পাঁচ বছর পরে

সফলতা মানে সমস্যা শেষ হওয়া না, সফলতা মানে আরো বড় সমস্যা আসা

পর্ব ৯৭ · ১৪ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

২০৩১। জানুয়ারি।

জাহিদের বয়স উনত্রিশ। সাতাশ থেকে উনত্রিশ, দুই বছর কোথায় গেল টেরও পায়নি। কিন্তু পাঁচ বছর? HSC-র পর যে ছেলেটা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্সে ভর্তি হয়েছিল, GPA 4.17 নিয়ে, সেই ছেলেটাকে এখন আয়নায় দেখলে চিনতে পারে, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারে না।

কোডকারিগর এখন আর দুইজনের টিম না। বারোজন। অফিস আছে। মফস্বল শহরে। পুরনো পোস্ট অফিসের পাশে, দোতলা বিল্ডিংয়ের পুরো দোতলা ভাড়া নিয়েছে। দেয়ালে সাদা রং, কাচের দরজা, ভেতরে এয়ার কন্ডিশন। বাইরে সাইনবোর্ড: "কোডকারিগর টেকনোলজিস"।

শহরের প্রথম টেক অফিস।

লোকে প্রথম প্রথম আসত দেখতে। "এইটা কী? কম্পিউটারের অফিস নাকি?" কেউ কেউ ভাবত সাইবার ক্যাফে। কেউ ভাবত প্রিন্টের দোকান। জাহিদ হাসত। বোঝাত না। কাজ দিয়ে বুঝিয়েছে।

বারোজনের টিম।

চারজন ডেভেলপার। দুইজন ফুলস্ট্যাক, দুইজন ব্যাকএন্ড। তিনজন সাপোর্ট ইঞ্জিনিয়ার, ক্লায়েন্টদের সমস্যা সমাধান করে, ফোনে বসে থাকে, রিমোটে ঢুকে ঠিক করে দেয়। দুইজন ডিজাইনার, একজন সেলস, একজন অ্যাডমিন। আর জাহিদ নিজে।

জাহিদ এখন কোড লেখে কম। আগে সারাদিন কোড লিখত। এখন মিটিং করে, ক্লায়েন্ট সামলায়, হিসাব দেখে, নতুন কাজ আনে। মাঝে মাঝে মনে হয় প্রোগ্রামার থেকে ব্যবসায়ী হয়ে গেছে। মনটা খারাপ হয়। তারপর আবার ভাবে, কোম্পানি চালাতে হলে তো কাউকে চালাতে হবে।

রাতে মাঝে মাঝে কোড লেখে। পুরনো অভ্যাস। সবাই ঘুমিয়ে গেলে ল্যাপটপ খুলে বসে। তখন মনে হয় আগের জাহিদ ফিরে এসেছে। যে ছেলেটা রাত তিনটায় PHP শিখত।

তিনটা প্রোডাক্ট। কোডকারিগরের মূল আয়ের উৎস তিনটা।

প্রথমটা সবচেয়ে পুরনো। হিসাবখাতা। বাংলাদেশের ছোট-মাঝারি অ্যাকাউন্টিং ফার্মগুলোর জন্য ফিনান্সিয়াল সফটওয়্যার। ট্যাক্স রিটার্ন, ভ্যাট ক্যালকুলেশন, ব্যালেন্স শিট, ইনকাম স্টেটমেন্ট। বাংলায়। পুরোটা বাংলায়। এটাই ছিল কোডকারিগরের প্রথম বড় আইডিয়া। জাহিদ দেখেছিল, মফস্বলের হিসাবরক্ষকরা এক্সেলে কাজ করে, কেউ কেউ এখনো খাতায় লেখে। ইংরেজি সফটওয়্যার কিনতে পারে না, কিনলেও চালাতে পারে না। তাদের জন্য বাংলায় সফটওয়্যার বানাল।

এখন পঁয়ত্রিশটা ফার্ম হিসাবখাতা ব্যবহার করে। মাসে সাবস্ক্রিপশন তিন হাজার টাকা। ছোট ফার্মের জন্য দুই হাজার। বড়দের জন্য পাঁচ হাজার। মাসিক আয় এখান থেকে প্রায় দেড় লাখ।

