জাহিদের ফ্রেমওয়ার্ক

এই ফ্রেমওয়ার্ক 'সঠিক' উত্তর দেবে না। কিন্তু 'ভুল' সিদ্ধান্ত এড়াতে সাহায্য করবে।

পর্ব ৯৬ · ১৪ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

জাহিদ ব্লগ পোস্ট লেখে না সাধারণত। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয় না। টুইটারে থ্রেড লেখে না। সে কোড লেখে, ক্লায়েন্টের কাজ করে, ইনভয়েস পাঠায়, bKash-এ টাকা আসে, পরের কাজে চলে যায়।

কিন্তু এই লেখাটা লিখতে হবে।

ছয় বছর ধরে যা দেখেছে, শুনেছে, বুঝেছে, সেটা শুধু নিজের ভেতরে রাখলে কোনো লাভ নেই। ইমরান ভাইয়ের কথা, রাকিবের কথা, সুমনের কথা, নাসিমের কথা, মিতুর কথা, ফারুকের কথা, রুবিনার কথা, মায়ের কথা। প্রতিটা গল্পের ভেতরে একটা করে পাঠ আছে। সেই পাঠগুলো একসাথে জড়ো করলে একটা ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড়ায়।

জাহিদ ল্যাপটপ খুলল। bdfacts.org-এ লগইন করল। নতুন পোস্ট। টাইটেল দিল:

"HSC-র পর কী করবে? একটা সিদ্ধান্ত-কাঠামো।"

লেখা শুরু করল সোজা কথায়।

"আমি জাহিদ। GPA 4.17 পেয়েছিলাম। না পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে চান্স হয়েছিল, না মেডিকেলে, না ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। ছয় বছর আগে মনে হয়েছিল জীবন শেষ। আজ আমি মাসে দেড় লাখ টাকার বেশি আয় করি, নিজের শর্তে, নিজের সময়ে, নিজের বাড়ি থেকে।"

"এই পোস্ট সেই রাস্তার গল্প না। এই পোস্ট হলো সেই ভুলগুলোর কথা যেগুলো আমি করেছি, আমার বন্ধুরা করেছে, আমার চেনা মানুষেরা করেছে। এবং সেই ভুলগুলো এড়ানোর জন্য একটা সহজ কাঠামো।"

"তুমি যদি এখন HSC পাস করে বসে থাকো, অথবা ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্টের অপেক্ষায় থাকো, অথবা কোথায় ভর্তি হবে সেটা নিয়ে ঘুম না আসে, তাহলে এই লেখাটা তোমার জন্য।"

"প্রথমে বলি, ৯টা ভুল চিন্তা যেগুলো আমাদের সিদ্ধান্ত নষ্ট করে। এগুলো আমি নিজে দেখেছি। নিজের জীবনে, বন্ধুদের জীবনে, পরিবারে।"

জাহিদ একটা একটা করে লিখতে শুরু করল। প্রতিটা বায়াসের পাশে একটা লাইনের ব্যাখ্যা। সহজ ভাষায়। কোনো ইংরেজি টার্ম না। কোনো পাঠ্যবইয়ের ভাষা না।

"এক। GPA দিয়ে ভবিষ্যৎ মাপা।"

"তুমি GPA 5.00 পেয়েছ? ভালো। কিন্তু এটা তোমার ভবিষ্যতের গ্যারান্টি না। তুমি GPA 3.50 পেয়েছ? সেটাও তোমার ভবিষ্যতের সীমানা না। GPA হলো একটা সংখ্যা। পরীক্ষার খাতায় তুমি কতটুকু মনে রাখতে পেরেছিলে তার হিসাব। বাস্তব জীবনে কাজের দক্ষতা, সমস্যা সমাধান, মানুষের সাথে কাজ করার ক্ষমতা, ধৈর্য, এগুলো মাপার কোনো পরীক্ষা HSC-তে হয় না।"

"আমি 4.17 পেয়ে ভেবেছিলাম আমি কিছু না। আমার বন্ধু 5.00 পেয়ে ভেবেছিল সে সব কিছু। দুজনেই ভুল ছিলাম। GPA একটা শুরু, শেষ না। প্রথম সংখ্যাটাকে নোঙর বানিও না।"

"দুই। সবাই যেটা করছে সেটা করা।"

"তোমার ব্যাচের ৫০ জন ভর্তি পরীক্ষার কোচিংয়ে গেছে? তুমিও যাবে? কেন? কারণ ওরা যাচ্ছে, তাই? নাকি তুমি সত্যিই ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে চাও?"

