১৮ বছরের জাহিদকে চিঠি

চিঠি পাঠানোর কোনো উপায় নেই। কিন্তু হয়তো কোনো ১৮ বছরের ছেলে বা মেয়ে এটা পড়বে।

পর্ব ৯৯ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-১৯

রাত দুইটা বাজে।

জাহিদ ল্যাপটপের সামনে বসে আছে। স্ক্রিনে একটা ফাঁকা Google Doc খোলা। কার্সর জ্বলছে, নিভছে। ঘরে আর কোনো আলো নেই।

আজ সারাদিন BDFacts-এর জন্য bias framework-টা গুছিয়ে লিখেছে। নয়টা bias, তিনটা প্রশ্ন, decision matrix। সব পরিষ্কার, ডাটা-ব্যাকড। এটা publish করবে।

কিন্তু এখন, এই রাত দুইটায়, জাহিদ অন্য কিছু লিখতে চাইছে।

সে Doc-এর টাইটেলে লিখল: "চিঠি।" মুছে দিল। "নিজেকে চিঠি।" সেটাও মুছল। শেষে লিখল: "প্রিয় জাহিদ (১৮)।"

এবার মুছল না।

জাহিদের বয়স এখন ৩৪। ঢাকায় থাকে, একটা ছোট ফ্ল্যাটে, নিজের আয়ে। CodeKaarigor নামে ব্র্যান্ড আছে, ছোট কিন্তু সত্যিকারের। বাবা-মায়ের জন্য প্রতি মাসে টাকা পাঠায়। রাকিব ভাইয়ের লোন শোধ হয়ে গেছে। সুমাইয়ার সাথে সংসার। মেয়ে ইরা, দুই বছর।

জীবন ঠিক আছে। পারফেক্ট না, কিন্তু ঠিক আছে।

কিন্তু আজ রাতে সে ১৮ বছরের জাহিদের কথা ভাবছে। সেই ছেলেটা যে GPA 4.17 পেয়ে নিজেকে ব্যর্থ মনে করেছিল। যে ছাদে উঠে একা একা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত।

সেই ছেলেটাকে যদি একটা চিঠি লেখা যেত।

জাহিদ টাইপ করতে শুরু করল।

"প্রিয় জাহিদ (১৮),

তুই এখন ভয়ে আছিস। GPA 4.17 নিয়ে পুরো পৃথিবী ভেঙে পড়েছে মনে হচ্ছে। আমি বলছি: পড়েনি।

রাসেল GPA-5 পেয়েছে, ফারুক পলিটেকনিকে চলে গেছে, তাহের মেডিকেলের জন্য কোচিং শুরু করেছে। সবার একটা পথ আছে। তোর কোনো পথ নেই।

এটা সত্যি না। তোর পথ আছে। শুধু তুই এখনো দেখতে পাচ্ছিস না। পথ সবসময় শুরুতে দেখা যায় না।"

জাহিদ একটু থামল। চায়ের কাপটা তুলে চুমুক দিল। চা ঠান্ডা। খেয়াল করল না।

"কিছু জিনিস তোকে বলতে চাই। দশটা কথা। মনে রাখবি।

১. GPA একটা সংখ্যা। জীবন সংখ্যায় চলে না। জীবন চলে সিদ্ধান্তে। 4.17 না, 5.00 না। তুই কি হাল ছাড়বি নাকি উঠে দাঁড়াবি, সেটাই আসল প্রশ্ন।

২. BUET, DU, Medical, এগুলো পথ, গন্তব্য না। গন্তব্য তোর নিজের হাতে। আমি NU-তে পড়েছি। আমি ব্যর্থ না।"

জাহিদ লিখতে লিখতে হাসল। NU-র কথায় একটু কষ্ট পেল, তারপরই হাসল। আগে কেউ জিজ্ঞেস করলে কোথায় পড়ো বলতে লজ্জা লাগত। এখন লাগে না।

"৩. NU-তে পড়া লজ্জার না। লজ্জা হলো কিছু না শেখা। তুই NU-তে গিয়ে ক্লাসের ফাঁকে YouTube-এ কোডিং শিখবি। সার্টিফিকেটটা NU দেবে। স্কিলটা তুই নিজে শিখবি।

৪. কোডিং শিখবি। YouTube থেকে। এটাই তোর জীবন বদলে দেবে।"

আঠারো বছরের জাহিদ কোডিং কী সেটাই জানত না। গ্রামের ছেলে, কম্পিউটার দেখেছে সাইবার ক্যাফেতে, Facebook চালানোর জন্য। কে বলবে সেই ছেলে একদিন React লিখবে, API বানাবে?