দ্বিতীয়টা কৃষিবন্ধু। সাইফুলের সাথে মিলে বানানো। সাইফুল, সেই কুমিল্লার ছেলে, যে কৃষি ডেটা নিয়ে কাজ করত। সে এখন কোডকারিগরের কো-ফাউন্ডার না, কিন্তু পার্টনার। অ্যাগ্রি-টেক অ্যাপ। কৃষকরা ফসলের দাম দেখতে পারে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস পায়, সার-বীজের দোকান খুঁজে পায়, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সরাসরি পাইকারদের সাথে যুক্ত হতে পারে। মধ্যস্বত্বভোগী বাদ। এটা এখনো পুরোপুরি লাভজনক হয়নি। ব্যবহারকারী আছে আট হাজার। রেভিনিউ আসে বিজ্ঞাপন থেকে, সার কোম্পানিদের স্পনসরশিপ থেকে। মাসে ত্রিশ-চল্লিশ হাজার। কিন্তু জাহিদ জানে, এটা বড় হবে। সময় লাগবে।

তৃতীয়টা স্কুলকানন। স্কুল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। ভর্তি, বেতন, পরীক্ষার ফলাফল, হাজিরা, অভিভাবকদের নোটিফিকেশন। দুশো স্কুল ব্যবহার করে। বেশিরভাগ মফস্বলের। ঢাকার স্কুলগুলো বিদেশি সফটওয়্যার কেনে, লাখ লাখ টাকা দিয়ে। মফস্বলের স্কুলগুলো সেটা পারে না। স্কুলকানন মাসে পাঁচশো টাকা। হ্যাঁ, পাঁচশো। জাহিদ ইচ্ছা করেই দাম কম রেখেছে। দুশো স্কুলে মাসে এক লাখ। কিন্তু ভলিউম বাড়লে এটাই সবচেয়ে বড় প্রোডাক্ট হবে। বাংলাদেশে স্কুল আছে এক লাখ পঁচিশ হাজারের বেশি।

তিনটা মিলিয়ে? বার্ষিক রেভিনিউ দেড় কোটি টাকার একটু বেশি। ডলারে দেড় লাখের কাছাকাছি।

জাহিদ বিয়ে করেছে। দুই বছর হলো।

মেয়েটা এই শহরেরই। নাম তানজিলা। বাবা স্কুলের শিক্ষক, মা গৃহিণী। তানজিলা অনার্স পড়েছিল ইংরেজিতে। চাকরি খুঁজছিল, পাচ্ছিল না। মফস্বলে ইংরেজি অনার্স দিয়ে কী চাকরি হয়?

মিম তাকে চিনত। মিমের বান্ধবীর বান্ধবী। মিম একদিন বলল, "ভাইয়া, আমাদের অফিসে একজন দরকার। UI/UX। আমি একা পারছি না। তানজিলা নামে একটা মেয়ে আছে, ক্রিয়েটিভ, শেখার আগ্রহ আছে।"

জাহিদ বলল, "UI/UX তো জানে না।"

"আমি শেখাব।"

তানজিলা এলো। মিম তাকে শেখাল। Figma, প্রোটোটাইপিং, ইউজার রিসার্চ। ছয় মাসে তানজিলা দাঁড়িয়ে গেল। এক বছরে সে কোডকারিগরের সেকেন্ড ডিজাইনার।

জাহিদ আর তানজিলা। অফিসে কলিগ, বাসায় দম্পতি। জটিল? হ্যাঁ, মাঝে মাঝে। অফিসের ঝগড়া বাসায় চলে আসে, বাসার ঝগড়া অফিসে। কিন্তু সামলে নিয়েছে। তানজিলা বুদ্ধিমতী মেয়ে। সে জানে কখন ডিজাইনার তানজিলা হতে হবে, কখন স্ত্রী তানজিলা।

বাবা। আবদুল করিম।

সিএনজি চালানো ছেড়ে দিয়েছে তিন বছর হলো। জাহিদ বলেছিল, "বাবা, আর না।" বাবা প্রথমে রাজি হয়নি। বলেছিল, "আমি কাজ না করে বসে থাকব?"

