুরিয়ে গেলেও আড্ডা ফুরায় না। কারণ আড্ডা বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো সামাজিক নিরাপত্তা।