পথচলা শেষ হয় না
GPA একটা সংখ্যা। তোমার জীবন একটা গল্প। সংখ্যা দিয়ে গল্প লেখা যায় না।
১
সন্ধ্যা ছয়টা বাজে। মাইমনসিং শহরের কালীবাড়ি রোডের মোড়ে একটা চায়ের দোকান।
দোকানটা পুরনো। কত পুরনো কেউ জানে না। কাদের চাচা নিজেও জানেন না। উনি বলেন, "আমার বাপ চালাইতো, আমি চালাই, আমার ছেলে চালাবে। হিসাব রাখার দরকার নাই।" দোকানের বেঞ্চটা কাঠের, তিন জায়গায় পেরেক মারা। দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডার, গত বছরের। ক্যালেন্ডারের ছবিতে কক্সবাজারের সমুদ্র। কাদের চাচা কোনোদিন কক্সবাজার যাননি।
জাহিদ বসে আছে। একা।
এই বেঞ্চে সে আগেও বসেছে। দশ বছর আগে। তখন সে আঠারো বছরের ছেলে। চার দশমিক এক সাত হাতে নিয়ে বসেছিল এই বেঞ্চে। কী করবে বুঝতে পারছিল না। পকেটে টাকা ছিল কুড়ি টাকা। বাবার দেওয়া। সেই কুড়ি টাকায় দুই কাপ চা হতো। একটা নিজের, একটা রাসেলের।
আজ আটাশ বছর বয়স। পকেটে কুড়ি টাকা না, বিকাশে ব্যালান্স আছে। কিন্তু জায়গাটা একই। বেঞ্চ একই। কাদের চাচা একই।
কাদের চাচা একটা কাপ চা নিয়ে এলেন। জাহিদ অর্ডার দেয়নি।
"তোমার জন্য চা সবসময় আছে।"
জাহিদ কাপটা হাতে নিল। চায়ে দুধ একটু বেশি। কাদের চাচা জানেন। দশ বছর ধরে জানেন।
২
চুমুক দিতে দিতে জাহিদ চারদিকে তাকাল।
শহরটা বদলেছে। এই মোড়ে আগে একটা মুদি দোকান ছিল, একটা সেলুন, একটা হোমিওপ্যাথি ফার্মেসি। এখন মুদি দোকানের সামনে bKash পয়েন্ট বসেছে। সেলুনের সাইনবোর্ডে লেখা "হেয়ার স্টাইলিং সেন্টার"। পাশে একটা মোবাইল ফোনের দোকান, সামনে Xiaomi-র পোস্টার।
আর রাস্তার ওপারে। যেখানে আগে ছেলেরা ক্রিকেট খেলত। এখন একটা দোতলা বিল্ডিং। নিচতলায় একটা ছোট অফিস। সাইনবোর্ডে লেখা: "কোডকারিগর"।
জাহিদের নিজের অফিস। সাতজনের টিম। মফস্বলের ব্যবসাগুলোর জন্য সফটওয়্যার বানায়। স্কুল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। ফার্মেসির স্টক। কৃষি সমবায়ের বাজার দরের অ্যাপ। ঢাকার স্টার্টআপের মতো চকচকে না। ফান্ডিং নেই, পিচ ডেক নেই। শুধু কাজ। মাসে জাহিদের হাতে আসে আশি-নব্বই হাজার। মাইমনসিংয়ে এটা অনেক টাকা। ঢাকায় এটা একটা ফ্ল্যাটের ভাড়া।
জাহিদ ঢাকায় থাকে না। থাকতে চায়ও না। এই শহরে বাবা-মা আছে। মিম ভার্সিটিতে পড়ছে। রাকিব ভাই গাজীপুর থেকে ফিরে নিজের ছোট গার্মেন্টস ইউনিট চালায়। বাবা এখনো মাঝে মাঝে CNG চালায়, অভ্যাসের জন্য। মায়ের সেলাই মেশিন চলে, কিন্তু এখন শখের সেলাই।
সন্ধ্যার আলো কমছে। জাহিদ চায়ের কাপ ঘোরাচ্ছে। ভাবছে।
৩
আজ সকালে ফোনে নোটিফিকেশন এসেছিল। "HSC ফলাফল ২০৩৬ প্রকাশিত।"