জাহিদ বুঝেছিল। বাবা বেকার থাকতে পারবে না। তাই একটা ব্যবস্থা করল। বিকাশ পয়েন্ট যেটা আগে থেকেই চালাচ্ছিল বাবা, সেটা আরো বড় করল। সাথে একটা ছোট দোকান। মুদি না, স্টেশনারি। স্কুলের পাশে। খাতা, কলম, বই, ফটোকপি মেশিন। জাহিদ পুঁজি দিয়েছে তিন লাখ টাকা।

বাবা সকালে দোকান খোলে, বিকেলে বিকাশ পয়েন্ট দেখে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে। শরীর ভালো আছে। হাঁটুর ব্যথা ছিল, ওষুধ খায়। ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে দুই বছর আগে। নিয়ন্ত্রণে আছে। জাহিদ প্রতি তিন মাসে ঢাকা থেকে একজন ডাক্তার আনায়। টেলিমেডিসিনও করে মাঝে মাঝে।

বাবা খুশি। সবচেয়ে খুশি যে ব্যাপারটায়, সেটা হলো: মানুষ তাকে এখন "করিম ভাই" না, "জাহিদের বাবা" বলে ডাকে। আগে সে ছিল সিএনজি ড্রাইভার করিম। এখন সে "সেই কোম্পানির মালিকের বাবা।"

বাবা এটা কাউকে বলে না। কিন্তু চোখে দেখা যায়।

মা। রাবেয়া বেগম।

সেলাই ছেড়ে দিয়েছে। চার বছর হলো। চোখে সমস্যা হচ্ছিল, সুই-সুতায় কষ্ট হতো। জাহিদ বলল, "মা, তোমাকে আর সেলাই করতে হবে না। কোনোদিন না।"

মা কেঁদেছিল। খুশিতে না। অভ্যাসের কষ্টে। বিশ বছর ধরে সেলাই করেছে। রাত জেগে জেগে। এক টাকা এক টাকা করে জমিয়েছে। সেলাই ছেড়ে দেওয়া মানে একটা পরিচয় ছেড়ে দেওয়া।

কিন্তু এখন? এখন মা ঘর সামলায়। রান্না করে। বিকেলে প্রতিবেশীদের সাথে গল্প করে। নাতি-নাতনির জন্য অপেক্ষা করে (এখনো হয়নি, কিন্তু মা প্রতি সপ্তাহে জিজ্ঞেস করে)।

মায়ের মুখে একটা বাক্য আছে যেটা সে প্রতিটা মেহমানকে বলে। প্রতিবেশী আসুক, আত্মীয় আসুক, কেউ আসুক:

"আমার ছেলে কোম্পানির মালিক। বারোজন কাজ করে তার অফিসে।"

তারপর একটু থেমে যোগ করে: "আর আমার মেয়ে সেই কোম্পানিতে ডিজাইনার। চল্লিশ হাজার টাকা মাইনে।"

মা "ডিজাইনার" শব্দটা ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারে না। "ডিজাইনর" বলে। কিন্তু গর্বটা ঠিকই পৌঁছায়।

রাকিব। জাহিদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো রাকিব।

রাকিব সেই ভাগ্নে যে দশম শ্রেণির পর পড়া ছেড়ে দিয়েছিল। গার্মেন্টসে হেল্পার হিসেবে ঢুকেছিল। সাত হাজার টাকা বেতন। জাহিদ তাকে অফার দিয়েছিল: একটা গার্মেন্টস ম্যানেজমেন্ট কোর্স করবে, খরচ জাহিদ দেবে।

রাকিব রাজি হয়েছিল। ছয় মাসের কোর্স। BGMEA-র ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। প্রোডাকশন প্ল্যানিং, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, মার্চেন্ডাইজিং বেসিকস। জাহিদ কোর্সের ফি দিয়েছে, ঢাকায় থাকার খরচ দিয়েছে।

রাকিব কোর্স শেষ করে ফিরে এসে একটা মিড-সাইজ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে জুনিয়র সুপারভাইজার হিসেবে ঢুকল। পনেরো হাজার। তারপর? রাকিবের ভেতরে একটা ব্যাপার ছিল যেটা আগে কেউ দেখেনি: সে মানুষ সামলাতে পারে। শ্রমিকরা তাকে পছন্দ করে। সে চিৎকার করে না, বকা দেয় না, কিন্তু কাজ আদায় করে নেয়।