"পাল বলে একটা জিনিস আছে। মাছ যেমন পালে চলে, মানুষও পালে চলে। তোমার বন্ধু ঢাকায় যাচ্ছে, তুমিও যাবে। তোমার কাজিন BBA পড়ছে, তুমিও পড়বে। কেউ একবার থামে না। জিজ্ঞেস করে না: আমি কেন যাচ্ছি?"

"আমার এক বন্ধু সবার সাথে ঢাকায় গেল। সবাই যা পড়ে সেটা পড়ল। চার বছর পর ডিগ্রি হাতে নিয়ে আবার সেই প্রশ্নে ফিরে এল: এখন কী করবো? চার বছর আগেও এই প্রশ্ন ছিল। চার বছর পরেও এই প্রশ্ন। শুধু বাবার টাকা খরচ হয়ে গেছে।"

"তিন। ডিগ্রি দিয়ে নিজেকে পরিচয় দেওয়া।"

"'আমি BUET-এর ছেলে।' 'আমি মেডিকেলে পড়ি।' 'আমি DU-তে পড়েছি।' এই বাক্যগুলো আমরা পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করি। কিন্তু ভেবে দেখো, তুমি কী করো সেটা তোমার পরিচয়, তুমি কোথায় পড়েছিলে সেটা না।"

"ডিগ্রি একটা হাতিয়ার। পরিচয় না। তুমি ফারুককে চেনো না, কিন্তু সে পলিটেকনিক থেকে পাস করে আজ সোলার কোম্পানি চালায়। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে না কোথায় পড়েছ। জিজ্ঞেস করে কত কিলোওয়াটের প্ল্যান্ট বসাতে পারো।"

"চার। 'প্রেস্টিজ' দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া।"

"পাবলিক ইউনিভার্সিটি মানেই ভালো? প্রাইভেট মানেই খারাপ? কারিগরি মানেই 'কম'? এই ধারণাগুলো কোথা থেকে এলো? সমাজ থেকে। বাবা-মায়ের মুখ থেকে। আত্মীয়দের কাছ থেকে। কিন্তু সত্য হলো, প্রেস্টিজিয়াস মানে সবসময় লাভজনক বা সুখী না।"

"আমি এমন ডাক্তার দেখেছি যে সাত বছর পড়ে মাসে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকায় চেম্বার চালায়। আমি এমন প্লাম্বার দেখেছি যে মাসে পঞ্চাশ হাজার আয় করে। কোনটা বেশি 'প্রেস্টিজিয়াস'? সমাজ বলবে ডাক্তার। কিন্তু ব্যাংক একাউন্ট বলবে অন্য কথা।"

"মানে এই না যে ডাক্তারি খারাপ। মানে হলো প্রেস্টিজ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিও না। যদি সত্যিই ডাক্তার হতে চাও, হও। কিন্তু শুধু লোকে ভালো বলবে বলে? সেটা তোমার ভুল হবে।"

"পাঁচ। 'নিরাপদ' পথ বলে কিছু নেই।"

"সরকারি চাকরি নিরাপদ? হ্যাঁ, চাকরিটা টিকে থাকবে। কিন্তু তুমি কি টিকে থাকবে? মাসে কুড়ি হাজার টাকায় ঢাকায় থাকবে কীভাবে? বাসা ভাড়া বারো হাজার, বাকি আটটায় খাবে, পরবে, যাতায়াত করবে? পাঁচ বছর পর ইনক্রিমেন্ট হবে দুই হাজার? দশ বছর পর বেতন হবে পঁচিশ?"