"আমি জানি তুই এখন 'কোডিং' শব্দটাও জানিস না। জানবি। তুই বাংলায় কথা বলিস, ইংরেজিতে লিখিস, আর JavaScript-এ ভাবিস। সেদিন আসবে।"

"৫. বাবার CNG-র meter যেমন শূন্য থেকে শুরু হয়, তোর ক্যারিয়ারও তাই হবে। প্রতিদিন নতুন করে শুরু। ভয় পাবি না।"

এই লাইনটায় জাহিদের চোখ ভিজে গেল।

বাবা প্রতিদিন সাড়ে পাঁচটায় উঠে CNG বের করতেন। meter-এ শূন্য। কতটুকু আয় হবে জানেন না। কিন্তু বের হতেন। জাহিদের Fiverr-ও তাই ছিল। প্রথম দিন শূন্য, দ্বিতীয় দিন শূন্য, সপ্তম দিন শূন্য। পনেরোতম দিন একটা অর্ডার। পাঁচ ডলার।

বাবার CNG-র meter আর জাহিদের Fiverr dashboard, একই জিনিস।

"বাবা ক্লাস এইট পাশ। কিন্তু বাবা যেটা জানেন সেটা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শেখায় না: প্রতিদিন উঠে কাজে বের হওয়া, কোনো গ্যারান্টি ছাড়া।"

"৬. মায়ের হিসাবের খাতাটা ভালো করে দেখবি। ওই খাতায় যা আছে, MBA-তে শেখায় না।"

মায়ের সেই খাতা। ময়লা মলাটের, বলপয়েন্ট কলমে লেখা। চাল কত, ডাল কত, বিদ্যুৎ বিল কত। যা আছে তা দিয়ে চলো। জাহিদ এখন CodeKaarigor-এর হিসাব করতে গিয়ে মায়ের খাতার কথা ভাবে। Income minus expenses equals savings। মা এটা MBA ছাড়াই জানতেন।

"মা বলেছিলেন, 'টাকা আসে, টাকা যায়। যেটা থাকে সেটাই তোমার।' এটা ফিনান্সের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত আর সবচেয়ে সত্য সংজ্ঞা।

৭. রাকিব ভাইয়ের ত্যাগ, এটা সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ তোর জীবনে। ফিরিয়ে দিবি।"

রাকিব ভাই নিজের Diploma ছেড়ে দিয়েছিল, গার্মেন্টসে চাকরি নিয়েছিল, মাসে বারো হাজার টাকা থেকে পাঁচ হাজার পাঠাত জাহিদের পড়ার জন্য। জাহিদ প্রথম Fiverr থেকে পঞ্চাশ ডলার তুলে প্রথম কাজ করেছিল রাকিব ভাইকে bKash করা। ভাই বলেছিল, "ধার কিসের? তুই তো আমার ভাই।" জাহিদ বলেছিল, "তাই তো শোধ করছি।"

এখন জাহিদ সাব্বিরের স্কুলের বেতন দেয়। রাকিব ভাই জাহিদের উপর বিনিয়োগ করেছিল, জাহিদ সাব্বিরের উপর করছে।

"বিনিয়োগের সেরা রিটার্ন কোনো stock market-এ নেই। সেটা আছে মানুষের উপর।"

"৮. বন্ধুদের সাথে তুলনা করবি না। রাসেলের পথ রাসেলের। ফারুকের পথ ফারুকের। তোর পথ তোর।"