তিন বছরে রাকিব প্রোডাকশন ম্যানেজার। ষাট হাজার টাকা বেতন। তার আগে এই পদে যে লোক ছিল তার ডিগ্রি ছিল টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ। রাকিবের দশম শ্রেণি পাস আর ছয় মাসের সার্টিফিকেট। কিন্তু ফ্যাক্টরি মালিক বলেছে, "রাকিব যে দিন থেকে এসেছে, প্রোডাকশন এফিসিয়েন্সি আট পার্সেন্ট বেড়েছে।"

রাকিবের মেয়ে আয়েশা। পাঁচ বছর। একটা ভালো স্কুলে পড়ে। ইংরেজি মিডিয়াম না, কিন্তু ভালো বাংলা মিডিয়াম। মাসে তিন হাজার টাকা বেতন। রাকিব দেয়। নিজে দেয়। জাহিদের কাছ থেকে নেয় না।

রাকিব একদিন জাহিদকে ফোন করে বলেছিল, "ভাই, তুমি যে আমাকে সেই কোর্সে পাঠাইছিলা, সেইটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা। আয়েশা যেদিন বড় হবে, আমি তাকে বলব, তোমার মামা না থাকলে তোমার বাবা আজও হেল্পার থাকত।"

জাহিদ কিছু বলতে পারেনি। গলা ধরে গিয়েছিল।

মিম। ছোট বোন।

অনার্স শেষ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়েই কোডকারিগরে জয়েন করেছে। লিড ডিজাইনার। তানজিলাকে সে-ই ট্রেইন করেছে। এখন দুইজনের ডিজাইন টিম। ছোট, কিন্তু দক্ষ।

মিমের বেতন চল্লিশ হাজার। মফস্বলে চল্লিশ হাজার মানে অনেক। তার বন্ধুরা যারা ঢাকায় চাকরি করে, তারা পঁচিশ-ত্রিশ পায়। ঢাকায় থাকে ভাড়া বাসায়, মাসে বারো হাজার টাকা ভাড়া দেয়, ট্রান্সপোর্টে আরো পাঁচ হাজার যায়। হাতে থাকে আট-দশ হাজার। মিম বাড়িতে থাকে। খরচ নেই বললেই চলে। চল্লিশ হাজারের প্রায় পুরোটাই সেভিংস বা নিজের পেছনে খরচ।

মিম এনগেজড। ছেলেটা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ঢাকায় কাজ করে। রিমোট করতে চায়। বিয়ের পর এই শহরে চলে আসবে। জাহিদ বলেছে, "কোডকারিগরে জায়গা আছে।" ছেলেটা ভাবছে। ঢাকায় আশি হাজার পায়। মফস্বলে এত পাবে না। কিন্তু মফস্বলে খরচও তো কম।

মিমের সবচেয়ে বড় গর্ব: সে নিজের বিয়ের খরচ নিজে দেবে। বাবা-মায়ের কাছ থেকে একটা টাকাও নেবে না। ভাইয়ের কাছ থেকেও না। "আমি নিজে কামাই করি, নিজের বিয়ে নিজে করব।"

মা বলে, "পাগলি।" কিন্তু চোখ ভিজে যায়।

জাহিদের আয়। এটা বলা দরকার, কারণ সংখ্যাটা গুরুত্বপূর্ণ।

কোম্পানি থেকে জাহিদ নিজে মাসে নেয় এক লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা। ওনার্স ড্র। বাকিটা কোম্পানিতে থাকে। কর্মীদের বেতন, অফিস ভাড়া, সার্ভার খরচ, মার্কেটিং। বছর শেষে যা প্রফিট থাকে, তার থেকে আরো কিছু নেয়। গত বছর মোট নিয়েছে ছত্রিশ লাখ। মাসে তিন লাখের কাছাকাছি।

GPA 4.17। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। ফিজিক্স। মফস্বল।

মাসে তিন লাখ।

যে ছেলেটাকে আত্মীয়রা বলেছিল "NU-তে পড়ে কী হবে?" যে ছেলেটার বাবা সিএনজি চালাত আর মা সেলাই করত। যে ছেলেটা ফেসবুকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিজ্ঞাপন দেখে শুরু করেছিল।

মাসে তিন লাখ।

কিন্তু এটা ভাবলে ভুল হবে যে জাহিদ প্রতি মাসে তিন লাখ টাকা পকেটে রাখে আর সুখে আছে।

১০

কারণ সমস্যা আছে। প্রচুর সমস্যা।

গত বছর একজন ডেভেলপার চলে গেল। সাদিক। জাহিদের প্রথম দিকের হায়ার। ভালো ছেলে, ভালো কোডার। কিন্তু একদিন রিজাইন দিল। জাহিদ জিজ্ঞেস করল, "কেন?"