"'নিরাপদ' পথের একটা লুকানো খরচ আছে। সুযোগ-খরচ। তুমি যখন একটা 'নিরাপদ' চাকরিতে বসে থাকো, তখন অন্য সব সম্ভাবনা থেকে দূরে থাকো। পাঁচ বছর পর তুমি আবিষ্কার করো যে তোমার বাইরে থাকা বন্ধু, যে 'ঝুঁকি' নিয়েছিল, সে তোমার তিনগুণ আয় করছে।"

"ছয়। আজকের টাকা আর কালকের টাকা এক না।"

"ডিপ্লোমা করলে দুই বছরে কাজ পাবে, মাসে পনেরো হাজার। ইউনিভার্সিটিতে গেলে চার বছর পর হয়তো চাকরি পাবে, মাসে পঁচিশ হাজার। কোনটা ভালো?"

"অনেকে বলবে ইউনিভার্সিটি। কিন্তু হিসাব করো। ডিপ্লোমা: দুই বছর পর থেকে আয় শুরু। চার বছরের মাথায় তুমি ইতিমধ্যে ২৪ মাস কাজ করেছ। ইউনিভার্সিটি: চার বছর পর আয় শুরু, তার আগে খরচ। পাঁচ বছরের মাথায় গিয়ে হিসাব মেলাও, দেখবে ডিপ্লোমাওয়ালা এগিয়ে আছে।"

"মানে এই না যে ইউনিভার্সিটি সবসময় ভুল। মানে হলো আজকের টাকা আর কালকের টাকা আলাদা। দশ বছরের হিসাব করো, দুই বছরের না।"

১০

"সাত। একটা সফলতার গল্প দেখে লাফ দেওয়া।"

"তোমার পাড়ায় একজন ফ্রিল্যান্সার মাসে দুই লাখ আয় করে? দারুণ। কিন্তু তোমার পাড়ায় আরো পঞ্চাশজন ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছিল যারা ছয় মাসে ছেড়ে দিয়েছে, সেটা কেউ বলে না।"

"একজন সফল মানুষকে দেখে সিদ্ধান্ত নিও না। জিজ্ঞেস করো: এই পথে যারা হেঁটেছে তাদের কতজন পৌঁছেছে? উত্তরটা সাধারণত হতাশাজনক। কিন্তু সেই হতাশাজনক সত্যটা জানা দরকার, আগে থেকে।"

"এক শতাংশের সফলতা দেখে লাফ দিও না। নিরানব্বই শতাংশের গল্পটাও শোনো।"

১১

"আট। চোখের সামনে যা দেখি সেটাই সব মনে করা।"

"তোমার মফস্বলে কী কী চাকরি দেখো? শিক্ষক, ব্যাংকার, ডাক্তার, সরকারি কর্মকর্তা। তো তুমি ভাবো এগুলোই একমাত্র অপশন। কিন্তু বাংলাদেশে এমন হাজারো কাজ আছে যা তুমি কোনোদিন দেখোনি। ডেটা এন্ট্রি, ডিজিটাল মার্কেটিং, সোলার ইনস্টলেশন, অ্যাগ্রো-প্রসেসিং, লজিস্টিক্স, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট।"

"যেটা দেখো না সেটা নেই, এমন না। শুধু তুমি দেখোনি। খোঁজো। ইন্টারনেট আছে। BDJobs আছে। LinkedIn আছে। YouTube আছে। তোমার মফস্বলে যেটা দেখো সেটাই পুরো দুনিয়া না।"

১২

"নয়। কাজের 'লেবেল' দেখে বিচার করা।"

"'ও তো মিস্ত্রি।' 'ও তো কারিগর।' 'ও তো ড্রাইভার।' এই বাক্যগুলো শুনলে বোঝা যায় কথাটা সম্মানের সাথে বলা হচ্ছে না। অথচ এই মিস্ত্রি, কারিগর, ড্রাইভার ছাড়া তোমার শহর একদিনও চলবে না।"

