দশ বছর পরে

GPA-র সাথে জীবনের কোনো correlation নেই। ২১ লাখ ছাত্র এটা জানে না। কিন্তু এই পাঁচজন জানে।

পর্ব ৯৮ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

২০৩৬ সাল। জানুয়ারি।

ঢাকায় শীত পড়েছে। শীত মানে ঢাকার শীত, গায়ে একটা জ্যাকেট দিলেই চলে, কিন্তু রিকশাওয়ালারা মাফলার পরেছে, চায়ের দোকানে ভিড় বেড়েছে, আর সকালে কুয়াশায় রাস্তার ওপারটা ঝাপসা দেখায়।

জাহিদ গুলশানের একটা অফিসে বসে আছে। অফিসটা বড় না, তিনতলা বিল্ডিংয়ের দোতলায়, চারটা রুম। কিন্তু দরজায় একটা সাইনবোর্ড আছে: "কোডকারিগর"। নিচে ছোট করে লেখা: "ডিজিটাল সলিউশনস ফর বাংলাদেশ"।

এটা জাহিদের ঢাকা অফিস। গত বছর খুলেছে। এর আগে সব কাজ মফস্বল থেকে চলত। কিন্তু ক্লায়েন্ট বাড়ছে, টিম বাড়ছে, কিছু মিটিং ফেস-টু-ফেস না হলে হয় না, তাই ঢাকায় একটা ছোট অফিস।

জাহিদের বয়স এখন চৌত্রিশ।

এইচএসসি পাস করেছিল ২০২৬-এ। সেই কবে। দশ বছর আগে। দশ বছর আগে সে ছিল একটা মফস্বলের ছেলে, GPA 4.17, কোনো ক্লিয়ার প্ল্যান নেই, শুধু একটা সেকেন্ডহ্যান্ড ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট কানেকশন।

এখন তার কোম্পানিতে পঁচিশজন কাজ করে। ঢাকায় দশজন, মফস্বলে পনেরোজন। সবাই remote, শুধু ঢাকার অফিসে সপ্তাহে দুদিন আসতে হয়। মফস্বলের টিম সম্পূর্ণ remote। জাহিদ নিজে সপ্তাহে তিন দিন মফস্বলে থাকে, দুই দিন ঢাকায়।

বছরে রেভিনিউ পাঁচশো হাজার ডলার। মানে প্রায় ছয় কোটি টাকা। এটা গুগল বা মাইক্রোসফটের হিসাবে কিছু না, কিন্তু মফস্বলের একটা ছেলের হিসাবে, যে দশ বছর আগে মাসে পাঁচশো টাকায় টিউটোরিয়াল দেখত, এটা অনেক কিছু।

আজ একটা বিশেষ দিন।

পাঁচ বন্ধু একসাথে দেখা করছে। রাসেল, ফারুক, সুমাইয়া, আরিফ, আর জাহিদ। সবার বয়স চৌত্রিশ। এইচএসসির পর দশ বছর। একটা ছোট reunion।

জায়গাটা ধানমন্ডির একটা রেস্টুরেন্ট। রাসেলের পছন্দ। "একটা ভালো জায়গায় বসি, আড্ডা দিই।" রাসেল বরাবরই এরকম, পরিপাটি, অর্গানাইজড, যেকোনো কিছু প্ল্যান করতে পারে।

জাহিদ আগে পৌঁছল। তারপর রাসেল। তারপর ফারুক, হাতে একটা ব্যাগ, ভেতরে মিষ্টির বাক্স।

"মিষ্টি কেন?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।

ফারুক হাসল। "তৃতীয় বাড়ি হলো। গত মাসে রেজিস্ট্রি করলাম।"

রাসেল বলল, "তৃতীয়? তুই বিল্ডার হয়ে যাচ্ছিস নাকি?"