সাদিক বলল, "ভাই, আমি ঢাকায় যাব। এখানে গ্রোথ নেই।"

জাহিদ বোঝানোর চেষ্টা করল। "গ্রোথ নেই মানে? কোম্পানি তো বাড়ছে। তোর বেতন বাড়ছে।"

"ভাই, মফস্বলে থেকে কোন বড় কোম্পানিতে সুইচ করব? আমার রিজিউমে 'কোডকারিগর, মফস্বল' লেখা থাকলে ঢাকার কোম্পানি কি সিরিয়াসলি নেবে?"

জাহিদ চুপ করে গেল। কারণ সাদিক ভুল বলেনি।

সাদিক চলে গেল। সাথে একটা ক্লায়েন্টও নিয়ে গেল। একটা অ্যাকাউন্টিং ফার্ম। সাদিক তাদের বলেছে, "আমি ঢাকায় নিজে সাপোর্ট দেব, কম খরচে।" ক্লায়েন্ট রাজি হয়ে গেল।

জাহিদের রাগ হয়েছিল। কিন্তু পরে ভেবে দেখল, সে নিজেও তো এই কাজই করেছিল। ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছিল অন্যের ক্লায়েন্ট কেড়ে নিয়ে না, কিন্তু মার্কেটপ্লেসে গিয়ে নিজের দাম কমিয়ে। একই জিনিস, ভিন্ন রূপ। প্রতিযোগিতা।

১১

আর আছে ক্যাশ ফ্লো-র সমস্যা।

রেভিনিউ দেড় কোটি মানে প্রতি মাসে সাড়ে বারো লাখ আসে, এমন না। কোনো মাসে বিশ লাখ আসে, কোনো মাসে পাঁচ লাখ। ক্লায়েন্ট পেমেন্ট দেরি করে। স্কুলগুলো তিন মাস পর পর দেয়। অ্যাকাউন্টিং ফার্মগুলো সময়মতো দেয়, কিন্তু কেউ কেউ ক্যান্সেল করে। কৃষিবন্ধু থেকে রেভিনিউ অনিয়মিত।

কর্মীদের বেতন দিতে হয় মাসের এক তারিখে। বারোজন। মোট বেতন সাড়ে চার লাখ। অফিস ভাড়া পঁচিশ হাজার। সার্ভার, ডোমেইন, ক্লাউড, টুলস মিলিয়ে আরো ত্রিশ হাজার। মোট মাসিক খরচ পাঁচ লাখের বেশি। এই টাকা প্রতি মাসে থাকতেই হবে। না থাকলে?

একবার হয়েছিল। গত বছর। জুন মাসে তিনটা বড় পেমেন্ট আটকে গেল একসাথে। ব্যাংকে ব্যালেন্স দুই লাখ। বেতন দিতে হবে সাড়ে চার। জাহিদ নিজের সেভিংস থেকে আড়াই লাখ ঢেলেছিল কোম্পানিতে। তানজিলাকে বলেনি। রাতে ঘুমাতে পারেনি। তিন দিন।

সেই তিন দিনে জাহিদ বুঝেছিল: কোম্পানি চালানো আর কোড লেখা এক জিনিস না। কোড লেখায় বাগ ফিক্স করলেই হয়। কোম্পানি চালানোয় বাগ ফিক্স করতে গেলে আরো তিনটা বাগ তৈরি হয়।

১২

প্রতিযোগী আছে। ঢাকায় বড় বড় সফটওয়্যার কোম্পানি। তারা এখন মফস্বলের মার্কেটে নামছে। ইন্টারনেট সস্তা হয়েছে, ক্লাউড সফটওয়্যার সহজলভ্য। একটা ঢাকার কোম্পানি স্কুল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার বানিয়েছে, মাসে তিনশো টাকায় দিচ্ছে। স্কুলকানন পাঁচশো। কিছু স্কুল সুইচ করেছে।

জাহিদ দাম কমায়নি। কমালে লস হবে। বরং ফিচার বাড়িয়েছে। প্যারেন্ট অ্যাপ, যেখানে অভিভাবক সন্তানের হাজিরা, পরীক্ষার নম্বর, হোমওয়ার্ক রিয়েল-টাইমে দেখতে পারে। এটা ঢাকার কোম্পানি দেয়নি। কিন্তু কতদিন এই সুবিধা টিকবে? তারাও তো বানাবে।