"আমি একটা মেয়েকে চিনি যে গ্রাফিক ডিজাইন করে। YouTube থেকে শিখেছে। কোনো ডিগ্রি নেই। মাসে পঁচিশ-ত্রিশ হাজার আয় করে। তার পাড়ায় লোকে বলে, 'কম্পিউটারে ছবি আঁকে।' যেন এটা কোনো কাজ না। অথচ তার আয় পাড়ার বেশিরভাগ 'চাকরিজীবী'র চেয়ে বেশি।"

"দক্ষতাকে সম্মান দাও। লেবেলকে না।"

১৩

জাহিদ একটু থামল। কফি খেল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। মফস্বলের রাত। রাস্তায় দু-একটা রিকশা। কোথাও মসজিদ থেকে আজানের রেশ।

নয়টা বায়াস লিখে ফেলেছে। এবার আসল অংশ। ফ্রেমওয়ার্কটা।

সে জানে, শুধু "এটা করো না, ওটা করো না" বললে কাজ হয় না। মানুষের কিছু একটা দরকার যেটা দিয়ে সে নিজে হিসাব করতে পারে। একটা টুল। একটা কাঠামো।

১৪

"এবার আসি আসল প্রশ্নে। HSC-র পর কী করবে? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে তিনটা প্রশ্ন নিজেকে করো।"

"এক। আমি কী করতে ভালোবাসি?"

"সত্যি করে বলো। বাবা-মায়ের স্বপ্ন না, আত্মীয়দের পরামর্শ না, বন্ধুদের প্ল্যান না। তুমি কী করতে ভালোবাসো? হতে পারে কোডিং, হতে পারে রান্না, হতে পারে ইলেকট্রনিক্স, হতে পারে লেখালেখি, হতে পারে মানুষকে শেখানো। কিছু একটা আছে যেটা তুমি টাকা ছাড়াও করতে, সেটা কী?"

"দুই। আমার পরিবার কতটুকু সাপোর্ট দিতে পারবে?"

"এটা কঠিন প্রশ্ন। কিন্তু সৎ প্রশ্ন। তোমার বাবা কত আয় করেন? পরিবারের খরচ কত? তোমার পড়ার পেছনে মাসে কত খরচ হবে? কত বছর ধরে? এই খরচটা তোমার পরিবার বহন করতে পারবে, নাকি ঋণ করতে হবে, নাকি জমি বিক্রি করতে হবে?"

"যদি চার বছরের ইউনিভার্সিটি পড়ার খরচ তোমার বাবার জমি বিক্রি করে যোগাতে হয়, তাহলে সেই ডিগ্রির দাম অনেক বেশি। শুধু টিউশন ফি না। বাবার জমি, মায়ের গহনা, পরিবারের নিরাপত্তা, এগুলো হিসাবে আনো।"

"তিন। বাংলাদেশের দশ বছর পরে কী দরকার হবে?"

"এখন ২০২৬। ২০৩৬-এ বাংলাদেশে কোন সেক্টরে মানুষ দরকার হবে? রিনিউয়েবল এনার্জি? হ্যাঁ। ডিজিটাল সার্ভিস? হ্যাঁ। অ্যাগ্রো-প্রসেসিং? হ্যাঁ। স্বাস্থ্যসেবা? হ্যাঁ। ক্লাইমেট অ্যাডাপ্টেশন? হ্যাঁ। তুমি যা পড়বে বা শিখবে, সেটা কি দশ বছর পরেও কাজে লাগবে?"

"তুমি জানো না ঠিক কী হবে। কেউ জানে না। কিন্তু দিকটা বোঝা সম্ভব। পানি যেদিকে গড়ায়, সেদিকে নৌকা ভাসাও।"

১৫

"এখন আসি ফ্রেমওয়ার্কে।"

"তোমার সামনে যত অপশন আছে, প্রতিটার জন্য পাঁচটা জিনিস হিসাব করো। কাগজে লেখো। মাথায় রেখো না, কাগজে লেখো।"

"এক। মোট খরচ। শুধু টিউশন ফি না। থাকা, খাওয়া, যাতায়াত, বই, কোচিং, সব মিলিয়ে। আর সুযোগ-খরচও যোগ করো। মানে এই সময়টায় যদি কাজ করতে তাহলে কত আয় হতো, সেটাও একটা খরচ।"