জাহিদ জানে ১৮ বছরের জাহিদ এটা শুনবে না। কারণ পুরো সিস্টেমটাই তুলনার উপর দাঁড়িয়ে। মেধা তালিকা, GPA ranking, কে কোথায় চান্স পেল।

রাসেল এখন সিঙ্গাপুরে। ফারুক ইলেকট্রিক্যালের দোকান দিয়েছে, মাসে লাখ টাকার উপরে আয়। কিন্তু রাসেলের "ভালো থাকা" আর জাহিদের "ভালো থাকা" এক জিনিস না।

"তুলনা করবি না। তোর পথ আলাদা। আলাদা মানে খারাপ না। আলাদা মানে আলাদা।

৯. 'সফলতা' মানে টাকা না। সফলতা মানে সকালে উঠে যে কাজটা করো সেটা করতে ভালো লাগা।"

সকালে উঠে জাহিদ কোড লেখে। সেটা তার ভালো লাগে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে মনে হয় দিনটা বৃথা যায়নি। ১৮ বছর বয়সে সফলতা মানে ছিল চান্স পাওয়া। চান্স পাওয়া আর সুখী হওয়া যে এক জিনিস না, সেটা বুঝতে ষোলো বছর লেগেছে।

"১০. তুই পারবি। আমি জানি। কারণ আমি তোর ভবিষ্যৎ। আর আমি ঠিক আছি।

— জাহিদ (৩৪)"

জাহিদ চিঠিটা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ল। আস্তে আস্তে।

"বাবার CNG-র meter" লাইনটায় গলায় কিছু আটকে গেল। "রাকিব ভাইয়ের ত্যাগ" লাইনটায় চোখ ভিজে গেল। "মায়ের হিসাবের খাতা" লাইনটায় হাসল।

Ctrl+S। সেভ।

এটা কি BDFacts-এ পোস্ট করবে? হয়তো কোনো ছেলে বা মেয়ে পড়বে আর একটু শক্তি পাবে।

কিন্তু জাহিদ সিদ্ধান্ত নিল: না। এই চিঠিটা personal। এটা তার নিজের জন্য। কিছু জিনিস নিজের কাছে রাখতে হয়। সব কিছু content না।

কিন্তু অন্য একটা জিনিস publish করা যায়।

সে নতুন ডকুমেন্ট খুলল। এবার professional, data-driven। টাইটেল: "বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্তে ৯টি Cognitive Bias: একটি Framework।"

"প্রতি বছর বাংলাদেশে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী SSC ও HSC পরীক্ষা দেয়। এরপর কী? এই প্রশ্নের উত্তরে কমপক্ষে ৯টি cognitive bias কাজ করে।"

এক. Anchoring Bias: GPA দিয়ে জীবনের মূল্য নির্ধারণ।

দুই. Herd Mentality: সবাই Engineering পড়ছে তাই আমিও। নিজের আগ্রহ বিচার না করে পালের হাওয়ায় চলা।

তিন. Identity Bias: "আমি science student, আমাকে science-এই থাকতে হবে।"

চার. Status Bias: প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়ে নিজের মূল্য মাপা।

পাঁচ. Certainty Bias: "চাকরির গ্যারান্টি কোথায়?" নিশ্চয়তা বলে কিছু নেই।

ছয়. Present Bias: ভবিষ্যতের জন্য আজকের ত্যাগ করতে না পারা।

সাত. Survivorship Bias: "অমুক BUET থেকে Google-এ গেছে।" হাজারো যারা যায়নি তাদের কথা না ভাবা।

আট. Availability Bias: কাছের একটা উদাহরণ দিয়ে পুরো সিস্টেম বিচার করা।

নয়. Stigma Bias: "NU-তে পড়া মানে ব্যর্থ।" সামাজিক কলঙ্ক দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

১০

তারপর তিনটা প্রশ্ন:

প্রশ্ন ১: "আমি কি নিজের আগ্রহে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, নাকি অন্যদের দেখে?" এটা Herd, Identity, Status ফিল্টার করে।