"বিল্ডার না, কিন্তু জমি আছে তো, বাড়ি করি। একটা বাবা-মায়ের, একটা আমার, একটা ভাড়া দিচ্ছি।"

সুমাইয়া এলো কিছুক্ষণ পর। ল্যাবকোটটা নেই, কিন্তু চোখের নিচে কালি আছে। "Sorry, OT থেকে আসছি। একটা সিজারিয়ান ছিল।"

আরিফ সবার শেষে। গায়ে একটা সাদা শার্ট, চুল ছোট করে ছাঁটা, কিন্তু হাতদুটো আগের মতোই, কারখানায় কাজ করা মানুষের হাত, শক্ত, একটু রুক্ষ। আরিফ হাসল। "ভাই, ঢাকা চিনতে পারি না। দুই বছর ছিলাম না, সব বদলে গেছে।"

অর্ডার দেওয়া হলো। খাবার আসতে সময় লাগবে। ততক্ষণে আড্ডা।

রাসেল শুরু করল। রাসেল বরাবরই শুরু করে।

"বলো তো, দশ বছর আগে কে ভাবতে পেরেছিল আমরা এখানে বসব? আমাদের মধ্যে কেউ কি ভেবেছিল দশ বছর পর কোথায় থাকবে?"

জাহিদ বলল, "আমি তো ভাবতেই পারিনি। আমার তো প্ল্যানই ছিল না।"

ফারুক বলল, "আমারও না। আমি তো ভেবেছিলাম বাবার সাথে রিকশা চালাবো।"

সবাই চুপ হয়ে গেল একটু। ফারুকের বাবার কথা সবাই জানে। রিকশাচালক। এখন রিটায়ার্ড। ফারুকের টাকায় মফস্বলে মধ্যবিত্তের মতো থাকেন। নিজের বাড়ি, তিন বেলা ভালো খাবার, মাঝে মাঝে নাতি-নাতনিদের নিয়ে ঘুরতে যান। রিকশার হ্যান্ডেলবার আর ধরতে হয় না।

সুমাইয়া বলল, "আমি ভেবেছিলাম। ডাক্তার হবো, এটা তো ছোটবেলা থেকেই ঠিক ছিল।"

"হয়েছিস তো," রাসেল বলল।

"হয়েছি।" সুমাইয়া একটু থামল। "কিন্তু ছোটবেলায় যেভাবে ভেবেছিলাম, সেভাবে হয়নি। ভেবেছিলাম ডাক্তার হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। টাকা আসবে, মানুষ সম্মান করবে, জীবনটা সেট। কিন্তু..."

"কিন্তু?"

"কিন্তু চোদ্দ ঘণ্টা ডিউটি, রাতে ইমার্জেন্সি কল, দুই বছরের মেয়েকে দেখার সময় নেই। মা দেখছে আমার মেয়েকে। আমি ডাক্তার হয়েছি ঠিকই, কিন্তু মা হতে পারছি কি?"

টেবিলে আবার নীরবতা। এই ধরনের কথা পুরুষরা সাধারণত বোঝে না। কিন্তু এই পাঁচজনের মধ্যে একটা বন্ধন আছে যেটা GPA-র রেজাল্ট শীটে ধরা পড়ে না।

আরিফ বলল, "আমি কোরিয়া থেকে ফাইনালি ফিরে এসেছি।"

"কবে?" জাহিদ জিজ্ঞেস করল।

"দুই বছর হলো। শেষ তিন বছর মিলিয়ে পঁচিশ লাখ সেভ করেছিলাম। সব এনে ঢেলে দিলাম একটা প্লাস্টিক মোল্ডিং ফ্যাক্টরিতে।"

রাসেল ভ্রু তুলল। "প্লাস্টিক মোল্ডিং? কেন?"