"দুই। প্রথম আয় কবে? এই পথে গেলে কত বছর পর তুমি প্রথম টাকা আয় করবে? দুই বছর? চার বছর? সাত বছর? এই সময়টুকু তোমার পরিবারকে অপেক্ষা করতে হবে।"

"তিন। দশ বছরে কত আয় সম্ভব? প্রথম বেতন দিয়ে বিচার করো না। দশ বছরের মোট আয় কত হতে পারে? ক্যারিয়ারের গ্রোথ কেমন? পাঁচ বছর পর বেতন কত হবে? দশ বছর পর?"

"চার। তোমার দক্ষতা ও আগ্রহের সাথে কতটুকু মেলে? তুমি গণিতে ভালো কিন্তু মেডিকেলে ভর্তি হচ্ছ? তুমি হাতের কাজ পছন্দ করো কিন্তু BBA পড়ছ? তোমার যা ভালো লাগে সেটার সাথে তোমার পথ কতটুকু মিলছে?"

"পাঁচ। পড়া বা ট্রেনিংয়ের সময়টায় পরিবার কি টিকে থাকবে? তুমি যদি চার বছর পড়ো, এই চার বছর তোমার পরিবারের আর্থিক অবস্থা কেমন থাকবে? তোমার ছোট ভাইবোনের পড়ার খরচ? মায়ের চিকিৎসা? বাবার ব্যবসা? তুমি শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবলে চলবে না। পুরো পরিবারটাকে নিয়ে ভাবো।"

১৬

"প্রতিটা অপশনের পাশে এই পাঁচটা জিনিস লেখো। তুলনা করো। কোনটায় খরচ কম, কোনটায় আয় আগে শুরু হয়, কোনটায় দশ বছরের সম্ভাবনা বেশি, কোনটায় তোমার আগ্রহ মেলে, কোনটায় পরিবার টিকে থাকবে।"

"একটা সতর্কতা। এই ফ্রেমওয়ার্ক তোমাকে 'সঠিক' উত্তর দেবে না। কোনো ফ্রেমওয়ার্কই সেটা দেয় না। জীবনে 'সঠিক' উত্তর বলে কিছু নেই। কিন্তু এটা তোমাকে 'ভুল' সিদ্ধান্ত এড়াতে সাহায্য করবে।"

"ভুল সিদ্ধান্ত মানে কী? সবার দেখাদেখি, সমাজের চাপে, প্রেস্টিজের লোভে, একটা মিথ্যা নিরাপত্তার আশায়, একজনের সফলতা দেখে, চোখের সামনের অপশনে আটকে গিয়ে, কোনো লেবেলের ভয়ে, এমন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া যেটা তোমার পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে, তোমার আগ্রহের বাইরে, আর বাংলাদেশের ভবিষ্যতের বাইরে।"

১৭

জাহিদ শেষ অংশটা লিখল। ধীরে। প্রতিটা শব্দ ওজন করে।

"আমি কোনো expert না। আমি একজন ছেলে যে GPA 4.17 পেয়ে নিজের পথ খুঁজেছে। এই ফ্রেমওয়ার্ক আমার অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি। তোমার অভিজ্ঞতা আলাদা হবে। তোমার পরিবার আলাদা, তোমার জেলা আলাদা, তোমার সামর্থ্য আলাদা।"

"কিন্তু প্রশ্নগুলো একই।"

"আমি কী করতে ভালোবাসি? আমার পরিবার কতটুকু সাপোর্ট দিতে পারবে? বাংলাদেশের দশ বছর পরে কী দরকার হবে?"