একুশ লাখ শিক্ষার্থী। আবার। প্রতি বছর একুশ লাখ। যেন একটা মেশিন প্রতি মার্চে একুশ লাখ ছেলেমেয়ে উৎপাদন করে, তাদের হাতে একটা করে GPA ধরিয়ে দেয়, বলে, "এবার নিজে চলো।"
দশ বছর আগে জাহিদ ছিল এদেরই একজন। চার দশমিক এক সাত। সেই সংখ্যাটা এখনো শরীরে গেঁথে আছে। কিন্তু সেটা এখন শুধু স্মৃতি। জীবনটা সে নিজে বানিয়েছে। ইট দিয়ে না, কোড দিয়ে।
ব্যাচের গ্রুপটা খুলল। "HSC 2026 Batch"। দুশো সতেরোজন মেম্বার। বেশিরভাগ মিউট। কিন্তু আজকে গ্রুপে নড়াচড়া আছে।
রাসেল লিখেছে: "দশ বছর। মনে আছে সেই দিনটা? আমি পাঁচ পেয়ে ভেবেছিলাম জীবন সেট।"
রাসেল এখন ঢাকায়। BUET থেকে পাস করে মাল্টিন্যাশনালে চাকরি। বেতন ভালো। কিন্তু গত বছর ফোনে বলেছিল, "দোস্ত, অফিসে বসে মরে যাচ্ছি। কোনো ক্রিয়েটিভিটি নেই। শুধু রিপোর্ট আর মিটিং।" জাহিদ বলেছিল, "ছেড়ে দে।" রাসেল বলেছিল, "ছাড়ব কীভাবে? ফ্ল্যাটের লোন আছে।"
GPA 5 পাওয়া ছেলে। দশ বছর পর ফ্ল্যাটের লোনে আটকে আছে। জীবন সেট হয়নি। জীবন কখনো সেট হয় না।
৪
ফারুক লিখেছে: "আমি তো আজকে নিশাপুরে আছি। নতুন সোলার প্ল্যান্ট।" সাথে একটা সেলফি। হেলমেট পরা। পেছনে সোলার প্যানেলের সারি।
ফারুক। GPA 3.80। পলিটেকনিক। সবাই বলেছিল বেচারা। সেই বেচারা এখন মাসে দেড় লাখ আয় করে। নিজের কোম্পানি। নিজের পিকআপ ভ্যান। নিজের টিম। ফারুক জানে সোলার প্যানেল কীভাবে লাগাতে হয়, ব্যাটারি কীভাবে কনফিগার করতে হয়, ইনভার্টার কীভাবে ক্যালিব্রেট করতে হয়। এগুলো কোনো BBA বইয়ে নেই। এগুলো হাতে শেখা জিনিস।
কিন্তু ফারুক মাসে কুড়ি দিন বাইরে। স্ত্রী ফোনে অভিযোগ করে। ছেলেটা বাবাকে চেনে, কিন্তু বাবার সাথে থাকে না।
সুমাইয়া লেখেনি। সুমাইয়া কখনো গ্রুপে লেখে না। সুমাইয়া ডাক্তার। ময়মনসিং মেডিকেলে। প্রাইভেট প্র্যাকটিস ধরলে মাসে এক লাখ হয়। সামাজিক মর্যাদা আছে, মানুষ "ম্যাডাম" বলে ডাকে। কিন্তু সপ্তাহে ছয় দিন হাসপাতালে। নিজের জন্য সময়? নেই।
আরিফ কোরিয়ায়। পাঁচ বছরের প্ল্যান করেছিল, সাত বছর হয়ে গেছে। মাসে দুই লাখ আয় করে। দেশে এক লাখ পাঠায়। বাবা-মায়ের ঘর পাকা হয়েছে। বোনের ছেলে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। কিন্তু আরিফ নিজে? কোরিয়ায় একটা ছোট ঘরে থাকে। একা।
জাহিদ। নিজে। মাসে আশি-নব্বই হাজার। রাসেলের চেয়ে কম। ফারুকের চেয়ে কম। আরিফের চেয়ে কম। সুমাইয়ার সমান।
কিন্তু জাহিদ প্রতিদিন সন্ধ্যায় কাদের চাচার দোকানে চা খায়। বাবা-মায়ের সাথে রাতের খাবার খায়। অফিস পাঁচ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে। ঢাকার ট্র্যাফিকে আটকে থাকতে হয় না। ফ্ল্যাটের লোন নেই। বিদেশে একা ঘরে বসে থাকতে হয় না।
কে জিতেছে?