"জাপানে শিখেছিলাম। কোরিয়ায় আরও শিখলাম। বাংলাদেশে এই স্কিলটা রেয়ার। বেশিরভাগ প্লাস্টিক কারখানা পুরোনো পদ্ধতিতে চলে। আমি precision molding জানি। জাপানিজ কোয়ালিটি কন্ট্রোল জানি। সেটাই আমার advantage।"

"রেভিনিউ কেমন?" ফারুক জিজ্ঞেস করল। ফারুক বরাবরই নম্বর জানতে চায়।

আরিফ মাথা নাড়ল। "এখনো uncertain। শুরু হয়েছে মাত্র। কিছু অর্ডার আসছে, কিছু ক্লায়েন্ট পেয়েছি, কিন্তু ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে প্রফিট আসতে সময় লাগে। তিন-চার বছর লাগবে ব্রেকইভেন করতে।"

"কিন্তু তুই বাড়িতে আছিস," জাহিদ বলল।

আরিফ হাসল। সেই হাসিতে ছয় বছরের প্রবাসজীবনের সব ক্লান্তি ছিল। "হ্যাঁ, বাড়িতে আছি। এটাই তো আসল কথা। মা-বাবার সামনে আছি। ভাতের থালায় মায়ের হাতের তরকারি। রাতে নিজের ঘরে ঘুম। ছয় বছর বিদেশে থাকলে বুঝবি এগুলোর দাম কত।"

রাসেলের দিকে সবাই তাকাল। রাসেল, গ্রুপের সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। GPA 5.00। বুয়েটে পড়েছিল। ক্যাম্পাসে সবার আগে জব পেয়েছিল।

"তুই বল, রাসেল। Engineering Manager, তাই না? কত বেতন?"

রাসেল একটু অস্বস্তিতে হাসল। "দেড় লাখ।"

ফারুক শিস দিল। "দেড় লাখ। ভালো তো।"

"ভালো, কিন্তু..." রাসেল থামল। বাকিরা অপেক্ষা করল।

"কিন্তু আমি বোরড, ফারুক। এটা বলতে গেলে অকৃতজ্ঞ শোনায়, আমি জানি। বাংলাদেশে দেড় লাখ বেতন পায় কত পার্সেন্ট মানুষ? হয়তো এক পার্সেন্টও না। কিন্তু আমি সকাল নয়টায় অফিসে ঢুকি, রাত আটটায় বের হই, মিটিং করি, কোড রিভিউ করি, জুনিয়রদের মেনটর করি, ম্যানেজমেন্টকে রিপোর্ট দিই। প্রতিদিন একই জিনিস। রিপিট। রিপিট। রিপিট।"

"তো?"

"তো আমি নিজের কিছু করতে চাই। একটা startup। আমার নিজের প্রোডাক্ট। দশ বছর ধরে অন্যের কোম্পানি বানিয়ে দিচ্ছি। এবার নিজেরটা বানাবো।"

জাহিদ রাসেলের দিকে তাকাল। দশ বছর আগে রাসেল ছিল সবার ওপরে। GPA 5.00, বুয়েট, গোল্ডেন বয়। সবাই ভেবেছিল রাসেল সবচেয়ে বেশি এগিয়ে যাবে। রাসেল এগিয়েছে, কিন্তু "এগিয়ে যাওয়া" শব্দটার মানে দশ বছরে বদলে গেছে।

ফারুকের গল্পটা সবচেয়ে অবাক করার মতো।

GPA 3.80। পাঁচজনের মধ্যে সবচেয়ে কম। এইচএসসির পর কেউ ফারুককে নিয়ে বিশেষ কিছু ভাবেনি। রিকশাচালকের ছেলে, GPA কম, ইউনিভার্সিটিতে চান্স পায়নি। গল্প শেষ। এরকম হাজার হাজার ছেলে আছে বাংলাদেশে।

কিন্তু ফারুক সোলার প্যানেলের কাজ শিখল। একটা ছোট দোকান দিয়ে শুরু করল। আস্তে আস্তে ইনস্টলেশন, আস্তে আস্তে ক্লায়েন্ট, আস্তে আস্তে টিম।