"এই তিনটা প্রশ্নের সৎ উত্তর দিলে, আর উপরের নয়টা ভুল চিন্তা এড়ালে, তোমার সিদ্ধান্ত খারাপ হবে না। পারফেক্ট হবে না, কারণ পারফেক্ট বলে কিছু নেই। কিন্তু খারাপ হবে না।"

"আর সেটাই যথেষ্ট।"

১৮

জাহিদ "Publish" বাটনে ক্লিক করল।

রাত একটা বাজে। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ। জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করল। ভাবল, হয়তো কেউ পড়বে। হয়তো পড়বে না। সেটা তার হাতে নেই।

সে যা জানে, যা শিখেছে, যা দেখেছে, সেটা লিখে রেখে দিল। একটা ওয়েবসাইটে। যেখানে বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তের যেকোনো ছেলে বা মেয়ে পড়তে পারবে। ফ্রি। কোনো পেওয়াল নেই, কোনো লগইন নেই, কোনো বিজ্ঞাপন নেই।

শুধু তথ্য। শুধু অভিজ্ঞতা। শুধু একটা ফ্রেমওয়ার্ক।

১৯

পোস্টটা ভাইরাল হলো।

জাহিদ ভাবেনি এটা হবে। সে শুধু লিখেছিল, নিজের কথা, নিজের শেখা, নিজের ভাষায়। কিন্তু বাংলাদেশে লাখ লাখ ছেলেমেয়ে আছে যারা ঠিক এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজছে: HSC-র পর কী করবো?

প্রথম দিনে দুই হাজার ভিউ। কেউ একজন ফেসবুকে শেয়ার করেছিল। তারপর আরেকজন। তারপর একটা HSC ব্যাচ গ্রুপে গেল। তারপর আরেকটায়। তারপর একজন শিক্ষক তার ক্লাসে দেখালেন। তারপর একটা ইউটিউব চ্যানেল স্ক্রিনশট নিয়ে ভিডিও বানাল।

সাত দিনে পঞ্চাশ হাজার ভিউ।

bdfacts.org-এর সবচেয়ে বেশি পঠিত পোস্ট।

২০

কমেন্টগুলো জাহিদ পড়ল।

"ভাই, আমি GPA 3.80 পেয়েছি। সবাই বলে কিছু হবে না। আপনার লেখা পড়ে মনে হচ্ছে হয়তো হবে।"

"আমার বাবা রিকশা চালান। আমি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে চাই কিন্তু খরচ যোগাতে পারবো না। এই ফ্রেমওয়ার্ক দেখে বুঝলাম, ডিপ্লোমা আমার জন্য বেটার অপশন হতে পারে।"

"আমি মেয়ে। মফস্বলে থাকি। ফ্রিল্যান্সিং করতে চাই কিন্তু পরিবার রাজি না। রুবিনার কথাটা কোথায় পড়বো?"

"স্যার আপনি কি কোচিং করেন? ফোন নম্বর দেন।"

শেষ কমেন্টটায় জাহিদ হাসল। সে কোচিং করে না। সে কোনো গুরু না, কোনো মোটিভেশনাল স্পিকার না, কোনো ক্যারিয়ার কাউন্সেলর না। সে একটা ছেলে। মফস্বলের। GPA 4.17। যে হোঁচট খেতে খেতে নিজের পথ তৈরি করেছে।

আর সেই পথের মানচিত্রটা রেখে দিয়েছে। যেন পরের জন পথ খুঁজে পায়।

২১

রাত দুইটা। জাহিদ ঘুমাতে গেল।

শেষ যে জিনিসটা ভাবল, সেটা ছয় বছর আগের সেই রাতের কথা। রেজাল্টের রাত। GPA 4.17 দেখে মনে হয়েছিল পৃথিবী ভেঙে পড়েছে। মনে হয়েছিল সামনে কোনো পথ নেই।

পথ ছিল। শুধু দেখতে পাইনি।

এখন দেখি। এবং যা দেখি, লিখে রাখি। যেন আরেকটা ছেলে বা মেয়ে, আরেকটা মফস্বলে, আরেকটা রেজাল্টের রাতে, ভাবে না যে পৃথিবী শেষ হয়ে গেছে।

কারণ শেষ হয়নি। শুরু হয়েছে।

---

*দশম অধ্যায়: জাহিদ কী করলো? -- ALL BIASES REVIEWED। পর্ব ৯৬/১০০।*