প্রতিযোগিতা শেষ হয় না। কখনো হয় না।

১৩

তবু জাহিদ থামেনি।

একটা জিনিস জাহিদ বুঝেছে যেটা অনেক বড় বড় ডিগ্রিধারী বোঝে না: সফলতা একটা গন্তব্য না। সফলতা একটা চলমান প্রক্রিয়া। সফলতা মানে সমস্যা শেষ হওয়া না। সফলতা মানে আরো বড় সমস্যা আসা। আগে সমস্যা ছিল: পরের মাসের ভাড়া কোথা থেকে আসবে? এখন সমস্যা: বারোজনের বেতন কোথা থেকে আসবে? সমস্যা বদলেছে, শেষ হয়নি।

কিন্তু পার্থক্য আছে।

আগে সমস্যার মুখে জাহিদ ভয় পেত। এখন ভয় পায় না। কারণ সে জানে, সমস্যা সমাধানযোগ্য। সে আগেও সমাধান করেছে। আবারও করবে।

আগে জাহিদ একা ছিল। এখন একা না। বারোজনের টিম আছে। তানজিলা আছে। বাবা-মা আছে, যারা আর দুশ্চিন্তায় নেই। মিম আছে, যে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে। রাকিব আছে, যে নিজের মেয়েকে ভালো স্কুলে পড়াচ্ছে।

জাহিদ একদিন সন্ধ্যায় অফিসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। রাস্তায় রিকশা চলছে, দোকানে লোকজন, মসজিদ থেকে আজান আসছে। সেই মফস্বল। সেই ছোট শহর। যেখানে কেউ কখনো ভাবেনি একটা টেক কোম্পানি হবে।

মোবাইলে একটা নোটিফিকেশন এলো। স্কুলকানন-এর একটা নতুন স্কুল সাইন আপ করেছে। রংপুর থেকে। দুশো এক নম্বর।

জাহিদ হাসল। ছোট একটা হাসি।

১৪

রাতে বাসায় ফিরে তানজিলা জিজ্ঞেস করল, "আজ অফিসে কী হলো?"

"কিছু না। একটা নতুন স্কুল পেলাম।"

"আর?"

"আর সাদিকের পুরনো ক্লায়েন্ট ফোন করেছিল। ফিরে আসতে চায়।"

"কেন?"

"সাদিক সাপোর্ট দিতে পারছে না। একা একা এত কাজ সামলাতে পারছে না।"

তানজিলা হাসল। "ফিরিয়ে নেবে?"

"হ্যাঁ। কিন্তু আগের দামে না। নতুন দামে।"

তানজিলা চা বানাতে গেল। রান্নাঘর থেকে বলল, "তোমার মা ফোন করেছিল। বলেছে রবিবার আসতে।"

"কেন?"

"কেন আবার? তোমার মামাতো ভাইয়ের বিয়ে। তোমার মা সবাইকে বলে বেড়াচ্ছে, 'আমার ছেলে আসবে, কোম্পানির মালিক।'"

জাহিদ চায়ের কাপ হাতে নিল। জানালা দিয়ে আকাশ দেখল। শীতের রাত, তারা ভালো দেখা যাচ্ছে। মফস্বলে তারা দেখা যায়। ঢাকায় যায় না।

সে ভাবল: পাঁচ বছর আগে এই জানালা দিয়ে তাকিয়ে কী ভাবত? ভাবত পরের মাসের ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ পাবে কিনা। ক্লায়েন্ট পেমেন্ট দেবে কিনা। ইলেকট্রিসিটি বিল দিতে পারবে কিনা।

এখন কী ভাবে? ভাবে বারোজনের বেতন সময়মতো দিতে পারবে কিনা। নতুন প্রোডাক্ট লঞ্চ করার সময় হয়েছে কিনা। ঢাকার প্রতিযোগী কতটা এগিয়ে গেছে।

সমস্যা বদলেছে। কিন্তু সমস্যা আছে।

জাহিদ চা খেল। তারা দেখল। ভাবল: এটাই জীবন। সমস্যা থাকবে। সমাধানও থাকবে। শুধু থামলে চলবে না।

থামলে চলবে না।