এখন ফারুকের কোম্পানিতে পনেরোজন কাজ করে। বছরে রেভিনিউ পঞ্চাশ লাখ টাকা। তিনটা বাড়ি বানিয়েছে। জমি কিনেছে। সোলার প্যানেলের ইকুইপমেন্ট আছে, গুদাম আছে, পিকআপ ভ্যান আছে।

পাঁচজনের মধ্যে net worth-এ ফারুক সবার উপরে। এটা কেউ দশ বছর আগে কল্পনাও করতে পারত না।

রাসেল বলল, "ফারুক, তোর GPA ছিল 3.80।"

ফারুক হাসল। "হুমম।"

"আর আমার ছিল 5.00।"

"হুমম।"

"তুই আমার চেয়ে বেশি কামাচ্ছিস।"

ফারুক হাসি চওড়া করল। "GPA দিয়ে সোলার প্যানেল লাগানো যায় না, রাসেল।"

সবাই হেসে উঠল। কিন্তু হাসির ভেতরে একটা সত্য আছে যেটা হাসির ব্যাপার না।

খাবার এলো। বিরিয়ানি। পাঁচজন পাঁচ রকম জীবন থেকে এসেছে, কিন্তু বিরিয়ানির ব্যাপারে সবাই একমত।

খেতে খেতে জাহিদ একটা হিসাব করল। মাথার ভেতরে। সে হিসাব করতে ভালোবাসে, সবসময়ই ভালোবেসেছে।

এইচএসসিতে GPA-র rank ছিল:

রাসেল 5.00। সুমাইয়া 4.83। আরিফ 4.50। জাহিদ 4.17। ফারুক 3.80।

মাসিক আয়ে rank এখন:

ফারুক, সোলার বিজনেস, মাসে চার লাখ প্লাস (বিজনেস প্রফিট)। জাহিদ, কোডকারিগর, মাসে তিন লাখ প্লাস। সুমাইয়া, গাইনি স্পেশালিস্ট, মাসে এক লাখ বিশ হাজার (সরকারি বেতন আর চেম্বার মিলিয়ে)। রাসেল, Engineering Manager, দেড় লাখ। আরিফ, ম্যানুফ্যাকচারিং, এখনো uncertain, ব্রেকইভেনের আগে।

GPA-র rank: রাসেল, সুমাইয়া, আরিফ, জাহিদ, ফারুক।

আয়ের rank: ফারুক, জাহিদ, রাসেল, সুমাইয়া, আরিফ।

ranking প্রায় উল্টে গেছে। সবচেয়ে কম GPA যার, সে সবচেয়ে বেশি কামাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি GPA যার, সে চতুর্থ।

জাহিদ এটা কাউকে বলল না। কারণ এটা বলার মতো কথা না। এটা বুঝার কথা।

কিন্তু শুধু টাকার হিসাব দিয়ে জীবন মাপা যায় না।

সুমাইয়া কম কামাচ্ছে রাসেলের চেয়ে, কিন্তু সুমাইয়া প্রতিদিন মানুষের প্রাণ বাঁচায়। আজ সকালে যে মা সুস্থ সন্তান পেয়েছে, সেই মায়ের কাছে সুমাইয়ার দাম কত? সেটা কোনো salary sheet-এ ধরা পড়ে না।

আরিফ এখনো ব্রেকইভেন করেনি, কিন্তু আরিফ বাড়িতে আছে। ছয় বছর প্রবাসজীবনের পর নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে কারখানা চালাচ্ছে। জাপান আর কোরিয়ার স্কিল বাংলাদেশে এনেছে। সেই স্কিল থেকে আরও দশজনের কর্মসংস্থান হচ্ছে।

রাসেল দেড় লাখ বেতন পায়, কিন্তু রাসেলের মাথায় একটা startup-এর স্বপ্ন আছে। সেই স্বপ্নটা হয়তো পরের দশ বছরে সত্যি হবে। কে জানে, পরের reunion-এ রাসেলই হয়তো সবার ওপরে থাকবে।