৫
কেউ জেতেনি।
কারণ এটা রেস না।
এই কথাটা বুঝতে জাহিদের দশ বছর লেগেছে। এই কথাটা HSC-র রেজাল্টের দিনে কেউ বলেনি। কোচিং সেন্টারে বলেনি। পাড়ার মানুষ বলেনি। বাবা বলেনি। মা বলেনি। কারণ তারাও জানত না।
সবাই বলেছিল: "সেরা হতে হবে।" কিন্তু সেরা মানে কী? রাসেলের বেতন? ফারুকের ব্যবসা? সুমাইয়ার সম্মান? আরিফের টাকা? জাহিদের স্বাধীনতা?
প্রতিটার সাথে একটা দাম আছে। রাসেলের বেতনের দাম স্বাধীনতা। ফারুকের ব্যবসার দাম পরিবার। সুমাইয়ার সম্মানের দাম সময়। আরিফের টাকার দাম দেশ। জাহিদের স্বাধীনতার দাম আয়।
পাঁচজনের মধ্যে জাহিদ সবচেয়ে কম আয় করে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি হাসে। এটা সাফল্য, নাকি সান্ত্বনা? জাহিদ জানে না। জানার দরকারও নেই।
চার্টটা দেখলে একটা জিনিস পরিষ্কার হয়। পাঁচটা লাইন। পাঁচজন। আটটা মাপকাঠি। আয়, চাকরির নিরাপত্তা, পরিবারের সময়, স্বাস্থ্য, সামাজিক মর্যাদা, স্বাধীনতা, বৃদ্ধির সুযোগ, সুখ। কোনো একটা লাইন সবকটায় সেরা না। প্রতিটা লাইন কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু। কোনো একটা পথ সব দিক থেকে শ্রেষ্ঠ না।
এটাই উত্তর। উত্তর এই যে কোনো একটা উত্তর নেই।
৬
জাহিদ চায়ের শেষ চুমুক খাচ্ছে। এমন সময় একটা ছেলে এসে পাশে বসল।
ছেলেটার বয়স সতেরো-আঠারো হবে। হাতে একটা ফোন। চোখে সেই চেনা চাহনি। দশ বছর আগে জাহিদের চোখেও এটা ছিল। ভয়, আশা, বিভ্রান্তি, সব মিলিয়ে একটা ঘোলাটে কিছু।
ছেলেটা ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। স্ক্রিনে একটা সংখ্যা। জাহিদ দেখতে পেল না সংখ্যাটা। কিন্তু ছেলেটার মুখ দেখে বুঝল, পাঁচ না।
কাদের চাচা ছেলেটার সামনে একটা চা রাখলেন। "আজকে HSC রেজাল্ট। আজকের সব ছেলেদের চা ফ্রি।" কাদের চাচা প্রতিবছর বলেন। এটা তাঁর নিয়ম।
জাহিদ ছেলেটার দিকে তাকাল।
"রেজাল্ট কত পেয়েছো?"
ছেলেটা একটু চমকে তাকাল। তারপর মাথা নিচু করল।
"তিন দশমিক আটনয়।"
গলার স্বরে লজ্জা। যেন অপরাধ করেছে। যেন তিন দশমিক আটনয় একটা অপরাধের শাস্তি।
জাহিদ হাসল। আস্তে।
"তিন দশমিক আটনয়? আমার এক বন্ধু তিন দশমিক আশি পেয়েছিল। দশ বছর আগে।"
ছেলেটা তাকাল। "তারপর?"
"এখন সে মাসে দেড় লাখ টাকা আয় করে। নিজের ব্যবসা। সোলার এনার্জি।"
ছেলেটার চোখ একটু বড় হলো। "সত্যি?"
"সত্যি। কিন্তু সেটা সে GPA দিয়ে করেনি। স্কিল দিয়ে করেছে। হাতের কাজ শিখেছে। ইলেকট্রিক্যাল সিস্টেম শিখেছে। সোলার ইনস্টলেশন শিখেছে। মার্কেট বুঝেছে। তারপর নিজে শুরু করেছে।"
ছেলেটা চুপচাপ শুনছে। চায়ে হাত দেয়নি।
৭
"আমি কী করবো?"