প্রশ্ন ২: "আমি কি একটা সংখ্যা বা tag দিয়ে নিজেকে judge করছি?" এটা Anchoring, Survivorship, Availability ফিল্টার করে।

প্রশ্ন ৩: "আমি কি ভয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, নাকি তথ্যের ভিত্তিতে?" এটা Certainty, Present, Stigma ফিল্টার করে।

তিনটাতেই যদি উত্তর হয় "না, নিজের আগ্রহে, পুরো পরিস্থিতি বিবেচনা করে, তথ্যের ভিত্তিতে," তাহলে ভালো সিদ্ধান্ত। একটাতেও "হ্যাঁ" হলে, থামো, আবার ভাবো।

শেষে একটা decision matrix। চারটা কলাম: বিকল্পটা কী, আগ্রহ কতটুকু (১-১০), পরিবারের সামর্থ্য (হ্যাঁ/না/আংশিক), ৫ বছর পর কোথায় থাকব (নিজে research করে)। বাবার মতামত শুনবি, মায়ের মতামত শুনবি। কিন্তু সিদ্ধান্ত তোর। কারণ পরিণতিও তোর।

জাহিদ ডকুমেন্টটা সেভ করল। এটা পোস্ট করবে BDFacts-এ।

১১

জাহিদ ল্যাপটপ বন্ধ করল। রাত তিনটা।

পাশের ঘরে সুমাইয়া আর ইরা ঘুমাচ্ছে। জাহিদ আলতো করে দরজা খুলে উঁকি দিল। ইরা সুমাইয়ার বুকের উপর মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। ছোট্ট হাতটা মুষ্টি করে ধরে আছে।

বারান্দায় গেল। ঢাকার আকাশে তারা দেখা যায় না। আলোক দূষণ। কিন্তু তারা আছে। দেখা যাচ্ছে না মানে নেই না।

পথও তাই। ১৮ বছরের জাহিদ পথ দেখতে পাচ্ছিল না। কিন্তু পথ ছিল। সবসময় ছিল।

সে মনে মনে সেই ছেলেটার কথা ভাবল। সেই রোগা, ভীতু, চুপচাপ ছেলে যে ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখত। যে জানত না যে একদিন সে ঢাকায় থাকবে, নিজের ফ্ল্যাটে, নিজের মেয়েকে নিয়ে, নিজের আয়ে।

জাহিদ ফিসফিস করে বলল, "তুই পারবি।"

কেউ শুনল না। কিন্তু সেটা ঠিক আছে। কিছু কথা শোনার জন্য বলা হয় না। বলার জন্য বলা হয়।

১২

চিঠি পাঠানোর কোনো উপায় নেই। সময় পেছনে যায় না। ডাকবাক্সে ২০১০ সালের ঠিকানা লেখা যায় না।

কিন্তু বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও, এই মুহূর্তে, একটা ছেলে বা মেয়ে বসে আছে। হয়তো ফোনের স্ক্রিনে রেজাল্ট দেখছে। হয়তো 4.17 পেয়েছে, বা 3.50, বা 2.80। হয়তো মনে হচ্ছে পৃথিবী ভেঙে পড়েছে।

পড়েনি।

GPA একটা সংখ্যা। জীবন সংখ্যায় চলে না।

সিদ্ধান্ত নাও। নিজের সিদ্ধান্ত। Bias চেনো, প্রশ্ন করো, research করো। ভয়ে নয়, তথ্যে। পালের হাওয়ায় নয়, নিজের আগ্রহে।

পথ আছে। সবসময় আছে। 4.17 দিয়েও পথ আছে। 3.50 দিয়েও। শূন্য দিয়েও। কারণ পথ GPA তৈরি করে না। পথ তুমি তৈরি করো। তোমার সিদ্ধান্তে, তোমার পরিশ্রমে, তোমার ধৈর্যে।

চিঠি পাঠানোর কোনো উপায় নেই। কিন্তু হয়তো কোনো ১৮ বছরের ছেলে বা মেয়ে এটা পড়বে। আর বুঝবে: 4.17 দিয়েও পথ আছে। পথ সবসময় আছে।