ফারুক সবচেয়ে বেশি কামাচ্ছে, কিন্তু ফারুকের সবচেয়ে বড় অর্জন টাকা না। ফারুকের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো তার বাবা আর রিকশা চালান না। একজন রিকশাচালকের ছেলে নিজের হাতে তিনটা বাড়ি বানিয়েছে, পনেরোজনকে চাকরি দিয়েছে, বাবাকে মধ্যবিত্ত জীবন দিয়েছে। এটার মূল্য কত? এটা কোনো GPA শীটে, কোনো university ranking-এ, কোনো admission test-এ ধরা পড়ত না।

আর জাহিদ? জাহিদ মফস্বলে থেকে কোম্পানি চালাচ্ছে। সপ্তাহে তিন দিন মফস্বল, দুই দিন ঢাকা। Best of both worlds। ঢাকার ক্লায়েন্ট, মফস্বলের জীবনযাত্রা। শহরের সুযোগ, গ্রামের শান্তি।

বিরিয়ানি শেষ। চা এলো।

জাহিদ বলল, "একটা কথা বলি?"

সবাই তাকাল।

"দশ বছর আগে আমাদের GPA দিয়ে বিচার করা হয়েছিল। রাসেল 5.00, সুমাইয়া 4.83, আরিফ 4.50, আমি 4.17, ফারুক 3.80। সেই নম্বর দিয়ে ঠিক করা হয়েছিল কে ভালো আর কে খারাপ। কে চান্স পাবে আর কে পাবে না। কে সফল হবে আর কে ব্যর্থ হবে।"

"তো?"

"তো সেই নম্বরের সাথে আমাদের জীবনের কোনো মিল নেই। ফারুক 3.80 পেয়েছিল, ফারুক আজ সবচেয়ে বেশি কামাচ্ছে। আমি 4.17 পেয়েছিলাম, আমি দ্বিতীয়। রাসেল 5.00, রাসেল চতুর্থ। ranking উল্টে গেছে।"

রাসেল বলল, "কিন্তু ranking তো শুধু আয় দিয়ে হয় না।"

"হয় না," জাহিদ রাজি হলো। "আয় দিয়ে হয় না। কিন্তু GPA দিয়েও হয় না। সেটাই তো পয়েন্ট। GPA দিয়ে কিছুই হয় না। GPA একটা সংখ্যা, একটা পরীক্ষার রেজাল্ট। সেটা দিয়ে একটা মানুষের আগামী দশ বছর predict করা যায় না। অথচ আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা এই prediction-এর ওপর দাঁড়িয়ে আছে।"

সুমাইয়া বলল, "প্রতি বছর একুশ লাখ ছেলেমেয়ে এইচএসসি দেয়।"

"হ্যাঁ। একুশ লাখ। তাদের বলা হয় GPA-ই সব। 5.00 মানে তুমি জিতেছো, 3.80 মানে তুমি হেরেছো। কিন্তু আমরা পাঁচজন জানি এটা সত্যি না। আমরা জানি কারণ আমরা দশ বছর পার করে এসেছি।"

১০

চায়ের কাপ খালি হলো। বিল এলো।

ফারুক বিল নিতে চাইল। "আমি দিই।"

রাসেল বলল, "তুই সবসময় বিল দিস।"

"তো? টাকা আছে তো, তাই দিই।" ফারুক হাসল। সেই হাসি, যেটা দশ বছর আগেও ছিল। যখন GPA 3.80 পেয়েছিল, তখনও এই হাসি ছিল। রিকশাচালকের ছেলে, কিন্তু হাসিতে কোনো ভার নেই। কখনো ছিল না।

বাইরে বের হলো পাঁচজন। ধানমন্ডির রাস্তা। সন্ধ্যা নামছে। রিকশার ঘণ্টা বাজছে, গাড়ির হর্ন বাজছে, রাস্তার পাশে ফুচকার দোকানে লাইন।