প্রশ্নটা এলো। জাহিদ জানত আসবে। দশ বছর আগে সে নিজে এই প্রশ্ন করেছিল। বাবাকে। গুগলকে। bdfacts.org-কে। কেউ পুরো উত্তর দেয়নি। কারণ পুরো উত্তর কারো কাছে নেই।
জাহিদ উত্তর দিল না। তার বদলে বলল, "তিনটা জিনিস ভাবো।"
ছেলেটা তাকাল।
"এক। তুমি কী করতে ভালোবাসো? মানে সত্যিকারের ভালোবাসো। টাকার জন্য না, মানুষ কী বলবে তার জন্য না। যেটা করতে গেলে সময় কোথায় চলে যায় বোঝা যায় না, সেটা।"
ছেলেটা ভাবছে।
"দুই। তোমার পরিবার কতটুকু সাপোর্ট দিতে পারবে? এটা টাকার কথা শুধু না। সময়ের কথা। ধৈর্যের কথা। তোমার বাবা কি দুই বছর অপেক্ষা করতে পারবে তুমি কিছু না আয় করলেও? নাকি ছয় মাসের মধ্যে টাকা লাগবে? এটা জানা দরকার। কারণ সব পথ একই সময়ে ফল দেয় না।"
ছেলেটা মাথা নাড়ল। ফোনটা হাতে ঘোরাচ্ছে। কিন্তু স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছে না।
"তিন। বাংলাদেশের দশ বছর পরে কী দরকার হবে? এখন যেটা হট, সেটা দশ বছর পরে নাও থাকতে পারে। দশ বছর আগে সবাই বলত BBA করো। এখন BBA করে লাখ লাখ ছেলেমেয়ে বেকার। দশ বছর আগে কেউ বলত না কোডিং শেখো। এখন কোডিং জানা ছেলেমেয়ে পৃথিবীর যেকোনো জায়গা থেকে কাজ করতে পারে। সোলার এনার্জি দশ বছর আগে কেউ গুরুত্ব দেয়নি। এখন প্রতিটা জেলায় সোলার কোম্পানি।"
জাহিদ থামল।
"ভবিষ্যৎ কী চাইবে, সেটা পুরোপুরি জানা যায় না। কিন্তু দিকটা বোঝা যায়।"
ছেলেটা ফোনে নোট অ্যাপ খুলল। তিনটা পয়েন্ট টাইপ করতে শুরু করল। দশ বছর আগে জাহিদের কাছে নোট অ্যাপ ছিল না। ছিল একটা পুরনো খাতা। সেখানে লিখেছিল, "আমি কী করবো?" উত্তর লেখেনি। কারণ উত্তর ছিল না।
এই ছেলেটার কাছেও উত্তর নেই। কিন্তু প্রশ্নগুলো লিখে রাখছে। এটাই শুরু।
৮
"আর একটা কথা।"
ছেলেটা তাকাল।
"কী?"
জাহিদ একটু চুপ করল। কথাটা কোনো বইয়ে পড়েনি। জীবন শিখিয়েছে।
"GPA একটা সংখ্যা। তোমার জীবন একটা গল্প। সংখ্যা দিয়ে গল্প লেখা যায় না।"
ছেলেটা কিছু বলল না। কিন্তু তার চোখ বদলাল। সেই ঘোলাটে ভাবটা একটু কমল। পুরো গেল না। কিন্তু একটু কমল। এটুকুই যথেষ্ট।
কাদের চাচা দূর থেকে দেখছেন। চা বানাচ্ছেন। কাদের চাচা জানেন না GPA কী। তিনি জানেন চা কীভাবে বানাতে হয়। তিন প্রজন্ম ধরে জানেন। কাদের চাচার দোকান চল্লিশ বছর ধরে চলছে। চল্লিশ বছর টিকে থাকা, এটাও সাফল্য।
৯
জাহিদ চায়ের দাম দিল। দুই কাপের। নিজেরটা আর ছেলেটারটা।
ছেলেটা বলল, "না, আমি দিই।"
"থাক। আজ আমার তরফ থেকে।"
ছেলেটা "ধন্যবাদ" বলল। তারপর জিজ্ঞেস করল, "আপনি কী করেন?"
জাহিদ রাস্তার ওপারে তার অফিসের দিকে ইশারা করল। "কোডকারিগর। সফটওয়্যার বানাই।"
"আপনার GPA কত ছিল?"