জাহিদ একটু দাঁড়াল। পেছনে তাকাল। পাঁচটা মানুষ, পাঁচটা গল্প। একই সময়ে একই পরীক্ষা দিয়েছিল। একই সিস্টেমের ভেতর দিয়ে গেছে। কিন্তু পাঁচজন পাঁচ দিকে গেছে। কেউ ইঞ্জিনিয়ারিং, কেউ সোলার, কেউ মেডিকেল, কেউ প্রবাস, কেউ কোড।

কার পথ সঠিক ছিল? সবার। কারণ "সঠিক পথ" বলে কিছু নেই। আছে "নিজের পথ"।

জাহিদ হাঁটতে শুরু করল। ঢাকার সন্ধ্যা। গুলশানের অফিসে ফিরতে হবে, একটু কাজ বাকি আছে। কাল সকালে মফস্বলে যাবে। বাসে। এখনো বাসেই যায়। গাড়ি কেনেনি। গাড়ি কেনার সামর্থ্য আছে, কিন্তু কেনেনি। মফস্বলের ছেলে, বাসে যেতে লজ্জা পায় না।

হাঁটতে হাঁটতে জাহিদ ভাবল, দশ বছর আগে সে ভয় পেয়েছিল। GPA 4.17 পেয়ে ভেবেছিল সব শেষ। ভর্তি পরীক্ষায় কোথাও হবে না। জীবনে কিছু হবে না। সেই ভয়টা কত বড় ছিল, আর কত অদরকারি ছিল। জীবন GPA-র ফাংশন না। জীবন একটা অদ্ভুত সমীকরণ, যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ variable-গুলো কোনো পরীক্ষায় মাপা হয় না। জেদ, অভিযোজন, সাহস, কৌতূহল, ধৈর্য, এগুলোর কোনো নম্বর নেই। কিন্তু এগুলোই আসল।

GPA-র সাথে জীবনের কোনো correlation নেই। একুশ লাখ ছাত্র এটা জানে না। কিন্তু এই পাঁচজন জানে।

১১

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার সময় ফারুক বলল, "পরের reunion কবে?"

রাসেল বলল, "পাঁচ বছর পর? ২০৪১?"

"না," জাহিদ বলল। "পরের ঈদে। পাঁচ বছর অনেক বেশি।"

সুমাইয়া হাসল। "ঈদে আমার ডিউটি থাকে।"

আরিফ বলল, "ঈদে কারখানা বন্ধ থাকে। আমি ফ্রি।"

ফারুক বলল, "ঈদে বাবা-মাকে নিয়ে আসবো। বাবা ঢাকা দেখেনি কোনোদিন।"

সবাই চুপ হয়ে গেল আবার। ফারুকের বাবা। সারাজীবন রিকশা চালিয়েছেন, ঢাকা দেখেননি। এই একটা বাক্যের ভেতরে বাংলাদেশের একটা পুরো অর্থনীতি লুকিয়ে আছে।

"চল, ঈদে হবে," রাসেল বলল।

পাঁচজন পাঁচ দিকে ছড়িয়ে পড়ল। রাসেল উবারে, সুমাইয়া CNG-তে হাসপাতালের দিকে, আরিফ হাঁটতে হাঁটতে কারওয়ান বাজারের দিকে, ফারুক রিকশায় (বাবার পেশার প্রতি একটা অব্যক্ত শ্রদ্ধা, ফারুক এখনো রিকশায় চড়ে)।

আর জাহিদ? জাহিদ বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটল। কাল সকালে বাসে মফস্বল। কিন্তু আজ রাতে অফিসে একটু কাজ। একটা নতুন প্রোডাক্টের wireframe। কোডকারিগরের পরবর্তী প্রজেক্ট।

মফস্বলের ছেলে, ঢাকার রাস্তায়, পকেটে ফোন, মাথায় কোড, আর বুকের ভেতরে একটা গল্প যেটা দশ বছর আগে শুরু হয়েছিল একটা সেকেন্ডহ্যান্ড ল্যাপটপ দিয়ে।

গল্পটা এখনো চলছে।