জাহিদ হাসল। "চার দশমিক এক সাত।"
ছেলেটা তাকাল। চার দশমিক এক সাত। তিন দশমিক আটনয়। পার্থক্য কত? শূন্য দশমিক আটাশ। কিন্তু দুজনের দুনিয়া? একই। একই ভয়। একই প্রশ্ন। একই রাস্তা।
জাহিদ উঠে দাঁড়াল।
"যাই।"
"আচ্ছা।"
"একটু ভাবো। তাড়াহুড়ো করো না। পথ বানাতে সময় লাগে। কিন্তু বানাতে পারলে সেটা তোমার নিজের পথ। কেউ কেড়ে নিতে পারে না।"
ছেলেটা মাথা নাড়ল।
১০
জাহিদ হাঁটতে শুরু করল। বাড়ির দিকে। পাঁচ মিনিটের পথ।
একই রাস্তা। তখন ল্যাম্পপোস্ট ছিল তিনটা, দুটো কাজ করত। এখন পাঁচটা, সবগুলো LED। ডানপাশে পুকুরের জায়গায় ব্যাংকের ব্রাঞ্চ। বাঁপাশে মাঠের জায়গায় কোচিং সেন্টার। কোচিং সেন্টার এই দেশে কখনো কমবে না।
আকাশে তারা উঠতে শুরু করেছে। মাইমনসিংয়ে এখনো তারা দেখা যায়। ঢাকায় যায় না। রাসেল তারা দেখতে পায় না। আরিফ দেশের তারা দেখতে পায় না। ফারুক ছেলের মুখ দেখতে পায় না। সুমাইয়া নিজের মুখ দেখতে পায় না।
জাহিদ তারা দেখতে পায়। এটা কি যথেষ্ট? জাহিদ জানে না। কিন্তু আজকের জন্য যথেষ্ট।
১১
পেছনে ফিরে তাকাল।
কাদের চাচার দোকানে সেই ছেলেটা এখনো বসে আছে। ফোনের দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু এইবার ফোনের স্ক্রিনে GPA নেই। স্ক্রিনে নোট অ্যাপ। তিনটা প্রশ্ন।
ছেলেটা ভাবছে।
সেটাই যথেষ্ট। ভাবা শুরু করাই যথেষ্ট। পথটা পরে আসবে। আগে প্রশ্ন, তারপর পথ। এই ক্রমটা উলটালে মানুষ হারিয়ে যায়। দশ বছর আগে জাহিদ প্রশ্ন করেছিল বলেই পথ পেয়েছে। রাসেল প্রশ্ন না করে পথে নেমে গেছিল বলেই আজ আটকে আছে।
জাহিদ ঘুরে হাঁটতে লাগল।
একই রাস্তা। একই তারা। একই শহর।
কিন্তু জাহিদ আর আগের জাহিদ না। আর চায়ের দোকানের সেই ছেলেটাও কাল আর আজকের ছেলে থাকবে না।
পথচলা এভাবেই কাজ করে। তুমি হাঁটো, পথ বদলায়। তুমি থামো, পথ থামে না। তুমি পড়ে যাও, পথ অপেক্ষা করে।
১২
জাহিদের পথচলা শেষ হয়নি।
কারণ পথচলা কখনো শেষ হয় না। শুধু পথ বদলায়। পা বদলায় না।
আজ একুশ লাখ ছেলেমেয়ে HSC রেজাল্ট পেয়েছে। একুশ লাখ ফোনে একটা করে সংখ্যা এসেছে। কেউ পেয়েছে পাঁচ। কেউ পেয়েছে চার দশমিক কিছু। কেউ পেয়েছে তিন। কেউ পাস করেনি।
কিন্তু সংখ্যাটা শুরু। শেষ না।
দশ বছর পর এই একুশ লাখের কেউ ডাক্তার হবে। কেউ ইঞ্জিনিয়ার হবে। কেউ ব্যবসা করবে। কেউ বিদেশে যাবে। কেউ কোডিং শিখবে। কেউ সোলার প্যানেল লাগাবে। কেউ চায়ের দোকান চালাবে। কেউ হারিয়ে যাবে। কেউ খুঁজে পাবে।
কে কোথায় যাবে, সেটা GPA ঠিক করবে না। সেটা ঠিক করবে সে কী প্রশ্ন করল, কী শিখল, কতটা হাঁটল, কতবার পড়ে উঠল।
এই গল্প জাহিদের। কিন্তু জাহিদ একা না।
২১ লাখ জাহিদ আজ পথ খুঁজছে। এই গল্প তাদের জন্য।